অপেক্ষার পূর্নতা

অপেক্ষার পূর্নতা

সে কালে পাঁচ টাকা দিয়ে কত কিছু পেতাম! এক টাকা দিয়ে দুইটা চকলেট পেতাম।এক টাকা দিয়ে বুট কিনতাম। বড়ই এর আচার একটা ও একটা মধুবন।আবার সেগুলো কিনে মোরশেদ,রাফি, নিজাম আর আমি মিলে খেতাম।তখন কতই না ভালো লাগত। আমি টাকা বেশি নিতাম না। নিতাম না বলতে মা দিত না। অবশ্য মায়ের কাছে থাকলেই তো দিত! মায়ের কাছেই তো নেই।বাবা শহরে চাকরি করত। সরকারি কর্মচারী। নয় কিংবা দশ হাজার টাকা মাইনে পেত।বাবার থাকা খাওয়ার খরচ বেতন থেকেই দিতে হত।তাই বাড়িতে তেমন পয়সাকড়ি পাঠাতে পারত না।এ নিয়ে বাবার সাথে মায়ের কত যে জগড়া হয়েছিল তার অন্তঃ নেই।বিশেষ করে মাসের শেষের দিকে বাবার সাথে মায়ের জগড়া বেশি হত।চাল থাকত না।সারা দিন কাজ করার উপরে থাকত বাবা।তাই তাকে ফোন দিলে তিনি মাকে কয়েকটা কটাক্ষ কথা শুনিয়ে দিতেন।তিনি বুঝতেই চেষ্টা করতেন না যে চাল শেষ হয়ে গিয়েছে। তরকারিরর কথা তো বাদই দিলাম। বাবার আগুন ঝরানো বাক্য গুলো শুনে মা আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারতেন না।ঠিক মেনে নিতে পারতেন না।তখন শুরু হয় সেই অনাকাঙ্ক্ষিত জগড়া। মা ফোন রেখে দিত।তিনি জানেন এই লোকের সাথে কথা বলে লাভ হবে না।এতে জগড়া আরো ঘভিরই হবে,তবে কাজের কাজ কিছুই হবে না।আমি দরজার আড়াল হতে দেখতাম।মা কান্না করছে।খুব কান্না করছে।মুখে ওড়না গুঁজে কান্না করছে।।মায়ের কান্না দেখে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারতাম না। খুব কষ্ট হত।আমি দরজার আড়াল থেকে বের হয়ে দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরতাম। আমার স্পষ্ট মনে আছে,সেদিন মা আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিল। উনার চোখের পানি আমার মুখে পড়ত। আমি আমার চোখের পানি মুছে মায়ের চোখের পানি মুছে দিতাম।বলতাম, মা আমি একদিন বড় হয়ে তোমার সব কষ্ট দুর করে দিব। তবুও তুমি কেঁদ না মা। তুমি কাঁদলে আমার ভালো লাগে না।
তখন মা বলত,
হুম বাবা।তাই যেন হয়। মাও তোর জন্যে দোয়া করি তুই যেন বড় হয়ে আমাদের সব দুঃখ কষ্ট গুলো দুর করে দিতে পারিস।
আমি কিছু বলতাম না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে মাকে দেখতাম।তিনি লাল চোখ আর মুখে গম্ভির ভাব নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন চাল ধার করার জন্যে। বাড়ির কারো কাছ থেকে চাল ধার করে আনতেন। ভাত আর আলুর ভক্তাটাই আমার প্রিয় খাবার ছিল।মাকে বলতাম আলুর ভক্তা করার জন্যে। মাও স্বাচ্ছন্দ্যে সেটা করতেন।মধ্যবিত্ত নয়, গরিব ছিলাম আমরা। তাই ইচ্ছে গুলোও ছোট ছিল।যেমন, আমি দুই তিন মাসে পর পাঁচ টাকা স্কুলে নিতাম। কিন্তু সেখানে মোরশেদ এর বাবা ওকে দৈনিক দশ টাকা দিত। ও অবশ্য আমাকে খাওয়াত।কারন আমি ছিলাম ক্লাসের ফাস্ট বয়।ওর ছিল দুই।এছাড়াও আমার আর ওর মাঝে একটা ভালো বব্ধুত্বও ছিল।ওর আম্মু আর আব্বুও আমাকে খুব ভালোবাসত।আমি কখনো টাকা নিতে পারতাম না এ নিয়ে আমি তেমন মন খারাপ করতাম না।করলেও মায়ের এমন অবস্থা দেখে কিছুই বলতাম না।মা অবশ্য সেটা কিভাবে জানি বুঝে পেলত।আমার মুখের অবস্থা দেখেই তিনি আমাকে পাঁচ টাকা দিতেন।বলতেব,যাহ বাবা কিছু খেয়ে নিস।আমি খুশি মনে টাকা গুলো নিতাম।পরিবারের অবস্থা দেখেই ইচ্ছে গুলো আপনা আপনিই ছোট হয়ে যেত।মায়ের রান্না চুলাতে থাকা অবস্থাতেই বাবার পরবর্তি ফোন চলে আসত।মা ধরত না।বাবা আবার দিত।মা মুখ কালো করে ফোনটা ধরত।আমি ঠিক জানি না তাদের মাঝে কি কথা হত।তবে কিছুক্ষন পরেই মায়ের আষাঢ়ে মুখখানা শীতের আকাশের ন্যায় স্বচ্ছল হয়ে উঠল। উজ্জ্বল হয়ে উঠত তার ফর্সা চেহারাটা।আমি জানি না কি এমন যাদু ছিল সে কথায়।যা শুনে আমার মায়ের অবস্থার এমন পরিবর্তন। এ নিয়ে আমি মাকে কখন প্রশ্ন করতাম না।তার সুখ তার কাছেই থাক।কারনটা তাদের মাঝেই সিমাবদ্ধ থাকুক। মায়ের হাসি দেখে আমিও হাসতাম। আষাঢ়ের কালো আকাশ যখন একটু ফর্সা হয়,নীল আকাশ টা যখন দেখা যায় পরিষ্কার, ঠিক তখন খেটে খাওয়া মানুষ গুলো যেমন খুশি হয় আমি মায়ের মুখ খানা দেখে তার চেয়ে বেশি খুশি হই।
.
দশম শ্রেনিতে থাকা কালিন মা আমাকে দশ টাকা দিতেন টিপিন গ্যাপে খাওয়ার জন্যে।প্রতিদিন দেওয়ার সাধ্যি ছিল না।সেদিন ও দেন নি।খুদায় আমার পেট যেন শাঁ শাঁ করছে।আমি যোহরের নামাজ টা পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম।এর পরেই কি জানি এক অলৌকিক কাহিনি ঘটল।আল্লাহ মনে হয় আমার কথা শুনেছেন। স্কুলের পাশেই বাজার।সেখানে আমার মেজো কাকার সাথে দেখা হল। তিনি কি বুঝে সেদিন আমাকে বিশ টাকা দিলেন।আমি যেন সোনার হরিন হাতে পেলাম।হেঞ্জা কাকুর
দোকানে গেলাম।সবাই প্রতিদিন কি ভাবসাব নিয়ে এই হোটেলে ঢুকে আমি তা দুর থেকে দেখি।আজ বিশ টাকা আছে।তাই আমি একটা অন্যরকম ভাব নিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। অনেকেই আড় চোখে দেখছিল।হয়ত আমার এই হঠাৎ দেখানো ভাব তাদের পছন্দ হয় নি।
খাওয়া শেষে ক্লাসে আসতাম।পেটে খাবার আছে এতেই মনটা কেমন জানি ভালো হয়ে গেল।তার উপর নিহাকে দেখে আমার মন আরো ভালো হয়ে গেল। নিহা! আমার প্রথম কি তা ঠিক আমি জানতাম না।কিন্তু এখন মনে হচ্ছে যে সেটা ছিল প্রথম আবেগ।কিন্ত এখনো তার সামনে গেল আমি নার্ভাস ফিল করি।কেন তা জানি না।এত কিছুর মাঝেও মেয়েটির জন্যে আমার একটা আলাদা টান কাজ করত।মনে হত যেন শুক্র বারেই স্কুলে যাই।ওকে দেখি। প্রান ভরে দেখি।ও নিজেও আমাকে দেখত।আমি তাকালেই চোখ ফিরিয়ে নিত।নেহাত গরিব বলে সামনে আগাই নি।

কলেজে উঠার পরেই জীবন কি তা আমি টের পেয়ে পেয়েছি। পড়ালেখার খরচ চালাতেই যেন সব টাকা শেষ। টিউশনি করাতাম। কিন্তু তারা কেউ ঠিক মত টাকা দিত,তো কেউ দিতই না।মাসে দিন তিনশ টাকা।তখন তিনশ টাকা দিয়ে কি আর হত? এত কষ্ট করে পড়াতাম। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। টাকার খুব প্রয়োজন ছিল আমার।এতই ব্যাস্ত ছিলাম যে ক্লাসে যে এত সুন্দর একটা মেয়ে ছিল তা আমি জানতামই না।ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষে উঠার পর তাকে দেখলাম। ছোট ছোট চোখ দুটোয় গাঢ় কাজল,ঠোটে হালকা গোলাপি লিপষ্টিকে মেয়েটাকে দারুন লাগছিল। ওর দিকে তাকাতেই দেখলাম ও আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।আমি তাকাতেই চোখ সরিয়ে নিলাম। বুকের বাম পাশটা যেন খুলে পড়ে যাবে এমন অবস্থা। ওর চোখের দিকে তাকাতেই আমি কেমন জানি শক খেয়ে উঠলাম। খুব জোরে নড়ে উঠলাম।আমার এ অবস্থা দেখে আরাফাত বলে উঠল,
কিরে বেটা কি হয়েছে।এমন ষাড়ের মতন লাফিয়ে উঠলি যে?
আমি বেপারটা এড়িয়ে গিয়ে বললাম,
নাহ।এমনি।একটু মজা করলাম।
ও বলল,
তুই মজাও করতে পারিস। আগে জানতাম না তো?
আমি কিছুই বললাম না। ও আবার বলল,
তোর সাথে দেখা হওয়ার পর থেকে দেখে আসছি যে তুই কেমন চুপচাপ। তেমন কথাও বলিস না। আর আজ সেই তুই কিনা বলছিস তুই মজা করছিস? হাসালিরে বন্ধু হাসালি। ও কেমন জানি তাচ্ছিল্যের হাসি দিল। আমি আবার চুপ হয়ে গেলাম।গরিব ছেলেদের হাসতে নেই।এরা হাসলেই এর দ্বিগুণ কষ্ট ওদের পেতে হয়।
মেয়েটা আমাকে আগ থেকেই দেখত। এটা আমি এই কিছু দিন আগেই বুঝতে পারছি আমি তাকালেই দেখতাম কেমন ড্যাবড্যাব চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।কিছু দিন পরেই রুলস টা বদলে গেল।আমি তাকালে সে আর চোখ নামিয়ে নিত না।উল্টা শান্ত চোখে তাকিয়ে থাকত। আমি তাকালে আর চোখ ফিরাতে মন চাইত না।আমিও তাকিয়ে থাকতাম। সেও তাকিয়ে থাকত। কেমন জানি এক অদ্ভুত অনুভূতি হত।তেমনি সেদিনও আমি তাকিয়ে ছিলাম। সেও!স্যার এসে আমাকে ডাকল। সবই বলছিল যে আমি নাকি সেদিন স্যার ডাকার পরেও কোন জবাব দেই নি। আমারো তাই মনে হয়।যখন স্যার আমাকে পিঠে একটা থাপ্পড় মারলেন তখন হুঁস এল।আমাকে আর ওকে দাঁড় করানো হল আমার পাশে আরাফাত। সে মুখে হাত দিয়ে হাসতেছে।খুব হাসতেছে।আর আমার গা জ্বলে পুড়ে একাকার। বেটা স্যার আসছে আমাকে একবার বলবে না।স্যার বা থাকলে এতক্ষনে ওকে মেরে তক্তা বানাতাম।আমাদের এভাবে তাকিয়ে থাকা যেন স্যার মেনে নিতে পারেন নি।তাই দুজনকেই ক্লাস থেকে বের করে দিলেন। ক্লাস থেকে হয়েই আমরা দুজনেই কলেজের শহিদ মিনারে এসে বসলাম।আমি নিচু হয়ে চিন্তা করতে থাকলাম যে ও কেন আমার সাথে এখানে আসছে।কেন? তাহলে কি সে ও আমাকে…
নাহ। এ হতে দেওয়া যাবে না।এমনটা হলে যে আমি ধ্বংস হয়ে যাব।বাবা মায়ের কষ্ট গুলো লাগব করা তো দুরে থাক নিজের গুলাও লাগব করতে পারব না।আমি যে আমার মাকে দেওয়া কথাটা রাখতে পারব না।ও কিছু কটাক্ষ কথা বলব বলে মাথা উঁচু করে ওর দিকে তাকালাম।কিন্তু কিসের কি।আমি ওকে কিছু বলা তো দুরে থাক আবার ওর ওই চোখের ঘভিরতায় হারিয়ে গেলাম।নাহ! এভাবে চললে আমি অল্প দিনেই উন্মাদ হয়ে যাব।
কয়েক সপ্তাহ কলেজে গেলাম না।বাড়িতে বসেই পড়লাম।নানা রকম সমস্যা ছিল বাড়িতে।ভাড়া ছিল না।এই নিয়ে বাবার সাথে মায়ের সেকি জগড়া আমি তাদের থামাতে বৃথা চেষ্টা করতাম।তারা কেউ থামত না।শেষমেশ বাবা রেগে গিয়ে মায়ের গায়ে হাত তুললেন।আমি নির্বাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে রইলাম।বাবা এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন যেন তিনি বড় সড় ভুল করে পেলেছেন।বাবার চোখ বেয়ে পানি ঝরে পড়ল।মায়ের দিকে তাকালাম।বা পাশের গালটা লাল হয়ে আছে।নিচের দিকে তাকিয়ে আছেন।কান্না করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।আমি মন চাচ্ছিল যে বাবাকে কশিয়ে একটা দেই।নেহাত বাবা বলে কিছুই বললাম না।ছোট ভাইটা আর ছোট বোন টা মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করছে।আর আমি আস্রু সজল চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছি।

মা থাকবে না।চলে যাবে বাপের বাড়ি। তার নাকি আর কষ্ট সহ্য হয় না।একথা মনে হতেই বুকটা কেঁপে উঠত। তাহলে কি আমি মা হারা হব? আমি মাকে অনেক বুঝালাম।তিনি বুঝলেন না।চলে গেলেন রুহি আর মাহিনকে নিয়ে।রেখে গেলেন আমি।কি আশ্চর্য যাওয়ার সময় বলে গেলেন যে তোর বাবা খেয়াল রাখিস। এত কিছুর পরেও বাবার জন্যে এত চিন্তা? তাহলে চলে যাচ্ছে কেন? প্রশ্নটা করার ইচ্ছে ছিল।কিন্তু কিসের বাধায় আর করা হয়ে উঠে নি।আমি বাবার রুমে গিয়ে দেখলাম তিনিও বিমর্ষ চোখে একদিকে চেয়ে আছেন প্যারালাইজড রোগির মত। চোখ বেয়ে কয়েকফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল।বাবা কে একটা প্রশ্ন করার ইচ্ছে ছিল কিন্তু তার এ অবস্থা দেখে সেটা করা হয় নি।সেদিন সকাল হতে না হতেই মায়ের ফোন। এক প্রকার খোবের উপর ছিলাম।তাই ফোন টা ধরি নি আবার দিল। এবার কাটার সাহস পেলাম না।ধরলাম! ঘরে পান্তাভাত আছে।সেগুলো খাওয়ার জন্যে ফোন দিয়েছে।বাবাকে খেতে বলছে।শেষে আবার বলল,তোর বাবাত দিকে একটু খেয়াল রাখিস । এ কথা শুনার পরেই ফোনটা কেটে দিলাম। বাবা ছুটিতে আসছে।বাড়িতে তিনি এখন একা। বাবাকেও পান্তা ভাত দিলাম। নিজেও খেলাম। তৃপ্তি করে খেলাম।মায়ের হাতের খাওয়া।আর খাওয়া হবে না মনে হয়। খেয়েই বেরিয়ে গেলাম। পড়ার ইচ্ছে নেই।মন ভালোও নেই।ঠিক যোহরের নামাজের আযানের পর ঘরে গেলাম। আমি ঢুকতেই দেখলাম রুহি আর মাহিন বেরিয়ে আসছে।ভিতর থেকে বাবা মায়ের কথার আওয়াজ আসছে।তার মানে মা ফিরে এসেছে? আমি এগুতেই তাদের কথা আওয়াজ পেলাম।
বাবা :এই তুমি কি এখনো রেগে আছ?
মা :এত জোরে কেউ কাউকে চড় মারে? আমার গালটা এখনো ব্যাথা করছে।
:আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও।আসলে তুমি তো জানই আমি এমনিই। একটু বেশি রাগি।
:হুম।আমি ছাড়া তোমাকে এর থেকে বেশি কেউই জানে না।আমি জানতাম তুমি আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। তুমি আমাকে নিতে আসবেই।তাইতো চলে আসলাম। আর…
:আর…?
:আমিও যে তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না, তাই।
:খুব ভালোবাস তাই না।
:কি মনে হয়.
আমি আর শুনলাম না।ওদের রুমেও গেলাম না।তারা তাদের মধ্যেই সিমাবদ্ধ থাকুক।এর মাঝেই তারা সুখে থাকুক।আমি জানি তারা একে অপরকে খুব ভালোবাসে।খুব!

কলেজের গেইট দিয়ে ঢুকতেই কেউ একজন বলে উঠল,
:এত দিন কোথায় ছিলেন।
আমি পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি মেয়েটা। আজিব বেপার হল আমি তার নাম জানি না।আমি মানুষ টাই বড় অদ্ভুত। নাহ কিছু বলব না।ওকে এড়িয়ে চলতে হবে।
আমি আবার হাঁটা দিলাম।
ও আবার বলে উঠলল
:আরে আরে কই যান।দাঁড়ান?
:জি কিছু বলবেন?
:আপনি এত দিন কই ছিলেন?
:সেটা আপনার না জনলেও চলবে।
এই বলে চলে এলাম।ওকে লাই দেওয়া যাবে না।লাই দিলেই আমার অবস্থা একেবারে খারাপ হয়ে যাবে।
কলেজের বিদায় অনুষ্ঠানের দিন একটা চিরকুট পেলাম।
প্রিয় তাসফি,
কলেজের প্রথম দিন থেকেই তোমাকে মনের অধিনস্ত করে পেলেছি।তোমার মাঝেই আমি আমাকে খুঁজে পাই।এখনও! আমি তোমার সম্পর্কে সব জানি।যত জড় আসুক তোমার সাথে থাকার প্রতিজ্ঞা নিয়েছি। আর যাই হোক তোমাকে ছাড়া আমি অসম্পুর্ন।তুমি ছাড়া আমার ভিতরে আর কিছুই নেই।তুমি শেষ এটাই আমি জানি।তুমি তো জানই ভালোবাসার কথা মেয়েরা বলতে তারে না।শহিদমিনারের সামনে তোমার অপেক্ষায় আছি।আজ চাইলে আসতে পার।যদি আজ না আস তবে সারা জিবন এখানে তোমার জন্যে অপেক্ষা করব।ভালোবাসার সেই মধুর বাক্যখানি একবার শুনার জন্যে। অপেক্ষায় রইলাম।
স্নেহা।
আমার একটুও বুঝতে বাকি রইল না যে কে দিয়েছে।আমি সেদিন যাই নি।ওর ভালোবাসা আমার মত ছেলে পাওয়ার যোগ্যতা রাখে না।খুব বড় মনের মানুষ ও।নাহ! আমি সেদিন যাই নি।কাগজটা ছুড়ে পেলে দিয়ে অস্রু সজল চোখে স্বার্থপরের মত চলে এলাম।আমি ভালো নই।খুব খারাপ।তবে এটা ভালো লাগল যে ও আমাকে তুমি করে বলেছে।
.
পড়া লিখা শেষ করে চাকরি করছি।অবশেষে বাবা মায়ের দুঃখ আমি লাগব করতে পেরেছি। তাদের কে একটু হলেও সুখ এনে দিতে পারছি।থাকুক তারা সুখে।তাদের সুখের জন্যেই তো আমার এত আত্নত্যাগ। কিন্তু নিজের কষ্ট গুলো লাগব করতে পারি নি।পারি নি নিজের মাঝে সুখ কে বিচরণ করতে।কেন? জানেন? কি ভাবছেন। না স্নেহার জন্যে নয়।রুপার জন্যে। ভার্সিটিতে সে ছিল আমার প্রেমিকা।তখন স্নেহার কথা ঠিক তেমনন মনে নেই।রুপার ভালোবাসা আমার সব ভুলিয়ে দিয়েছে।আজ যে সফল হয়েছি এর পিছনে রুপার হাত যে অতি নগন্য না নয়।খুব কেয়ার করত। আমার মাঝে ও নিজেকে ঢুকিয়ে দিয়েছে।আমার ভাবনায় সে প্রবেশ করছে।আমি এক মূহুর্তের জন্যে ভুলে গিয়েছিলাম যে স্নেহা নামের কোন মেয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে।হয়ত তার অভিশাপে আমি রুপার হতে পারি নি বা রূপা আমার।রুপার বিয়ে হয় ঠিকই।তবে আমার সাথে নয়।অন্য কারো সাথে। ওর বিয়ের পরের দিন আমি ঠায় উপস্থিত হলাম ভার্সিটিতে।এমন ভাব করলাম যেন আমি কোন কষ্টই পাই নি।আরাফাত তো দেখে অবাক। শুধু ও নয়।আমাদের ব্যাচের সবাই অবাক।সবার মতে আমার এখন সোখ পালন করা দরকার।কিন্তু রূপা যে না করে গেল।আমি কিভাবে ওর কথা অমান্য করি? তবুও নিজেকে একা করে কিছু সময়ের জন্যে কাঁদতাম।
:মামা আইশ্যা পড়েছি।
:…
:মামা?
:হু
: কলেজ আইয়া গেছে।
:ওও।
তারপর তার ভাড়া মিটিয়ে হাটা ধরলাম অপেক্ষা রত সেই মানবির দিকে।সেই শহিদমিনারের দিকে। আমার বিশ্বাস সে আজো আমার অপেক্ষায় আছে।
কলেজের মূল ফটক দিয়ে ঢুকতেই রহিম স্যারের সাথে দেখে।এই সেই স্যার যিনি আমাকে আর স্নেহা কে ক্লাস থেকে বের করে দিয়েছেন।আমি কুশল বিনিময় করলাম।তিনিও। তবে গম্ভির মুখ নিয়ে।কয়েকটা কথা বললেন,
মানুষ সব সময় ভুল টাই বেশি করে।সঠিক টা তাদের সামনে থাকা স্বত্বেও তারা সেই ভুল টাই করে।ভুল করার পরে তারা বুঝে কোনটা ভুল আর কোনটা সঠিক। যাই হোক দেরি করে হলেও তুমি আসছ।এতেই আমি খুশি।যাও মেয়েটাকে আর কষ্ট দিও না।
আমি কিছু বললেন না।স্যার চলে গেল।আমি আবার হাঁটা দিলাম। যতই সামনের দিকে যাচ্ছি ততই বুকের ভিতর টা ক্ষুদ্র হয়ে আসছে।ওই তো শহিদ মিনার দেখা যাচ্ছে।
হ্যাঁ! আমি স্পষ্ট দেখত পাচ্ছি কেউ একজন বসে আছে।গায়ে নিল শাড়ি হাতে কয়েকটা চুড়ি।মাথার সামনের চুল গুলো কপালে পড়ে আছে।চোখে গাড়ির কাজল। ঠোটে হালকা গোলাপি লিপষ্টিক।ভাঁজ করা হাটুর উপর দুহাত।তার উপর থুতুনি দিয়ে এক দিকে তাকিয়ে আছে।বুকের বাম পাশটা নড়ে উঠল। চেহারার অনেক পরিবর্তন হয়েছে।এর জন্যে অবশ্যই আমিই দাই।আমি ওর সামনে গেলাম।আমাকে দেখা মাত্রই ও দাঁড়িয়ে গেল।আমি তাকিয়ে রইলাম তার অস্রু ভরা চোখের দিকে।আমি আবার এই চোখে ডুব দিতে চাই। আবার হারিয়ে যেতে চাই।মাথা নিচু করে পেললাম। সে তাকিয়েই আছে।হ্যাঁ সে কাঁদছে।কলার টা চেপে ধরে ভেজা কন্ঠে বলল,আমি জানতাম তুমি আসবে।তবে এত দেরি করলে যে?
আমি কিছু বলতে পারছি না।চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।ও আবার ভেজা কন্ঠে বলল,একবার জড়িয়ে ধরবে? নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না।জড়িয়ে ধরলাম ওকে। সেও আমাকে গ্রহন করে নিল।ভালোবাসার পরম মায়ায়।আমি বললাম,
:আমি যদি আজ না আসতাম?
: অপেক্ষা করতাম।
:তুমি কি পাগল নাকি!
:হুম সেই প্রথম থেকেই…
আমি কিছু বলতে পারি না।কিছু বলার সাহস পাই না।ও নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল
:আমি শুনতে চাই সেই মধুর বাক্য যার জন্যে এত প্রতিক্ষা।
আমি ভেজা কন্ঠে বললাম,
:তুমি জানো আমি তোমার জন্যে প্রথম। কিন্তু আমি…
:থাক বলা লাগবে না।আমি জানি।
:কি জান
:রুপার কথা
:কিভাবে?
:তোমাকে এত ভালোবাসি,অথচ তোমার খবর রাখব না? এ কেমন ভালোবাসা।
আমি আবার চুপ হয়ে গেলাম।
ও আবার বলল,
:এত কথা শুনতে চাই নি।সেই বাক্যটা শুনতে চাই।আমি অস্থির হয়ে আছি।
আমি বলললাম।খুব সুন্দর করে বললাম,
আমি তোমাকে ভালোবাসি।
আমি জানি না সে এর মাঝে কি মজা পেল। আমিও জানি না এই কথা বলার পর নিজের মাঝে এক অন্য রকম অনুভুতি হল।এই অনুভূতির কি না সেটা কেউই জানে না।
কেউ কখনও এর পূর্ন অর্থ প্রকাশ করতে পারবে না।সেই ক্ষমতা কাউকে দেওয়া হয় নি।
আমার মুখে মধুর বাক্য খানি শুনে সে
সে তৃপ্তির হাসি দিল।কান্না মিশ্রিত সে হাসি।অপূর্ব লাগছিল ওকে।আমি যেন সেই আগের স্নেহা কে দেখছি।ওর হাসির প্রেমে পড়লাম আবার।মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম।তাকিয়ে রইলাম সে ছোট ছোট চোখ গুলোর দিকে। চোখের ঘভিরতায় হারিয়ে গেলাম।নাহ! আজ কেউ বাধা দিতে পারবে না কেউ না।।আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি আর সেও।

আজ তারা একে অপরের দিকে চেয়ে থাকবে।ততক্ষন যতক্ষণ না তাদের মন ভরছে।না তাদের মন কখন ভরবে না।তবুও তারা তাকিয়ে থাকবে।থাকুক তারা তাকিয়ে।থাকুক না তারা একটু সুখে।হাজারো কষ্টের মাঝে একটু সুখ পেলেও সেটা বড় বৃহত্ত মনে হয়।একটি অপেক্ষারত ভালোবাসা,
আজ সেটা পূর্নতা পেল।এর শেষ পরিনয় হল। ভালোবাস থাকুক আজিবন। বেঁচে থাকুক ভালোবাসা। সন্মান জানাই সেই সকল মেয়েদের যারা এমন অপেক্ষা করেছেন।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত