আত্মহত্যা

আত্মহত্যা

শায়লিন ৭তলা বিশিষ্ট বাসার ছাদের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে দু হাত প্রসারিত করে! মনে হচ্ছে মেয়েটি আত্মহত্যা করবে? এক পায়ে দাঁড়িয়ে আরেক পা শূন্যে ভাসিয়ে রেখেছে ৷ একবার দুবার না অনেকবার সে এমনটা করছে! আমি পাশের বিল্ডিংয়ের একটি রুমে ভাড়ায় থাকি ৷ রুমের জানালা দিয়েউঁকি দিয়ে মেয়েটার মতিগতি লক্ষ্য করছিলাম! সেদিন দরকারে শায়লিনের বাসায় গিয়েছিলাম ৷ তার ছোট ভাইয়ের থেকে বেশ কিছু টাকা পেতাম, সেই টাকাগুলো আনতে ৷ কিন্তু সে টাকা না দিয়ে তার বোনের রুমে বসে আমাকে জোর করিয়ে লুডু খেলতে বাধ্য করেছিল ৷ বেডে বসে লুডুখেলছিলাম ৷ বেডের পাশে টেবিল ছিল ৷ টেবিলের উপর অনেকগুলো বই ৷ বইয়ের এক পাশে ডায়েরী ৷

গোলাপী রঙের ডায়েরী ৷ খুব বেশি কৌতূহল জাগলো ডায়েরীটা পড়ে দেখার জন্য ৷ অন্যের ডায়েরী পড়া অন্যায় এটা ভাল করে জানি ৷ কিন্তু কোনো বিষয়ে আমার কৌতূহল জাগলে লোভ শামলাতে পারিনা ৷ যেভাবে হোক কৌতূহল কাটাতে ডায়েরীটা পড়তেই হবে! শায়লিনের ভাইয়ের সাথে লুডু খেলা শেষ করে ডায়েরীটা শীতের পোশাকের ভেতর লুকালাম! শীতকাল হওয়ায় ডায়েরীটা লুকানোর জন্য সুবিধায় ছিল! বাসায় গিয়ে গায়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে ডায়েরীটা পড়া শুরু করলাম! কিন্তু টানা ৫০ টা পাতা উল্টালাম একটা পাতাতেও কোনো লেখা পেলাম না! আরো পাতা উল্টাতে লাগলাম ৷ আরো ৫০ টা পাতা উল্টানো শেষ করলাম ৷ তবুও কোনো লেখা পেলাম না ৷ আশাহত হয়েগেলাম ৷ রাগ হচ্ছিল খুব ৷ মন চাইলো ডায়েরীটা ছিঁড়ে ফেলি ৷ রাগকে দমন করতে না পেরেডায়েরীটা ছুঁড়ে মেঝেতে ফেলে দিলাম ৷ ডায়েরীটা উল্টা হয়ে পড়ে রইলো ৷ নজর দিয়ে দেখলাম শেষ পাতা একদিকে আর সমস্ত পাতাগুলোআরেক দিক হয়ে আছে! শেষ পাতাতে নীল কালিতে লেখা দেখতে পেলাম! বিছানা থেকে উঠে মেঝে থেকে ডায়েরীটা তুলে নিয়ে শেষ পাতার লেখাগুলো পড়তে লাগলাম ৷ শায়লিন লিখেছে,

___জীবনে কিছুই করতে পারলাম না ৷ না ভাল ছাত্রী ছিলাম, না ভাল মানুষ ৷ দুবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েও কৃতকার্য হতে পারিনি! বাবা, মায়ের নিকট বেয়াদব মেয়ে আমি ৷ তাদের সন্তুষ্ট করার মত কাজ করতে পারিনি আজও৷ কোনো কাজ কর্ম করিনা, করলে তো তাদের মন ভরবে ৷ বন্ধু সার্কেলের দৃষ্টিতে হাসির পাত্র ৷ যথেষ্ট সুন্দরী হয়েও স্মার্ট হতে পারিনি ৷

বয়ফ্রেন্ডের সাথে বড়সর আঘাতটাও পেলাম! এটা ছিল বড় ভুল! কিছুই পেলাম না জীবনে! কিছু করতে পারলে তো পাব! আমি যেটা পারি সেটাহচ্ছে খাই দাই আর ফেসবুক চালাই! এমন জীবনরেখে কি হবেটা কি?”শেষ লেখা, এপর্যন্তই লিখেছে সে! বুঝতে বাকি রইলোনা যে সে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে! আজই সে আত্মহত্যা করবে! সিদ্ধান্ত নিলাম শায়লিন যে বাসায় থাকে সেটার ছাদে যাব ৷ রুমথেকে বের হয়ে গেলাম ৷ দারোয়ানকে ম্যানেজ করে বাসার ভেতর ঢুকলাম ৷ হঠাৎ আমার ফোনটা টুং করে বেজে উঠলো ৷ ম্যাসেজ এসেছে ৷ ম্যাসেজের শব্দে মনে পড়লো আমার আজ অনার্স সেকেন্ড ইয়ারের রেজাল্ট দিবে ৷ প্রথমবর্ষে দু-সাবজেক্টে ফেইল করেছিলাম ৷ এবার যে কি হবে আল্লাহই ভাল জানেন? ভয়ে দুশ্চিন্তায় হাত পা বুক কাঁপছিল ৷

হ্নদস্পন্দন এত বেড়ে গিয়েছে যে লিফটে উঠে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না! অনেক ধৈর্য্য ধরে মনকে শক্ত করে ম্যাসেজটা সিন করলাম ৷ ম্যাসেজ দেখা মাত্র ফোনটা হাত থেকে পড়ে গেল ৷ মাথা ভনভন করে ঘুরতে লাগল ৷ মনে হচ্ছিল মাথায় কেউ অনবরত লাঠি কিংবা রড দিয়ে পিটাচ্ছে! চোখে ঝাঁপসা দেখছিলাম ৷লিফটের ভেতরটা আলোয় আলোকিত থাকলেও আমার চোখে অন্ধকার লাগছিল ৷ জীবনটাকে তুচ্ছ মনে হচ্ছিল ৷ এই পরাজয়ের গ্লানী কেমনেগুচবো? কি করলে এমন পরাজয়ের দূঃখ ভুলে থাকতে পারব? হ্যাঁ, আমি ৪ সাবজেক্টে ফেলকরেছি ৷ স্বাভাবিক! লেখাপড়া করলে তো পাশ করব ৷ ভুল সিদ্ধান্তের কারণে কঠিন সাবজেক্ট নিয়ে অনার্স করতে গিয়ে জীবনটাকে নরক বানিয়ে ফেলেছি! এর পরপরই ফোন এলো ৷ ফোন রিসিভ করে যা জানতে পারলাম সেটার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না ৷

কখনো ভাবিওনি এমন দূঃসংবাদের সম্মূখীন হবো! খবর পেলাম আমার আব্বু সড়ক দূর্ঘটনায় মারা গেছে! বিনা মেঘে বজ্রপাতে দ্বগ্ধ হলাম মনে হলো! আব্বুর মৃত্যুর খবর শুনে পৃথিবীটাউলোটপালট হয়ে গেল ৷ আরেকটা বছর অনার্সে থাকব বলে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সেটা হারিয়ে গেল নিমিষে! ছাদে যাবার সিদ্ধান্ত পাল্টাতে হলো ৷ এখন আমাকে রুমে গিয়ে বিছানায় গড়াগড়ি করতে হবে ৷ অন্যথায় নিজেকে শামলানো কঠিন ৷ লিফট নিচের দিকে চলতে লাগল ৷ শেষপর্যন্ত বাসা থেকে বের হয়ে এলাম ৷ আমি যে বাসায় থাকি সেটার রুমে আসলাম ৷ এরপর ওয়াশরুমে গিয়ে নিজেই নিজের মাথাতে পানি ঢালছিলাম আর গলা ছেড়ে কান্না করছিলাম ৷ বাবা আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেল এটা কিছুতেই বিশ্বাসকরতে পারছিলাম না ৷ কান্নায় চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে ফেলছিলাম ৷ বুকটা হাহাকার করছিল পাহাড় পরিমাণ কষ্টে ৷ তীব্র যন্ত্রণা বুকে এসে পুরো দেহটাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছিল ৷ কি করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না ৷ হঠাৎ গার্লফ্রেন্ডের ফোন এলো ৷ সে বলছে,

___আমাকে ভুলে যাও! আমার কাল দিন পরই বিয়ে ৷ গোপনে বিয়ে ঠিক করে রেখেছিল বাবা, মা ৷ আজ রেজাল্ট পেয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিলো আর পড়াতে দিবেনা আমাকে ৷ ফেইল করেছি ৷ তাই আমার উপর থেকে তাদের আশা ফিকে হয়ে গেছে ৷ বিয়ে আমাকে বাধ্য হয়ে করতে হচ্ছে ৷ তুমি তো স্টাডির উপর আছো ৷ আমি পালালে তুমি আমাকে গ্রহণ করবেনা ভাল করে জানি ৷ আমার কাল দিন পরই বিয়ে এটা জানাতে ফোন দিলাম! আর তোমার রেজাল্ট কি বলো? আমাদের সম্পর্ক তো আজ থেকে শেষ, আর কথা হবেনা ৷

আমাকে মাফ করে দিও! আমার গার্লফ্রেন্ড এক নাগারে কথাগুলো বলে গেল ৷ বুঝতে পারলাম বিপদ আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে ৷ এটা বেঁচে থাকার লক্ষ্যণ নয় ৷ যে স্বপ্ন নিয়ে বাঁচার আশা করেছিলাম সব মাটির সাথে মিশে ধূলোয় ধূসরিত হয়ে গেল! নাহ, নিজের মনকে শান্ত করতে পারলাম না ৷ কঠিন ও ভয়ানক সিদ্ধান্ত বেছে নিলাম৷ এছাড়া কোনো উপায় নেই ৷ আমার কু-প্রবৃত্তি বারবার বলছিল, “এভাবে মানুষ বাঁচতে পারেনা, ভাগ্য তোকে উষ্টা মেরেছে!

এই জীবন তোকে থুথু মেরে অন্য পথে চলছে ৷ এমন ব্যর্থ পরাজিত জীবন নিয়ে কি করবিটাকি? ঠোকর খেতে খেতে জীবন চালিয়ে যাবার চেয়ে মরে যাওয়া ভাল ৷ তোর মত নিষ্কর্ম ও ব্যর্থ মানুষের বেঁচে থাকাও অন্যায় ৷ মরে যা তুই, ভাল থাকবি!” অনেক ভাবলাম ৷ সিদ্ধান্ত নিলাম আত্মহত্যা করব ৷ কান্না থামিয়ে মনকে শান্ত করে চোখ দুটো চেপে ভাবলাম অনেকক্ষণ! শায়লিন যে বাসায় থাকে সেটার ছাদ থেকেই লাফিয়ে আত্মহত্যা করব ৷ এবার ছাদে উঠে পড়লাম ৷ শায়লিন এখনো ছাদে দাঁড়িয়ে ৷ আমাকে দেখে বুকের ওড়নাটা ঠিক করে জড়োসরো হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়ালো ৷ তার সাথে কোনো কথা হলোনা ৷ আমি পড়ে গেলাম বিপাকে ৷ সে থাকাকালিন ঝাঁপ দেওয়া কঠিন ৷ তাছাড়া আত্মহত্যা করলে তার উপর দোষ চাপতে পারে! ভাবলাম কি করা যায়? হঠাৎ শায়লিন বলে উঠল,

__আপনার রেজাল্ড দিয়েছে তাইনা? আমি মুখে কিছু না বলে মাথা নাড়ালাম! শায়লিন ফের বলল,
__ছাদে কেন আসছেন? আমাকে দেখতে? তার কথার জবাব দিতেই হলো ৷ চাপাস্বরে বললাম,
__হুম, তোমাকে দেখতে এলাম!
__আমি কি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম জানেন?
__কি?
__আত্মহত্যা করার ৷ ডিপ্রেশনের জ্বালা সহ্য করতে পারছিলাম না ৷ কোনো কিছুতে বিন্দু পরিমাণ সুখ খুঁজে পাচ্ছিলাম না! তাই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম!

__আত্মহত্যা করবে না?
__নাহ!
__কেন?
—অনেক ভেবেছি ৷ ভেবে বুঝতে পারলাম আত্মহত্যা এসবের সমাধান নয় ৷ পৃথিবীতে সুখে নেই, পরকালে যে সুখে থাকব এর গ্যারান্টি খুঁজে পাচ্ছিলাম না ৷ তাছাড়া আমি একটা হাদিসের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম!

__কোন হাদিস?
__ রাসূল (সাঃ) বলেন: যে ব্যক্তি নিজেকে পাহাড়ের ওপর থেকে নিক্ষেপ করে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামে যাবে। সেখানে সর্বদা সে ওইভাবে নিজেকে নিক্ষেপ করতে থাকবে অনন্তকাল ধরে। যে ব্যক্তি বিষপান করে আত্মহত্যা করবে, সেই বিষ তার হাতে থাকবে। জাহান্নামে সর্বদা সে ওইভাবে নিজেকে বিষ খাইয়ে মারতে থাকবে অনন্তকাল ধরে। যে ব্যক্তি কোনো ধারালো অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করেছে তার কাছে জাহান্নামে সেই ধারালো অস্ত্র থাকবে যার দ্বারা সে সর্বদা নিজের পেটকে ফুঁড়তে থাকবে। [সহীহ বুখারী : ৫৪৪২; মুসলিম : ১০৯] এটা! এটা মনে হতেই অন্তর কেঁপে ওঠে ৷ এবং শাস্তির ভয়ে নিজেকে শুধরে নিই ৷ তাছাড়া যেই বাবা, মা আমাকে এত কষ্টে বড় করেছেন তাদের সীমাহীন কষ্ট দিয়ে কেমনে আত্মহত্যা করি বলেন?

পরাজয় বরণ করে আত্মহত্যা করা ভীরু মানুষের কাজ! আমার ব্যর্থতায় বাবা, মা একটু অভিমান করে বকাবকি করে এজন্য আমি রাগ মনেতে চেপে রেখে জিদের বশে আত্মহত্যা করব এটা যে কতটা বোকামীর কাজ এখন উপলদ্ধি করতে পারছি ৷ বন্ধু বান্ধব তে সফলতার সময়েও হিংসা করে, ব্যর্থতায় হাসাহাসি করবে এটাই স্বাভাবিক ৷ ওদের ব্যবহারে কষ্ট পুষে রাখছি সত্যিই লজ্জার বিষয় ৷ আর প্রেমিক ৷ সে তো অমানুষ ছিল ৷ নিজের পাপের শাস্তি পেয়েছি মাত্র ৷ তার জন্য কষ্ট পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছিলাম এটা যে কতবড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল মনে হতেই আমার গা কাঁপছে! যাহোক, এসব ভুলে যেতে চাচ্ছি! এমন ভুল যেন কেউ না করে এটাই কাম্য! শায়লিনের কথাগুলো মন দিয়ে শুনে নিজের সব প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেলাম ৷ বাবার মৃত্যুর জন্য কষ্ট হলেও মনকে শক্ত করে সিদ্ধান্ত নিলাম পরিবারের হাল এবার আমাকেই ধরতে হবে ৷ কোনো বোকামী নয় আর! শায়লিনকে শুধু “আসছি” বলে ছাদ থেকে চলে যাচ্ছিলাম ৷ তখনই শায়লিন বলল,

__রেজাল্ট কি ছিল বললেন না যে? মিষ্টি হাসির রেখায় উচুঁ গলাতে বললাম,
___৪ সাবজেক্টে ফেইল!

শায়লিন অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো ৷ আমি তৃপ্তির হাসি হেসে এবং তাকে, “মাঝে মধ্যে ফোন দিব” বলে বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম!

২ বছর পরঃ শায়লিন আমার স্ত্রী ৷ আমরা গ্রামে বাস করছি ৷ বাবার জমি চাষাবাদ করে, একটা পুকুর ও হাস-মুরগির খামার করে বেশ ভালভাবে সংসার চালিয়ে যাচ্ছি! যদি আত্মহত্যা করতাম, তবে?

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত