একটি পোট্রেট

একটি পোট্রেট

সাবা দুইতলা’র রুমটাতে থাকে।
আর বাসায় থাকলে বেশিরভাগ সময় সে ছাদে কাটিয়ে দেয়, ছবি আঁকার সরঞ্জাম নিয়ে।
তাই ওর সব জিনিষই দুই সেট। একসেট বেডরুমে, আরেকসেট ছাদের সিঁড়ি ঘরে।
যখন যেখানে মন চায়, ছবি আঁকতে বসে যায় সাবা। ক্যানভাসকে সাজায় রঙবেরঙ এর রঙ দিয়ে ।

আজ অনেকক্ষণ সাবা ছাদে। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হবু হবু, দিনের আলো কমে এসেছে। চারিদিক লালচে আলোর আভা।
মা এতোক্ষণ বিরক্ত করেনি তাকে,
ছবি আঁকছে, আঁকুক। কিন্তু ক্ষিদেও তো লেগেছে মেয়েটার। সেই কবে দুপুরে সামান্য ভাত খেয়েছে!
মা ছাদে উঠেন। দেখেন, মেয়ে এক মনে ছবি’র দিকে তাকিয়ে আছে।
-কিরে, আজ কি আকঁলি?
সাবা মায়ের দিকে ফিরে হাসে।
মা ছবি’র কাছে যায়। চোখ পড়তেই তার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠে। গা গুলিয়ে বমি আসতে চায়!
-এটা কি আঁকলি তুই!
-কেনো মা, ভালো হয়নি?
-এই ছবি কিভাবে আঁকলি তুই! আমার তো এক মুহূর্তও সহ্য হচ্ছেনা।
সাবা’র মা তনুজা’র মনে হলো, একেবারে তাজা হৃদপিন্ডটাই এখনো জীবন আছে, ধপধপ করে নড়ছে!
-এই ছবিটা তুই এখনি সরা, আমার মাথা ঘুরছে।
আর তাড়াতাড়ি খেতে আয়। আমি নিচে যাচ্ছি।
আচ্ছা, না, তুই আমার সাথে আয়। আর শোন, এমন আজেবাজে ছবি আর আঁকবিনা।
-মা, তুমি বেশি আপসেট হচ্ছো।
এটা একটি সাধারণ পোস্ট মর্টেমের ছবি
আঁকলাম। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, ছবি আঁকাটা সার্থক হয়েছে আমার হি হি হি…
-হাসবিনা। নিচে নাম।
আলো আঁধারি এই পরিবেশে ছবিটা তনুজা’র বুকে ধাক্কা দিয়েছে খুব।
বুক পেটের মাঝখানে কেটে দুইপাশে চামড়া ঝুলিয়ে রাখা। বুকের, পেটের সব, ফুসফুস, কিডনি তার চোখের সামনে। হৃদপিন্ডটা একটা কেশহীন কিন্তু পুরুষালী হাতে। ওটা একদম তাজা, রক্ত ঝরছে!
মনে হচ্ছে, জীবন্ত মানুষের পোস্ট মর্টেম!
কি ভয়ংকর, কি ভয়ংকর!!
তনুজা নিচে নেমেই বাথরুমে যায়, বমি বমি ভাব লাগে তার। কিন্তু বমি আসছেনা। বমি হলে খুব ভালো লাগতো। এখন বুকে, গলার কাছে আটকে আছে।
শান্তি লাগছেনা।

মেয়ে রান্নাঘরে এসে মাকে খুঁজে না পেয়ে ডাকে।
-আম্মু, কোথায় তুমি? খিদে লাগছে তো। লাচ্ছা সেমাই আছে? খেতে ইচ্ছে করছে।
-এইতো আসছি। চনাভুট খাবিনা?
-সেমাই নেয়?
-আছে। দাঁড়া দুই মিনিট, দুধ গরম করি।
মা সেমাই দেন। মেয়ে টেবিলে বসে খায়।
মা আরেকটা চেয়ারে বসে মেয়ের দিকে তাকিয়ে কিছু বুঝার চেষ্টা করেন। তার একুশ বছর বয়সী মেয়েটার চেহারা এখনো ষোলো বছর বয়সী কিশোরীদের মতোই মিষ্টি, নিঃষ্পাপ।
কোনো দুশ্চিন্তা, মন খারাপ ভাব কিছুর স্পর্শ
নেই মুখে।
মা তবুও নিশ্চিন্ত হতে, মেয়ের কাছে জানতে চান,
-তুই কি কোনো কারণে আপসেট?
-কেনো আম্মু, আপসেট হবো কেনো!
-আমার মনে হচ্ছে এমনকিছু। তুই আমার মাথায় হাত দিয়ে বল, তুই আপসেট নোস।
হাসতে হাসতে সাবা’র কাশি উঠে যায়। মা গ্লাস এগিয়ে দেন।
-নে পানি খা। আর সত্যি করে বল।
ও একটু স্বাভাবিক হয়ে বলে,
-কি বলতাম আম্মু, দেখি বলো?
-তুই কি কারো প্রেমে পড়েছিস?
সাবা এবার মুচকি হাসে।
আচ্ছা, হাসিটাতে কি একটু লাজুকতা ছিলো!মায়ের মনে সন্দেহ জাগে।

সাবা মাকে জড়িয়ে ধরে।
-আম্মু, ছবিটার কারণে এতোকিছু জানতে চাইছো, না? কাল পোস্টমর্টেমের একটি ভিডিও দেখেছি, মাথার ভেতর দৃশ্যগুলি ঢুকে গিয়েছিলো, তাই এঁকে ফেললাম। তুমি ভয় পেওনা। আর আমার কোনো প্রেমিক নেই। কেউ আমাকে ভালোবাসেনা।
-এটা কেমন কথা, কেউ ভালোবাসবেনা কেনো, আমার এই সুন্দর মেয়েটাকে!
-এটা হচ্ছে, কথার কথা। প্রেমিক নাই, তাই বলা।
আচ্ছা, কেউ ভালোবাসেনা, এটা বলার সময় সাবা’র চোখে কি কোনো দুঃখ লুকিয়ে ছিলো!? তনুজা ঠিক ঠাঁহর করতে পারেনা।
তনুজাও মেয়েকে জড়িয়ে ধরে।
-হ্যাঁরে, বলনা, আমার মেয়েটা এতো কিউট, এতো ভালো ছবি আঁকে। কতো জনই তো তোর পেছন পেছন ঘুরে, তাইনা?
-হুম, বুঝছি, কথা নেয়ার চেষ্টা! মা আজকাল ছেলেদের, মেয়েদের পেছন পেছন ঘুরতে হয়না। কারো কাউকে ভালো লাগলেই সরাসরি বলে দেয়।
-তাই! তোকেও বলেছে?
-না মা, বলে নাই।
-হুম। শোন, কেউ ভালোবাসি বললেই কিন্তু ভালোবাসা হয়না। যতো তাড়াতাড়ি ভালোবাসা হয়, ততোই তাড়াতাড়ি তা ভেঙে যায়, বুঝলি?
-হুম আম্মু, বুঝলাম। আজ বিরানি রাঁধবে আম্মু? খুব খেতে মন চায়ছে।
-কাল রাঁধি? আজ শরীর ভালো লাগছেনারে, বমি বমি লাগছে। আর সকালের সবকিছু রয়ে গেছে।
-ঠিক আছে, কাল খাবো।
রাতে মেয়ে অনেকক্ষণ মায়ের সাথে গল্প করে। প্রায় মাঝরাতে একটা’র দিকে তার নিজের রুমে চলে যায়, ছবি আঁকা একটু বাকি আছে বলে।
সকালে মা নাস্তা বানিয়ে, গরুর মাংসও ভিজিয়ে রাখে, বিরানি করবে বলে।
মেয়েকে ডাকতে যায়। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।
মা অনেক ডাকার পরও মেয়ে জবাব দেয়না।
তনুজা ভয় পেয়ে যায়।
পাশের বাসার কয়েকজনকে ডেকে আনে। পুলিশকেও কল করা হয়েছে। পুলিশ আসে, দরজা ভাঙা হয়।
সাবা’র শরীরটা উড়না গলায় প্যাঁচিয়ে, ফ্যানের সাথে লটকানো। তার জিহ্বা মুখ দিয়ে বের হয়ে গেছে, চোখ দু’টি ঠিকরে বের হয়ে আসতে চাইছে। কি ভয়ংকর সেই দৃশ্য!
আর তার আঁকা ছবিটা ফ্রেমে তখনো তাজা হৃদপিন্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রুমে বিভৎস দুইটি দৃশ্য!
তনুজা হরহর করে একগাল বমি করে, সেখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান।
জ্ঞান আসলে তাকে জানানো হয়, সাবা’র শরীরটা কাটা ছেঁড়া করে দেখতে হবে!
তনুজা বুঝতে পারেনা, মেয়ের মাথায় কিসের এতো চাপ ছিলো, যে কারণে গলায় চাপ দিয়ে তার থেকে মেয়ে বাঁচতে চাইলো!
একটিবার মেয়ে যদি তা শেয়ার করতো, একটিবার!
তনুজা আবার একঘণ্টার জন্য হলেও কাল রাতটা ফেরত পেতে চায়। মেয়েকে সে যেকোনভাবে সেই চাপ থেকে ফিরিয়ে আনতো।
২০.০১.১৮

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত