অজানা ক্ষত

অজানা ক্ষত

বিয়ে বাড়িতে অনেক্ষন ধরে লক্ষ করছি এক নেকাপ পরা মেয়ের এক জোড়া চোখ বার বার আমার দিকেই পরছে।চোখের চাহুনি আমার খুব চেনা।কেমন যেন অজানা ভয়ে বার বার শরীর যেভাবে ঘামে ঠিক তেমন ই ঘেমে একাকার হচ্ছি। কে ওই মেয়ে?খুব জানতে ইচ্ছে করে।বোরকার আড়াল এর মানুষটাকে একবার দেখতে ইচ্ছে করে__ এর মাঝেই আমার কাঁধে কারো হাত এর স্পর্ষ পেয়ে আমি থমকে যাই। তাকিয়ে দেখি আমার স্ত্রী আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি।

-নিলয় কি হয়েছে ঘামছো যে?প্রেসার বাড়ে নি তো?
-না রিয়া।

কি অদ্ভুত!এসি অন তার পরেও ঘামছো আমার কিন্তু খুব চিন্তা হচ্ছে। আমি হেসে বললাম না ঠিক আছে।আমি তখন ও খুব ভালোভাবে অনুভব করছি সেই মেয়ে আমায় দেখছে।মানুষ এর অদ্ভুত এক ক্ষমতা আছে তাকে কেউ কেমন ভাবে দেখে তারা সেই চোখ দেখেই বুঝে ফেলতে পারে। রিয়ার সাথে কথা বলতে বলতে পাশে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই।সবকিছু ফাকা।কেন যেন আমি এপাশ ওপাশ খুজছি।অদ্ভুত লাগছে নিজের আচরণ নিজের কাছেই।এ প্রান্ত ও প্রান্ত খুঁজে ও কাউকে না পেয়ে যখন আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম তখন ই পিছন থেকে এক চেনা গলায় আমায় বলছে,আমায় খুঁজছো বুঝি? আমি আতকে উঠে পিছন ফিরে দেখি সেই বোরকা পরা মেয়ে।শুধু চোখ দেখা যাচ্ছে। ছলছল চোখ দিয়ে পানি বেয়ে পরছে।

_কে আপনি?

মেয়েটা হেসে বললো খুব কষ্ট চিনতে নিল? এই চেনা নাম চেনা স্বরে শুনে বুকের ভিতর টা কেমন মোচর দিয়ে উঠলো।এই নামে তো তিন বছর আমায় কেউ ডাকে না।অনেকদিনপর এই নাম শুনে বুকের ভিতর বাধ টা যেন আলগা হয়ে গেল।

-তুমি ইতু তাইনা? মেয়েটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে মুখের নেকাব খুলে বললো হুম।

এতো কাছের মানুষটার মুখ এতদিন পর দেখে বুকের অজানা ক্ষত জানান দিতেছে,নিলয় আমি সেই ক্ষত লুকিয়ে রেখেছিলে আজ আমার তোমায় জ্বালাবার সময় এসেছে।তুমি জ্বলবে পুড়বে, দুমরে,মুছরে যাবে কিন্তু ভয় নেই আমি তোমায় মারবো না। কেমন আছো নিল বলে ইতস্তত হয়েই বললো নিলয়? ওর এই নিল থেকে নিলয় বলে ফেলা আমায় জানান দিয়ে যায় আমরা আর আগের মতন কাছের নেই। এই ইতুর সাথে আমি ৭বছর রিলেশন করে বিয়ে করার ১বছরের মাথায় ডিভোর্স হয়ে যায়। আজ তার ৩বছর পর ওর সাথে দেখা।গোল পৃথিবীতে আগেই দেখার কথা ছিল কিন্তু হয়তো ওর এই আড়াল এর কারনে আমার চোখ এড়িয়ে গেছে।

ইতু: বিয়ে করেছো কবে?

আমি: এই ৮মাস।এখানে তুমি?

ইতু: আমার স্বামীর অফিসের কলিগ এর বিয়ে।

ইতুর মুখে আমার স্বামী শুনে আমি শুধু আহত হইনি।মনে হল আমার এ কথা শোনার আগে মৃত্যু কেন হলনা।সম্পর্ক থাকাকালিন অচেনা কারো সাথে ইতু কথা বলবে তাই মানতে পারতাম না। আজ কি করে এত বড় কিছু মানবো। তো বিয়ে করেই ফেললে? ইতু হেসে বলে বাবা মায়ের বোঝা হয়ে থাকা কি অতো সহজ মশাই?

আমি: এখন তোমার শ্বশুর বাড়ির লোক ভালো তো?

ইতু: ভালো বলেই তো বেচে আছি তাইনা।তার চেয়েও বেশি ভালো কি জানো আমায় আমার স্বামী বুঝে।সে তার মাকে মায়ের জায়গায় রাখে।আমায় আমার জায়গায়।যার কারনে আমার ভুল হলে সে আলাদা ভাবে বুঝায়।তার মা বোন এর কথার উপর ই ভিত্তি করে আমায় সন্দেহ বা রাগারাগি করতোনা।জানো নিলয় আমার কষ্ট হত না যদি আমায় শুধু তোমার মা মারতো।আমার কান্না পেত না যদি আমায় শুধু তোমার বোন কথা শুনাতো।আমার খুব কষ্ট লাগতো তখন যখন তোমার সামনে তোমার মা, বোন আমায় আর আমার মা বাবাকে যা না তা বলেছিল আর তুমি প্রতিবাদ করোনি।আমার বুকের এখান টায় লেগেছিল যখন তুমিও তাদের মতন বলেছিলে ইতু বাবার কাছ থেকে ২লাখ টাকা এনে দেও।

দুনিয়ায় একটা মেয়ের সবার ভালোবাসা লাগেনা জানো।শুধু স্বামীর আস্থা ভরসা ভালোবাসা পেলেই হয়।কিন্তু আমি তাই পাইনি। আমি ইতুর কথা বলার সময় ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।কত যন্ত্রনা বুকে চেপে রেখেছিল ও ইতু মা মারা গেছে ৩মাস হল।মারা যাবার সময় সে অনেক অসুস্থ ছিল।বার বার আমায় বলেছিল একবার তোমার সাথে দেখা করে মাফ চাইবে তা আর হয়নি।মাকে ক্ষমা করে দিও। ইতু চোখের পানি মুছে বললো তার প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই।

আমি: তাহলে কি সব অভিযোগ আমার উপর?

তোমার প্রতিও সেদিন থেকে অভিযোগ নেই যেদিন তুমি তোমার দুলাভাইয়ের মিথ্যে কথার উপর ভরসা করে আমার গায়ে হাত তুলেছিলে।তোমার কাছে আমি ছাড়া সব চন্দ্র তারার মতন সত্যি ছিল।আর আমি ছিলাম মিথ্যে। এর মাঝের বাচ্চা মেয়ে মা বলে ইতুকে জরিয়ে ধরলো। আমি ইতুকে বললাম তোমার সন্তান?

ইতু: হুম।

মেয়েটাকে আমার কোলে নেয়া উচিৎ তবুও পারছিনা।হিংসে হচ্ছে।এই বাচ্চা মেয়ের প্রতি হিংসে তা ভেবেও নিজের প্রতি লজ্জা হচ্ছে তবুও হিংসে হচ্ছে। মেয়েটা চলে গেল।ইতুকে বললাম বিয়ে করেছো বাচ্চাও হয়েছে।আমি আমার স্মৃতিগুলি এর নঘন্য ছিল কি যে আমাদের ডিভোর্স এর সাথে সাথেই আবার বিয়ে করে নিলে? ইতু আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে বিয়ে হয়েছে এই তিন মাস। তাহলে ওই বাচ্চা?

ইতু: ও আমার হাসবেন্ড এর এক্স ওয়াইফ এর মেয়ে তিনি মারা গেছেন। আমি কি বললো ভেবে না পেয়ে চুপ হয়ে আছি।

ইতু: একটা কথা কি জানো আমি এই বাচ্চা মেয়েকেও নিজের করে নিতে পেরেছি।কারো সংসার ও নিজের করে নিয়েছি।শুধু তোমায় ই নিজের করতে পারিনি কখনো। এর মাঝেই রিয়া কোক এর গ্লাস নিয়ে আমার কাছে এসে দাড়ালো।

রিয়া: কি করছো এখানে?

আমি হুট করে কি বলবো বুঝতে পারছিনা। ইতু নেকাব পরে রিয়াকে বলছে ভাবি আমার বাচ্চাটা ভাইয়ের কাছে ছিল।ভাই ওকে আমার কাছে দেয়ার জন্য এখানে এসেছে।ভাই না থাকলে বাচ্চাটা ভির এ হারিয়েই যেত। রিয়া হেসে বলে ও আচ্ছে ভাবি।চলেন ওদিকে যাই। বরযাত্রী এসে গেছে।আমার কাজিন এর বিয়ে আরকি তাই আমি একটু বিজি ই এর কারনে আমার বরটার দিকে খেয়াল রাখাই হয়না। রিয়া আমার হাত ধরে বলে ও বর তুমি মাইন্ড করনিতো? আমি বার বার রিয়ার হাত সরিয়ে দিয়ে বললাম কি করছো? রিয়া হেসে বলে কেন ভাবি কি তার বর কে আদর করে না নাকি?কি ভাবি ভুল বলেছি? ইতু হেসে বলে না ঠিক আছে

রিয়া: আর বলবেন না ভাবি আমার বরটা যে লাজুক।বিয়ের আগে প্রেম টেম ও করেনি।আমার কপাল কি ভালো বুঝুন একে বর হিসেবে পেয়েছি।তবে বেচারা রোমান্টিক আছে হি হি হি।

আমি রিয়াকে ধমক দিয়ে বললাম তুমি বউয়ের কাছে যাবেনা? ও হুম হুম এই বলে যেতে নিল হাতের কোক ধাক্কা লেগে ইতুর বোরকায় পরলো। ইস ভাবি কিযে হল।মাফ করবেন।

ইতু: ঠিক আছে।আপনি বোন এর কাছে যান।

রিয়া আমার দিকে তাকিয়ে বলে এই তুমি একটু থাকো এদিকে আমি যাই ওখানে। আমি ইতুর কাছে গিয়ে বলতে নিলাম ভিজেছে কি সব।জানি আজ আর স্পর্ষ করার অধিকার নাই।তাই পাশে দাড়িয়েই রইলাম। ইতু হাত সামনে দিয়ে বলে থাক আমি ঠিক আছি।এখন আমার যাওয়া উচিৎ।এই বলে ইতু চলে যেতে নিল। আমি পেছন থেকে বললাম ইতু দাড়াও।

ইতু: হুম

আমার দোষ টা কি শুধু আমি তোমায় বুঝিনি তা? ইতু একরাশ অভিমান নিয়ে বললো, তুমি মানুষ হিসেবে ভালো। এমনকি আমার প্রেমিক হিসেবেই ভালো ছিলে।বর হিসেবে নয়।সব মানুষ কি সব হিসেবে ভালো হয় মশাই? আমি ওর এত কঠিন জবাব এর কাছে ঘায়েল হয়ে গিয়েছিলাম। আচ্ছা তুমি কেন বিবাহিত,সন্তান এর বাবাকে বিয়ে করতে গেলে? ইতু মুছকি হেসে বললো আমি তো ডিভোর্সি।এমন মেয়েকে কে আর বিয়ে করবে?আমি তো বাকি সবার মতন অতীত লুকাতে পারি নি।এই বলে চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল।

কেন যেন আমার চোখ ঝাপ্সা হয়ে আসছে।আমি লুকাতে চাই।এই দুনিয়ার সবার আড়ালে গিয়ে কাঁদতে চাই।একবার যদি অতীতের ভুল সুধরানো যেত!আপসোস,!একবার যদি সব আগের মতন করা যেত, একবার যদি ইতুকে বুঝতাম!একবার যদি ওর মনের মতন স্বামী হতে পারতাম! অজানা ক্ষত বুকের ভিতরে বলতে লাগলো,এক জীবনে সব পাপ কি সুধারানো যায়! এক জীবনে সব কি যায় পাওয়া?এই ক্ষত মাঝে মাঝেই বুকের ভিতর টা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে করবে ছাই।এটাই নিয়তির লিখা।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত