দহন

দহন

“ভালোবাসার মানুষটার সঙ্গে বিয়ে না হওয়াটাই বোধহয় ভালো।বিয়ে হলে মানুষটা থাকে,ভালোবাসা থাকেনা। “হুমায়ুন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ উপন্যাসের এই কয়েকটা লাইন নিয়ে সেই সকাল থেকে সোহা আর প্রিয়তার মধ্যে তর্ক হয়েই যাচ্ছে।তর্ক বললে ভুল হবে,অনেকটা ঝগড়ার পর্যায়েই সেটা চলে গেছে।

প্রিয়তা হুমায়ুন আহমেদের এই উক্তিটার ঘোর বিরোধিতা করছে,সোহা এক বাক্যে কথাটা মেনে নিলেও নীলিমা এখানে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে।তার বক্তব্য হলো,’হয়তো,হয়তোবা না!’প্রিয়তা নীলিমার এই নিরপেক্ষ আচরণটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেনা।কোথায় নীলিমা তাদের যে কোনো ১টা পক্ষ নিয়ে দল ভারী করে ঝগড়াটা থামিয়ে দিবে!তা না…সে ২জনের হয়েই নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে!! প্রিয়তার বক্তব্য হলো,”হুমায়ুন আহমেদ বললেই বুঝি ভালোবাসা চেঞ্জ হয়ে যায়?এতো সহজ না,ভালোবাসা চেঞ্জ হওয়া।যেসব ছেলে-মেয়েরা ভালোবাসতে পারেনা বিয়ের আগে,তারা বিয়ের পর কিভাবে ভালোবাসবে?যত্তস ব ভালোবাসতে তো হবে আগে..নাকি?

“ভালোবাসা! হাহ্ হাহ্ হা…ভালোবাসা!হুমায়ুন স্যার একদম ঠিক বলেছে।বিয়ের পর পুরুষদের ভালোবাসা পাল্টে যায়।যা থাকে বা আছে সবই হলো বালুবাসা!”নীলিমার শান্ত অথচ গম্ভীর চেহার দিকে তাকিয়ে সোহা আবারো বলতে থাকে,”না..বলছিনা শুধু পুরুষদের ভালোবাসা চেঞ্জ হয়,মেয়েদেরও হয়..আসলে বিয়ের আগে যা হয়,সব আবেগের ঘোরে থেকে টাইম পাস করা..বিয়ের পর তো আর সেসবের কোনো সুযোগ থাকেনা..তাই ভালোবাসার বদলে বালুবাসা প্রকাশ পায়…হাহা হাহা প্রিয়তা এবার রেগে গিয়ে বলে,”সমস্যা কি তোর?নিজে ভালোবাসতে পারিসনা বা পছন্দ করিসনা বলে,অন্যের ভালোবাসা নিয়ে এতো জ্বলিস বা বলিস কেন শুনি?সব পুরুষতো আর এক না, তাইনা?আমার।”

-ওসব ভালোবাসা নয়।ভালোবাসা বলে কিছু নেই..শুধু একটা “আহ!থামবি তোরা?কতোক্ষণ ধরে বাচ্চাদের মতো এসব ঘ্যানঘ্যান শুরু করছিস?ভালোবাসা পাল্টায়।ঘণ্টায় ঘণ্টায় পাল্টায়।অনেকটা চোখের পলকের সাথে তুলনা করা যায়।কারো ভালোবাসা চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে যেমন হয়ে যায়,তেমনি অনেকসময় সেটা ২য়বার পলক ফেলতে না ফেলতেই শেষও হয়ে যায়।তবে কিছু ভালোবাসার চোখ এবং চোখের পলক একজায়গায় এসে স্থির হয়..মাঝখানে পলকের হয়তো একটু এদিক-সেদিক হয়,তখন ভালোবাসা পাল্টায় না,বরং আরো শক্তভাবে সেটা স্থির হয়ে যায়। ভালোবাসাটা যেমন আশীর্বাদ, তেমনি অভিশাপও বটে!

নিশ্চয়তা আর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়েই ভালোবাসা চলতে থাকে,কিছু ভালোবাসা তাজা ফুল ফুটাতে সক্ষম হয় এবং ফুলগুলো দিয়ে সুন্দর ফুলদানি তৈরি করে ঘরে সাজিয়ে রাখতে পারে।আর কিছু ভালোবাসা!!…ভালোবাসা চলতে থাকে ভালোবাসার মতো…এটা নিয়ে বড়াই যেমন করা চলে,দুঃখও কম পাওয়া চলেনা…এই বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীলিমা- এবং হাঁটতে শুরু করে..।পিছনে প্রিয়তা আর সোহা অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। “প্রিয়তা…প্রিয়তা…”প্রিয়তা একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে।সোহা ডাকছে তাকে!নাকি নীলিমা!! “প্রিয়তা!” এবার খুব জোরেই ডাক পড়ে।প্রিয়তা চমকে উঠে!পিছনে তাকিয়ে দেখে দীপক!

-“মন কই থাকে তোর?কখন থেকে ডাকছি আমি?!”
-না..মানে..
-কি না মানে করছিস?
-তুমি এভাবে চিৎকার করছো কেন?
-চুপ..শালি,বউ,বউয়ের মতো থাকবি।আমার সাথে গলা উচিয়ে কথা বলবিনা।বিয়ের আগে অনেক অত্যাচার সহ্য করছি। যা..তাড়াতাড়ি গরম পানি কর,গোসল করবো প্রিয়তা কিছু না বলে চোখের পানি মুছতে মুছতে চলে যায়!

পানি বসিয়ে আজ অনেক কিছুই ভাবছে প্রিয়তা!এই কি তার সেই দীপক!যে কিনা বিয়ের আগে তারজন্য পাগল ছিল!এই কি সেই দীপক, যে একদিন দেখা না করলে অস্থির হয়ে যেতো। চাঁদমুখখানা না দেখলে নাকি সারাটা দিন তার মিথ্যাে হয়ে যেতো!!অথচ এখন,চোখের পানি ফেলে বালিশ ভিজিয়ে ফেললেও দীপক তার দিকে একবারও ভালোভাবে চেয়ে দেখেনা!দিন দিন দীপক কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে,ভালোবাসার উপস্থিত খুব কমই পায় প্রিয়তা।সবকিছু কেমন জানি ফিকে হয়ে যাচ্ছে… প্রিয়তার খুব মনে পড়ে..দীপক সম্পর্কে একবার সোহা একটু নেগেটিভ কিছু বলায় কি ঝগড়াটাই না সে করেছিল সোহার সাথে সেদিন!কথা বলেনি প্রায় ১বছরের মতো।আর আজ সেই দীপক “পানি গরম হলো!!”দীপকের কথায় প্রিয়তা আবার ফিরে আসে বাস্তব নামক কঠিন জগতে।এইতো,তার দীপক দাঁড়িয়ে আছে।যাকে অগ্নিশপথ করে বিয়ে করে প্রিয়তা।আর আজ সেই অগ্নিদহনে দগ্ধ হচ্ছে প্রিয়তা।দীপক কি কিছুই বুঝতে পারেনা!!

-আমার দিকে তাকাই থেকে কি দেখছিস?পানি গরম হইছে?
-‘হাহ্..হয়েছে।নামিয়ে দিচ্ছি এখুনি।

প্রিয়তা খুব তাড়াহুড়া করে পাতিল নামাতে গেলে গরম পানি তার হাতে ছিটকে পড়ে।প্রিয়তা চিৎকার করে উঠে, “ওমাগো!!”দীপক দ্রুত আসে,”দেখি…কিন্তু না,ওর হাতের দিকে না চেয়ে পানির পাতিলটা নিয়ে চলে যায়। যাবার সময় বলতে শোনা যায়,”সামান্য একটা পাতিলও নামাতে পারেনা।” প্রিয়তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে থাকে।হাত পোড়ার চেয়েও মনের দহনটা অনেক বেশি স্পষ্ট আর কষ্টের এখানে। প্রিয়তার খুব মনে পড়ে,একবার তার পায়ে ছোট একটা কাঁটা বিঁধেছিল।দীপক সেদিন কি যে পাগলামি করেছিল.. কেমন অস্থির হয়ে যায় সেদিন দীপক।

-“দেখি..”
-কিছু হয়নি তো বাবা..সামান্য একটা কাঁটা..
-এটা সামান্য হলো বুঝি!!

দীপক ওর পায়ের কাঁটাটা তুলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়।দীপককে এতো বিচলিত হতে দেখে প্রিয়তার সেদিন সত্যিই কি যে ভালো লাগে..”পাগলটা এতো ভালোবাসে কেন আমাকে?”..

-আমাকে সারাজীবন এইভাবেই ভালোবাসবে তো?মানুষ তো বলে,বিয়ের পর নাকি ভালোবাসা থাকেনা,তুমি কি এমনি…সেদিন দীপক ওর কথা থামিয়ে দিয়ে হাতটা খুব শক্ত করে ধরে বলে,”নিন্দুকেরা কতোকিছুই বলবে,এসব কানে নিলে চলবে বলো?তোমাকে কখখনো ছেড়ে যাবোনা..খুব ভালোবাসি..খুউ..ব।বিয়ের পর আরো অনেক বেশি ভালোবাসবো।”এই বলে দীপক ওর হাতে একটা আলতো চুমো দেয়।

সেদিনও প্রিয়তা কেঁদেছিল।তবে সেটা অনেক বেশি সুখের কান্না ছিল।আর আজ কান্নাটা তার বুকে শলা ফুটাচ্ছে।
তবে দীপকও তাকে ভালোবাসে,সেটা গভীর অন্ধকারে ।আদর করে তখন তাকে ছোট করে “প্রিয়া”বলেই সম্বোধন করে।বলে,”আজ খুব মিস বিহেভ করেছি,তাইনা?আর করবোনা প্রিয়া…এরপর…দুজনেই ভালোবাসার সমুদ্রে ভেসে যায় কিছুক্ষণের জন্য। কিন্তু পরেরদিন আবার সব প্রিয়তা খুব জোরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বান্ধবি সোহার কথা ভাবছে সে এখন!”ভালোবাসাকে তেমন সহ্য করতে পারতোনা।অথচ..আচ্ছা সোহা তো দেশের বাইরে ঘুরতে গিয়েছিল,ঢাকায় কি এখনো আসেনি! চলে তো আসার কথা… ফোন দিয়ে কি জিগ্যেস করবো?ও কেমন আছে!!”বিড়বিড় করে বলেই ফোনটা হাতে নেয় “কিরে প্রিয়তা!এতোদিন বাদে!!”

-হ্যাঁ, কি খবর তোর?কেমন আছিস?
-আছিরে..তোর ভাইয়াটা এখনো বাসায় আসছেনা,বল তো কি করি?ফোনও ধরছেনা।

এদিকে টেনশনে মরছি আমি…এই ফোনটা রাখ,তোর ভাইয়া চলে আসছে…”প্রিয়তা কিছু বলার আগেই সোহা ফোন কেটে দেয়।প্রিয়তার খুব হাসি পায়…বিষাদ না সুখের,বুঝা দায়।”পাগলি..কেমন আছি সেটাও জানতেও চাইলোনা…”এই বলে আবার হাসি দেয় প্রিয়তা।হাসতে হাসতেই হঠাৎ চিৎকার করে কেঁদে উঠে প্রিয়তা…তবে প্রিয়তার খবর একজন সবসময়ই নেয়।নীলিমা!ও এখন কি করছে, কে জানে? গতকাল ফোনও দেয়নি!আচ্ছা,আমি আজ নিজেই দেইনা বলতে না বলতেই দেখে নীলিমার ফোন বাজছে।তাড়াতাড়ি ফোনটা ধরে প্রিয়তা,”কিরে ভুলেই গেলি!গতকাল তো ফোন দিসনি!”এই বলে প্রিয়তা কেঁদে ফেলে ।নীলিমা জানে দীপক আর প্রিয়তার ব্যাপারটা। “এই পাগলি,কাঁদছিস কেন?গতকাল হঠাৎ আমার শাশুড়ি অসুস্থ হয়ে পড়েন।হাসপাতাল দৌড়াদৌড়ি.. বুঝিস ই তো…

-হুম,বুঝছি।তোর শাশুড়ি এখন কেমন?আর ভাইয়া?
-আলহামদু লিল্লাহ সবাই ভালো আছে রে।তোর খবর বল,ফোন ধরেই কান্না শুরু করলি কেন?
-“সে তো প্রতিদিনের ঘটনা।”এই বলে প্রিয়তা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। নীলিমাও দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বলে,”মন খারাপ করিস না প্রিয়তা।দেখবি দীপক আবার আগের মতো হয়ে যাবে “নারে..তুই কিছুই জানিস না,ওর ব্যবহারটা প্রতিদিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে…
-তুই কিছুদিনের জন্য বাড়ি থেকে ঘুরে আয়না?

প্রিয়তা চাপা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে,”আর বাড়ি!!”দীপক আর প্রিয়তার বিয়েতে প্রিয়তার ফ্যামিলির কেউ রাজি ছিলোনা..তাদের অমতেই বিয়ে করে প্রিয়তা।নীলিমা তাই দ্রুত বলে.. “আরে..আরে..বাড়ি বলতে আমার বাড়ির কথা বললাম।আমার এখানে তো কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে আসতেই পারিস।”

-হুম,তা পারি..
-তাহলে?

তারপর অনেক কথা হয় ২বান্ধবির মধ্যে।নীলিমা আজ সত্যিই খুব ভালো আছে।নীলিমার বয়স যখন ১৬ বছর বয়স।তখন নীলিমার বাবা-মা ভালো পাত্র পেয়ে বিয়ে দিয়ে দেয় নীলিমাকে।নীলিমারও সুন্দর বরটাকে কেন জানি ভালোই লেগেছিল।কিন্তু নীলিমার স্বামী ওকে খুব মারধোর করতো।পরে তার বাবা-মা তাদের মেয়েকে ঐ পশুর কাছ থেকে মুক্ত করে নিয়ে এসে পুনরায় পড়াশোনায় ঢুকিয়ে দেয়।ধীরে ধীরে নীলিমা স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও একটা ক্ষত তার মনে থেকেই যায়।তবে সেই ক্ষতটাও ঢেকে ফেলে নীলিমার বর্তমান বর সালমান।নীলিমার জন্য বিয়ের আগে থেকেই সালমান খুব পাগল ছিলো ওর জন্য।কিন্তু নীলিমার অতীত বেদনা তাকে তাড়িত করতো সবসময়। তাই নিজেকে গুটিয়ে রাখতো সালমান থেকে।প্রিয়তা এমনকি সোহাও কতো বুঝিয়েছে নীলিমাকে,যেনো সালমানের ডাকে সাঁড়া দেয়…কিন্তু,নীলিমা!তবে হঠাৎ একদিন ফ্যামিলি থেকেই তাদের বিয়ে হয়।সালমান নীলিমাকে ভালো রেখেছে,খুউব ভালো রেখেছে।

এখানে ওদের ভালোবাসাটা সত্য হিসেবে উজ্জ্বল হয়ে আছে। প্রিয়তা এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে সকালে ঘুম ভাঙে দীপকের ডাকে।গতকাল কখন আসলো?ওকে ডাকলো না যে!প্রিয়তা এসব ভাবতে ভাবতেই দীপক কেন ডাকছে,শুনতে গেল প্রতিদিন ভোর হয়,সূর্যের আলো ছুঁই ছুঁই করেও প্রিয়তার মনটা কেন জানি আর ছুঁতে পারেনা।সেখানে কেবল ঘণ কুয়াশা। দীপকের ডাক আজ কি তবে কিছু আলো এনে দিয়ে কুয়াশা সরাতে পারবে?নাকি…জা নেনা প্রিয়তা!কেউ জানেনা…”

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত