প্রতিচ্ছবি

প্রতিচ্ছবি

হাফসার গায়ের রঙ চাপা। যাদের গায়ের রঙ ময়লা তাদের চেহারায় মাধুর্য্য থাকতে হয় নয়ত পুরুষ মানুষ ফিরে তাকায় না। হাফসা কপালের ব্রণ ঢাকতে ছোট্ট টিপ পরে, কালচে ঠোঁটে কোনো রঙের লিপস্টিক মানায় না। ও হালকা গোলাপি মিশেল লিপবাম ইউজ করে। শরীরে মাংস নেই, চেহারায় জৌলস নেই সহজেই ভীড়ের মাঝে হারিয়ে যেতে পারত, সর্বনাশ করেছে ওর লম্বা দু’খানা পা। পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি উচ্চতা, পাড়ার ছেলেরা ওর নাম দিয়েছে বগা মামী। আমারো ওকে ঠিক পছন্দ হত না, কারণে অকারণে সারাক্ষণ হাসে কিন্তু চেহারার রুক্ষতা কাটে না।অথচ এই মেয়েটাকেই আমাদের বাসায় আনতে হল।

তূর্য সবে নার্সারি উঠেছে, ওকে প্রাইভেট টিউটর দেবার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু বিকাল হলেই বাইরে যাবার মর্জি করে তাই বাধ্য হয়ে বাসায় টিচার রাখলাম। হাফসার সমাজ কল্যাণে মার্স্টাস। তূর্যদের কিন্ডারগার্টেনে পড়ায়। হাফসার বাবা জীবিত নেই, মাকে নিয়ে ভাই-ভাবীর সাথে আমাদের পাশের বাড়িতেই ভাড়া থাকে। ওকেই তূর্যর টিচার ঠিক করলাম। প্রথম দিন পড়াতে এসেছে টুকটাক কথা হল। কথার প্রসঙ্গে জানলাম,ওর আর আমি এস.এস.সি পাস করেছি একই সালে। মলিন হাসল,

-ভাবী, দেখেন। আপনার বাচ্চার বয়স পাঁচ বছর আর আমার এখনও বিয়েই হল না।

-আমার এইচ.এস.সি পরীক্ষার পর পরই বিয়ে হয়ে যায়।রেজাল্ট ভালোই ছিল কিন্তু বাবা-মা আর্কিটেক্ট পাত্র পেয়ে আর না করলেন না।

-বিয়ের পর পড়তে চান নি?

-চেয়েছিলাম। তোমার ভাই ভর্তি করল না।শ্বশুরশ্বাশুড়ির বয়স হয়েছে তারাও নাতির মুখ দেখার জন্যে তাড়া দিতে লাগল। তারপর তো এই সংসার করছি। হাফসা হাত বাড়িয়ে আমার কাঁধ স্পর্শ করল,

-আরে ভাবী মন খারাপ করছেন কেন?ভাইয়ার জায়গায় আমি থাকলে এত রুপবতী বউকে কলেজে পাঠাতাম না।আপনি শাড়ি পরে বারান্দায় দাঁড়ালে আমি জাস্ট ফিদা হয়ে দেখতাম। নাস্তায় চা-বিস্কুট,সেমাই হাফসা আরাম করে খেল,

-ভাবী, বাড়িতে বাজার খরচের টাকা দেই তবু খেতে বসলে লজ্জা করে। ভাইয়ের সংসার,বুঝেনই তো।

সেদিন থেকে সাধারণ চেহারার মেয়েটির উপর কেমন অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে পরলাম। হাফসা তূর্যকে পড়ায় অনেকটা সময় নিয়ে। তূর্যর চেয়ে আমার সাথে গল্প করে বেশি। বাড়িতে একা থাকি,ছেলের বাবা নয়টা- ছয়টা অফিস করে, হাফসার মত বন্ধু পেয়ে সত্যি আমার কিছু খুচরো সময় কাটে। সমবয়সী, কথার ছলে ছেলেদের প্রসঙ্গ আনে৷ এই বিষয়ে হাফসার আগ্রহ বেশ।

-মিষ্টি ভাবী, ছোটবেলায় আমার একজনকে খুব ভালো লাগত।

-নাম কি?

-বলব না। হাফসা লাজুক হাসে।

-আহা, বলো না।

-তুহিন ভাই,আপনার কর্তা। ভাইয়ার কাছ থেকে গল্পের বই ধার নিতে আসতাম। গম্ভীর মুখে বই উল্টেপাল্টে হাতে দিত।সাত দিনের মধ্যে ফেরত দিবি,একটা পৃষ্ঠা নষ্ট হলে তোর কান ছিঁড়ে ফেলব। বই কি আর পড়তাম ভাইয়াকে দেখতে আসার জন্যেই যত বাহানা।

-তারপর?

-একদিন খুব সাহস করে বইয়ের কাজে চিঠি রেখে গেছিলাম। পড়েছে কি না জানি না, আর পড়লে ও বা কি উনার বয়েই গেছে কালো মেয়েকে পাত্তা দিতে।

-এভাবে বলছ কেন?

-অর্নাসের উঠার পর মা খুব চেষ্টা করেছিলে বিয়ে দিতে। তখন বয়স কম ছিল, চেহারায় চটক ছিল। একটা ছেলে আমাকে দেখে পছন্দও করেছিল। ব্যাংকের ক্যাশিয়ার, চেহারা সুন্দর। হাইটে কম তাই ঢঙ করে না করে দিলাম। এখন পস্তাই। ওর মুখটা দেখতে দেখতে বিষণ্ন হয়ে যায়।

-এত চিন্তা করো না। আল্লাহপাক যেখানে নসিবে রেখেছেন বিয়ে একদিন হবেই।

-নাগো ভাবী, ভাইয়ের গর্জ নাই। সম্বন্ধ আসে না।

হাফসার ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ওর আরো দুটো টিউশন আছে। কিন্ডারগার্টেন জব করে,টিউশন করায়। খাওয়া-পরার চিন্তা করতে হয় না,যথেষ্ট স্বাবলম্বী। ওই যে, লোকে কি বলে! ওর বাড়ি ফিরতে রাত হয়।পাড়ার মধ্যবয়স্ক পুরুষদের সাথে রাস্তায় দেখা হলে একগাল হাসে,

-কি ম্যাডাম, কেমন আছ?

-জ্বী,ভালো।

-শরীরটা ভালো তো?

মুখে কথা বলে কিন্তু চোখ হাফসার দেহটাকে ঘিরে উপর-নীচ হয়। হাফসার মাটির সাথে নিজের শরীরটা মিশিয়ে দিতে ইচ্ছা হয়। ভোরে উঠে হাফসা নাস্তা বানিয়ে স্কুলে যায়। লাঞ্চে শুকনো রুটি খেয়ে অভ্যাস হয়ে গেছে। রাতে বাড়ি ফিরে খাবার টেবিলে ভাতের সাথে তরকারি থাকে না। অসুস্থ মা কোনোদিন সবাইকে লুকিয়ে এক টুকরো মাছ, একবাটি ডাল তুলে রাখে। হাফসাকে বলেছিলাম,

-মাকে নিয়ে আলাদা থাকতে পারো না?

-পারি ভাবী, আমার যা ইনকাম মাকে নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্য চলে যাবে। কিন্তু মাথার উপর ভাই-ভাবী থাকার পরও লোকে ইঙ্গিতে শুতে যেতে বলে, আর আলাদা থাকলে তো হাফসার দীর্ঘশ্বাস অব্যক্ত কথা জানান দেয়। একদিন হাফসা এল সন্ধ্যায়৷ পরনে সবুজ শাড়ি,ম্যাচিং টিপ। চোখের কাজলে মুখ মাখামাখি।ধপ করে সোফায় বসে পরল।

-ভাবী একগ্লাস ঠাণ্ডা পানি খাওয়াবে? পানি এনে দেখি হু হু করে কাঁদছে। ওর মাথায় হাত দিলাম,
-কি হয়েছে?

– বান্ধবীর ম্যারিজ ডে ছিল,সেখানেই যাচ্ছিলাম।মোড়ের চায়ের দোকান থেকে ওরা বলছে,
-যতই সাজো, বিয়ে হবে না। ওর কান্নার প্রকোপ আরো বাড়ল। ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম।

-ভাবো,এসব তো প্রায়ই শুনি, সয়ে গেছে। আরো কি হয় জানো?

-কি?

-স্কুলের পিয়ন, আফজাল চাচা তক্কে তক্কে থাকে৷ আমি বাথরুম গেলেই খটাশ করে দরজায় ধাক্কা মারে, বাথরুমের সিটকিনি ভাঙা। অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে।

-ভাবী, আপনাদের পরিচিত কেউ থাকলে আমার কথা বলবেন।এই ধরেন, ডির্ভোসী বা একটা বাচ্চা রেখে বউ মারা গেছে। আমার কোনো সমস্যা নাই।স্বামী সুখের আশা করি না,মাথার উপর একটা ছাদ থাকলে লোকজনের কান কথা থেকে তো বাঁচতাম।

তূর্য ঘুমাচ্ছে। ওকে আর পড়ার জন্যে ডাকলাম।অনেকক্ষণ বসে থাকার পর হাফসা উঠে চলে যায়, ওকে সান্ত্বনা দেবার ভাষা আমার নেই। ও চলে যাবার পর পায়ে পায়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াই। তীক্ষ্ণ নাক, টলটলে চোখ। মা বলতেন, বিধাতা আমার মেয়েকে বড় যত্ন করে বানিয়েছেন। মিথ্যা বলেন নি নয়ত গরীব ঘরের কেরানি মেয়ে বনেদি ঘরের পুত্রবধূ হতে পারত না।

তুহিনকে হাফসা পছন্দ করত, আরো অনেকেই করত। শিক্ষিত,রুচিবান,ব্যক্তিত্ববান চেহারা। এত ভালো বর পেতে ভাগ্য লাগে। ভাগ্যবতী! শাড়ির আঁচল এক ঝটকায় বুক থেকে সরাতেই আয়নায় যেন আলো ফুটল। ফর্সা চামড়ায় কালো ব্লাউজ এটে আছে। গলায়,কাঁধে কামড়ের দাগ। কাল রাতে কয়েল ধরিয়ে আনতে দেরি হয়ে ছিল। ছ্যাঁত করে জ্বলন্ত কয়েল নাভির উপর লাগিয়ে দিল। পোঁড়া জায়গায় হাত বুলাতে বুলাতে হাফসার কথা ভাবছিলাম।

-ওর তবু আঙুল তুলে সমাজকে দোষারোপ করার জায়গাটুকু আছে আর যার ঘরের ভেতর সমাজ বাস করে সে আঙুল তুলবে কার উপর!

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত