তবুও ভালবাসতাম আমি

তবুও ভালবাসতাম আমি

মেয়েটা অন্ধ ছিলো, তবুও ভালবাসতাম আমি।

জাকাতের টাকা বিলি করতে গিয়েছিলাম সেদিন।
ম্যানেজারদের উপর মোটেও আস্থা ছিলনা, তাই
নিজেই গিয়েছিলাম।

একটা বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মেয়েলি কন্ঠে
ডেকে উঠলো কেউ,পিছু ফিরে চাইতেই দেখি
একটা মেয়ে,বয়স ১৬-১৭হবে, ডানহাত হাতপেতে
দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটা।
বেশ অবাক হয়েছিলাম মেয়েটাকে দেখে।
চোখেমুখে কালি,চেহারায় ক্ষুধার্ততার ছাপ,
পরণের কাপড় গুলো যেন ময়লায় নিজেদের
উজ্জ্বলতা হারিয়েছে।
ভাবছিলাম এতবড় মেয়ের হাতপেতে চাইতে কি
একটুও লজ্জা করলনা?
মেয়েটাকে যখন দেখছিলাম,মেয়েটা ওর
ছোটহয়ে যাওয়া ওড়নাটা মাথায় টেনে দিচ্ছিলো
বারবার।
এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম,তোমার নাম কি?
মেয়েটা বলেছিল,
—সামিরা।
—তোমার পরিবারে কে আছেন? আইমিন
পরিবারের সদস্য কতজন?
— জ্বী আমি আর আমার মা।
— ঘরে আজ কি রান্না হয়েছে?
— কিছুইনা,,,দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উত্তর দিয়েছিলো
মেয়েটা।
,
বাড়িফিরে ভাবছিলাম মেয়েটার কথা, আচ্ছা কতটুকু
কষ্ট পরলে মানুষ
চাইতে পারে?
মেয়েটাকে সেদিন কিছু টাকা দেয়ার পর খুব খারাপ
লেগেছিলো আমার।কারণ টাকাগুলো ফুরিয়ে
গেলে হয়ত আবার উপোস থাকবে মেয়েটা।
পরদিন আবার গিয়েছিলাম মেয়েটার বাড়ি।একটা নতুন
থ্রীপিচ কিনে মেয়েটাকে দিয়েছিলাম।বলেছি
লাম, সামিরা তোমার পছন্দ হয়েছে?
মাথা নেড়ে জানান দিয়েছিলো সামিরা।চোখ দিয়ে
জল এসেছিলো সামিরার।বলেছিলাম তুমি কাঁদছ কেন
সামিরা?
— আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন,আমার দুইটাই মাত্র জামা
ছিলো, তারো একটা কাল ইদুরে কেটে টুকরো
টুকরো করেছে।নতুন করে কেনার সামর্থ এখন
নেই,,,
শুনে খুব খারাপ লেগেছিল আমার।মাত্র দুটো
কাপড়েই খুশি থাকে সামিরাদের মত মানুষগুলো।মাত্র
দুটো!!”
আর তার একটা নষ্ট হলেই খুব কষ্ট পায় ওরা।কি
আজব জীবন,জীবনের চাওয়া-পাওয়া গুলো তাইনা?
ফিরে আসার আগে বলেছিলাম,
— সামিরা,কাল কিন্তু আবার আসব,তুমি কিন্তু অবশ্যই
নতুন
জামাটা পড়বা।ঠিক আছে?
আবারো মাথানেড়ে উত্তর দিয়েছিলো সামিরা।
,
কয়েকদিন পরের কথা,
সামিরাকে একটা যাত্রী ছাউনীতে বসে থাকতে
দেখে এগিয়ে গিয়েছিলাম আমি।আমার দেয়া
থ্রীপিচটা পরে এসেছিলো ও।
ওর নামটা না ধরেই বলেছিলাম,কেমন আছো?
চমকে উঠে বলেছিল ও, কে?
— আমি,চিনতে পারছনা?
— না তো, সত্যিই আপনাকে চিনতে পারছিনা।মাটির
দিকে মুখ করে উত্তর দিয়েছিলো ও।
শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম সেদিন। ভেবেছিলাম
সামিরা তো ধনী হয়ে যায়নি,তাহলে আমাকে না
চেনার কারণ কি?
নাকি ও কি ভুলে গেল? কদিন আগেও তো ওর
কুড়েঘরে গিয়ে থ্রীপিচটা আমিই দিয়ে
এসেছিলাম।
— আপনি কি এখনো দাঁড়িয়ে আছেন?প্রশ্ন
করেছিলো সামিরা।
ওর প্রশ্নশুনে নিজেকে খুবছোট মনে হচ্ছিল
সেদিন।এতগুলো মানুষের সামনে ও আমার দিকে
তাকালও না একটাবার,অথচ সবাই আমার দিকে হা করে
তাকিয়ে ছিলো সেদিন।হয়ত সবাই বখাটে ভাবছিলো
আমায়।
ফিরে আসার জন্য পা বাড়াতেই সামিরা আবার
বলেউঠে,
— আসলে আমি অন্ধ, দুটো চোখেই দেখতে
পাইনা,তাই চিনতে পারিনা কাউকেই,,,
থমকে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি ওর কথাশুনে।নিজের
কানদুটোকে বড় অবিশ্বাসী মনে হচ্ছিলো
আমার।
এগিয়ে গিয়ে বলেছিলাম কি বললে সামিরা?
— হ্যা আমি অন্ধ।
কথাটা যেন শীলের মত বিধেছিলো আমার বুকে।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন বোবা হয়ে
গিয়েছিলাম আমি।সামিরাকে কিছু বলার ভাষা যেন
হারিয়ে
ফেলেছিলাম সেই মূহুর্তে।
কারো হাত-পা ভাংলে বলাযায় দুঃখ করোনা ঠিক
হয়েযাবে,কিন্তু সামিরাকে কি বলব? অন্ধত্ব কি
চিকিৎসায় ঠিক হয়েযায়?
এত সুন্দরী একটা মেয়ে, অথচ অন্ধ,ভাবতেই
দুফোটা জল চলে এসেছিলো আমার,,,,
নিজেকে সামলে নিয়ে বলেছিলাম,
— আমি জীবন
— ওহ জীবন ভাইয়া! আমায় মাফ করবেন,আমি তো
দেখতে পাইনা তাই চিনতে পারিনি।
— এখানে কারসাথে এসেছো?
—মা-র সাথে।
—তো তোমার মা কই?
সামিরা চুপ হয়েযায় আমার প্রশ্ন শুনে।
আমি আবার প্রশ্ন করেছিলাম,কি হল সামিরা,তোমার
মা
কই?
সামিরা এবার উত্তর দেয়, মা ভিক্ষে করতে
গেছেন ভাইয়া।
আরকিছু বলতে পারিনা আমি, ইচ্ছে করছিলো ওর
মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেই।ওকে একটু স্বান্তনা
জানাই।কিন্তু তা তো সম্ভব নয়।
ভাবছিলাম,দুখিনী মেয়েটাকে কি বলব আর?
মনে পরেগেল গোলাপ ফুলের কথা, পাপড়ীর
নিচে কাঁটা থাকে।তুলতে গেলে ব্যাথালাগে।সামিরাও
যেন তেমনি একটা গোলাপ ফুল, খুব সুন্দরী,কিন্তু
হাজার কাটায় ভরা যেন সামিরার জীবন,,,
হঠাৎ একটা হাত আমার সামনে পেতে দাঁড়ায়
কেউ,তাকিয়ে দেখি একজন বয়স্ক মহিলা।
—বাবা দুটো টাকা দিবেন?
কন্ঠশুনে সামিরা চেঁচিয়ে উঠেছিলো,বলেছিল,মা
উনার কাছে কিছু চেয়োনা,উনি এমনিই না চাইতেই
অনেক কিছু দিয়েছেন আমাদের।
বুঝতে পারি আমি, উনি সামিরার মা।
,
তারপর থেকেই সামিরার প্রতি মায়াটা যেন বেড়ে
গিয়েছিলো আমার।রোজ ওদের বাড়িতে যেতাম,
ওদের জন্য খাবার নিয়ে যেতাম।সামিরার মা ভিক্ষে
করার জন্য বাহিরে থাকতেন।
সামিরার অনুমতি নিয়ে সামিরাকে মিরা বলে ডাকতাম
আমি।
,
একদিন বাবা ডেকে বলেছিলেন, জীবন তোমার
ব্যাপারে কিছু কথা শুনেছি,ইদানিং তুমি নাকি কোন এক
অন্ধ মেয়ের বাড়ি যাওয়া আসা করছো?
দুনিয়াতে কি মেয়ের অভাব!!!
বাবার কথা শুনে মনটা খুব খারাপ হয়েছিলো সেদিন।
আচ্ছা ধনী মানুষগুলো গরিবের পাশে দাঁড়ালে
কেন মানুষদের এতো হিংসে হয়?
তবুও আমি মিরাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম সেদিন।
মিরার বাড়ির সামনে চেয়ারম্যান বসেছিলো সেদিন।
বাবাকেও বসে থাকতে দেখে বেশ অবাক
হয়েছিলাম আমি।
মিরার দুহাত বেঁধে চোরের মত মিরাকে দাঁড় করে
রেখেছিলো ওরা।
মিরা সমাজ নষ্ট করেছে,মিরা একটা কুলটা নারী।তাই
নষ্ট সমাজটাকে পবিত্র করতে মিরা কে শাস্তি দিবে
ওরা।
মিরা কাঁদছিলো,খুব করে কাঁদছিলো ও।বারবার
বলছিলো ও, আমি কোন পাপ করিনি।
পুরো সমাজটা যখন মিরার বিপক্ষে, দুখিনি মেয়েটা
যখন বদনামে ডুবে যাচ্ছিলো,আমি এগিয়ে
গিয়েছিলাম।দাঁড়িয়েছিলাম মিরার পাশে।কারণ ওর
বদনামটা
ছিলো আমাকে নিয়েই,,,
বলেছিলাম,মিরা সত্যিই বলেছে,মিরার সাথে আমার
খারাপ কোন সম্পর্ক নেই।
কিন্তু সমাজটা জোর করে মিরাকে আমার বিয়ে
করাতে বাধ্যকরে।
,
ফুল শয্যার রাতে একবুক ব্যাথা নিয়ে বিছানায়
শুয়েছিলাম আমি।আপসোস করছিলাম আমি, একটা অন্ধ
মেয়ে আমার জীবনে এলো? বুঝতে
পেরেছিলাম আমি,জীবন নামের এই আমি-র মরণ
হয়েগেছে, বিয়েটা সেই মরণেরই একটা উপমা।
রাগ হচ্ছিল সমাজটার উপর, ভাবছিলাম সত্যিই উপকারীর
অপকার সবাই করে।
,
সে রাতে সামিরা আমায় বলেছিলো,ভাইয়া আমি
আপনার উপর কোন দাবী করবনা।আমি জানি, আমি
আপনার জীবনটাকে নষ্ট করে দিয়েছি।তবুও বলছি
আপনি আমায় ডিভোর্স দিয়েদিন,আমি কোন আপত্তি
করবনা।মোহরানার দাবিও করবনা কোনদিন,,,,
শুনে বুকটা ব্যাথায় মুচড়ে উঠেছিলো আমার।কতটা
দুঃখ পেলে ফুলশয্যার রাতে ডিভোর্সের অনুমতি
দেয় একটা মেয়ে?
ওর মাথায় সেদিন হাত বুলিয়ে ছিলাম আমি।বলেছিলাম,
না
মিরা তুমি তো কোন দোষ করোনি।আমার হয়ত
কপালটাই খারাপ ছিলো।
রাতটা মেঝেতেই শুয়ে কাটিয়েছিলো সামিরা।
,
দিন সাতেকপর বাবা খুব চাপ দিচ্ছিলেন সামিরাকে
ডিভোর্স দেয়ার জন্য।
মোহরানা বাঁধা হয়েছিলো দুলাখ টাকা।কিন্তু আমি
কোন
সিদ্ধান্তই নিতে পারছিলামনা।একটা দুখিনী মেয়ে
কষ্টপাবে সেজন্য মন টানছিলোনা আমার।আর
মনথেকে সামিরাকে মেনেও নিতে পারছিলামনা
আমি।বন্ধুরা ফোন দিয়ে টিটকারি করত আমায়,,,,
কিছু বলতে পারতামনা আমি।
অবশেষে জীবনের কাছে হার মেনে
নিয়েছিলাম আমি।সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিলাম আমি।
একরাত্রে সামিরা বসে আছে,
ডাকলাম আমি,
— সামিরা একটা কবিতা শুনবে?
— বলুন।
আমি শুনিয়েছিলাম একটা কবিতা,মিরাকে ভেবে রচনা
করেছিলাম আমি।কবিতায় বলেছিলাম,
কি হতো এ জীবনে তোমার সাথে দেখা না
হলে…
কি ই বা হতো এ জনমে তোমার মায়াতে না
আটকালে….
খুব জানতে ইচ্ছে করে….
সৃষ্টিকর্তা তার কারনটা কখনোই আমায় ষ্পষ্ট
করলোনা, আমিও জানতে পারলামনা ঠিক কি ছিলো
আমার পূণ্য।
সামিরা সেদিনো খুব কেঁদেছিলো।ওকে বুকে
টেনে নিয়েছিলাম আমি।
বলেছিলাম, মিরা তুমি মনের নয়ন দিয়ে আমায়
দেখো, আমায় শুধু ভালবাসা দিও।
আমি আরকিছু চাইনা,শুধু তোমাকেই চাই।
ফুলশয্যা হলো আমাদের।
আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম মিরাকে।হারিয়ে
যাচ্ছিলাম
মিরার দেহের উঞ্চনাতায়,,,,,,
,
রাতের খাবার আমি রোজ মিরার হাতে খেতাম।
মাছের কাটা গুলো নিজেই বেছে নিতাম,তারপর মিরা
খাইয়ে দিতো।
আমি বলতাম মিরা, বলতো আমি কেমন দেখতে?
মিরা বলত,তুমি আমার জীবনের আলো, আলো
তো উজ্জল হয় তাইনা?
ওহ একটা কথা তো বলাই হয়নি,বাবা আমায় বাড়িথেকে
বের করে দিয়েছিলেন।
বাবাকে বলেছিলাম,বাবা ভালবাসা বিধাতার জন্য
ছেড়ে
দেয়া যায়, কিন্তু বাবা তুমি তো মানুষ।তুমি তো বিধাতা
নও।
ঘর ছেড়েছি তবুও মিরাকে ছাড়তে পারিনি।
নতুন বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলাম,সেখানে মিরার মা দিনে
মিরার
দেখাশোনা করতেন।আর রাতটাতে তো আমিই
মিরার নয়ন মণি।
বন্ধুরা আর টিটকারি করেনা।এক সকালে দরজাখুলে
দাঁড়িয়ে দেখি বন্ধুরা দাঁড়িয়ে আছে।
সবাই কেঁদে মাফ চেয়েছিলো আমার কাছে।
বলেছিলো, দোস্ত খাটি প্রেমটা কি এমনই?
বলেছিলাম,জানিনারে, তবে এটুকু জানি,মিরার আলো
আমি,আর আমার জীবন মিরা।
অনেক উপহার দিয়েছিলো ওরা, আমাকে নয়,
ওদের মিষ্টি মিরা ভাবি কে দিয়েছিলো।
,
একদিন সামিরাকে নিয়ে ওর চোখের পরিক্ষার জন্য
যাচ্ছিলাম।সাথে ছিলো রউফ।রউফ আমার বেষ্ট
একটা ফ্রেন্ড।
হঠাৎ একটা মোটর সাইকেল আমাকে ধাক্কা দেয়।
চিৎকার করে পরে গিয়েছিলাম আমি আর রউফ।হাতটা
মিরার থেকে ছিটকে গিয়েছিলো আমার।মিরা চিৎকার
দিয়ে উঠেছিলো, পাকা রাস্তাটায় আমায় হাতড়ে
খুজছিলো মিরা।চিৎকার দিয়ে বলছিলো,কেউ কি
আছো আমার জীবন কে বাঁচাও,আমার স্বামীকে
একটু বাঁচাও।আমায় ডাকছিলো ও, জীবন তুমি ঠিক
আছো তো? জীবন কোথায় তুমি?
সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম মিরা আমায় কতটুকু
ভালবাসে।
সেদিনই মিরা ওর ভালবাসার জানান দিয়ে আমায় ছেড়ে
চলেযায়,কারণ আমায় খুজতে গিয়ে ও মাঝ রাস্তায়
চলে গিয়েছিলো।অপর দিক থেকে ছুটে
আসছিলো একটা ট্রাক।চোখের সামনেই
থেৎলে দিয়ে চলেযায় মিরাকে।
আমি শুধু কাঁদতে থাকি,,,,

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত