হেরে যাওয়াই ব্যর্থতা

হেরে যাওয়াই ব্যর্থতা

” আন্টি এ মাসের বেতন টা আজ দিতে পারবেন? খুব উপকার হতো! ” আমার কথা শোনে আন্টির মুখ মূহুর্তেই ফ্যাকাসে হয়। আন্টি বললেন,

‘ কিভাবে দেই বলো! তোমার আঙ্কেলের মাস পূর্নতা হয়নি। তাই হাতে তেমন টাকা নেই। আর তুমি তো দুই মাস ধরে উর্মিকে পড়াচ্ছো।’

” দেখেন আন্টি দেয়া যায় কিনা? বাবা অসুস্থ। উনার জন্য কিছু ঔষুধ আর ছোট বোনের জন্য একটা ক্রিম নিতে হবে। অনেক উপকার হবে। ”

আন্টি আনমনা মনে রুমে যায়। আমি বসে বসে উর্মিকে পড়াচ্ছি। উর্মি মেয়েটাও একটু ভিন্ন রকম। পড়ার সময় আজব আজব প্রশ্ন করে বসে। পনেরো মিনিট মনোযোগ দিয়ে পড়লে বাকি সময়টুকু দুষ্টুমি করে কাটিয়ে দেয়। উর্মি বলে স্যার, আপনারা গরিব কেনো? কোনো উত্তর জানা ছিল না আমার। আবার বলে স্যার, আমার আব্বু প্রতি সপ্তাহে রাত হলে অনেক গুলা টাকা ড্রয়ারে রাখে তালা দিয়ে। কিন্তু আমারে দেয়না। দুজনে কথা বলতে বলতেই আন্টি এসে হাজির। আমার হাতে সাতশো টাকা দিয়ে বললেন, তোমার আর উর্মিকে পড়াতে আসতে হবে না। মনে মনে দুই মাসের পড়ানোর সময়টুকু হিসেব মিলানোর চেষ্টা করছি। কিছুতেই ভুল কিছু খুঁজে পেলাম না। তাহলে আন্টি হঠাৎ আসতে মানা করলো কেনো? উত্তরটা জানার জন্য বললাম, আন্টি আমার অন্যায়টা কোথায়? আন্টির চোখে রাগ ভেসে আছে। বললো, ওর জন্য অন্য টিচার রাখছি। হাতে ছিল আর বিশ মিনিট। কখন যে সময় পেরিয়ে গেল টেরই পেলাম না। মুখে হাসি নিয়ে আন্টিদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসলাম।

ওখান থেকে বেরিয়ে বাবার জন্য কিছু ঔষুধ ক্রয় করলাম। ছোট বোনের জন্য ক্রিম কিনতে ক্যাপসুল মার্কেটে যাই। ক্রিমটার দাম অনেক বেশি। আকুতি-মিনতি করেও মূল্য কমাতে পারিনি। পাশ থেকে হঠাৎ একটি অপরিচিত মেয়ে এসে বলল, ভাইয়া আপনাকে অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছি কী নিয়ে যেন জোরাজুরি করছেন। কিছু মনে না করলে আমি হেল্প করতে পারি? মেয়েটিকে সব ঘটনা বললাম। সে ক্রিমের পুরো টাকা টা দিতে চাচ্ছে। আমি নিতে চাচ্ছি না কারণ, মেয়েদের ইনকাম সোর্চ খুব-ই সীমিত। সে জোর করেই ক্রিমের টাকা’টা দিয়ে দিল। মেয়েটির নাম কী, কি করে কিছুই জানা হয়নি। ভাবছি জিজ্ঞাসা করবো। সেই মূহুর্তে মেয়েটি চলে যায়। আমিও চলে এলাম।

মায়ের হাতে বাবার ঔষুধের থলেটা দিয়ে বললাম, এখন বাবার কি অবস্থা? মা বলল, একটু কমের দিকে। আমি রুমে চলে এলাম। ছোট বোন পল্লবী শুয়ে শুয়ে বিজ্ঞান বই পড়ছে। আমাকে দেখা মাত্র বই বন্ধ করে গুছিয়ে রেখে দিল। পল্লবী ঠোঁট বাকা করে হাসি দিয়ে বলে, ভাইয়া তোমার হাতে কি? এটা তোর কালো মুখ ফর্সা করার মেশিন নে ধর। ক্রিমটা পেয়ে বেশ খুশি। ওদের খুশিটা যেন আমার অনেক কিছু। এমন সময় পাশের রুম থেকে বাবার খকখক কাশির আওয়াজ শোনতে পেলাম। ওখানে গিয়ে বাবাকে ঔষুধ খাওয়ালাম। ঔষুধ একদমি খেতে চায় না। দিন দিন পরিবারের আর্থিক অবস্থাটা যেন অবনতির দিকে যাচ্ছে।

মন খারাপ হলে বাসার ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকি। আজও তাই করলাম। চারিদিকে চোখ বুলিয়ে প্রকৃতি দেখছি। হঠাৎ পানির ট্যাংকির দিকে নজর পড়ে। দেখতে পাই ওখানে একটি মেয়ে দাঁড়ানো। কানে হেডফোন, হাতে মুঠোফোন। সম্ভবত গান শুনছে। এই মেয়ে আমাদের ফ্ল্যাটে থাকে বলে মনে হয় না। আগ্রহ নিয়ে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাকে দেখে কানে থেকে হেডফোন খুললো। তাঁর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। এমন সুন্দরী, রূপবতী আর একজন আছে বলে মনে হচ্ছে না।

চোখ দুটো কালো কুচকুচে। ভ্রুটা যেন একদম চিকন। সুন্দরী মেয়েদের সৌন্দর্যরূপ নিয়ে প্রশংসা করতে হয় না। তাহলে তারা ভেবে বসে খারাপ দিক বুঝানো হচ্ছে। নাম জিজ্ঞাসা করবো কিন্তু ভয়ে আঁতকে যাচ্ছি। শেষ-মেশ নাম জিজ্ঞাসা করে ফেললাম। দু’ঠোঁট খানিকটা বাকা করে নাম বললো জান্নাতুল ফেরদৌস। নামে যেমন সুন্দর তেমনি রূপের দিক দিয়েও কমতি নেই। হঠাৎ মেয়েটির মোবাইলে ফোন আসে। আর ছাদ থেকে চলে যায়। বাবা অসুস্থ আর মা তেমন কাজ কর্ম করতে পারে না। সংসারের যাবতীয় খরচ আমার উপর। পরিবারের সদস্য সংখ্যা চার জন্য। দুটো রুম ভাড়া নিয়ে শহরেই অবস্থানরত আছি। রাতে আমি আর পল্লবী শুয়ে আছি। এমন সময় আমার দিকে মুখ করে বলল,

” ভাইয়া, ফ্ল্যাটে একটা নতুন মেয়ে আসছে। দেখতে খুবই সুন্দর। তোমার সাথে ভালো মানাবে। ” আমি স্তব্ধ হলাম পল্লবীর কথা শোনে। তাহলে কী ও সব দেখে ফেলছে? কথাটা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলাম। বললাম,

” আমি দেখি নাই। আর কাউকে নিয়ে এমন কথা বলতে হয় না। ” লক্ষ্য করলাম ওর মুখটা হঠাৎ পেঁচার মত হয়ে গেল।

” ভাইয়া, বাড়িতে আসার পর থেকে দেখছি তোমার মন খারাপ। আমার সাথেও তেমন কথা বলছো না। কি হয়েছে ভাইয়া? ” আমি পল্লবীর কাছে কখনো কিছু লুকাইনি। তবে আজ লুকাতে হচ্ছে। বললাম,

” না, কিছু না। এমনি শরীর টা ভালো লাগছে না। ”

পল্লবী আর কিছু না বলে ঘুমিয়ে পড়লো। আমার ঘুম আসছে না। মেয়েটির জন্য নয়, ঘুম আসছে না টিউশনির জন্য। কী এমন অপরাধ ছিল তার জন্য বাদ দেয়া হলো আমাকে? রাত জুড়ে সংসার নিয়ে চিন্তার জগতে ব্যস্ত আমি। সেই অপরিচিত মেয়ে মানে জান্নাতুলকে মনে করার চেষ্টা করছি। যদি সংসারের কথা ভুলে থাকতে পারি! কিন্তু কিছুতেই পারছি না।

ঘুম না আসাতে ছাদের উপর যাবো ভাবছি। সিঁড়ির গুন্ডি পেরিয়ে ছাদের গেটের কাছে পৌঁছিয়ে দেখি গেট খোলা। এতো রাতে ছাদে কারো থাকার কথা না। কিন্তু আমি তো দেখছি গেট খোলা। হয়তো ভুল করে কেউ খোলে রেখেছে! ছাদের কোণে বসে বসে মোবাইলে গান শুনছি। হালকা বাতাস, মিটিমিটি তাঁরা জ্বলছে বেশ মুগ্ধকর পরিবেশ। হঠাৎ পেছন থেকে গলা খাকারের শব্দ শোনতে পেলাম। তাকিয়ে দেখি জান্নাতুল। কিন্তু ও এতো রাতে এখানে কি করবে? ও বলে ভাইয়া, এতো রাতে একা একা বসে বসে গান শুনছেন ভূতের ভয় পান না? ভয়! কিসের ভয়? ভয় তো পাই মানুষের নিতীবান কথায়। মেয়েটি আমতা আমতা করে বলে, ভাইয়া আমি আপনার পাশে বসতে পারি? একচিলতে হাসি দিয়ে বললাম, বসতে পারেন সমস্যা নাই। পাশে বসলো। দুজনের মাঝখানে বাঁধা হিসেবে জান্নাতুলের মোবাইল রাখা ছিল। আমি অল্প আলোতে বসে বসে মোবাইল টিপছি আর গান শুনছি। ও বিরক্ত হয়ে বলে, মোবাইল রাখেন তো! আপনাদের ছেলেদের এই একটা সমস্যা। সারাক্ষণ মোবাইল আর মোবাইল। কারো সাথে ভালো ভাবে বসে কথা বলেছেন কখনো? দেখবেন খুব ভালো লাগবে, মনের অশান্তি গুলো নিমিশেই চলে যাবে। আমি মাঝখানে মোবাইল রেখে থুতনিতে ভর করে জান্নাতুলের দিকে তাকিয়ে আছি। যদিও ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিছু দেখা যাচ্ছিল না। আমি বললাম,

” আমি না-হয় নির্জন গভীর রাতে একা বসে আছি। কিন্তু আপনি এতো রাতে এখানে আছেন কেনো? ”

” ঘুম আসছে না কিছুতেই। তাই ভাবলাম ছাদে গিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করে আসি। ভালোই হলো আপনাকে পেয়ে। দুজনে ঘুম না আসা পর্যন্ত গল্প করতে পারবো। ”

” আমি যদি গল্প না করি! যদি চলে যাই? ” জান্নাতুল হাসি দিয়ে বলে,

” কেউ যেতে চাইলে তাকে আটকানো ঠিক হবে না। ”

” বেশ, আমার নাম জিজ্ঞাসা করলেন না যে! জানার ইচ্ছা নেই নাকি?

ও লজ্জা স্বরুপ হাসিয়ে বলে, ভাইয়া দুঃখিত। মনে ছিল না। প্লিজ ভাইয়া কিছু মনে করবেন না। আসলে সারাদিন রুমে একা একা থাকি তো মন ভালো থাকে না। মনে হয় পোষা প্রাণীদের মত খাঁচায় বন্ধী হয়ে আছি। আমি বললাম, জ্বী আমার নাম আবির। অনার্স কমপ্লিট করেছি। এখন বেকার। বুঝতে পারলাম ও চমকে উঠলো। বলে, কেনো ভাইয়া, আর পড়বেন না? আমি বললাম পড়ার ইচ্ছে থাকলেও কিছু সময় পরিস্থিতির জন্য পড়া হয়না। ছাড়ুন তো এসব কথা, রুমে একা থাকেন কেনো? অাঙ্কেল আন্টি উনারা কোথায় থাকে? ও মাথা নিচু করে বলল, মা বাবা দুজনেই চাকুরি করে। দুই দিন পর পর বাসায় আসে।

জানেন না ভাইয়া, একা একা দিন কাটানো খুবই যন্ত্রনার। আপনি ছাদে একা একা আনমনা হয়ে গান শুনছিলেন কেনো? বললাম, কিছু কথার উত্তর জানা থাকে না। প্রশ্নের জন্য কারণ গুলো মারা যায়। এক এক করে সব ঘটনা খোলে বলি। জান্নাতুল মাথা নিচু করে বলল, আপনি ইচ্ছে করলে আমাকে পড়াতে পারেন। আপনার জন্যও ভালো হবে আর আমারও কষ্ট করে বাহিরে গিয়ে দৌড়া দৌড়ি করতে হবে না। আমি আমতা আমতা করে বললাম, কিন্তু অাঙ্কেল আন্টিকে না জানিয়ে ঠিক হবে না মনে হয়! ও সব আমি দেখবো। আপনি কাল থেকেই পড়ানো শুরু করবেন আমাকে। ও চলে গেল। আমিও রুমে এসে শুয়ে পড়লাম।

সকালে ঘুম ভাঙে পল্লবীর চেঁচামেচিতে। সাধারণত খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠি। কিন্তু কাল বেশি রাত্রি জাগরণ হয়েছে তাই সকালে জাগনা পাইনি। ঘুম ঘুম চোখে বললাম, ” সাতসকাল ডাকছিস কেনো, কি হয়েছে? ” ভাইয়া, এক বড় আপুর সাথে সামনে সপ্তাহে পিকনিকে যাবো। এক হাজার টাকা লাগবে।”

টাকার কথা শোনে মনে হলো মাথায় আমার আসমান ভেঙে পড়ে। এদিকে টিউশনিটাও নেই। টাকা টা এখন কোথায় পাবো? আর পল্লবীকেই বা এখন কী জবাব দিবো! তবুও শান্তনা স্বরুপ বললাম যাওয়ার দুই দিন আগে দিবো।
কয়েক বন্ধুর কাছে ফোন দিয়ে কিছু টাকা ধার চাইলাম। ওরা কেউ দিবে না বুঝতে পারলাম। একেক জনে একেক বাহানা দেখিয়ে এড়িয়ে যাচ্ছে। মধ্যবিত্তটা যেন গলায় বেধে থাকা কাটার মত। গিলতে চাইলে আরো ভালো ভাবে আটকে যায়।

সন্ধ্যা ছয়টা, জান্নাতুলকে এখন পড়ানোর সময়। যেতে লজ্জাও করছে। মনে মনে ওকে ভালো লাগা কাজ করছে। সামর্থ্যনুযায়ী ভালো লাগা প্রকাশ করতে হয়। আমার মাঝে ভালো লাগা প্রকাশ করার মত সামর্থ্যটা নেই। দরজার সামনে গিয়ে টুকা দিলাম। ও দরজা খোলেই স্বাগতম জানায়। রুমে ঢুকে খাটের উপর পা ঝুলিয়ে বসলাম। আমার জন্য হালকা নাস্তার ব্যবস্থা করলো। খেয়াল করলাম ও মুচকি মুচকি হাসছে। কিন্তু আমার মাঝে হাসির ছায়াটা আসছে না। তবুও ঠোঁট বাকা করে হাসির অভিনয় করে যাচ্ছি। আমি নাস্তা খাচ্ছি আর জান্নাতুল বলছে, আপনাকে আজ কেমন যেন অন্য মনষ্ক দেখা যাচ্ছে! কিছু হয়েছে? ওর প্রতি দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছি, তাই সত্যিটাই বলে দিলাম। জান্নাতুল ওর পার্স থেকে এক হাজার টাকা বের করে আমার হাতে দিল। বললাম, আমাকে টাকা দিলেন কেনো? মাস তো পূর্ন হয়নি। আজ কেবল শুরু করলাম। প্রথম টিউশনিটা এর জন্যই চলে যায় আমার। জান্নাতুল আমার কথা শোনে হাসছে। এভাবে কয়েকবার বারণ করা সত্যেও কাজ হলো না। কিন্তু ওকে যে আমার ভালো লাগে এটা বলতে পারছি না। অভাবের কাছে ভালোবাসাটাও যেন ব্যর্থ।

এভাবে কয়েকদিন পড়ানোর পর হঠাৎ দেখি ওদের রুমে তালা ঝুলছে। আমি হতভম্ব হলাম। মনে মনে ভাবছি, ওদের রুমটা তালা থাকবে কেনো? পড়ানোর দোহাই দিয়ে ওর সাথে মন ভরে কথা বলা যেত। কিন্তু এখন আর সেটাও হচ্ছে না। নাম্বারও নেই ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করবো। রুমে এসে পল্লবীর কাছে জিজ্ঞাসা করলাম। ও যা বলল শোনে স্তব্ধ হলাম। বলে, আপুরা তো আজ দুপুরে চলে গিয়েছে। আমি বললাম, যাওয়ার সময় ও কিছু বলে যায়নি? না ভাইয়া, কিছুই বলে যায়নি। শোনার সঙ্গে সঙ্গেই চোখ ভিজে গেল আমার। এই প্রথম দুই দিনের সম্পর্কের জন্য চোখে পানি আসলো। পল্লবী বলে, ভাইয়া তুমি জান্নাতুল আপাকে পছন্দ করতে তাইনা? চোখের পানি মুছে বললাম, না এমনি পানি আসছে চোখে।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত