একটু ভয়

একটু ভয়

এইমাত্র মেয়েটিকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে এক কাপ কফি নিয়ে বারান্দায় এসে দাড়ালো রিনা। নিজের নামের সাথে মিলিয়ে মেয়েটার নাম রেখেছে ‘মীনা’।

একমাত্র মেয়েটা দেখতে দেখতে ৫ বছরে পা দিল। মায়ের আদল পাওয়ায় মেয়েটাও মার মত সুন্দরী হচ্ছে দিন দিন। রিনার বান্ধবীরা প্রায় মস্করা করে

বলে এত কালো একটা মানুষের বেবি কিভাবে এত ফর্সা হয়! জাহিদ যে অসম্ভব কালো তাতে একটুও দুঃখ নেই রিনার। কেনইবা দুঃখ থাকবে?

জাহিদের সাথে তো আর জোর করে তার বিয়ে দেয়া হয়নি। বরং নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবেসে, দীর্ঘ ৬ বছর প্রেম করে পরিবারের

সম্মতিতে ধুমধাম করেই বিয়ে করেছে এই কালো মানুষ টাকে। মীনা দেখতে কিন্তু মায়ের মতই হয়েছে। যদিও স্বভাব টা পেয়েছে বাপের মত।

বাপের মত শর্টকাট সোজা সাপটা আর ভিষণ আত্মসম্মান মর্যাদা সম্পন্ন। কালো মানুষের আর কিছু থাক আর না থাক গিঁটেয় গিঁটেয় আত্মসম্মানে ভরপুর।

এ ছাড়াও এরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ও সৎ হয়ে থাকে। এমনিতে যথেষ্ট হাসিখুশি প্রানবন্ত এবং মিশুকও বটে। কিন্তু যদি কোনো দিক থেকে তার ইগোতে

কেউ এতটুকু আঘাত করে তবে আর তার নিস্তার নেই। যদি সে বয়সে ছোট হয় তবে মুখের উপরে কড়া জবাব দিয়ে দিবে, আর যদি বয়সে বড়

হয় তবে সম্মানের খাতিরে মরে গেলেও তার ছায়াটি আর মাড়াবে না সে। মীনার বয়স যখন ২, তখন প্রচন্ড গরমে একদিন অফিস থেকে ফিরে

জাহিদ রিনার কাছে ঠান্ডা পানি খেতে চাইছিল। রিনা জাহিদ কে বসতে বলে ছুটে গেল বাড়িওয়ালার কাছে ফ্রিজের ঠান্ডা পানি আনতে।

কিন্তু রিনাকে খালি হাতে ফিরতে দেখে জাহিদ জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকালো রিনার দিকে। রিনা মুখটা বেজার করে বলল – -“রোজ রোজ ঠান্ডা পানি

আনাতে তারা বিরক্ত হন …! তুমি একটু বোস আমি টিউবওয়েল চেপে
ঠান্ডা পানি নিয়ে আসছি।”
ওইদিনই রাত ৮ টার দিকে নতুন ফ্রিজ নিয়ে হাজির হলো জাহিদ। এবং ওই রাতেই বাড়িওয়ালার কাছে নোটিশ পাঠালো

যে সামনের মাসে তারা বাসা ছেড়ে দিবে!

ফোনটাও বন্ধ। ক্রমেই দুঃশ্চিন্তা গুলো গাড়ো হচ্ছে। সে আরো এক কাপ কফি বানিয়ে আনলো। অস্থির ভাবে পায়চারী করছে বারান্দায়

আর ঘনঘন কাপে চুমুক দিচ্ছে। সাধারণত রাত ৯ টার বেশি কখোনোই দেরী হয়না জাহিদের। রিনার ছোট খালা একবার বেড়াতে এসেছিল এই বাড়ি।

সেবার জাহিদ ১০ টার পরেও বাসায় ফেরেনি দেখে খুব ছটফট করছিল রিনা। ওই ছটফটানি দেখে ছোট খালা ব্যাঙ্গ করে বলেছিল – –

“যেইনা হুতুমপেঁচার মত কালোমুখো স্বামী, তার জন্য আবার চিন্তায় বাচিস না!! তুই ছাড়া দুনিয়ার অন্য কোন মাইয়া ওর দিকে ফিইরাও

চাইবো না, তুই নিশ্চিত হয়ে ঘুমা, সময় হলে ও ঠিকই চলে আসবে।”

কথাটা শুনে গা জ্বলে গেলেও নেহায়েত মুরুব্বী এবং মায়ের ছোট বোন বিধায় নিঃশব্দে হজম করে গেল রিনা। সেদিন রিনার মনে কু ডেকেছিল।

আজোও ডাকছে … সেদিন কিছু হয়নি বলে যে আজ হবেনা তাতো নয়। রিনা বুঝলো তার বুকের মধ্যে চাপা ধুক্ ধুকানি শুরু হয়ে গেছে,

কেননা তখন ঘড়িতে রাত ১২ বেজে ৩৫ মিনিট। তাই বলে এতটা দেরী এর আগে কোনদিন হয়নি, এবং তা হওয়ারও কোন প্রকার সম্ভাবনা নেই।

জাহিদ Non Smoker সুতরাং বন্ধু বান্ধবের পাল্লায় পরে কোন পার্টি ফার্টিতে মদ খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পরে থাকার কোন চান্স নাই।

আর তা ছাড়া ফয়সাল ভাই ছাড়া এই দুনিয়ার আর কোন বন্ধু আছে বলেও জানা নেই রিনার। ফয়সাল আর জাহিদ একই অফিসে চাকরি না

করলেও পাশাপাশি অফিসেই জব করে তারা। ফলে রোজই Lunch Time এ এক সাথেই Lunch করে দুজন।

রিনার ধুকধুকানি ধীরে ধীরে উৎকন্ঠায়, উৎকন্ঠা থেকে ভয় এবং ভয় থেকে এখন অজানা আশংঙ্কাতে পরিনত হয়েছে। ঘড়ির কাটা যখন বলছে

‘এখন রাত ১ টা বেজে ২৫ মিনিট’, তখন তার
ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ও বলছে ‘জাহিদ নিশ্চয়ই কোন বিপদে পরেছে …!!!’
-“হ্যালো ফয়সাল ভাই, আপনার বন্ধু কোথায়? ও তো এখোনো বাসায় ফেরেনি!!”
কাদতেঁ কাদতেঁ রিনা বলল ফয়সাল কে। ফোনের ওপাশ থেকে ফয়সাল বলল –
-“কি বলেন ভাবি! আমি আর ও তো এক সাথেই বের হলাম অফিস থেকে। ঠিক আছে আপনি শান্ত হোন, আমি খোজ নিয়ে দেখছি”
বলে ফোনটা কেটে দিলো ফয়সাল, ফোনটা কাটতে না কাটতেই রিনা টের পেল মীনা ঘুম থেকে উঠে কার সাথে যেন কথা বলছে!!

বাড়ির মেইন দরজা লাগানো, এবং এই ফ্লাটের দরজাও ভিতর থেকে লাগানো! তবে কে এলো ঘরে? কিভাবে এলো? তার মেয়ে কার সাথেই বা
কথা বলছে? ….
বোধহয় ঘুমের মধ্যেই সপ্নে কথা বলছে মীনা, এমনটা ভেবেই কিছুটা স্বস্তি নিয়ে এগিয়ে গেলমেয়ের ঘরের দিকে। কিন্তু ঘরে ঢুকতেই রিনা ধাক্কার মত খেল!! বড়বড় চোখ নিয়ে দেখলো
মীনা লাল একটা জামা পরে সেজেগুজে খাটের উপরে বসে আছে!! কিন্তু তার মেয়েতো জামাটাই ঠিক মত পরতে পারেনা,

সাজগোজ তো দুরের কথা!! তার উপর আবার নিজে নিজে মাথায় লাল ফিতা দিয়ে বেনী বেধেঁছে .. এটা তো আরোও অসম্ভব!!

কি হচ্ছে ব্যাপার টা বুঝে ওঠার আগেই মীনা দৌড়ে এসে তার মা কে জড়িয়ে ধরলো, এবং তোতাপাখির মত ভাঙা ভাঙা
শব্দে বলল –
-“মামোনি মামোনি বাবা হাতপাতালে আতে তলো বাবাল কাতে দায়”
রিনার বিষ্ময়ের কোন সীমা থাকেনা, যোগ বিয়োগ করেও কোন হিসেব মিলছে না তার,
মেয়েকে জড়িয়ে ধরে উন্মাদের মত জিজ্ঞাসা করলো –
-“কেক..কে বলল মা তোমাকে এই কথা? সপ্নে দেখেছো?”
-“না, আমাল আলাকতা মা বলল”
-“কোন মা? কিসের মা?”
-“দানিনা”
-“তোমাকে এই জামা কাপড় কে পড়ালো?”
-“ওই মা তাই পলিয়ে দিয়েতে”
-“কোন মা???”
-“দানিনা”
রিনা সম্পূর্ণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল!! এরকম অবস্থায় এর আগে কোনদিনই পরেনি সে। মেয়ে
কে আরো কিছু জিজ্ঞাসা করবে তার আগেই জাহিদের ফোন থেকে ফোন এলো!! দিক বেদিক
না ভেবে পাগলের মত ফোনটা রিসিভ করল সে। কিন্তু ওপাশ থেকে ভেসে এলো অপরিচিত
একটা কন্ঠস্বর!!
-“হ্যালো আপনি কি জাহিদ সাহেবের স্ত্রী বলছেন?”
-“হ্যাঁ .. জী .. বলছি .. কিন্তু আপনি কে? আমার স্বামী কোথায়?”
-“আপনার স্বামী (অমুক) হসপিটালে আছেন, আপনি দয়াকরে দ্রুত চলে আসুন।”
-“কিন্তু ওর কি হয়েছে বলবেন প্লিজ …. হ্যালো ….হ্যালো …..”
আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফোনটা কেটে দিল ব্যক্তিটা। এমনকি বন্ধও করে দিল
ফোনটা। একটা মূহুর্থও আর ভাবার সময় নেই .. উদভ্রান্তের মত মেয়েটাকে কোলে নিয়ে বের
হলো বাসা থেকে। এত রাতে তার বাসার সামনে সি এন জি দেখে বেশ অবাক হলো রিনা।
আরো অবাক হলো যখন দেখল সিএনজি ওয়ালা তাকে দেখেই দরজা খুলে দিল। যেন সে এই রাত
দুপুরে তার জন্যই অপেক্ষা করছিল!! আরোও বিস্ময়ের মুখোমুখি হলো সিএনজি ওয়ালার সাথে
কথা বলে। তাকে কিছু জিজ্ঞাসা না করেই যখন সে গাড়ি স্টার্ট দিল এবং চালানো শুরু
করলো, তখন রিনা জানতে চাইলো –
-“না শুনেই কোথায় যাচ্ছেন? আমি কি আপনাকে বলেছি কোথায় যেতে হবে?”
সিএনজি চালক বলল –
-“আপা রাইত বিরাতে মানুষ কি আর ঘুরতে বাইর হয়? নিশ্চয়ই যাইবেন কুনো না কুনো
হাসপাতালে!!”
-“কেন অন্য কোন সমস্যাও তো হতে পারে!! যাইহোক, আপনি (অমুক) হসপিটালে যান।”
সিএনজি চালক একটু থেমে বলল –
-“ওই দিকেই যাচ্ছি আপা”!!!

——-
হসপিটালে পৌঁছে জাহিদের বেডের পাশে বসে আছে রিনা। এইমাত্র তার জ্ঞান ফিরলো।
মাথায় বেশ আঘাত পেয়েছে সে। এসময় একজন মহিলা ডক্টর একটা নবজাতক বাচ্চা কোলে
নিয়ে প্রবেশ করলেন রুমে। জাহিদ কে লক্ষ্য করে বললেন-
-“বাচ্চাটার অবস্থা এখন ভালো, কিন্তু ওর মাকে বাচানো যায়নি, প্রচুর রক্ত ক্ষরণে মারা
গেছে বেচারি।”
জাহিদ কিছু একটা বলতে যাবে তখনই হঠাৎ মীনা চেঁচিয়ে উঠলো!!
-“ওইতা আমাল বোন, আমাল বোন.. ওকে আমাল কোলে দাও” বলে কাদতেঁ লাগল।
অবাক, আর বিষ্মিত হতে হতে রিনা ক্লান্ত। ডাক্তারের কাছ থেকে বাচ্চাটা কোলে নিয়ে
মীনার কান্না থামালো। কি অদ্ভুত কিউট বাচ্চাটা। নিজের মায়ের কোলে আছে এমনটা
ভেবেই রিনার বুকে খাবারের সন্ধান করছে সে। …

সিএনজি থেকে নেমেই ডক্টর জানালেন তার স্বামী এখন বিপদমুক্ত। সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার পথে জাহিদ যে বাসে করে ফিরছিল

সেই বাসের সামনে হঠাৎ করে একটা মেয়ে এসে দাঁড়ায় আত্মহত্যা করার জন্য। বাসের চালক মেয়েটাকে বাচাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে

পাশের এক সিএনজির সাথে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে অনেকেই আহত হলেও নিহত হয় ওই মেয়েটি এবং সিএনজি চালক!!

মেয়েটি ছিলো অন্তসত্তা। যখন রাস্তার উৎসুক জনতা দাড়িয়ে দাড়িয়ে আহারে, উহুরে করছিল তখন জাহিদ তার মাথার আঘাত কে

উপেক্ষা করেই রাস্তা থেকে মেয়েটিকে তুলে হসপিটালে নিয়ে আসে। এবং সে জ্ঞান হারায়। মেয়েটির শাড়ির আঁচলে বাধা ছিল একটি কাগজ,

যাতে লেখা ছিলো –
“আর মাত্র ক’দিন বাকি, পেট থেকে ওটা বেরোতে চাইছে … কথা দিয়েছিলে আজ নয় কাল, কাল নয় পরশু ওকে স্বীকৃতি দিবে।

সমাজের ধিক্কার আর সইতে পারছি না। সন্তান কে পিতৃ
পরিচয় দিতে না পারার থেকে মৃত্যুই শ্রেয়”

মেয়েটার নাম ঠিকানাও লেখা নেই …। এসময় রিনার ইচ্ছা হলো মেয়েটা কে একবার দেখার। ডক্টর তাকে নিয়ে গেল মর্গের দিকে,

পিছু পিছু গুটি গুটি পায়ে মীনাও এগিয়ে গেল মায়ের সাথে। মর্গের সামনেই শোয়ানো ছিল নতুন দুইটা লাশ। মুখে কোন কাপড় ছিলনা

তাই সহজেই দেখা গেল লাশ দুটোর মুখ। মেয়েটার লাশ দেখে কোন ভাবান্তর না হলেও সিএনজি চালকের লাশ টা দেখে সে পাথর হয়ে গেল!!

এই সিএনজি চালকের সিএনজিতেই এসেছে সে হসপিটালে …!!! নিজেকে ধরে রাখার শেষ ক্ষমতা টুকুও যখন হারাতে বসেছে এমন সময় মেয়েটার লাশের

দিকে ইঙ্গিত করে মীনা আবারো চেঁচিয়ে বলে উঠলো –
-“ওই দে .. ওতাই তো আমাল আলাকতা মা, ওই মাতাই তো আমাকে দামা পলিয়ে দিল।”
(ওই যে .. ওটাই তো আমার আরাকটা মা, ওই মা টাই তো আমাকে জামা পরিয়ে দিল)

……………………………………….(সমাপ্ত)………………………………………

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত