অবহেলা- হৃদয় স্পর্শ

অবহেলা- হৃদয় স্পর্শ

-বাবা কিছু বলার ছিলো(আমি)
-আমার এখন সময় নাই?(বাবা)
-বাবা….
-তুই এখান থেকে যাবি?(গরম করে)
মাথা নিচু করে সেখান থেকে চলে আসি, এটা আমার সাথে নতুন না, সেদিন থেকে দেখছি, আম্মুর কাছে গেলাম….
-আম্মু?(আমি)
-কি বলবি, বলে আমাকে উদ্দার কর?
-আম্মু আমার খুব প্রচন্ড মাথা ব্যাথা করছে?
-তোর এসব ফালতু নাটক দেখার সময় আমার কাছে নাই,নাদিয়াকে স্কুলের জন্য রেডি করতে হবে…
-আম্মু আমি ওকে আজ দিয়ে আসি..
-আমরা তোকে কোনো কিছু করতে বলেছি মুখ পোড়া,যেভাবে আছিস সেভাবে থাক,
-আম্মু আমি কি তোমাদের ছেলে না?
-সেজন্য তো এখনো খাইতে পারছিস?
-আম্মু,তোমারা কি আমার সাথে একটু ভালো করে কথা বলতে পারো না?
-এর থেকে ভালোর তুই যোগ্য না?
-তাহলে গলা টিপে মেরে ফেলোনি ক্যানো?

বলে ওইখান থেকে চলে এলাম, মানুষ ভুল করে কিন্তু সেই ভুলের প্রতিদান যে কাউকে এভাবে দিতে হয় আমি জানতাম না,
তখন সেই ছয় বছরের আমি, আর আমার পিচ্ছি ৪ বছরের ছোট বোন নুসাইবা, ও আমার জীবনের পুরোটা ছিলো,আমার
বেড়ে ওঠার সঙ্গী ছিল ও , আমার আর মা-বাবার চোখের মনি ছিলো, দিনের ৪ ভাগের তিন ভাগ ও আমার কাছে থাকতো,
সেদিন ও আমরা দুই ভাই বোন পুকুরেই গিয়েছিলাম,ও পুকুর পাড়ে দাড়িয়ে ও ছোট্ট দাত গুলা বের করে আমার দিকে থাকিয়ে
হাসছিলো, কিন্তু পরের ডুব দিয়ে উঠে আর আমার সেই পিচ্ছি বোনের মুখ আমি দেখতে পাই নি, আমি ভাবছিলাম বাসায় চলে গেছিলো, তাই অত টা মাথায় নেয় নি, তারপর কিছুক্ষন পর যখন বাসায় গিয়ে ওকে না দেখি,আবার পুকুর পাড়ে ছুটে আসি,
এসে পুকুরের মাঝে একটা ছোট্ট পুতুলের মতো আমার পিচ্ছি বোন টা কে ভাসতে দেখি, সেদিন আমি আমার বোনকে হারায় আর হারিয়ে ফেলি আমার সারাজীবনের সুখ, ও বেচে থাকতে মা-বাবা যখন ওকে আমার চেয়ে বেশি আদর করতো, আমি মা-বাবাকে অভিযোগ দিতাম, কিন্তু ও মারা যাওয়ার পর সেটাকে হিংসা বলে সবাই,আর সবার কাছে আমি খুনি হয়ে যাই, বিশ্বাস করেন আমার চোখের মনি টার প্রতি আমার বিন্ধু মাত্র হিংসা থাকলে আমার লাইফ টা এখানেই শেষ হয়ে যেতো, আমার মা-বাবা কখনো বুঝেনি আমি ওকে হারিয়ে কতটা একা হয়েছি,কতটা কষ্ট পেয়েছি, উল্টা তারা আমাকে মানসিক আর শারিরিক নির্যতান দুইটায় করে, আমার এখন পিচ্ছি দুইটা ভাই বোন আছে, কিন্তু আমি তাদের দ্বারে কাছে যেতে পারিনা,
-বাবা আমার কাল পরীক্ষা আমার পরীক্ষার ফিস দিতে হবে?
-পরীক্ষার ফিস দিতে পারি একটা শর্তে জিপিএ ফাইভ পেতে হবে…
-আচ্ছা
সেদিন বাবা পরীক্ষার ফিস দিয়েছিলো,কিন্তু সে টাকাটা আমার লাইফে আরেক বিপদ ডেকে আনে?
আমার পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভের বদলে ৪.৮১ পেয়েছিলাম জেএসসি তে, কিন্তু তার জন্য আমার উপর যে মানসিক যন্ত্রনা
হয়েছিলো তা আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মনে থাকবে?

সেদিন বাবা আমাকে মাথার উপর থেকে ফেলে, একটা লোহার রড দিয়ে মেরেছিলো, রক্তে আমার সারা শরীর মাখামাকি হয়ে গেছিলো, আমার মাথা ফেটে গেছিলো, কিন্তু জ্ঞান না হারানো পর্যন্ত আমার উপর এ নির্যাতন চলতে থাকে..

সেদিন থেকে আমার প্রতি রাতে মাথা ব্যাথা করতো, এমন হত যে মাথা ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে বেহুস হয়ে যাই, আমি ব্যাথায় চিৎকার করতাম কিন্তু কেঊ আমার ডাকে সারা দিতো না, মাঝে মাঝে ভাবতাম চলে যাই, কিন্তু ওরা আমাকে যত কষ্ট দেখ না কোনো ওরাই তো আমাকে জন্ম দিছে?

ওরা আমাকে যত টা অবহেলা করতো আমি তাদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতাম, আমি সাধারনত কোথায় বেড়াতে যাই না,কিন্তু কি মনে করে আমার ফুফাতো বোনের বিয়েতে যাই, কিন্তু সেদিন টাও আমার জন্য ভালো ছিলো না, আমার একটা সমবয়সী ফুপাতো বোন ছিলো,যার দুর্বলতা আমার প্রতি ছিলো, ও সেদিন আমাকে সেখানেই প্রপোজ করে বসে, কিন্তু আমি কোনো মতেই রাজী হয়নি, আমি চুপ করে একটি রুমে বসে ছিলাম, কিন্তু সে সময় ও মেয়েটা রুমে ডুকে দরজা বন্ধ করে দেয়,আর চিৎকার শুরু করে দেয়, আমার মা-বাবা ও ছুটে আসে, কিন্তু তারা আমার কাছে একবারের জন্য ও জানতে চাই নি ,আমার কোনো দোষ আছে কিনা, সেদিন থেকে সবাই আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়, আমার ঠিকানা হয় আমার সেই অন্ধকার রুম, রাতের অন্ধকারের বাড়ির ছাদ, আমি প্রতি রাতে ছাদে যেতাম, তখন আকাশে একটা তারাকে টার্গেট করতাম আর ওটাকে নুসাইবা বলে ডাকতাম
-হাই আপি কেমন আছিস?
-এই বুড়ি হাসছিস ক্যান?
-কথা বলবি না তোর ভাইয়ের সাথে?
-তুই ও কি আমাকে অন্যদের মতো তোর খুনি ভাবিস?
-আচ্ছা আপু তোর মনে পড়ে না তুই ভাত খেয়ে এসে তোর মুখের ময়লা গুলো আমার শার্টে মুচে দিতে, তোর মনে পড়ে না,তোর হাতের মুঠোয় আমার একটা আঙ্গুল থাকতো, আপু বিশ্বাস কর আমি তোকে একটু হিংসা করতাম না, কিন্তু এখন করি কারন মা-বাবা তোর জন্য সারাক্ষন কাদে আর আমার জন্য একটু ভাবে না, আচ্ছা আপু আমি যদি তোর মতো তোর কাছে চলে যাই আম্মু আব্বু কি আমার জন্য একটু ও কাদবে না,তাদের দুচোখের এক ফোটা জলের কারন ও আমি হতে পারবো না
তারা কি আমাকে জড়িয়ে ধরে একটু কাদবে না,বলবে না কেনো চলে গেলি…
আকাশের ওই তারা টাও হয়তো আমাকে দেখে কাদছে,আর বলছে কাদবেরে ভাই খুব কাদবে…
ওই ঘটনার পর আব্বু আর মুখের দিকে তাকায় নি…
আর আমার কারো সাথে কথা বলা অফ, আকাশের দিকে থাকিয়ে যখন এই কথা গুলো ভাবছিলাম আর চোখের জল ফেলছিলাম তখন একটা ছোট্ট হাত আমার মুখের জল মুচে দিলো, আমার আরেক পিচ্ছি বোন নাদিয়া, পিচ্ছি টা দেখতে একদম আমার নুসাইবার মতো…
-কিরে তুই এতো রাতে এখানে আম্মু দেখেনি?
-নারে আম্মু ঘুমাচ্ছে,
-তুই ঘুমাস নি ক্যান?
-তোর কান্নার আওয়াজ শুনে ঘুম আসছিলো না,ভাইয়া তুই প্লিজ আর কাদিস না,আমার কষ্ট লাগে,
-আচ্ছা আর কাদবো না,তুই চলে যা আম্মু দেখলে আমাকে বকবেরে,
-না আমি যাবো না,জানিস আমার খুব ইচ্ছা করে তোর কাছে আসতে,তোর সাথে কাদতে,তোর চোখের জল মুচে দিতে,কিন্তু
আম্মু আসতে দেয় না, ও যখন এই কথাগুলো বলছিলো তখন আম্মু আসলো…
-আমার একটা মেয়ে খেয়ে তোর শান্তি হয় নি, আবার ওকে…..
আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনা, আমার চোখে শুধু পানি আসে, আমি বুঝিনা আমার চোখে এতো পানি কেন?
আমার ইচ্চা করে আমার কলিজা টা ছিড়ে দেখাতে কত সহ্য করতে পারে একটা মানুষ,আমিও তো মানুষ ,কিছু কিছু সময় মনে হতো আমি মানুষ না,আমাকে পশুর থেকে ও খারাপ বেবহার করত,পশুর ও তো খবর রাখে আমার তাও রাখে না।
সেদিন রাত ১ টায় ঘুমাই কিন্তু ঘুম ভাঙে সন্ধা ৮ টায়, আসলে ওটা ঘুম ছিলো না আমি অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম,কিন্তু ওরা আমার রুমে এসে আমাকে একবার ডেকেও দেখে নি, আমি বেচে আছি কিনা, আমার সবার সাথে খাওয়া অনেক আগে বন্ধ হয়ে গেছিলো, আমার খাওয়ার কোনো খবর তাদের কাছে ছিলো না, আমি খেতাম যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়তো, এমন কোনোদিন নেই,আমার ভাতের উপর আমার চোখের পানি পড়েনি, কিন্তু তাতেও আমার সুখ আমি ওদের কাছে আছি, কিন্তু ইদানীং মাথা ব্যাথাটা খুব বেশি হচ্ছে… খুব বেশি, দিনের ১৫ ঘন্টা আমার মাথা ব্যাথা হয়,আর দিনের ৪ ঘন্টা সেন্সলেস, কিন্তু তাতে কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, আমার মনে হয় আমি যদি আমার রুমে মারা যাই,তাহলে তারা তখন জানতে পারবে যখন লাশ পচে গন্ধ বের হবে… আজ মাথা ব্যাথা টা খুব বেশি লাগছে,সব কিছু কেনো জানি না অন্ধকার লাগছে, হাতের কাছের ডাইরির পৃষ্টাটা কাছে টেনে নিলাম আর লিখতে শুরু করলাম…

“বাবা মা বিশ্বাস করো নুসাইবার মৃত্যুতে আমার কোনো হাত ছিলো না,ওটা একটা আকস্মিক ঘটনা ছিলো, তোমরা ওকে যতটা না ভালোবাস তে আমি তার থেকে বেশি ভালোবাসতাম, ও তো আমার চোখের মনি ছিলো বলো, আমি কি করে ওকে,
আর হ্যা বাবা ওই মেয়েটাকে আমি কিছু করিনি,তোমরা কেনো বুুজনা তোমরা তো জানো আমি কারো সাথে কথা বলি না,তাহেল আমি কেনো এমন একটা খারাপ কাজ করতে পারি, তোমরা আমাকে মারতে আমার কোনো কষ্ট ছিলো না,কিন্তু যখন থেকে আমার সাথে কথা বলা অফ করে দিলে তখন থেকে খুব কষ্ট হয়,আমার মনে হয় আমি চিৎকার করে বলি আমি কিছু করিনি,কিন্তু বলতে পারি না, জানি আমার কথা কেও বিশ্বাস করবে না । আমার না খুুব ইচ্ছা করতো তোমাদের সাথে এক
টেবিলে বসে খাই, আমার ভাই বোনের সাথে কথা বলি,খাইয়ে দিই কিন্তু ওরা তোমাদের ভয়ে আমার সাথে কথা বলতো না,আম্মু যখন নাদিয়াকে খাইয়ে দিতো,আমার খুব ইচ্ছা হতো আমি ও আম্মুর হাতে খাবো,আমিও তোমাদের ছেলে,তাহলে আমি যত দোষ করি তোমরা আমাকে এতো অবহেলা করো কেনো,আমি আজ কিছু না করেও আজ একটা বড় অপরাধী, আব্বু তোমরা যখন আমার বোনের খুুুুনি বলো না তখন মরে জেতে ইচ্ছে করে,সেই দিন আমাকে কেনো জেলে দিলে না ।তাও তো আজ আমাকে এতো অবহেলা সহ্য করতে হতো না। জানো আব্বু-আম্মু আমি আর কাঁদলে চোখ দিয়ে পানি পরে না মনে হয় আমার চোখের পানি শেষ হয়ে গিয়েছে। আমাকে ও তোমাদের ছেলের মতো ভালোবাসতে পারো না ,সেই দিন যদি আমি খুন হয় তাহলে আজকে ও তোমরা খুন,,হয়তো আমার আমার থেকেও বড় খুন ।আমার জন্য কি তোমাদের চোখে একটু ও পানি আসে
না,আমার খুব দেখার ইচ্ছা আমার জন্য তোমাদের চোখে পানি আসছে ,আমার জন্য আমি যদি এরপর ও চোখে পানি না আসে ,তাহলে পৃথিবির মা-বাবার তাদের সন্তানের প্রতি ভালোবাসা মিথ্যা হয়ে যাবে,”আমার না অনেক কষ্ট হচ্ছে মাথা টা অনেক বেথা করছে, আমার কি ভাগ্য আজকে আমি মারতে বোসেছি কিন্তু তোমরা কেউ নেই আমার পাশে,আমার না তোমাদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে, তোমাদের দেখতে মন চাচ্ছে ,কি করবো ,আমি এতটাই অসহায় জে শেষ বারের মতো তোমাদের সাথে কথা বলতে পারছি না,, আর মানে হয় থাকবো না এই নিষ্ঠুর পৃথীবিতে, আব্বু-আম্মু আমার শেষ বারের মতো একটা কথা রাখবে ,আমার কবরটা আমার ছোট বোনের পাশে দিও,এই পৃথীবিতে আমার কেউ আপন ছিলো না, কিন্তু যদি পরোকালে আমার ছোট বোনটা কে আমার কাছে পাই,,,,আর যদি আমি কোনো ভুল করে থাকি তাহলে মাপ করে দিও,,ইতি তোমাদের অবহেলা ছেলে, আর হে আমার কবরের পাশে গিয়ে একটু কেদো।।

হঠাৎ করে হাতের কলম টা ছুটে গেলো,আর এক ফোটা পানি চিঠির টার উপর পড়লো, সাথে একটি নিষ্পাপ মুখ, সবাইকে ছেড়ে না ফেরার দেশে আজ পাড়ি জমিয়েছে ,,,,,
সে আর কখনো ফিরে আসবেনা এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত