আমি কুৎসিত হয়ে জন্মেছি

আমি কুৎসিত হয়ে জন্মেছি

আমি জন্মাবার পরই আমাকে জানিয়ে দেয়া হলো আমি কুৎসিত হয়ে জন্মেছি। আমিও মেনে নিয়ে ছিলাম। বাড়িতে মেহমান এলে, সুন্দর হয়ে জন্মানো আমার বোনটাকেই সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হতো। পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে নিজেকে আড়াল করে কান পেতে মেহমানদের মুখে বোন এর প্রশংসা শুনতাম। পরিচিত জন জানতে চাইতেন আপনার ছেলে কোথায়? ওকে যে দেখছি না!

আমাকে ডেকে নেয়ার শব্দ গুলোও ছিলো অনেক ভিন্ন। কই আমার কালো মানিক! আমার কালো বাবা’টা কই! এই যে আমার কালো ছেলে। আমাদের বাড়ি’র কাজের ছেলে। এই কথা বলেই বাবা অথবা মা কপালে চুমু দিয়ে কোলে বসিয়ে রাখতো। হয়ত আমার উপমা দিয়ে পরিচয় করিয়ে দিতে এর থেকে ভাল কোন শব্দ তাদের জানা ছিলো না। কারন এটাই আমি কুৎসিত হয়ে জন্মেছি।

ভাইয়া দেশের বাহিরে থাকায় কয়েক বছর পর পর আসতো। পুরনো ক্যামেরায় রিল ভরে তাতে হাতে গোনা কিছু ছবি তোলার ব্যবস্থা হতো। কখনও তিরিশটা কখনও বা আটাশটা। ভাগ্য ভাল থাকলে বত্রিশটা। মাজে মাঝেই এমন হতো পুরো রিল জুরেই আমার কোন ছবি থাকতো না। আমার না কি ক্যামেরা ফেস ভাল না। আমি ছবি তুলে কি করবো! তাই আমি বোন হয়েও আমার ভাই বোনদের সাথে কোন গ্রুপ ছবিতে আমার জায়গা করে নিতে পারিনি। সবটা সময় পার হয়েছে ছবি তুলে দিতেই। আর তাই আজ এতো বছর পর পুরনো ছবির এলবামে সবার ছবির মাঝে আমাকে আর আমি খুঁজে পেলাম না। কারন একটাই, আমি কুৎসিত হয়ে জন্মেছি।

বন্ধু বান্ধবীদের আড্ডা থেকে শুরু করে ফ্রেন্ডদের সেলফিতেও আমার জায়গা হয়নি। কারন আমি থাকায় না কি ছবির সৌন্দর্য নষ্ট হতো। নারী সমাজে একটা ছেলের নাম পেতে অনেক সময় লাগলেও আমার কিন্তু দেরি হয়নি। খুব সহজেই ক্ষেত্র নামটা পেয়ে গিয়ে ছিলাম। জন্ম দিনের অথবা বিয়ের অনুষ্ঠান এ সবাই যখন হইচই করে আনন্দ করতো তখন আমার জায়গাটা হতো সোফার এক কোনে। কারন একটাই আমি কুৎসিত হয়ে জন্মেছি।

বাড়ির অন্যান্য ভাবি’রা যখন বাহারি রং এর শাড়ি কেনায় ব্যস্ত তখন আমার মহান স্বামী নামের ব্যক্তিটি যিনি কুৎসিত জেনেও আমাকে বিয়ে করে জীবন দান করেছেন। তার সেই মহানুভবতায় আমার হাতে গুজে দেন পড়নের মোটা একটা শাড়ি। আমাকে দামি কোন কিছু পড়লেও না কি দেখতে ভাললাগে না। অযথা টাকা খরচের কি দরকার! আর তাছাড়া আমার এতো জাত বেজাত দেখেই বা লাভ কি। একটা পড়লেই হলো! কারন যে একটাই, আমি কুৎসিত হয়ে জন্মেছি।

আমি কি একটু ফোনে কথা বলতে পারি এই বলে ফোন নিয়ে উঠে দাঁড়ায়ে বেশ কিছু দূরে ফোন আলাপ সারছে দেখতে আসা বিয়ের পাত্রী। এখানে বসেই বেশ শুনতে পেলাম, এমন গাঁজা খোর টাইপের একটা ছেলের সাথে আমার বিয়ে দিতে চাইছো। আর কোন ছেলে পাওনি! কি বলবো বলুন? জীবনে একটা সিগারেট ও আজ অবধি খেয়ে দেখিনি। তবুও এমন কথা শুনতে হচ্ছে। করন আমি যে কুৎসিত হয়ে জন্মেছি।

প্রায়ই শুনতে হয় যেমন তোমার চেহারা তেমন তোমার মন। সুন্দর হলেই না কি তার মন হবে সুন্দর। কুৎসিত এর কি আর ভাল মন থাকে! কি করে থাকবে? যে দিন থেকে আমায় বলেছো আমি কুৎসিত হয়ে জন্মেছি সে দিন থেকেই আমি পৃথিবীর সব সৌন্দর্য থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। তোমরা যখন সৌন্দর্য চর্চায় ব্যস্ত আমি তখন আমার কুৎসিত আবরনকে ঢাকতে নিজেকে আড়াল করেছি।

কথায় বলে বিধীর বিধান যায় না খন্ডন। আমিও তা খন্ডাবার চেষ্টা করিনি। কেউ বলেছিলো দূর আকাশের ওপারে না কি স্রষ্টা বসে থাকেন। তাই জানালার গ্রিলে হাত রেখে আকাশের ওপারে স্রষ্টাকে খুঁজে বেড়িয়েছি। ভেজা দু’চোখে জীবন বিধানে নিজেকে আর একবার দেখার খুব ইচ্ছে জাগে। সয়ং স্রষ্টা লিখেছেন নিজ হাতে আমি তোমাকে গড়েছি এমন ভাবে সুন্দর যেনো ভয় করে তোমার কুৎসিত অবয়বা দেখে।আমি আরো লিখেছি, হে সুন্দর আমি চাইলেই পারি তোমাকেও কুৎসিত করতে। কে শোনে কার কথা! যেখানে আমার কুৎসিত রুপ নিয়ে স্রষ্টারই কোন কষ্ট নেই। সেখানে সৃষ্টির কষ্টের সীমা নেই।

আমি তো কুৎসিত! সুন্দর এর চোখে উদাহরণ মাত্র । তাই আবারো দু’গাল জলে ভাসিয়ে মধ্য আকাশে চোখ রাখি। আর নিজের পরিচয় খুঁজি। আমি জন্মাই নি ছেলে হয়ে না জন্মেছি আমি মেয়ে হয়ে। আমার পরিচয় একটাই। আমি কুৎসিত হয়ে জন্মেছি।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত