ভাগ্যের লিখন

ভাগ্যের লিখন

বিয়ের দিন যার বিয়ে ভেঙ্গে যায় তার চেয়ে কপাল পোঁড়া আর কে আছে? আমিও তেমন একজন হতভাগী। গত পরশু যখন আমার গায়ে হলুদ মাখিয়ে হাত দুটো মেহেদী দিয়ে রাঙ্গিয়ে দিচ্ছিল তখন কি আর জানতাম এমনি করে আমার আমার জীবনে অারেকটা কলঙ্কের দাগ লাগবে?

আমার জীবনটাইতো দুঃখের সাগড়ে নিমজ্জিত, যেখানে আরো দুঃখ এলেও ভয় করি না। তবে আমি তো মেয়ে, একটি মেয়ে বিয়ে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখে। ঘর বাঁধার স্বপ্ন, সুখের সংসারের স্বপ্ন, স্বামী সন্তানের স্বপ্ন, লাল শাড়ী পরে শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন যখন এক নিমিষেই ভেঙ্গে যায় তখন শুধু স্বপ্নগুলো ভাঙ্গে না, ব্যাঘাত ঘটে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন ধারনের। লোক মুখে কটু কথা শোনা, কারো আড়চোখে তাকানোর মধ্যেও তখন মনে হয় বিষ ঢেলে রাখে।

সপ্তাহখানেক আগে যখন হুট করে বিয়েটা ঠিক হয়েছিল তখন ছেলে পক্ষের কথা শুনে আমার আপুর মন ভরে উঠল। আমিও স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম, আমিও আট দশটা মেয়ের মত লাল শাড়ী পরব, বধূ সাজব। যদিও মন থেকে সায় দিচ্ছিল না, কিন্তু আপুর কথা ভেবেই রাজী হলাম। আমার আপুই যে আমার সবকিছু। আমাকে একা রেখে আপুও বিয়ে করতে রাজী না। তাইতো আপু আমার বিয়েটাই আগে দিতে চেয়েছিলেন।

সবকিছু ঠিক ঠাক, ঘর ভর্তি মেহমান। বিয়েটাও ঘরোয়া পরিবেশেই হবে। ঢাক ঢোল পিটিয়ে ধুমধাম করে বিয়ে দেয়ার মত টাকা নেই আমার আপুটার। তাই এলাকার সবাইকে দাওয়াত করাও সম্ভব হয়নি। বর যাত্রী এল, খাবার খেল আবার চলেও গেল। শুধু বিয়েটা হয়নি, শুধু আমার বধূ সাজা হয়নি। বিয়ের আগে ছেলে পক্ষ কিছুই চায়নি। অথচ আজ বলছে বিয়ের দুই মাসের মধ্যে এক লক্ষ টাকা জোগাড় করে ওদের দিতে হবে। যেখানে রাতে খেতে বসে একটি ডিমকে অর্ধেক ভাগ করে সকালের জন্য রাখতে হয় সেখানে দশ হাজার টাকা জোগাড় করাও আমার আপুর পক্ষে সম্ভব না। তাই আর বিয়েটাও হয়নি, আমারও শ্বশুর বাড়ি যাওয়া হয়নি।

আজ মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। মা থাকলে জড়িয়ে ধরে অনেক কান্না করতাম। পুকুরপাড়ে চলে এসেছি, এখানে কান্না করলে কেউ দেখে না। আর মা নিজেও এই পুকুরপাড়ে বসেই কান্না করত। বাবা যখন নেশা করে অনেক রাতে ফিরত মা তখন কিছু বলতে গিয়েও পারত না। কারণ বাবা কিছু না হতেই মায়ের গায়ে হাত তোলে। তখন মা নির্জন এই পুকুরপাড়ে এসে একা একা কাঁদত। আমি খুঁজতে খুঁজতে যখন এখানে আসতাম, মা তখন আঁচলে চোখের পানি মুছে আমাকে জড়িয়ে নিতেন বুকে। আজ আমার মা অনেক দূরে, ঐ আকাশের নীলে মিশে আছে। মা মারা যাওয়ার সময় আমি স্কুলে ছিলাম, বাড়িতে এসে বাড়ি ভর্তি মানুষের ভিতর দিয়ে গিয়ে দেখেছিলাম আমার মায়ের নিথর দেহ সাদা চাদরে ঢেকে রেখেছে। কতটা কেঁদেছিলাম জানিনা, তখন আপু অামাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে অনেক কেঁদেছিল।

পুকুরপাড় থেকে উঠতে হবে, আমি জানি আমার আপুটাও এখন কাঁদবে। যাদের ভাগ্যে কান্না লিখা থাকে তারা হাসবে কি করে? আপুটা একটা স্কুলে পড়ায়, ওটার বেতন দিয়েই চলে আমাদের দুই বোনের সংসার। বছর দুয়েক আগে বাবা তার সংসার থেকে আমাদের দুই বোনকে আলাদা করে দিয়েছে। বাবার সংসার বলতে, আমাদের মা যখন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন তার দুই মাস পরেই বাবা বিয়ে করে নতুন সংসার পাতলেন। যে বলবে সৎ মা মায়ের মতই, তার সাথে আমার জনমের আড়ি। হাজার বা লাখে যদিও কিছু সৎ মা ভালো হয় তবে “মায়ের মত, আর মা” আকাশ পাতাল তফাৎ। আমার সৎ মা তেমনি একজন গুনধর মহিলা। কার একটি লেখা যেন পড়েছিলাম,” ছোট ছেলেটির বাবা তাকে প্রশ্ন করেছিল, তোমাকে যে নতুন মা এনে দিলাম সে কেমন আর তোমার আপন মা কেমন ছিল? ছেলেটি উত্তরে বলেছিল, আমার আপন মা মিথ্যেবাদী ছিল।

আমার আপন মা রাগ করে বলত আমাকে খেতে দিবে না, আবার আমাকে মুখে তুলে না খাইয়ে দেয়া পর্যন্ত নিজে খেত না। আর নতুন মা সত্যবাদী, তাইতো দুদিন ধরে আমাকে খেতে দেয়নি। ঘরে এসে দেখি আপু আমাকে দেখে ওড়নায় চোখ মুছে। আমাকে দেখে মুখে হাসি আনার বৃথা চেষ্টা করে বলছে, “তুই মন খারাপ করিস না, তোকে আমি আরো ভাল ছেলের সাথে বিয়ে দেব। আমি আপুকে জড়িয়ে ধরে বলছি, “আপু লাগবে না, মেয়েদের বিয়ে না হলে কী হয়? আপু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে, নারে বোন মেয়েদের ঠিকানাই যে শ্বশুরবাড়ি।

গভীর রাতে বালিশে মাথা রেখে শোয়ে আছি। তুষারকে খুব মনে পড়ছে এখন। মানুষের দুঃখের দিনে তার খুব কাছের মানুষগুলোও তাকে ছেড়ে যায়। দুঃখটাকে সবার ভয়, কেউ চায় না দুঃখের ছোঁয়া লাগুক। তাই তুষারও চায়নি আমার সাথে সম্পর্ক রাখতে।  রাখতে চায়নি বললে ভুল হবে, মুখে বলেনি যে সম্পর্ক রাখবে না, কিন্তু দিন দিন অবহেলার পরিমান বাড়ছিল। কথায় কথায় বলত তোমাকে বিয়ে করে আমি কী পাব? শ্বশুর বাড়িই তো নেই।

আমি নিজেই সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। কারণ সেও আমার বাবার মত নেশায় জড়িয়ে পড়েছে, শত বলার পড়েও নেশা ছাড়তে পারেনি।  আমি যেন তার মধ্যে আমার বাবার স্বভাবগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। তাই নিজেই আর যোগাযোগ করিনি তুষারের সাথে। একটা সম্পর্কের শুরুর দিকের পরিস্থিতীর মত যদি সবসময় থাকত তাহলে কোনো সম্পর্কই মনে হয় নষ্ট হত না। কষ্ট পেতে হত না আমার মত জনমদুঃখীর।  তাই তো ভালোবাসার মানুষটি আজ এক মেরুতে আর আমি আরেক মেরুতে।

আপুটা সকালে না খেয়ে স্কুলে চলে গেছে, একটু ডিম তরকারি ছিল সেটা আমার জন্য রেখে গেছে। এই আপুটাও আমার মায়ের মত, যত দুঃখই আসুক, নীরবে সহ্য করে যায়। আপুর সমবয়সী মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে সবার, ছেলে মেয়েও আছে দুইটা তিনটা করে। আর আপু শুধু আমাকে নিয়েই এতটা সময় জীবনের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে।

পুকুরপাড়ে বসে কাঁতছি, মানুষের কটুকথা আর সহ্য করতে ইচ্ছে হয় না। প্রতি এলাকায়ই মনে হয় মানুষকে কষ্ট দেয়ার জন্য, খোঁচা মেরে কথা বলার জন্য এই পাজি মানুষগুলো থাকে। “মাগো, তুমিতো মরে গিয়ে বেঁচে গেছো, আমাকেও কেন তোমার সঙ্গে নিলে না? মাগো এই পৃথিবীর মানুষগুলো ভালো না, শুধু কষ্টই দিতে জানে।”

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত