মনে মনে

মনে মনে

রিশানের খালাতো বোন লীনার গায়ে হলুদ আজ৷ রিশান মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই কাজ করছে। তাকে কোনো কাজ দেয়া হয়নি। রিশান জানে খালা রাগ করে তাকে কাজ দেয়নি। সেই বা কী করবে? খালার ইচ্ছে ছিল লীনার সাথে রিশানের বিয়ে দেবে। কিন্তু রিশান লীনাকে সবসময় আপন ছোটবোনের মতোই দেখে এসেছে। আপন বোনকে কী করে বিয়ে করা সম্ভব? এখন লীনার বিয়ে হচ্ছে অন্য জায়গায়। ছেলে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। দেখতে সুন্দর। বনেদি ঘর। রিশানের চেয়ে অবস্থান অনেক ভালো। সে তো এখনো চাকরিও জোগাড় করতে পারলো না। লীনা ঘরের পর্দা উঁচু করে রিশানকে ডাকলো, রিশান ভাই, একটু এদিকে আসবে?

— কী হয়েছে?
— এসোই না।

রিশান এগিয়ে গেল। লীনা বলল, পার্লারের মেয়েগুলো কেমন করে আটকে দিয়ে গেছে দেখো নথটা খুলে গেছে। পরিয়ে দাও তো!

— আমি কি নথ পরাতে পারি? অন্য কাউকে ডাক।
— কেউ নেই। দেখো তুমি..সবাই ব্যস্ত। চেষ্টা করো, পারবে।

নথ পরাতে পরাতে রিশানের মনে হলো লীনাকে সে সত্যি আপন বোনের মতোই দেখে। তাকে বিয়ে করা কোনোভাবে সম্ভব ছিল না। বিয়েটা ভালোভাবে হয়ে গেল। লীনার বিদায়ের পর রিশান রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ। সে সময় লীনার ছোটভাই যুব এসে একটা ভাঁজ করা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলল, এটা লীনা আপু তোমাকে দিতে বলেছে। যুব চলে গেলে রিশান কাগজটা খুলল। গুটিগুটি অক্ষরে লেখা ছোট একটা চিঠি। রিশান ভাই, তুমি কি জানতে না, আম্মু আর খালামণি আমার জন্মের পরই তোমার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করে রেখেছিলো? আমি ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছি তুমি আমার বর। তোমার সাথেই আমার বিয়ে হবে। অথচ তোমাকে বিয়ের কথা বলতেই তুমি মানা করে দিলে। বলে দিলে আমি নাকি তোমার বোন। কিন্তু আমি তো তোমাকে কখনো ভাই ভাবিনি। আমি তবু তোমাকে জোর করিনি। জোর করলে হয়তো বিয়ে করে নিতে আমায়, কিন্তু নিজে ভালো থাকতে না।

তুমি কল্পনা করতে পারো, তুমি যাকে ভালোবাসো সে পাশে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকবে, আর তোমার বিয়ে হবে অন্য কারো সাথে? আজ আমাকে সেই দিন দেখতে হচ্ছে। কষ্ট শুধু আমি একা পাব কেন? তুমিও শাস্তি পাবে। তোমার শাস্তি হচ্ছে তুমি আর কোনোদিন আমার সামনে আসবে না। আমার বৌভাতে যাবে না। আমি বাড়ি এলে এই বাড়িতে আসবে না। যে ফ্যালিমি প্রোগ্রামে আমি থাকব, সেখানে তুমি থাকবে না, এমনকি রাস্তাঘাটেও যেন তোমার সাথে দেখা না হয়। যদি দেখা হয়ে যায় তো সেদিন কী করব কল্পনাও করতে পারবে না।

চিঠির নিচে নাম লেখা নেই। লীনা এটা কী করল? রিশানের মাথাটা যেন চক্কর দিয়ে উঠল। সে কোনোরকমে হেঁটে বাড়ি গেল। সারারাত তার ঘুম হলো না। মাথায় চিঠির প্রতিটা অক্ষর ঘুরপাক খেতে লাগলো। ভোরবেলা ভার্সিটির অযুহাত দিয়ে বাড়িতে চলে গেল রিশান। প্রায় চার বছর হয়ে এলো। রিশান কিছুদিন আগে একটা চাকরি পেয়েছে। বিয়ে করেনি এখনো। বিয়ের কথা ভাবলে তার তীব্র অপরাধবোধ হয়। সাথে অস্বস্তি। লীনার সাথে এরপর আর দেখা হয়নি। শুনেছে তার একটা মেয়ে হয়েছে।

একদিন নিউমার্কেটে ফুটপাথ ধরে হাঁটার সময় হুট করে লীনার সাথে দেখা হয়ে গেল। লীনার সাথে তার বর আর মেয়ে। রিশান একটু আড়ালে দাঁড়ালো। লীনা আগের চেয়ে একটু মোটা হয়েছে। হাসিখুশি দেখাচ্ছে তাকে। মেয়েটা বড্ড সুন্দর। পুতুলের মতো। আধো আধো কথা বলছে। এটা ওটা দেখাচ্ছে। বাবা তাকে কোলে নিয়ে ঘুরে ঘুরে জিনিস দেখাচ্ছে। রিশান একমনে বাচ্চাটাকে দেখে যাচ্ছিলো, হঠাৎ কে ওর পেছন থেকে হাত ধরে টান দিল। রিশান তাকিয়ে দেখল লীনা। রিশান অবাক গলায় বলল, তুই?

— হুম। তুমি আমাকে এড়িয়ে চলো কেন? বিয়ের পর একদিনও দেখা করার সময় হলো না তোমার? লীনার গলায় অভিমান। রিশান হতভম্ব হয়ে গেল। লীনা বলে চলেছে, তুমি অনেক খারাপ রিশান ভাই। আমি তোমার জন্য কতদিন অপেক্ষা করেছি। সেবার আমার যখন মেয়ে হলো, সবাই গেল, শুধু তুমি গেলে না। তুমি পছন্দ করো বলে আমি খেজুর গুড় দিয়ে পায়েস রান্না করে তুলে রেখেছিলাম। খালামণিকে বলে রিশান লীনাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, তুই-ই তো আমাকে বলেছিলি তোর সাথে যেন দেখা না করি। লীনা যেন আকাশ থেকে পড়ল।

— আমি এই কথা কখন বললাম?
–কেন তুই চিঠি দিসনি?
— কোন চিঠি?
— তোর বিয়ের দিন দিয়েছিলি। মনে করে দেখ।

লীনা মনে করার কোনো প্রয়োজন মনে করলো না। সে হাত নাড়িয়ে বলল, আমি কোনো চিঠি দেইনি। বিয়ের এত ব্যস্ততার মধ্যে আমি তোমাকে চিঠি দেব কখন? আর কেউ দিয়ে থাকলে মজা করেছে। রিশান ভাই, তুমি এত বুদ্ধু কেন? চলো তো আমার মেয়ের সাথে দেখা করিয়ে দেব। লীনা রিশানের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল।

রিশান কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারছে না। এতদিন যে চিঠিটা সত্যি বলে মেনে নিয়ে সে এত কষ্ট পাচ্ছিলো সেটা নাকি ভুয়া চিঠি! রিশানের ইচ্ছে হলো নিজেকে কষে কয়েকটা চড় লাগিয়ে দেয়। আসলেই তো একটা মেয়ে তার বিয়ের দিন এমন চিঠি কেন লিখবে? তাছাড়া বিয়েতে লীনা যথেষ্ট খুশি ছিল। গায়ে হলুদের দিন সবার সাথে নাচানাচি পর্যন্ত করেছে। আর সে গর্দভ সেদিনের পর থেকে কোনো মেয়ের আশেপাশে ঘেষতেও ভয় পেয়েছে। মনে মনে নিজেকে গালি দিল। ভাবল যুবকে ধরবে। কিন্তু এখন ধরে লাভ কী? হয়তো যুবও ভুলে গেছে কবেকার কথা। রিশান পুরো বিষয়টা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে নিজের দিকে মনোযোগ দিল। মা কয়েকদিন ধরে একটা মেয়ের কথা বলছে। ওই মেয়েটাকে দেখা যায়। এখন বিয়ে না করলে তার বিয়ের বয়সটা পারই হয়ে যাবে।

মেয়েটার নাম আনিশা। রিশানের প্রথমেই মেয়েটাকে পছন্দ হয়ে গেল তার হাসি দেখে। পাতলা ঠোঁট। হাসলে মুখের দু’পাশে সুন্দর ভাঁজ হয়ে সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ে। যেন মুখের প্রতিটা অংশ হাসছে। কথা বলে নিচু গলায়। তবে মেয়েটা একটু ছোট। মাত্র অনার্সে ভর্তি হয়েছে। রিশান এত ছোট মেয়ে বিয়ে করতে চাইছিলো না, তবে আনিশাকে দেখে সে মানাও করতে পারলো না। বিয়ে পাকা হয়ে গেল। আনিশার বাবা ইতালি থাকে। দুই মাস পর দেশে আসবে। তখন বিয়ে হবে। এই দুই মাস আনিশার সাথে রিশানের চুটিয়ে প্রেমের পর্ব চলল।

রিশানের এখন মনে হয় এক জীবনে প্রেম না করতে পারলে সেটা অর্ধেক বৃথা। তার জীবন বৃথা হতে হতে বেঁচে গেছে। আনিশাকে সপ্তাহে একদিন দেখতে না পারলে তার দমবন্ধ হয়ে আসে। রাত জেগে কথা চলতেই থাকে। সবচেয়ে ভালো লাগে যখন আনিশা নতুন নতুন রান্না শিখে সেটা রিশানের জন্য নিয়ে তার অফিসে পৌঁছে যায়। সব রান্না ভালো না হলেও রিশানের কাছে সেই তেল মসলার সাথে মিলে থাকা আনিশার ভালোবাসা আর খাওয়ার সময় তাকিয়ে থাকা তৃপ্তিমাখা দৃষ্টিতে প্রতিটা ডিশ অমৃতের মতোই মনে হয়। মাঝে ভ্যালেন্টাইন ডে পড়ে গেল। সেদিন তারা সারাদিন হাত ধরে ঢাকা শহর ঘুরে বেড়ালো৷ দেখতে দেখতে বিয়ের সময়ও চলে এল।

বিয়ের দিন বাড়ি আসার পর লোকজনে ভর্তি বাড়িতে রিশান এক মুহূর্তের জন্যও বউকে পেল না। ফটোশ্যুট শেষ হলে সব মহিলারা ঘিরে বসল আনিশাকে। আর রিশানকে ডেকে নিয়ে গেল বন্ধুরা। তাদের স্পেশাল ট্রিট দিতে হবে বিয়ের। ওসব ছাইপাশ কিনে আনালেও রিশান খেল না। আনিশার কথা ভেবে গেল বসে বসে। সেখান থেকে এসেও নিস্তার নেই। হাজারটা কাজ। তার ঘাড়ে এত দায়িত্ব! সেসব নিবৃত্তি করে সবাই শুয়ে পড়ার পর সে যখন বাসর ঘরে গেল তখন রাত তিনটা ছুঁই ছুঁই। দেখল বিয়ের ভারি শাড়ি পোশাক নিয়েই আনিশা ঘুমিয়ে গেছে। ক্লান্ত চেহারাটা দেখে রিশানের আর তাকে জাগানোর ইচ্ছে হলো না। সে জামাকাপড় ছেড়ে শুয়ে পড়ল পাশে।

সকালে ঘুম ভাঙলে আনিশাকে দেখতে পেল না। সে সবার সাথে কাজ করছে। ডাইনিং এ একটু দেখা পেলেও কথা বলার সুযোগ নেই। রিশানের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। দুপুরের পর সে বুকশেলফ থেকে শেক্সপিয়ারের একটা বই টেনে নিয়ে সোফায় গিয়ে বসল। বইয়ের এক লাইনও না পড়ে শুধু তাকিয়েই রইল। তার চাচাতো ভাই রুপু এসে পাশে বসে বলল, ‘রোমিও-জুলিয়েট’ বই কেউ এমন ভুরু কুঁচকে পড়ে নাকি? এক রাতেই তোর রোমান্সের উপর থেকে মন উঠে গেল নাকি? রিশান কথা বলল না। বইয়ের দিকে তাকিয়ে এতক্ষণে দেখল সে নিয়েছে একখানা রোমান্টিক বই! রুপু বলল, বুঝেছি তোর সমস্যা। ভাবীকে পাচ্ছিস না বলে মন খারাপ? তুই এক কাজ কর। ছাদে চলে যা। আমি ভাবীকে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। রিশান অবাক গলায় বলল, কেমন করে করবি?

— সে তোর জানতে হবে না। তুই যা।

রিশান ছাদের চাবি নিয়ে চলে গেল। ছাদটা তার বাবার খুব শখের৷ ছাদে তিনি অনেক রকমের ফুল, ঔষধী গাছ লাগিয়েছেন, সুন্দর করে সাজিয়েছেন পুরোটা। ছাদে বাড়ির লোক ছাড়া অন্য কারো আসার সুযোগ নেই। সবসময় তালাবদ্ধ থাকে। এমনকি মেহমান আসলেও ছাদে যাওয়াতে কড়া নিষেধ থাকে। একটু পর মিলি ভাবী এসে আনিশাকে দিয়ে গেল। বলল, বেশিক্ষণ বউকে রেখে দিও না আবার। একটু পরেই খোঁজ পড়ে যাবে নিচে।

মিলি ভাবী চলে গেলে রিশান আনিশাকে টেনে একটা কর্ণারে নিয়ে গেল। গাল টেনে দিয়ে বলল, তুমি কাকে বিয়ে করেছ বলো তো? আমাকে না আমার বাড়ির লোককে? আনিশা হেসে দিল। রিশানের রাগ পড়ে গেল। অনেকক্ষণ হয়ে যাওয়ার পরও দুজনের যখন আসার খবর নেই, তখন মিলি লীনাকে ডেকে চুপিচুপি বলল ওদের ডেকে নিয়ে আসতে। লীনা ছাদে গিয়ে দেখল রিশানের কাঁধে মাথা রেখে আনিশা বসে আছে। আজকের দিনটা মেঘলা। দুপুরে বৃষ্টি হয়েছে। আকাশে চমৎকার রংধনু হয়েছে। দুজনে মুগ্ধ হয়ে হাতে হাত রেখে রংধনু দেখছে।

লীনা নিঃশব্দে সেখান থেকে চলে এল। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে মুখো আঁচল চাপা দিয়ে কেঁদে ফেলল সে। এই এতগুলো দিন হওয়ার পরও সে কেন রিশান ভাইকে ভুলতে পারছে না? নিজেকে হাজার কোটিবার প্রশ্ন করেও উত্তর মেলে না। তার স্বামী যথেষ্ট ভালো মানুষ। সেই ভালোমানুষ লোকটার সাথে অভিনয় করে যেতে তার ভালো লাগে না। ইচ্ছে করে দু’চোখ যেদিকে যায় চলে যেতে।

তার প্রচন্ড অভিমানে লেখা চিঠিটা পড়েই যে রিশান এখনো বিয়ে করছে না সেটা বুঝতে পেরেছিল লীনা। তাই নিজে থেকে গিয়েছিল রিশানকে মিথ্যে কথাটা বোঝাতে। ভালো হয়েছে সে ভালো আছে। খারাপ থাকলে লীনার আরও বেশি খারাপ লাগতো। এক জীবনে সবার সবকিছু পেতে হয় না। কখনো কখনো প্রিয় মানুষের সুখের মাঝেই নিজের দুঃখটা ভুলে থাকতে হয়।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত