প্রবাস

প্রবাস

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই নিলার সাথে দেখা করতে বের হয়ে গেলাম৷ আমাদের কথা হয়েছে যে, আগামী দুই সপ্তাহ প্রতিদিন সকালে নিলার ক্লাসের আগে আমাদের দেখা করা বাধ্যতামূলক৷ এর একটা বিশেষ কারণও অবশ্যি আছে৷ কারণ হল আমি দুই সপ্তাহ পরেই বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দিচ্ছি৷আজকে দুই সপ্তাহের সপ্তম দিন৷ সত্যি বলতে, এত্ত সকালে ঘুম থেকে উঠতে একটু বিরক্তই লাগে৷ এর দুইটা কারণ আছে৷ প্রথমত, আমি খুবই নিদ্রাবিলাসি৷ আর দ্বিতীয়ত, আমি আসলে কখনোই নিলাকে সিরিয়াসলি নেই নি৷ কিন্তু আমাদের সম্পর্কের এই অল্প সময়ে নিলা সবসময়ই আমাকে প্রচন্ড ভালবেসে এসেছে৷ নিলা প্রচন্ড সুন্দরী হওয়ার সাথে সাথে খুবই সহজ সরল৷ তাই হয়তো আমার এত উদাসিনতার পরেও আমার সাথে আছে৷ যেয়ে দেখলাম নিলা গাছ তলায় বসে আছে।ওর সামনে যেয়ে দাড়াতেই ও বলল,

-আজও লেট করে ফেললে? আমি একটু হেসে বললাম,
-ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেল।
-আচ্ছা বাদ দাও,চল হাঁটা শুরু করি নয়তো ক্লাসে লেট করে ফেলব।
-আচ্ছা দাড়াও৷তাহলে রিকশা ভাড়া করি৷
-কি যে বল না তুমি? হাঁটার মজা কি আর রিকশায় পাওয়া যায়?
-কিন্তু তোমার ক্লাসে যদি লেট হয়ে যায়?
-আহা! তুমি চল তো।

এই বলে ও আমার হাত জরিয়ে ধরে হাঁটা শুরু করে দিল।সাধারণত পাব্লিকলি এভাবে হাঁটা আমার একদম পছন্দ না৷ তাই কোন রকম হাত ছাড়িয়ে আবার হাটঁতে লাগলাম৷ নিলা প্রায় দিনের মত আমাকে আবার জিজ্ঞাসা করল,

– তোমার যাওয়াটা কি খুব জরুরী? না গেলে হয় না?
– নিলা, এসব কি বলছ? তুমি তো জানো যে এটা আমার কত দিনের স্বপ্ন৷ তাছাড়া এই সুযোগের জন্য আমি যে কয়েকদিন যাবত কি পরিমানে কস্ট করছি তাও তো তুমি জানো৷

আমার কথায় নিলা যেন কিছুটা চুপ হয়ে গেল৷ প্রতিউত্তরে শুধু বলল, হু.. আমিও চুপচাপ হাটঁতে লাগলাম৷ আসলে নিলা মেয়েটা বস্তবতাটুকু সহজ ভাবে নিতে পারছে না৷ কিছুক্ষণ পর নিরবতা ভেঙে নিলা আবার বলে উঠল,

-ওখানে যাওয়ার পর আমার কথা মনে পরবে তো?
-হু..
-আমাদের স্মৃতিগুলো মনে থাকবে তো?
-হু..
-আমার সাথে যোগাযোগ রাখবে তো?
-আসলে নিলা এই ব্যপারেই তোমার সাথে কথা বলতে চাচ্ছিলাম..ভালো হল যে তুমি প্রসঙ্গটা তুলেছ..
নিলা কৌতুহলী দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে বলল,

-কি ব্যপারে?
-আসলে আমি ওখানে গেলে একেবারে সেটেল হয়ে যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছি.. তো আমদের সম্পর্কের স্হায়িত্বটা আর কিছু দিনেরই মাত্র।

নিলা আমার কথা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। আমরা ওর ইউনিভার্সিটির কাছাকাছি চলে আসলে ও কিছু না বলেই মাথা নিচু করে চলে গেল। আমি ভাবলাম, হয়তোবা বিষয়টা ও মেনে নিয়েছে৷ যাক, ও যত তারাতাড়ি মেনে নিবে ততই ওর জন্য ভালো।

এর পরের দুইদিন নিলা দেখা করার জন্য আসল না৷ কয়েকবার ফোন দিলাম কিন্তু রিসিভও করল না৷ পরে ও আমাকে মেসেজে জানিয়ে দিল যে, ও নাকি অসুস্থ তাই আসতে পারবে না৷ আমি জানি, ও মোটেও অসুস্থ না৷ আমার কথায় ও প্রচন্ড কষ্ট পেয়েছে তাই আসেনি৷ আচ্ছা আমি যে এভাবে একজন কে কাঁদিয়ে চলে যাচ্ছি আমি কি সুখে থাকতে পারব? পৃথিবীতে এমন কত ভালবাসা রয়েছে যারা একসাথে থাকতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত নিয়তি তাদের বিচ্ছেদ হয়ে গেছে৷ আমাকে তো সেই হিসেবে ভাগ্যবানই বলা যায়৷

আমার ফ্লাইটের দিন সকালে নিলা আমাকে ফোন দিয়ে আমাকে জানাল যে, আমার সাথে দেখা করবে৷
গাছতলায় যেয়ে দেখলাম নিলা এখনো আসেনি৷ এই গাছ তলাতেই নিলা আর আমার সবচেয়ে বেশিবার দেখা হয়েছে৷ আর সবচেয়ে বড় কথা এই জায়গায় নিলা আর আমার প্রথম দেখা হয়েছিল৷ হঠাৎ দেখি নিলা আমার সামনে দাড়িয়ে আছে৷ ও আমাকে বলল,

-এত গভীর মনযোগ দিয়ে কি ভাবছ?
-তেমন কিছু না৷ ভাবছিলাম এই গাছের নিচে আমাদের কত স্মৃতি তাই না?
-হুম৷ তোমার ফ্লাইট কখন?
-এইতো আজ রাতেই৷
– প্লিজ থেকে যাও… আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি৷ তোমাকে ছাড়া আমি বাঁঁচব না৷
-আহা নিলা বুঝার চেষ্টা কর এমন কখনো হয় না৷ আমিও তোমাকে ভালবাসি কিন্তু জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না৷
নিলা ক্রমাগত কাঁদতে লাগল৷ আমি আবার বলতে লাগলাম,

-আমি তো এখনো বেকার৷ লেখাপড়া এখনো বাকি৷তাই চাইলেও আমি তোমাকে কখনো নিজের করে পাব না৷ তাছাড়া এই সেমিস্টার পরে তোমার বাসা থেকেও বিয়ের জন্য চাপ দিবে৷ কাওকে বিয়ে করে ফেললে দেখবে আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে৷ নিলা তবুও বারবার কাদঁতে লাগল৷ আমি নিলাকে কোন রকম সান্তনা দিয়ে ওকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে শেষ বিদায় নিয়ে আসলাম৷

রাতে প্রচুর পরিমানে বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারনে আমার ওই রাতের ফ্লাইট বাতিল হয়ে গেল।তার পরের দিন সকালে ফ্লাইট বলে জানিয়ে দেয়া হল৷ তাই ভেবে আমি সকালে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম৷ যাওয়ার আগে কি ভেবে যেন গাছতলায় যাব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম৷ আমি যেয়ে অবাক হয়ে দেখি নিলা ওই জায়গায় বসে কান্না করছে৷ আমি নিঃশব্দে যেয়ে নিলার মাথায় হাত রাখলাম৷ নিলা কান্না থামিয়ে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ আমাকে জরিয়ে ধরে কাদঁতে কাদঁতে বলল,

-আমি জানতাম তুমি আমাকে ছেড়ে কখনও যেতে পারবে না৷ নিলা হয়তোবা আমার সাথে ব্যাগ আর লাকেজ খেয়াল করেনি৷ আমি নিলার চোখ মুছে দিয়ে ওর কপালে চুমু খেয়ে বললাম,

-আমায় এখন যেতে হবে৷ কালকের ফ্লাইট বাতিল হয়ে যাওয়াতে আজ কিছুক্ষণ পরেই আমার ফ্লাইট৷ আমি আসি৷ তুমি ভাল নিজের খেয়াল রেখ।

এই বলে আমি সামনের দিকে হাটতে লাগলাম৷ নিলা কি করছে তা পিছে ফিরে দেখার সাহস আমার নেই৷ অজানা কারনে আমার চোখ দুটোও ভিজে উঠছে৷ নিলাকে শেষ বারের জন্য দেখব দেখব বলেও আর পিছে ফিরলাম না৷ কারণ আমি জানি যে, আমি পেছনে ফিরলে আর যেতে পারব না৷ আমরা যতটুকু ধারণা করি বাস্তবতা আসলে তার চেয়েও অনেক নিষ্ঠুর৷

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত