অভিশাপ

অভিশাপ

সবুর মুন্সির এখন প্রতিদিন শুরু হয় বকা বাজি দিয়ে ।

-মরে না কেন ? হারামির বাচ্চা মরে না কেন ? এতো মানুষ মরে এই দুনিয়ার বজ্জাতটারে আল্লাহ চোখে দেখে দেখে না কেন ??

অভিশাপ আর বক বক করতে করতে সবুর মুন্সির সকাল পার হয় । সবুর মুন্সি গ্রামের খেজুর গাছ গুলো বর্গা নিয়েছেন গেরস্থিদের কাছ থেকে কিন্তু প্রতিদিন যে কোন একটা খেজুরের রসের পাতিল শূন্য হয়ে যায় । কোন এক অদৃশ্য চোর এই কৃত কার্যটা করে তার জানা নাই । আর তাই তো প্রতিদিন সকাল সকাল সবুর মুন্সির মুখ থেকে নিঃসৃত হয় মধুর বানী ।

কিন্তু আজ সব পাতিলের রসই ঠিক আছে কোনটাই চুরি হয় নাই । সবুর মুন্সি মনে মনে একটু খুশি হয়, যাক তাহলে
আইজ কোন রসই চুরি হয় নাই । গ্রামের দুরন্ত বালক সবুজ । তার জ্বালায় গাছের রস । কচি ডাব, ফল মূল কিছুই আস্থা থাকে না । চুরি করে কারো গাছের কিছু না খেলে তার যেন পেটের ভাত হজম হয় না । আর এই সবুজ আজ মরণ ব্যাধি নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি । অবস্থা খুবই আশংকা জনক । এই সবুজই, সবুর মুন্সির গাছের রস চুরি করে খেত ।

ডাক্তার তাকে বলেছে কাঁচা খেজুরের রস খাওয়ার ফলেই তার এই রোগ হয়েছে । বাদুরের মাধ্যমে নাকি এই রোগ ছড়ায় । তাই তো সবুজ আজ বরই অনুতপ্ত । মৃত্যু তার খুবই সন্নিকটে । কেন সে সবুর মুন্সির গাছ থেকে রস চুরি করে খেত গেল । তার কাছে মনে হচ্ছে সবুর মুন্সির কাছে মাফ চাওয়া দরকার । মাপ পাওয়া না গেলে তো সে যে মরেও শান্তি পাবেনা । সবুর মুন্সি কে হাসপাতালে খবর দেওয়া হয়েছে মৃত্যু পথ যাত্রী সবুজ কে দেখে আসার জন্য কিন্তু তাকে কেন খবর দেওয়া হয়েছে সে বুঝতে পারছে না কারণ গ্রামের সবুজ ছেলেটি তার কোন আত্মীয় স্বজন নয়।

সবুর মুন্সি বসে আছে সবুজের হাত ধরে । ছেলেটি শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেছে । সবুজের চোখে ছল ছল জল, আর করুণ চেহারা একেবারে হৃদয় ছুঁয়ে যায় । কান্না জড়িয়ে সবুজ, সবুর মুন্সি কে বলতে থাকে চাচা আমাকে আল্লাহর ওয়াস্তে মাপ করে দেন । আমি প্রতিদিন আপনার গাছের রস চুরি করে খেতাম । তাই তো আল্লাহ আমাকে এই শাস্তি দিল । আপনি মাপ না করলে তো আমি মরেও শান্তি পাব না । সবুর মন্সি কি বলবে ভেবে পায় না । সে নিজেই তো দোষি তার কাছে, কারণ তার অভিশাপেই তো সবুজ আজ মৃত্যু সজ্জায় । নিজেকে খুব দোষি আর অপরাধী মনে হয় সবুর মুন্সির । সবুজের করুন চাহনি করুন আবেদন সবুর মুন্সি হৃদয় আকাশ এবারের লন্ড ভন্ড করে দেয় । সবুর মুন্সি হাউ মাউ করে কেঁদে উঠে

বাপরে বরংচ তুই আমারে মাপ করে দে আমি তোরে অভিশাপ দিছি তোর মৃত্যু কামনা করছি । আমি তোরে হত্যা করছি বাপজান, আমারে মাপ দে । সবুর মুন্সি নিচু হয়ে সবুজকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে । সেই কাঁদায় নেই কোন অভিশাপ আছে শুধু একরাশ ভালোবাসা ।সবুর মুন্সি এক পাতিল রস নিয়ে জ্বাল দিচ্ছে । উদ্দেশ্য সবুজের জন্য নিয়ে যাবে হাসপাতালে । পরম মমতায় নাড়া দিচ্ছে রস গুলো আর মনে মনে বলছে আল্লাহ সবুজ কে তুমি ভালো করে দেও, আল্লাহ ভালো করে দেও ।

সবুর মুন্সির হাতে এক পাতিল রস । পরের দিন আবার আসছে সবুজ কে দেখতে কিন্তু একি সবুজের ক্যাবিনে এতো ভিড় কেন ? কাছাকাছি আসতেই কান্নার আওয়াজ আসলো তার কানে । যা বোঝার বুঝে গেল সে । নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না । হাত থেকে রসের পাতিল ফসকে গেল । রস গুলো সব ছড়িয়ে গেল হাসপাতালের ফ্লোরে । কিন্তু সবুজের কাছ অব্দি পৌঁছালো না কিন্তু পৌঁছানো উচিত ছিল কারণ এই রস ভালোবাসার রস অভিশাপের না ।

সবুর মুন্সির সবুজের মরা মুখটা দেখার আর সাহস হলো না । ক্লান্ত পায়ে বেড়িয়ে আসলো হাসপাতালের করিডোর থেকে আর পেছনে রেখে আসলো অভিশপ্ত সবুজ কে । নিজেকে ধিক্কার ছাড়া আর কিছুই দিতে পারছে না সে । হায় হায় কি করলো সে একটা তাজা প্রাণ কে নিঃশেষ করে দিল ??

শিক্ষা : অন্যের গাছের ফল বা রস কিছুই চুরি করে খেতে নেই কারণ অভিশাপ খুব খারাপ একটা জিনিস । আর কাউকে অভিশাপও দিতে নেই কারণ অনেক সময় সেই অভিশাপ রেডিয়েসনের মত কিভাবে অপরকে আঘাত হানবে সেটা আমরা কেউ বলতে পারিনা ।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত