অবেলায়

অবেলায়

ঘড়ির কাটা অনুযায়ী পশ্চিমাকাশে সূর্য হেলে পড়ার কথা হলেও সূর্য এখনো অস্ত যায়নি, সন্ধ্যাও হয়নি। তবে চাঁদ বিহীন সন্ধ্যার আকাশে মিটিমিটি করে জ্বলতে থাকা গোটা কয়েকটি তারা জানান দিচ্ছে রাত খুব নিকটে। সাথে শীতের প্রকোপটাও তীব্র আকার ধারণ করছে। ঝাপসা কুয়াশা চারপাশ জুড়ে ঘিরে আছে। শীতের মসৃণ শিশির কণা গ্লাসের আবরণ ভেদ করে পুরো শরীর জুরে বিচরণ করছে। জাগ্রত করে তুলছে গায়ের লোম সমগ্রলোক কে।
.
তখন আমি বাসের পিছনের সামনের সিটে চুপটি করে বসে আনমনে সিগারেট ফুকছিলাম। অফিসের একটা প্রজেক্টের কাজে বাধ্য হয়ে সিলেট যেতে হচ্ছে। যদিও যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিলো না তবুও।
যতটুকু উপনীত হচ্ছিলাম আমার পিছনের সিটে কোন এক অন্ধ মেয়ে বসে আছে। বাস হালকা ব্রেক চেপে বসলেই তিনি সজোরে আমার সিটের সাথে ধাক্কা খাচ্ছিলেন। আবার আমার চুলে ভুল করে অনেকবার হাতও বুলাচ্ছিলেন।
.
আর আমার পাশের সিটে সদ্য ভূমিষ্ঠা হওয়া এক শিশুর সগর্ভা মা ছিলেন। চেহারার গড়ন-বরণে অভাবীর ছাপ। কোন এক দুর্ভাগা সংসারের বাসকারী হবে হয়তো। বিশ্রী ধরনের গন্ধ আসছে তার গা থেকে। তবে ঘৃণা হচ্ছেনা। ঘৃণা হচ্ছেনা এই বলে যে, আমিও একদিন কারো গর্ভে এসেছিলাম। বড় চেনা এ গন্ধ! আমার মায়ের গন্ধযুক্ত যোগসূত্রে আমিও এই জ্যাতে ভূপতিত হয়েছিলাম। আগ্রহ বাড়িয়ে মহিলাটির সম্পর্কে জানতে চাইলাম, উনার ভাষায় যতটুকু বোধগম্য হলো উনি একজন রোহিঙ্গা। আমার অব্যক্ত ভাষায় তার জীবনের গল্প শুনছিলাম। ভাষা না বুঝলেও উনার অশ্রুসিক্ত চোখ বেয়ে পরা লোনা জলের বুলি ধারণ করতে পারছিলাম। উনিও আমার মত প্রিয়জন হারা এক স্বজন।
অনেক কথা হলো, অনেক জানা হলো তার থেকে। সুনামগঞ্জে উনার ক্যাম্প হওয়ার দরুন উনি ওখানেই নেমে পড়লেন। অতঃপর কাপল সিটে আমি একা হয়ে গেলাম।
.
.
তবে যাইহোক, সবমিলিয়ে খারাপ না লাগলেও তেমন একটা ভালো ও লাগছিলো না। তাই বসে ছিলাম, সুমনার দেয়া জ্যাকেট গায়ে দিয়ে ঔদাস্য অবস্থায়।
কুক্লিষ্টটার কারণে মনোবল ক্ষীণ করে অতীত বিচরণ করছিলাম। কিন্তু অনুভূতি যখন বর্বর একঘেয়েমি তার কাছে হীনবল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাসের ভিতর থেকে দৃষ্টি যুগল কে মেলে ধরলাম! মেলে ধরলাম ধরণীর গায়ে। কি চমৎকার এই মৃত্তিকা। আঁখি জুড়ানোর উপক্রম প্রায়। অনেকদিন বাহিরের আলো ভালোমতে দেখা হয় না। আসলে দেখার অধিকার নিজের অসচেতনতার কারণে হরণ হয়ে গেছে। তবুও আজ একচোখে দেখছি। সুমনা বলেছিলো সবকিছু মনোযোগ দিয়ে করতে; তাই আজ এই ধরাধামে মনোযোগ সহকারে নিজেকে মেলে ধরার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি।
.
কিন্তু কষ্ট হচ্ছিলো !
বুকে জমানো চাপা কষ্ট।
বহুদিনের, বহুপুরোনো কষ্ট।
দূরত্ব, ভুল বোঝাবুঝি, মান-অভিমান, বিচ্ছেদের সমন্বয়ে গঠিত বলিষ্ঠ এইগুচ্ছ পীড়া।
আসলে ভালোবাসার ভগ্নাংশে তৈরি ছিলো এই কষ্ট! যার কারণে এর ক্রিয়াও বেশি।
.
ভাবনা জগৎ আজ উদ্বিগ্ন। কোথা হতে, কীভাবে, কোন পাপের কারণে আজ সুমনা থেকে বিচ্ছিন্ন আমি।
.
অহ! সুমনা সম্পর্কে কিছু বলা হলো না। পুরোনাম সুমনা জান্নাত সৃষ্টি। হরিণের ন্যায় চারু তার অক্ষি যুগল, এলোকেশি তার চুল। সবমিলিয়ে সে ছিলো স্রষ্টার এক দৈব রচনা। বিধাতা যেন তাকে কোন কিছুর অপরিপূর্ণতা রেখে পৃথিবীতে পাঠাননি। কিন্তু সুমনার আ্যক্সিসিডেন্ট নামক আনাড়ি ঘটে যাওয়া পর থেকে তার পাশে আর আমি নেই। দূরে যেতে হয়েছিলো আমাকে, অনেক দূরে।
.
ঘটনাটি ঘটেছিলো আমাদের ক্লাস পার্টিতে।
সেটি ছিলো বর্ষাকাল।
কলেজের সবাই তখন আনন্দে নিরত। সুমনা তখন রাস্তার এপার-ওপার আমাকে খোঁজার আশায় বিচলিত।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত একটি মোটর সাইকেল এসে ধাক্কা দিয়েছিলো সুমনাকে। ঘটনাস্থলে সুমনা অচেতন হয়ে পড়লে তাকে স্থানীয় ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়।
ঘনঘটা বর্ষার মেঘলা আকাশে ঠিক তখনি আবির্ভূত হলো বেদনার বীণা। ডাক্তারবাবু স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন তার চোখ ব্যাহতী।
২৪ ঘন্টার মাঝেই তার অস্ত্রপাচার করতে হবে। নতুন কর্নিয়ার মাঝে ফিঁরে পাবে সে তার নতুন দৃষ্টি জীবন। না হলে সম্ভব না।
কিন্তু সুমনা চেয়েছিলো তার নতুন চোখ দিয়ে সে প্রথমে আমায় দর্শন করবে। না হলে প্রতিস্থাপন করতে দিবে না তার নতুন চোখ।
ততক্ষণে বিধিবাম!
২৪ ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও সে তার চোখ অপারেশন করায়নি।
.
কারণ, আমি ছিলাম না তার পাশে। ছিলাম না বর্ষার আকাশের এক খন্ড মেঘ হয়ে, অভিমানের সুরে বৃষ্টি হয়ে ঝরে গিয়েছিলাম । কারণ, নিয়তি ততক্ষণে আমায় নিয়ে গিয়েছিলো সুদূর রাশিয়ায়। হ্যাঁ, আব্বুর কোম্পানির ট্যুরে তখন আমি রাশিয়ায়। তবে সুমনাকে সেটা বলা হয়েছিলো না।
যদি বলে যেতাম তবে সে হয়তো রাস্তায় আর আমাকে খুঁজতো না। হয়তো হারাতেই হতো না তার নয়নাভিরাম দুটি চোখ। আমার জন্যই আজ দুনিয়ার আলো দেখা হতে বঞ্চিত সে। অপরাধী হয়ে গিয়েছিলাম নিজের কাছে। সুমনার কাছে হয়ে গিয়েছিলাম কাপুরুষ! ও ভেবেছিলো ওর অন্ধত্বের কারণে আমি দেশ ছেড়ে চলে গেছি।
.
যখন সিলেট বাসস্ট্যান্ডে নামলাম, তখন পিছনের সিটের মেয়েটিকে দেখতে পেলাম। সকল কিছুর অবসান ঘটিয়ে মেয়েটি আমার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিলো। আমার চোখ কে যেনো বিশ্বাস করতে পারছিলাম না!
.
এইতো সুমনা!
আমার সুমনা!
ভালোবাসার সুমনা!
ভালোলাগার সুমনা!
ভালো রাখার সুমনা!
.
.
সে ছাড়া আমার হৃদস্পন্দন অচল,
তার সংস্পর্শে নিঃশ্বাস হয় সচল,
তাকে পাওয়ার জন্য আমি সদা অবিচল।
তবু কেন আজ বিচ্ছেদ, বিপত্তি হতে দেয়না অগ্রসর।
দূরত্ব যে আজ করে তুলছে বর্বর।
!
অশ্রুসিক্ত নয়নে বলে যাই!
সুমনা!
সুমনা, তুমি আমার।
দূরত্ব হতে পারেনা দুর্বার।
অভিমানকে দিওনা প্রশ্রয়!
.
সুমনা শোনেনি।
সে বলল আগে কেন আসোনি?
আমি:-তোমার ঠিকানা তো দাওনি।
সুমনা:-খুঁজে কেন নাওনি?
-খুঁজেছি কিন্তু পাইনি।
-খোঁজার মাঝে ভুল ছিলো, নিকৃষ্ট তুমি। আমার অসহায়ত্ব কে এড়িয়ে তুমি দূরে পারি জমিয়েছিলে। তবে জীবনের পড়ন্ত বেলায় কেন এলে ? কেন অতীতস্মৃতির পাতা আজ নেত্রপাত করছো।
-শোন তবে, আমি তোমাকে ফেঁলে রেখে যাইনি। বিদেশ গিয়েছিলাম কাজে। তবে দেশে আসার পর তোমাকে খোঁজার কমতি রাখিনি, কিন্তু পাইনি। অনেক কষ্টে ছিলাম। তবে আজ পেয়েছি। অনেক নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি। অনেক স্বাধীন ভাবে চলেছি। তোমার শাসনের বেড়াজালে নিজেকে আবারো একবার আবদ্ধ করতে চাই। বর্ধিত হতে চাই তোমার বাহুডোরে।
-বড় অবেলায় তোমার প্রস্থান। ভুলে যাও আমাকে।ভালো আছি আমি। তোমার মত করে তুমি ভালো থেকো।
-না তুমি ভালো নেই। ভালো থাকতে পারোনা তুমি। তোমার চোখের নিচে পড়া কাজলের ন্যায় কৃষ্ণকায় বলছে তুমি ভালো নেই।
তোমার দৃষ্টিহীন চোখ বলছে তুমি ভালো নেই। তবুও কেন এমন করছো।
-শরীর কখনো মনের কথা বলেনা। ভালো আছি আমি, অনেক ভালো আছি। যতটা ভালো তুমি রাখতে পারতে না।
তুমি চলে যাও!
চলে যাও দূর অজানায়।।
.
কথাটি বলে সুমনা চলে যায়।
রেখে যায় স্মৃতি !
অতীতস্মৃতি কে দুঃস্বপ্নের রুপ দিয়ে চলে যায়।
তবুও ফিঁরে তাকায় না। অভিমানের কাছে চাপা দেয় প্রিয় মানুষটি কে।।
.
.
তবে ভালো থাকুক সুমনা!
ভালো থাকুক তার অভিমান নিয়ে।
ভালো থাকুক তার চিন্তিত শহরে।
আমার ফাঁকা শহরের বুকে মিছে ভালো থাকার অভিনয় করে যাবো আমি। চলতে থাকুক নিকোটিনের অথৈ সাগরে সাঁতার কাটা। কাটুক হাজারো নির্ঘুম রাত। অতীতস্মৃতি কুঁড়ে খাক আমায়। জীবনের পড়ন্ত বেলা পর্যন্তও আমি ভালোবেসে যাবো তোমায়। বড় অবেলায় পেয়েও আজ হারালে আমায়।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত