একটু খানি সুখ

একটু খানি সুখ

সবেমাত্র টিউশনি শেষ করে বালিশের পেটে মাথা রেখে একটু বিশ্রাম করার চেষ্টা করছিল বিথি।এমন সময় পাশের রুম থেকে বিথির শ্বাশুরি মা বললেন,

– কই গো বউ মা, বেলা যে শেষের দিকে, জলদি করে রান্নাটা সেরে ফেল”

বিথির আর বিশ্রাম করা হলো না।প্রাইমারি স্কুলের দু’কয়টা বাচ্চাদের বিকেলে টিউশনি করাই বিথি।নিজের ঘরে এসেই বাচ্চারা পড়ে।এতে করে মাস শেষে হাজার তিনেক এর মত টাকা পাই সে।বিথি এই বছর অনার্স তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল দিবে।গত তিন বছর আগে বিয়ে হয় তার।বিয়ের সময় বরপক্ষের লোক বলেছিলি বিথি বিয়ের পরও লেখা-পড়া করবে।কিন্তু বিয়ের পরে তারা লেখা-পড়া না করার জন্য তাগিদ দেয়।তারপরে অনেক চেষ্টা করে লেখা-পড়া করার জন্য বলে।এবং তারা রাজি হয়।তবে লেখা-পড়ার খরচ তারা দিবে না।বিথি নিজেই নিজের লেখা-পড়ার খরচ চালাতে হবে।যার কারণে বিকেল বেলা বাচ্চা গুলোদের টিউশনি করাই বিথি।সংসার চালানো, টিউশনি করানো এবং কলেজে যাওয়া, লেখা-পড়া করা খুব কষ্ট হয় বিথির।তবুও বিথি কষ্ট করতে চাই।লেখা-পড়া করতে চাই।ভালো একটা জব করতে চাই।

চুলায় ধোঁয়া হওয়ার ফলে বিথির চোখ থেকে পানি ঝড়তে থাকে অনায়সে।সাথে কিছু কষ্টের পানিও আছে।রান্নাটা শেষ করে হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসে যাই বিথি।এশারের আযান হতেই নামাজ টুকু আদায় করে, শ্বশুর-শ্বাশুরিকে খাইয়ে আবার পড়তে বসে যায় বিথি।নিজে এখনো কিছু খাই নাই।একজন বাঙালি বৌ কখনো নিজের স্বামীর আগে খাই না।স্বামীকে খাওয়ানোর পর অবশিষ্ট যা থাকে তাই খাই।এটাই হলো একজন বাঙালি বৌয়ের নৈতিক দায়িত্ব।
বিথির স্বামি ছোট-খাটো একটা জব করে।সন্ধা হতেই বাড়ি ফিরে চলে যাই পাড়ার ছোট টং দোকানে।সেখানে অনেক রাত অবদি আড্ডা দিয়ে, কোনো কোনো দিন রাত ১১টা আবার কোনো দিন রাত ১২-১টার পরে বাড়িতে ফিরে বিথির স্বামী।এখনো না খেয়ে বিথি পড়ার টেবিলে বসা।স্বামী আসার সাথে সাথেই পড়ার টেবিল ছেড়ে, খাবার বেরে দেয় বিথি।প্রচন্ড ক্ষিদার ফলে বিথির স্বামী দ্রুত গতিতে ভাত খেয়ে চলে যায়।কখনো কোনো সময় বিথির স্বামী, বিথিকে বলে নি,

– তুমি খেয়েছ তো, না খেলে আস দুইজনে এক সাথে খেয়ে নেই”

এমন ধরণের কোনো কথাই আজ অবদি বিথির স্বামী বিথিকে বলে নি।বিথি নিরবে কাঁদে।নিঃশ্চুপ হয়ে বুকের ভিতরে যন্ত্রনাটা চাপ দিয়ে ধরে রাখে।একজন নারী চাই তার স্বামীর মাধ্যমে সুখ পাওয়ার জন্য।শারীরিক সুখই সব সুখ না।শারীরিক সুখ কেবল কিছু সময়ের জন্য।একজন বিবাহিত নারী তার স্বামীর কাছ থেকে ভালোবাসা চাই, কেয়ার চাই, শাসন চাই, আদর চাই।সময় অসময় তাকে ফোন করে কথা বলা, কি করছে এখন ইত্যাদি।এমন সব নানা সুখ চাই প্রত্যেকটা বিবাহিত নারী।কিন্তু বিথি এমন কোনো সুখেই পেল না তার স্বামীর কাছ থেকে। বিথির স্বামী খেয়ে ঘুমের ঘরে আচ্ছন্ন হয়ে যায়।বিথি অবশিষ্ট কিছু থাকলে খাই আবার কোনো দিন না থাকলে না খেয়েই ঘুমিয়ে যায়। কত দিন, কত রাত, কত মাস স্বামীর পাশে মনের খায়েশ মিটিয়ে ঘুমাতে পারে নি বিথি। বিথির কোনো খুঁজ খবরই নেই না তার স্বামী।বিথি তার স্বামীর পাশে শুয়ে থাকে।চোখ হতে জল বেরিয়ে পরক্ষনেই বালিশ ভিজে যায়।জল গুলো মুছে ঘুমের আশায় চোখদ্বয়ের পাতা গুলো এক করে বিথি।

ফজরের আযান হতেই ঘুম ভেঙ্গে যায় বিথির।তার স্বামী এখনো ঘুমুচ্ছে।কত দিন কত বার বলেছে নামাজ পড়ার জন্য।কিন্তু বিথির কথাই শুনে নাই।ওল্টো বিথির গায়ে হাত তুলে তার স্বামী।নামাজটুকু আদায় করে বাড়ির টুকটাক কাজ গুলো সেরে নেই বিথি।সূর্যটা এখোন পুরোপুরি উদিত হয় নাই।আবছা আলো এসে হানা দিচ্ছে।হাঁস-মুরগি গুলো কে খাবার দিয়ে, গুরু গুলো ঘর থেকে বের করে বিথি।পুকুর হতে দুই বারে দুই কলসি পানি আনে।এত সব কাজ করতেই সকালটা অনেক হয়ে যায়।দ্রুত রান্না বসিয়ে দেয় বিথি।রান্না করার ফাঁকে বিছানা গুলো গুছিয়ে নেই সে।শ্বশুর-শ্বাশুরি ও তার স্বামীকে চা-নাস্তা দেই বিথি।চুলায় এখনো রান্না বসানো।ঘর থেকে তার স্বামীর আওয়াজ শুনতে পাই সে।

-কই গেল জমিদার বেটি, এখনো রান্না হয় নাই, কবে যামু অফিসে” স্বামীর মুখ থেকে এমন কথা শুনে বোবা হয়ে যায় বিথি।তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ভাতের মাড় পড়ে যায় বিথির হাতে।জ্বলসে যায় তার হাত খানা।এদিকে বিথি কোনো ভ্রুক্ষেপ না দিয়ে স্বামীর জন্য খাবার দেই তাড়াতাড়ি।স্বামী খেয়ে চলে যায় তার অফিসে।বলে যাই নাই বিথি কে যে, “আমি যাচ্ছি, তুমি খেয়ে কলেজে চলে যেও” এতটুকুও বলে না বিথিকে বিথির স্বামী।একজন গৃহবধূ এতটুকুই আশা করে তার স্বামীর কাছ থেকে।কিন্তু বিথি এতটুকু কথা হতে বিচ্ছিন্ন। শ্বশুর-শ্বাশুরিকে খাইয়ে, বাড়ির বাকি সব কাজ গুলো সেরে নিজে কিছু খেয়ে নিল বিথি।পেট ভরে না বিথির।ভরবে কি করে।প্লেট ভরে খেলেই কি পেট ভরে? না ভরে না।মনের একটা সুখ আছে, তৃপ্তি আছে, সেটা যদি কখনো পূর্ণ না হয় তাহলে পেট-মন দুটোই ভরে না।

ঘরির দিকে তাকিয়ে দেখে কলেজের সময় হয়ে গেছে।দ্রুততার সাথে কলেজে রওনা হয় বিথি।কলেজ হতে আসতে আসতে যোহরের আযান পড়ে যাই।রান্নাটা বসিয়ে নামাজ টুকু আদায় করে নেই বিথি।রান্না শেষ হতেই শ্বশুর-শ্বাশুরিকে খাইয়ে নিজে দু’কটা খাই।বাড়ির অন্য সব কাজ গুলো করে নেই।কাজ গুলো সেরে ওঠতেই বাচ্চা গুলো এসে হাজির হয়। এগুলোই তো বিথির সম্পদ।এগুলোকে পড়িয়ে যা টাকা পাই সে গুলো দিয়ে নিজের লেখা-পড়ার খরচ মিটায় বিথি।টিউশনি শেষ করে সন্ধার আগ মুহুর্তে আবার রান্না বসাতে হয় বিথিকে। গভীর রাত এখন ছুই ছুই।বিথির স্বামী এখনো আসছে না। বিথিকে তার নিজের বাপের বাড়িতেও বেড়াতে যাওয়ার জন্য দেয় না তার স্বামী এবং শ্বশুর-শ্বাশুরি। স্বামী আসতেই খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে যায়।বিথি আজ আর খেল না। না খেয়েই স্বামীর পাশে শুতে যাই সে।স্বামীর কপালে হাত খানা রাখতেই শুয়াত থেকে ওঠে পরে তার স্বামী।
বিথিকে বলতে লাগল,

– এসব ন্যাকামি বন্ধ করো, ভাল্লাগে না এসব” বিথি নিঃশ্চুপ। কোনো কথা বলতে পারে না।নিরবে শুধু চোখ থেকে পানি ঝড়ায়।স্বামীর কাছ থেকে কোনো সুখটাই পেল না বিথি।কখনো কি পাবে সুখ.? হয়তো পাবে, আবার হয়তো না। স্বামী তো, এটা ভেবেই নির্ঘুম রাত গুলো পার করছে বিথি নামের এই মেয়েটি…..

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত