অভিশপ্ত শীত

অভিশপ্ত শীত

শীতের রাত, ঘড়িতে এখনো ১২টা বাজেনি। দৃষ্টি ঘোলা হয়ে আসছে, চারদিকে কুয়াশা ঘেরা অন্ধকার। হিমেল বাতাসে শিহরিত মন, কম্পিত এই দেহ।
.
গায়ে মোটাসোটা সুয়েটার, তবুও কাঁপছে এই শরীর। মনে হচ্ছে হিমালয় থেকে আশা বাতাস গুলো সুয়েটার ভেদ করে শরীরে প্রতিটি পরতে আঘাত হানছে।
.
একটু উষ্ণতা পাওয়ার জন্য তড়িগড়ি করে বাড়ির দিকে রওনা হচ্ছি। ঘরে গিয়ে পেটপুরে খেয়ে কম্বলের নিছে ঢুকতে পারলেই বাঁচি।

কম্বলের উষ্ণতায় ঘুমের মাঝে স্বপ্নলোকে হারিয়ে যাবো অন্য একটি গ্রহে। ঘুরে বেড়াবো প্রিয় মানুষের হাতটি ধরে!!
.
একটু একটু করে হেঁটে চলেছি গন্তব্যের দিকে।অন্ধকারে নিজের অস্থিত্ব নিজেই খুঁজে পাচ্ছিনা। সামনে কি আছে ঠিকমত ঠাহর করতে পারছিনা।
.
অনেকদিন পর গ্রামের বাড়িতে আসলাম। গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ গুলো রাতের আঁধারে প্রায় অচেনা মনে হচ্ছে। হাতে কোন টর্চ লাইট নেই,

মোবাইলের আলোয় পথ গুলো দেখা যেতো, কিন্তু মোবাইলটাও বন্ধ হয়ে আছে।
.
গাছের পাতা থেকে শিশির কণা গুলো মাটিতে পড়ার টুপটুপ শব্দ হচ্ছে। প্রতিটি শব্দে কম্পিত হচ্ছে হৃদয়।

মনের মাঝে অদৃশ্য কিছু ভয় কাজ করছে। কিসের ভয় তা জানিনা, লোকের মুখে গ্রামের অনেক ভূতুড়ে গল্প শুনেছি।

কিন্তু আধুনিক যুগে এসে ভূত বলতে কিছু আছে এটা বিশ্বাস করা বোকামী ছাড়া কিছু নয়।
.
আশ্চর্য হলে সত্যি, এখন আমার নিজেকেই বোকা মনে হচ্ছে। কারন আমি এখন মনে মনে ভূত আছে বলে বিশ্বাস করতে বসেছি।

মনে হচ্ছ অদৃশ্য ভাবে কেউ একজন আমার পাশাপাশি হেঁটে চলেছে।
.
হঠাৎ কেউ একজন অন্ধকারে গাঢ় একটি কন্ঠে_ছোট মিয়া, ভালা আছো নি? কন্নাই গেছিলা এতো রাইচ্চা?!
.
কারো মুখে কথা গুলো শুনে পুরো শরীর নিমিষে আরো শীতল হয়ে গেলো। প্রতিটি পশম কাঁটা আকার ধারন করলো।
.
আমি থমথমে গলায় উত্তর দিলাম_কে, কে আপনি?!
গাঢ় কন্ঠটি আবার বলে উঠলো_আ্যই হাসেম পাগলা, ছোট নিয়া, আরে চিনেন নাই কেন?!
.
আশ্চর্য ব্যাপার, পাগল নিজেকে পাগল বলে এই প্রথম শুনলাম। হাসেম নামটা শুনে অবশ্য স্বস্তি পেলাম।
.
হাসেম নামে একজন গ্রামে আছে জানি। সম্পর্কে চাচা লাগে আমার। শীত এলেই উনার মাথা নাকি ঠিক থাকে না।

পাগলের মতো চলাফেরা করে। শীতের সাথে পাগলামীর সম্পর্কটা আমার অজানা!!
.
গ্রামে আসছি আজ পাঁচদিন হলো, এখনো উনার দেখা পাইনি। আজ হঠাৎ রাতের আঁধারে হাসেম চাচার সাথে দেখা হবে ভাবনায় ছিলো না।
.
আমি হেঁটে চলেছি, পাশে হনহন করে হাসেম চাচাও হেঁটে চলেছে। হাসেম চাচা এখন আর আমাকে কিছু বলছে না।

কিন্তু বিরবির করে নিজে নিজে কথা বলে যাচ্ছে। কি বলতেছে তা ঠিক মতো বুঝতে পারছিনা।
.
এক পর্যায় বাড়ির সামনে এসে উপস্থিত হলাম। ঘরের বাহিরে একশ ওয়াটের একটি বাল্ব লাগানো। কুয়াশায় বাল্বের আলোটাও স্পষ্ট না।

কিন্তু এখন হাসেম চাচাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হাসেম চাচাকে দেখে আমার গা শিহরিত হয়ে উঠলো।
.
অর্ধবস্ত্র পরিহিত হাসেম চাচা দাঁড়িয়ে আছে আমার পাশে। কনকনে এই শিতে তার গায়ে কোন সুয়েটার বা শীত নিবারন করার কিছুই নেই।

আছে শুধু গায়ে জরাজীর্ণ একটি পোষাক। চুলগুলো এলোমেলো, মুখে লম্বা লম্বা দাঁড়ি লাল হয়ে আছে। মনে হয় পানের পিক লেগে আছে।
.
অবাক করা দৃশ্য হলো, এই শীতে জরাজীর্ণ পোষাক পরেও কাঁপছে না তিনি। অথচ, আমার গায়ে এতো মোটা সুয়েটার থাকা স্বত্বেও অনবরত কাঁপছি।
.
আচ্ছা, পাগলদের কি শীত লাগে না?! শুনেছি যারা পাগল তাহারা প্রায় স্বপ্নলোকে হেঁটে বেড়ায়। স্বপ্নের মাঝে অনেক কিছুই আবিষ্কার করে।

মাঝে মাঝে জঠিল কোন ধাধায় পড়ে যায়। তখন তাহারা বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে।
.
হাসেম চাচা আমার দিকে গোলগোল চোখে তাকিয়ে দাঁত গুলো বের করে_ছোট মিয়া, আমারে ডরাইছো নাকি?!
আমি কৌতুহল বসত চাচাকে জিজ্ঞাস করলাম_চাচা আপনার গায়ে তো কিছু নেই। শীত লাগতেছে না?!
.
চাচা হে হে করে হাসি দিয়ে_পাগলের শীত গরম কিচ্ছু লাগে না। কিয়ের শীত আর কিয়ের গরম!!
.
আমি চাচাকে দাঁড়াতে বলে তড়িগড়ি করে রুমে গেলাম একটা চাদর এনে দিবো বলে। রুম থেকে বাহিরে এসেই দেখি হাসেম চাচা উদাও।
.
চাচাকে না দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। আম্মু ভাত খাওয়ার জন্য ডাকতেছে। কিন্তু খেতে ইচ্ছে করছে না। না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়লাম।
.
পরদিন ঘুম থেকে উঠে শিশির ভেজা সকালে নগ্ন পায়ে দোকানের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। পথেই মানুষের মুখে মুখে শুনতে পেলাম,

হাসেম পাগলার লাশ বটতলার রাস্তার পাশে পাওয়া গেছে।
.
হাসেম পাগলার লাশ কথাটা মাথায় ডুকছে না। রাতেই তো হাসেম চাচার সাথে দেখা হলো, কথা হলো। তাহলে লাশ হলো কখন?! কিভাবে!?
.
বটতলা রাস্তার পাশে গিয়ে দেখি মানুষের ভীর জমে আছে। ভীর ঠেলে সামনে গিয়ে দেখি শীতল একটি দেহ এখনো মাটিতে পড়ে আছে।

চোখ গুলো বন্ধ, কিন্তু মুখে হাসি ফুটে আছে। ঠিক যেমনটি, ‘ছোট মিয়া’ বলে হে হে করে হেসেছিলো গতরাতে!

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত