শাড়ি অনঃস্ত

শাড়ি অনঃস্ত

নাইট ক্লাবে একটা মেয়ে শাড়ি পড়ে এসেছে! অদ্ভুত লাগলো আমার কাছে। এগিয়ে গেলাম। নামটা জিজ্ঞেস করলাম। নাম বললো ক্যাথরিয়ানা। ভেবেছিলাম বাঙালী কিন্তু সে বেলজিয়ান। বললাম, আমি ডেভিড শেফার্ড। পেশাদার খুনি। মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে বললো, “ এ্যাঁঁ? আমার কাছে কী চান? ” ভয়ে কাঁপতে লাগলো সে। ভালোই লাগছে। দুই বছর আগে বাঙালী একটা মেয়েকে খুন করেছিলাম। সে ভয়েই অর্ধেকটা মরে গিয়েছিলো। পরদিন থেকে আমার অনুনয় হয় বাঙালী মেয়েদের ভয় চোখে দারুণ লাগে। “ কিছু না। আপনি শাড়ি পড়ে যে ক্লাবে আসলেন? এভাবে তো বাঙালীরা সাজে। প্রেমিক বাঙালী নাকি? ”

সে আমার থেকে একটু দূরে যেতে লাগলো। এড়িয়ে যেতে যেতে বললো, “ জ্বী নাহ। আমার প্রেমিক নেই। ভালো থাকবেন। বলেই মেয়েটা বেড়িয়ে পড়লো। আমি বেশ মজা পেলাম। সে সঙ্গে সে বাঙালীও না, প্রেমিকও বাঙালী না। তো সে শাড়ি পড়লো কেনো? এটুকু জানার জন্য ক্যাথরিয়ানার পিছু নিলাম। সে একটা ট্যাক্সি নিলো। ট্যাক্সির দরজাটা টানার আগে আমি উঠে পড়লাম। মেয়েটা দূরে সরে জানালা ঘেঁষে বসে বললো, “ আপনি! কোথায় যাবেন? “ কোথাও না। আপনি বাঙালী না হয়েও শাড়ি পড়লেন কেনো ওটা বলেন। আমি চলে যাবো। আমার কাছে এতো সময় নেই। ঘুমানোর আগে দুটো খুন করতে হবে। ”

ক্যাথরিয়ানা ভয়ে ভয়ে বললো, “ আমার দুজন বান্ধবী আছে বাঙালী। ওদের একজনের জন্মদিন ছিলো আজকে। তাই আরকি। মেয়েটার দিকে আমি ভালো করে তাকাতেই সে বললো, “ মিথ্যা বলেছি! “ তো সত্যিটা বলেন। “ সত্যিটা বলা যাবে না। “ তাহলে চলুন আপনাকে বিয়ে করবো। ” মেয়েটা প্রায় কেঁদেই দিলো। “ আমাকে ছাড়ুন না। আমাকে খুন করে আপনি কিছুই পাবেন না। এক পয়সাও নেই আমার কাছে। ”মেয়েটা ভেবেছে আমি টাকার জন্য খুন করি! হেসে বললাম, “ ভয় পাবেন না। আপনাকে খুন করবো না। শুধু বলেন কেনো শাড়ি পড়লেন। আমি নেমে যাবো। ”

ক্যাথরিয়ানার নাক ঘেমে একাকার। কিন্তু মেয়েটা শাড়ি পড়েছে কেনো ওটা বললে কী সমস্যা? “ আমার এক আত্মীয় বাংলাদেশে বিয়ে করেছে। তাঁদের সাথে বেড়াতে গিয়েছিলাম। তখন এসব দিয়েছে। আজকে শখ করে পড়লাম। ” বিশ্বাস করার মতো কথাই বললো। কিন্তু আবার ক্যাথরিয়ানার দিকে তাকাতেই সে বললো, “ এটাও মিথ্যা বলেছি! ” আমি সাধারণত কারো দুটো মিথ্যা সহ্য করি না। তার ঠিকানা পরপার হয়ে যায়। কিন্তু এই মেয়েটার মিথ্যায় আমি মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি।

“ তা তো বুঝতেই পেরেছি। কিন্তু আপনি সত্যিটা বলছেন না কেনো? ” মেয়েটা বললো, “ প্রচণ্ড ক্ষিদে পেয়েছে। আমি কথা বলতে পারছি না। সামনেই আমার বাসা। নেমে যাবো। আমি এই প্রথম কোনো মেয়ের হাত ধরলাম। অন্যরকম অনুভূতি। এর আগে যাদের হাত ধরেছি তাঁরা আর কেউ বেঁচে নেই! “ দেখুন আমি সরাসরি কথা বলতে পছন্দ করি। আপনি যদি সত্যিটা না বলেন তাহলে পিছু ছাড়তে পারছি না।

মেয়েটা হো হো করে কেঁদে দিলো! “ কদিন পরে আমি ডাক্তার হবো। আমি ডাক্তার না হতে পারলে বড় আপু খুব কষ্ট পাবে। আমাকে ছেড়ে দিন না দয়া করে। “ ডাক্তার হোন না আইনজীবী হোন আমার দেখার বিষয় না। আপনি শাড়ি পড়লেন কেনো তাই বলেন। সে ব্যাগ থেকে এক বোতল পানি বের করলো। চোখের পানি মুছতে মুছতে হয়তো তৃষ্ণার্ত হয়ে গেছে। সে পানির বোতলে চুমুক দিতে যাবে ঐ মুহূর্তে আমি হাত বাড়িয়ে বললাম, “ পানি খাবো, বোতলটা দিন। ”

হাত কাঁপছে মেয়েটার। বললো, “ পানি দিবো। তার আগে একটা কথা দিতে হবে। আপনি আর কোনোদিন আমার পিছনে লাগবেন না। ”মেয়েদের কান্না করলে এতো অপরূপ লাগে! মেয়েটার বাচ্চা বাচ্চা কান্নাতে আমি কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম। বললাম, “ ঠিকা আছে। আর কোনোদিনও পিছু করবো না। আজকেই শেষ। ” পানির বোতলে চুমুক দিলাম! তারপর আমার কী যেন হলো মনে নেই। চোখটা খুলে আমি নিজেকে একটা বাথরুমে আবিষ্কার করলাম! চেয়ারের মধ্যে আমার সমস্ত শরীর বাঁধা! কেউ একজন ঢুকে আমার চোখে পানি দিলো। দেখলাম ক্যাথরিয়ানা!

“ ক্যাথরিয়ানা তুমি? ” ক্যাথরিয়ানার চোখে পানি। “ আমি ক্যাথরিয়ানা না। আমি তৌসিবা। দুবছর আগে যে মেয়েটাকে বিমানের মধ্যে খুন করেছিলেন সে আমার বোন ছিলো! ” মনে পড়ে গেলো সে বাঙালী মেয়েটার কথা। “ হ্যাঁ মনে পড়েছে। তারিন নাম ছিলো না মেয়েটার? কিন্তু এখন তুমি কী আমাকে খুন করতে চাচ্ছো? ” মেয়েটা দুঃখের মধ্যে হেসে বললো, “ নাহ, খুন করার ইচ্ছে থাকলে আগেই করতাম। তোকে এখানে এনেছি তিলেতিলে মারতে। দুটো বছর ধরে ফাঁদটা পেতেছি এতো সহজে খুন করতে নয়। ”

জীবনে এই প্রথমবার আমি অসহায়। একটা বাথরুমে থাকতে হচ্ছে! মেয়েটা আসে দিনে এক বোতল নিয়ে। আর নিয়ে যায় আমার শরীর রক্ত। হাত, পা, নাক ইত্যাদি! চৌদ্দদিন পরে সে সাদা কাপড় পড়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, “ মিস্টার শেফার্ড সাহেব। আপনার কী কোনো শেষ ইচ্ছে আছে? ” আমি জানি আজকেই আমার শেষ দিন। জানতে চাইলাম, “ আমার একটাই শেষ ইচ্ছে। তুমি কীভাবে বুঝলে শাড়ি পড়লে আমি তোমার কাছে যাবো? ”

মেয়েটা আমার গলায় ছুরি চালানোর আগে বললো, “ গাধা এটা আপুর গায়ের শাড়ি। এখনো শাড়িতে রক্ত লেগে আছে! দেখা হবে পরপারে। আর আপুর সাথে দেখা হলে বলিস, আমি ডাক্তার হয়ে জীবনের প্রথম অপারেশনটা তাঁর খুনিকে দিয়েই শুরু করেছি! সামান্য একটা শাড়ির জন্য নিজের জীবন দিতে হলো! তা ভাবতেই হাসি পেলো। কিন্তু হাসবার শক্তিটুকুও পেলাম না। চোখটা সারাজীবনের জন্য বন্ধ হয়ে গেলো!

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত