দুঃখের ভেলা

দুঃখের ভেলা

স্কুলে ঢুকেই এদিক সেদিক তাকাচ্ছি। অনেকে বলেছে আমার মা নাকি চুপি চুপি আমাকে স্কুলে দেখে যায়। কিন্তু কেউ বলে না আমার মা কোনটা? আর আমি তো দেখিইনি কোনোদিন, চিনব কিভাবে? তাই খুঁজছি। যদি কেউ আমাকে চুপি চুপি খুঁজতে আসে তাহলে আমি ঠিকই চিনে নেব আমার মা’কে।  আর মা’কে চিনতে পারলেই বাবাকেও খুঁজে পাব। কি হতভাগিনী মেয়ে আমি? যে তার বাবা মা থাকা স্বত্বেও তাদের চিনে না।

স্কুলে প্রথমদিন এসেছিলাম নানার হাত ধরে। স্কুলে ঢুকেই দেখেছি সব ছাত্র ছাত্রীরা তার বাবা বা তার মায়ের হাত ধরে স্কুলে এসেছে। আমিই কেবল আমার নানার হাত ধরে এসেছি। যখন স্কুলের অফিস রুমে আমাকে ভর্তি করানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হলো তখন স্যার আমার বাবার নাম জিজ্ঞেস করেছিল। আমিতো জানিনা, নানা কখনো বলেনি। শুধু বলত তোর বাবা মা আছে, তুই বড় হলে তারা আসবে। স্যারের মুখে প্রশ্ন শুনে আমি নানার মুখের দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে আছি। নানা আমার বাবার নাম বলে দিল। ছোট্ট অামি স্কুল জীবন শুরু করেছি।

মা ঠিকই আমাকে চুপি চুপি দেখে চলে যেত। মা হয়তো প্রতিদিন আসত না। তা নাহলে এতদিন ধরে খুঁজছি, একবার হলেও মায়ের দেখা পেতাম। ক্লাসের ফাঁকে স্কুলে মাঠের কোণের গাছটির নিচে বসে থাকতাম। দেখতাম সাথের ছেলে মেয়েদের বাবা মা এটা ওটা মুখে তুলে তাদের খাওয়ায়। আমারো ইচ্ছে হতো এমন করে কেউ আমাকে খাওয়াক। কিন্তু আমার অাশা কেবলই আশা হয়ে থাকত।গ্রামের প্রাইমারী স্কুল। ছেলে মেয়েগুলোও একই এলাকার। তারা কেউ আমার সাথে মিশতে চাইত না। অজানা কারণ বুকে চেপে একা একা মাঠের কোণে বসে থাকতাম।  তবে লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিলাম। স্কুলের স্যার মেডামরা একটি পড়া একবার দেখিয়ে দিলেই পারতাম।

গালে হাত দিয়ে বসেছিলাম স্কুলের মাঠে। হঠাৎ একজন এসে আমাকে বুকে জড়িয়ে নিল। কপালে আর গালে অনেকগুলো চুমো দিচ্ছে। চোখে পানি নিয়ে বলছে, ” নওশীন, মা আমার। তুই কেমন আছিস মা? আমাকে চিনতে পারিসনি? আমি তোর মা।”  মায়ের গলা জড়িয়ে কান্না শুরু করে দিলাম। এই প্রথম আমি আমার মায়ের চাঁদমুখ দেখলাম। দুজনের কারো কান্নাই থামছে না। আমার চোখের পানি মুছতে মুছতে মা বলল, “কাঁদিস না মা, আমি দুদিন পরপর তোকে দেখে যাব। ” আরো বেশি করে কান্না আসছে। অভিমানী সুরে কথাগুলো না বলে থাকতে পারলাম না, ” দেখো মা দেখো ওদের সবার মা আছে। ওদের বাবাও আছে। ওদেরকে হাত ধরে স্কুলে নিয়ে আসে। ওদের বাবা মা ওদের মুখে তুলে খাওয়ায়। আমাকে কেউ ওদের মত আদর করে না। আমাকে কেউ ঘুম পাড়িয়ে দেয়না মা। আমি কাউকে মা বলে ডাকতে পারিনা

। কারো কাছে বলতে পারিনা এটা ওটা কিনে দেয়ার জন্য। আমাকে কেউ কোলে নেয়না মা। তুমি কোথায় ছিলে এতদিন? আবার কেনইবা এখন চলে যাবা? আমাকেও তোমার কাছে নিয়ে যাও মা। ”
আমার চোখের পানি মা মুছে দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু নিজে কাঁদছে অনবরত। বলছে,  “মা আমার, তুই কাঁদিস না। আমি যেখানে থাকি সেখানে তোকে নেয়া যাবে না। সেখানে রাক্ষস থাকে। আমি একদিন ঠিকই তোর কাছে চলে আসব।” আমি মায়ের চলে যাওয়া দেখছি। পিছু পিছু কিছু দূর গিয়েছিলাম। কিন্তু কোথায় যেন হারিয়ে গেল। নানা আর নানীকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলছি, “অ নানা, আজ আমার মা এসে আমাকে কোলে নিয়েছে। এই দেখো, আমাকে পাঁচ টাকা দিয়েছে মজা খাওয়ার জন্য। ”  নানা আর নানী অবাক হয়ে একে অন্যের দিকে তাকালো। ওদের চেহারায় কিছুটা ভয়ের ছাপ। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।  নানী আমার মাথার চুলে বিলি কাটছে আর বলছে, “এতদিন তোকে কোলে নিতে আসেনি, আজ তুই তোর মায়ের কোলে গেলি কেন?”  অসহায়ভাবে করুন দৃষ্টিতে পুকুরের দিকে তাকিয়ে আছি। কিছুই বলিনি আমি। এবার আমিই নানীকে প্রশ্ন করলাম, “আচ্ছা নানী, অামার মা বাবা অামার কাছে আসে না কেন?”

— তুই বড় হলে সব জানতে পারবি। এখন কিছুই বুঝবি না।
— নানী আমি ফোরে পড়ি, আমি সব বুঝব। তুমি বলো নানী, মা কেন আজো আমাকে রেখে চলে গেল?
— শুন তাহলে তোর মা কেন তোকে ছেড়ে আছে।

নানী বলছে আর আমি গালে হাত দিয়ে শুনছি। তোর বাবা তোর মাকে নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছিল। কিন্তু তোর দাদা তোর বাবা মাকে মেনে নেয়নি। তবুও বিয়ের কিছুদিন পর তোর বাবা তোর মাকে নিয়ে তোর দাদার বাড়িতে যায়। তোর দাদা বাড়িতে থাকতে দিলেও মনে মনে চাইত কখন তোর মা ঐ বাড়ি ছেড়ে চলে আসে। অনেক কথা শোনাইত। তোর বাবা কাজ করত ঢাকায়। আর তোর দাদা ফোন করে তোর মায়ের নামে মিথ্যে বলত।

এমনও বলত তোর মায়ের সাথে অন্য কোন লোকের সম্পর্ক আছে। বলতো তোর মায়ের সাথে রাতের বেলা অন্য লোক দেখা করতে আসে। তোর মা যখন আমাদের কাছে আসত, তখন সব বলত আমাদের কাছে।
যখন তুই তোর মায়ের পেটে এলি, তখন তোর দাদাই ফোন করেছিল তোর বাবার কাছে। তোর বাবার কাছে বলেছে তুই তোর বাবার মেয়ে না, অন্য লোকের মেয়ে। যে লোক তোর মায়ের সাথে দেখা করতে আসত, তার মেয়ে।
তোর বাবা তোর মায়ের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। তোর মা চলে এল আমাদের বাড়ি। যখন তুই আসলি দুনিয়ায়, তোর বাবাকে ফোন দিয়ে বলা হয়েছিল। কিন্তু তোর বাবা তোকে একবারের জন্যও দেখতে আসেনি। তোর বাবা তোকে নিজের মেয়ে বলে স্বীকার করেনি।  এক সময় তোর বাবা তোর মাকে বলেছে তোকে ছাড়া যদি যেতে পারে তাহলে যেন তোর বাবার কাছে যায়। আর নয়তো তোর মাকে নিবেনা।  তোর বয়স যখন এক মাস ঊনিশ দিন তখন তোর মা তোকে আমার কাছে দিয়ে তোর বাবার কাছে চলে গিয়েছে চিরদিনের জন্য। আর আসেনি। সেই থেকে তোকে আমরাই বড় করছি।  নানীর কাছ থেকে কথাগুলো শুনে নির্বাক হয়ে ছিলাম। তবুও প্রশ্ন করলাম।

— আচ্ছা নানী, মা আমাকে এত ছোট থাকতে রেখে চলে গেল কেন?

নানী আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আছে, আর কিছু বলেনি। নানার একমাত্র ছেলে আমার মামা বিয়ে করেছে। মামী হয়ে এসেছেন নতুন একজন। প্রথম প্রথম আমাকে অাদর করলেও পরবর্তীতে পরিবারের একজন অতিরিক্ত সদস্য মনে করত। যদিও ঘর মুছে দেয়া, থালা বাসন মাজা, কাপড় কাঁচা আর বাড়ির উঠান ঝাড়ু দিয়ে তারপর স্কুলে যেতাম। তবুও মামীর মন জয় করতে পারিনি। আমাকে নিয়ে মামা আর মামী প্রায়ই ঝগড়া করত। অামার জন্ম নিয়ে কথা উঠত।  নানী আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদত। আমিও কাঁদতাম।

খুব বেশি কেঁদেছিলাম নানা যেদিন প্রথম আমাকে মেরেছিল। প্রতি ক্লাসেই আমার রোল নং দুই তিন থাকত। কিন্তু ফাইভে পরীক্ষায় অংকে খারাপ হওয়াতে রোল নং হল তেইশ। সেদিন নানা রাগ করে আমাকে মেরেছিল। তখন খুব কেঁদেছিলাম। বলেছিলাম, আজ যদি অামার বাবা মা থাকত তাহলে এভাবে মারত না। নানা অামাকে পরম মমতায় বুকে টেনে নিলেন। স্কুল থেকে ফিরে মাকে দেখে আমি খুশিতে আত্মহারা। মা ছোট বোনকে নিয়ে এসেছে। দ্বিতীয় বারের মতো আমি আমার মায়ের বুকে ছুটে গেলাম। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কান্না করছি।

— মা, ও মা। তুমি আমাকে ছেড়ে আর কখনো যাবেনাতো?
— নারে মা, যাব না। আমার লক্ষী মেয়েটা।

মা আমার গালে কপালে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিয়ে আবার বুকে টেনে নিল। দুজনের চোখ দিয়েই অঝর ধারায় পানি পড়ছে। মা ছোট বোনটাকে ডেকে কাছে এনে বলল, নওশীন এটা তোর ছোট বোন।  কাছে টেনে নিলাম বোনটিকে। আমি যথেষ্ট সুন্দর। বোনটি একটু কম হলেও সুন্দরই। আমার চেহারার সাথে সামান্য মিল আছে। নানা নানী আমাদের নিয়ে ঘরে গেল।  মামীকে ডেকে এনে পরিচয় করিয়ে দিল, এটা তোর ছোট ভাইয়ের বউ।  মামী একটিবারের জন্য আমার মা’কে সালামও করেনি। কেমন এক রহস্যময়ী হাসি দিয়ে চলে গেল।

মানুষের অনেক রকম কষ্টে আর যন্ত্রনার মধ্যে, অনেক রকম আঘাত করার মধ্যে বড় আঘাত হলো কথা বলে আঘাত করা।  যেহেতু আমার মা তার বাবার সংসারে ফিরে এসেছে। তার সাথে আমি আর আমার ছোট বোনও আছি। আমাদেরতো আর রোজগার করার মত কেউ নেই। তাই সংসারের যাবতীয় কাজগুলো আমি আর মা করতাম। সেই সকাল থেকে গভীর রাত অবধি। মামী কোন কাজ করত না। টেলিভিশন দেখে আর এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে সময় পার করতেন। আর যেটুকু সময় বাড়িতে থাকতেন, কাজের দোষ ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করতেন। আর খুঁজে পেলেই শুরু হত কটুকতা।
মায়ের চরিত্র নিয়ে কথা বলত। আমার জন্ম পরিচয় নিয়ে কথা বলত। আর আমার জানামতে একমাত্র ঝগড়া করার সময় মানুষের মুখ থেকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট অশ্লীল কথাগুলো বের হয়।  মা আমাদের দুই বোনকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতেন। আমারও সাধ্য ছিল না চোখের জলকে আটকানো। মেয়ে হয়ে নিজ বাবা সম্পর্কে কেউ খারাপ মন্তব্য করতে চায় না। তবে আমার বাবার প্রতি অনেকবার খুব করে রাগ হতো।

মা শেষ পর্যন্ত আট মাস পর ছোট বোনটিকে নিয়ে বাবার কাছে ফিরে গেছে। কারন বাবার অন্য এক মহিলার সাথে সম্পর্ক ছিল। যদি মা ফিরে না যেত তাহলে বাবা সেই মহিলাকে বিয়ে করে বাড়ি তুলতেন।  মা যখন আবারো আমাকে ছেড়ে বাবার কাছে চলে যায় তখন আমি কাঁদতে কাঁদতে বেহুশ হয়ে পড়ি। নানী আমাকে চোখে মুখে পানি নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে পাখা ছেড়ে দিলেন।  আবার শুরু হল আমার মা হারানোর কষ্ট। এবার কষ্টটা বেশি লাগল, কারন পেয়ে হারানোর কষ্টটা একটু বেশিই হয়। তখন আমার সপ্তম শ্রেণীর পরীক্ষা দেয়া শেষ। নানা প্রচন্ড অসুস্থ। আমি স্কুলে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হলাম। দূর থেকে দেখা যায় মা ছোট বোনটিকে নিয়ে অাবার এদিকে আসছে। তবে সাথে এবার অারেকটি লোক আছে। দৌড়ে এলাম নানীর কাছে। প্রশ্ন করলাম নানীকে, “নানী বাইরে বের হয়ে দেখো মা আসছে। সাথের লোকটি কি আমার বাবা?”

নানী বলল হ্যাঁ, তোর নানা তো অনেক অসুস্থ্য। তাই খবর পাঠানো হয়েছে।মুখে একটা আনন্দের রেখা উদয় হল। তবে সেটা কেউ দেখেনি। বাবা মা আর ছোট বোনটি নানাকে দেখতে এসেছে। অামাকে দেখতে আসেনি কেউ। মা একটি বারের জন্য কথা বলেনি।  বুঝতে পেরেছিলাম, বাবা যেহেতু আমাকে স্বীকারই করেনা সেহেতু মা যদি অমার সাথে কথা বলে তাহলে বাড়িতে গেলে মায়ের কপালে দুঃখই আছে। দেখেছিলাম সেদিন দূর থেকে বাবা নামক মানুষটিকে। এই প্রথম জন্মদাতা পিতাকে দেখলাম। অন্যান্য ছেলে মেয়ের বাবাদের মতো আমার বাবারও হাত, পা, চোখ, নাক, কান সবই আছে। শুধু আমার জন্য আমার বাবার মনে বিন্দুু মাত্র ভালোবাসা নেই। যেখানে অামার বাবা অামার জন্ম নিয়ে সন্দেহ পোষন করে সেখানে অার ভালোবাসা জন্মাবে কোথা থেকে? বাবা মা অসুস্থ্য নানাকে দেখতে এসে বেশিক্ষন দেরি করেনি। যখন চলে যাচ্ছিল অামি রাস্তায় গিয়ে অনেক্ষন ওদের চলে যাওয়া দেখেছি।

আমার জে এস সি পরীক্ষা শুরু। নানাকে হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দিয়েছে। বাড়ি নিয়ে এসেছে নানাকে। আর মনে হয় শেষ রক্ষা হবে না। অসুস্থ্য নানাকে আত্মীয় স্বজনরা দেখে যাচ্ছে।  এবারও এসেছে বাবা মা।  নানা অাবার বাবার হাত ধরে বলেছেন যেন আমার দ্বায়িত্ব গ্রহন করেন। কিন্তু বাবা কিছুতেই রাজী না।  অজুহাত হিসেবে দেখিয়েছেন, বাবার সংসার নিয়েই টানাটানি চলছে। নানা প্রস্তাব করেছেন, আমার দায়ভার গ্রহন করলে নানা আমার বাবাকে চার লাখ টাকা দিবে।  এবার আমার বাবা সহজেই রাজী হয়ে গেলেন। সেদিনই বাবা মা আমাকে নিয়ে গেলেন সাথে করে। যাওয়ার সময় নানা নানীকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছিল না। জন্মের পর থেকে নানা নানীই আমার সব।  আর হঠাৎ তাদের ছেড়ে অজানা স্থানে চলে যেতে হবে ভেবে কান্না করতে করতে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম।

নতুন জায়গা, নতুন মানুষজন। মা আর ছোট বোনটা ছাড়া তেমন কেউ আমার সাথে কথা বলত না। মনে মনে ভাবতাম, বাবা মা ফিরে পাওয়ার চেয়ে নানা নানীর কাছেই ভাল ছিলাম। বাবা মা ফিরে পেলেও ভালোবাসা নামক জিনিসটা ফিরে পাইনি।  নানা এতগুলো টাকা দিল আমার দায়ভার গ্রহন করার জন্য। অথচ সপ্তাহ দুয়েক পর থেকেই বাবা আমার জন্য পাত্র দেখা শুরু করল। অথচ আমার বয়স তখন চৌদ্দও হয়নি।  ২০১৪ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারী আমার বিয়ে ঠিক করা হলো। হঠাৎ করেই আমাকে একদিন শাড়ি গহনা পরিয়ে কিছু লোকের সামনে হাজির করা হল। যেহেতু সুন্দর ছিলাম, দেখা মাত্রই তাদের পছন্দ হয়েছে। তারা বিয়ের দিন তারিখও ঠিক করে ফেলল। তখনও আমার চৌদ্দ বছর হতে বারো দিন বাকি। ঊনিশ ফেব্রুয়ারী আমার জন্মদিন। আর সাতই ফেব্রুয়ারী আমার বিয়ে ঠিক করা হলো।

কতটা কেঁদেছি তা শুধু আমি জানি। মামা মামীর পাযে ধরে কেঁদেছি। বাবা,মা, নানা, নানী এমনকি খালাত ভাইয়ের পা ধরেও কেঁদেছি। আমার প্রতি কারো একটু দয়া হয়নি। নানীকে বলছি, আমার বয়স এখনো চৌদ্দ হয়নি আমাকে কেন বিয়ে দিচ্ছ? নানা বিয়েটা আটকাতে চেয়েছিল। কিন্তু নানা তো মৃত্যু পথযাত্রী। কিভাবে আমার বিয়ে আটকাবে?
সবাই বুঝায়, এত ভালো ছেলে আর পাওয়া যাবে না। ছেলে বিদেশ থাকে, তিন বোনেরও বিয়ে দিয়ে ফেলেছে। অনেক জমি জমা। অনেক টাকা পয়সার মালিক। আমি অনেক সুখী হবো।  এদিকে কিছুতেই আমার কান্না থামছে না। আমাদের এদিকের নিয়ম হল বিয়ের দিন রাতে স্ত্রী তার স্বামীর সাথে দেখাও করতে পারবে না। কনের পক্ষ থেকে যারা আসবে তাদের সাথেই থাকবে।

আমার বিয়ের পর শশুর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। অালাদা দুটি ঘরে আমাদের থাকতে দিল। আমার খালাত ফুফাত ভাই বোন দুই রুমে। তবে আমার কান্না থামছে না। পাশের রুম থেকে খালাত ভাইকে ডেকে এনে পায়ে জড়িয়ে ধরে বললাম ভাই আমাকে এখান কে নিয়ে চলো। আমি আরো পড়ালেখা করতে চাই। অামার কান্না দেখে ভাই রাজী হইছে। আমার আরেকটি বোনসহ খালাত ভাইয়ের মোটর সাইকেল দিয়ে এক আন্টির বাসায় গিয়ে উঠি।
আন্টি খুশি না হলেও রাগ করেনি। এই বিয়েতে আন্টিও রাজী ছিল না। বিয়ের দিন শশুড় বাড়ি থেকে একটি মেয়ে পালিয়ে আসা মানে কলঙ্কের চূড়ান্ত। সেদিন খালাত ভাইটার সাথে আমার আরেকটি ফুফাত বোন থাকায় ঘটনা বেশি দূর গড়ায়নি।  পাঁচদিন পর আমার স্বামী মুরব্বীদের নিয়েই আমাকে আবার ফিরিয়ে নিতে এল। আবারো পাঠানো হল শশুড় বাড়িতে।

রাত্রি বারোটা, আমি বাইরে বসে আছি। স্বামী নামক লোকটি কয়েকবার ডেকেছে ঘরে যেতে। আমি যাচ্ছি না, শুধু কান্না করছি। লোকটি অসহ্য হয়ে আমাকে চড় মারল। আমি আরো কান্না করছি।  চৌদ্দ বছরের ছোট একটি মেয়ে আমি। ত্রিশ বছরের লোকটিকে দেখেই ভয়ে শিউরে উঠি। সেখানে চড় মারার পর কান্নাই থামছে না। পাশের ঘর থেকে শাশুড়ীর গলা শোনা গেল। “পালিয়ে গিয়েছিল মেয়েটি, মান সম্মান আরো নষ্ট করতে চায়। না মেরে সোজা করা যাবে না” আমাকে টেনে ঘরে নিয়ে বিছানায় ফেলে দিল। কিছু একটা করতে যাবে অমনি তার মোবাইলে একটি ফোন আসল। আমার নানীর ফোন। নানা আমাকে শেষবারের মত একটিবার দেখতে চায়।  কিন্তু লোকটি আমাকে নিয়ে যাবেরনা। সে তার ইচ্ছে পূরণ করার জন্য আমার সাথে জোরাজোরি করছে। আমি ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে পড়ি। মনে হয় কিছুটা ভয় পেয়ে সরে গিয়েছিল।  সকালে আরেকটি ফোন আসল। আমার নানা চিরদিনের জন্য মায়ার পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে।

বাড়ি ভর্তি এলাকার মানুষ। এই বাড়ি থেকে একজন মানুষ চিরদিনের জন্য চলে গেছে। কিন্তু যে চলে গেছে সে নানাটা আমার জীবনের একটা অংশ। যখন বাবা কে মা কে চিনতাম না। এমন কি বাবা মা খবর নেয়নি আমি বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি। তখন এই মানুষটাই আমাকে তিলে তিলে বড় করেছে।  কতটা কেঁদেছি জানিনা। লাশ গোসল করানোর পর জানাজার জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় আমি দিচ্ছি না নিয়ে যেতে। যখনি নিতে চাচ্ছে আমি অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছি।

তাই আমি জানাজার মাঠেও গিয়েছিলাম। অামার কান্নারত অজ্ঞান হওয়ার অবস্থা দেখে কেউ মানা করেনি।
নানার লাশ মাটি দেয়ার পর নানার ঘরে বসে কাঁদছি। উপস্থিত মানুষের সামনে আমার স্বামীকে বলেছি, “আমার নানা আমাকে শেষবারের মত দেখতে চেয়েছিল। এই লোকটা আমার নানার সাথে শেষ দেখাটা করতে দেয়নি।
ঐ লোকটা বাড়ি চলে গেছে, আমি যাইনি। আমি গিয়েছি বাবা মায়ের কাছে। নানা চার লাখ টাকা দিয়েছে। আমার হক আছে ঐ বাড়িতে। বাবা মায়ের কাছে ফিরে গেলেও আমার থেমে থেমে কান্না করা শেষ হয়নি।  এর দুদিন পর খবর পেলাম, আমার স্বামীর ছুটি শেষ। সে আবার দেশের বাইরে চলে গেল।

স্বামী বিদেশ চলে যাবার পর আমাকে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হল। খাওয়া দাওয়া ঠিকমত করতাম না। কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছিলাম। লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছি সাত মাস হলো।  একদিন আমার মোবাইলে চার পাঁচটি মেসেজ আসে। সুন্দর ছন্দ দিয়ে পাঠানো মেসেজগুলো। আমি কোনো মেসেজ দেইনি।  প্রতিদিন দুইটা তিনটা করে মেসেজ আসত। কৌতূহল বশত ফোন দিলাম।  মৌবাইলের ঐ পাড়ের ছেলেটি পরিচয় দিল তার তার পলাশ। আমার সাথে সে বন্ধুত্ব করতে চায়। আমি মানা করে দিয়েছি।  তবুও প্রতিদিন একের পর এক মেসেজ আসতই। আর বন্ধুত্ব না করে থাকতে পারলাম না।  আমার মন খারাপের সময়গুলোতে সে আমাকে হাসানোর চেষ্টা করত। আমাকে বুঝাইত, এখানেই জীবন শেষ নয়। অারো অনেক জীবন পড়ে আছে।

পলাশের উৎসাহে আমি নতুন করে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হলাম। পড়ার জন্য অনেক তাগিদ দিত।  আমার রেজাল্ড দেখে সবাই অবাক। এত কিছুর পরও দশম শ্রেণীতে আমার রোল নং পাঁচ। সবাই অবাক হবে কি? আমি নিজেই অবাক হয়েছি।  নানার মৃত্যু বার্ষিকীতে পলাশকে নিয়েই এতিম খানায় নানার জন্য দোয়ার ব্যাবস্থা করি। ঊনিশ ফেব্রুয়ারী পলাশ আমার জন্য ছোট একটি উপহারের প্যাকেট নিয়ে আসে। সাথে একটি গোলাপ আর দুইটি রজনীগন্ধা ফুল। ফুলগুলো হাতে দিয়ে পলাশ আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়।  কিছু সময়ের জন্য অবাক হয়ে গেছি। পলাশকে এত ভালো বন্ধু জানি, সে কি করে আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়? সেতো জানে অামি বিবাহিত।

আমি মানা করে দিয়েছি পলাশকে। বাড়ি চলে আসলাম। প্রেম ভালোবাসা আমার জন্য নয়। আমার জন্য কেবল ভাগ্যের সাথে যুদ্ধ করা। পলাশের সাথে আমার আর যোগাযোগ হয়নি। হয়তো তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়াতে কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু আমার কিছুই করার নেই। শেষে একটি কথা স্বীকার করেছে। আমার ছোট বোন আমার ফোন নাম্বার পলাশকে দিয়েছিল। আমি মনমরা হয়ে থাকি দেখে বোনটা এই কাজ করেছে।  প্রেমের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ার কারনে একমাত্র বন্ধুটিকেও হারিয়ে ফেললাম।  এ যেনন নদী ভাঙ্গা বাড়ি ঘরের মত। সবকিছু তলিয়ে নেয় নদীর অতল গহবরে।

দশম শ্রেণীতে থাকাকালীনই আমার স্বামীর সাথে ডিভোর্স হয়ে যায়। বিদেশ চলে যাবার পর থেকে আমার সাথে আমার স্বামীর আর কোন যোগাযোগ হয়নি।  তাই সবকিছু ভেবেই স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে মন দিয়ে লেখাপড়া করতে লাগলাম।  আমি যখন প্রাইভেট পড়তে যেতাম তখন একটি ছেলে ঔষধের ফার্মেসী থেকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। মাঝে মাঝে আমার পিছন পিছন অনেক দূর পর্যন্ত যেত। তবে আমি বোরখা পড়ে যেতাম, এমনকি হাত মোজাও লাগাইতাম।  প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার জন্য আমার এই একটিই পথ। আর যে মেডামের কাছে পড়তে যেতাম উনি আমাকে ফ্রি পড়াতেন। হিন্দু হয়েও আমাকে নিজের মেয়ের মত আদর করতেন। আমি পড়াগুলো সহজে পাড়তাম বলে মেডাম খুব খুশি হতেন।

অবসর সময় কাটানোর জন্য ফেইসবুক ব্যবহার শুরু করলাম। প্রথম প্রথম কিছুই বুঝতাম না। যারা যারা রিকুয়েস্ট পাঠাত সবই এক্সেপ্ট করতাম। নিজে কোনো পোস্ট লিখতাম না, মানুষের পোস্টগুলো পড়তাম। অনেকেই মেসেজ দিত, যখন ইচ্ছে হত রিপ্লে দিতাম নয়তো দিতামনা।  তবে একটি ছেলে প্রায় একটু পর পরই মেসেজ দিত। আমার সম্পর্কে জানতে চাইত। ভাল মন্দ খোঁজ খবর নিত। আমারও ভাল লাগত। অবসর সময় আর একাকীত্ব দূর হতো।  ছেলেটির নাম নাঈম।চড় এক মাস সময়ের মধ্যেই আমরা ভালো বন্ধু হলাম। দিনের বেলা সময় পেতাম না, পড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। রাতের বেলা মেসেজ দিত। কখনো কখনো সময় সুযোগ হলে ফোন দিয়েও কথা বলত।  একদিন সে আমাকে দেখতে চায়। আমি কিছুতেই দেখা করতে রাজী হইনি। শেষে আমার ছবি দিতে বলে সেটাও দেইনি। বুঝতে পারতাম প্রতিদিনই মন খারাপ করে কথা বলে।

শেষে আমার একটি ছবি দিয়েছি। কিন্তু নাঈম কিছুতেই বিশ্বাস করেনা যে ছবির মেয়েটিই আমি। শেষে যখন বোরখা পড়া ছবি দিলাম তখন দুই ছবি মিলিয়ে বিশ্বাস করেছে। শেষে নাঈম তার ছবি দেয়। এবার ঠিকই আমি তাকে চিনে ফেলি। নাঈমই সেই ঔষধের ফার্মেনীর ছেলেটি। যে প্রতিদিন আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু আমার আইডির নাম কোথায় পেল সেটা জানতে চাওয়াতে বললো আমার এক বান্ধবীকে কি গিফট যেন দিয়ে আমার আইডি নিয়েছে।  আমি নাঈমের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেই। ভেবেছিলাম অচেনা দূরের মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করব। আর নাঈম ইচ্ছে করে অভিনয় করে আমার সাথে বন্ধুত্ব করেছে। দুঃখ নিয়েই যার জীবন লেখা তার জীবনে সুখতো মরীচিকা।  নতুন রোগে আক্রান্ত হলাম। মাঝে মাঝে নাক বা কান দিয়ে রক্ত আসত। হঠাৎ দেখা দিত বলে তেমন একটা সতর্ক হইনি।

কিন্তু যখন প্রথম বয়ঃসন্ধি কালে পড়লাম তখন থেকেই রক্ত পড়ার আরেকটি রাস্তা দেখা দিল। এবং প্রতিদিনই রক্ত পড়ত । অনেকের কাছে শুনেছি বয়ঃসন্ধি কালে রক্ত ঝড়ে। কিন্তু কয়েক দিন হয়ে গেল সেটা কিভাবে সম্ভব।
একদিন স্কুলেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাই। আমার যে বান্ধবীর কাছ থেকে নাঈম আমার ফেইসবুক আইডি নিয়েছিল সে বান্ধবীটা নাঈমকে খবর দিল। নাঈম দৌড়ে স্কুলে গিয়ে উপস্থিত। যেহেতু নাঈম মেডিকেল কলেজে পড়ত আর নিজেদের ফার্মেসী আছে সেহেতু অল্পতেই আমার জ্ঞান ফিরিয়ে আনে। আর সেদিনই প্রথম দেখি, কোনো ছেলে আমার জন্য কান্না করছে। নাঈমের চোখ থেকে অনবরত পানি পড়ছে। কেঁদেই চলল ছেলেটি।

নাঈম অামাকে অনেক ভালোবাসে সেটা বুঝতাম। কিন্তু আমি তাকে সবসময় বন্ধুর চোখেই দেখে এসেছি।
নাঈম অামাকে ডাক্তার দেখাতে বলে। ডাক্তার অনেকগুলো পরীক্ষা দেয়। নাঈমই টাকা দিয়েছিল।
পরেরদিন রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বললো, অামার রক্তে ইনফেকশন দেখা দিয়েছে। ভবিষ্যতে ব্লাড কেন্সার হওয়ার সম্ভাবনা ষাট ভাগ।  ভিতরে রক্ত জমাট বেঁধে তারপর সেটা শরীরের বিভিন্ন অংগ দিয়ে বের করে দেয়। অামার শরীরে রক্ত নেই বললেই চলে। ডাক্তার বলেছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অামার শরীরে রক্তের প্রয়োজন।
নাঈমেরও রক্তের গ্রুপ এ পজেটিভ। নাঈম নিজ শরীর থেকে অামাকে এক ব্যাগ রক্ত দিয়েছে। সাথে ঔষধের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এস এস সি টেষ্ট পরীক্ষা শেষের পথে। নাঈমের দোকানের পাশের দুই দোকান আর এলাকার কিছু মানুষ জেনে গেল অামাদের দুজনের মাঝে কিছু একটা সম্পর্ক আছে। অথচ তখনও পর্যন্ত অামার আর নাঈমের সম্পর্কটা প্রেম অবদি পৌছেনি। গ্রামাঞ্চলে যারা থাকে তারা জানে গ্রামে কিছু মানুষ থাকে, যাদের কাজই হলো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিলকে তাল করা।

বিচার জমানোর মতো কিছু মানুষজন বসল। ওখানে বলা বলি হচ্ছে আমার গর্ভে নাঈমের সন্তান ছিল। সে সন্তান নষ্ট করার পর থেকেই অামার রক্ত পড়া শুরু হয়েছে। ঘুনে ধরা সমাজের মানুষগুলোর উপর বড্ড বেশি ঘৃণা জন্মে গেছে।। মানুষকে মিথ্যে অপবাদ দিতে পারলেই তারা স্বার্থক হয়। লোক পাঠায় নাঈমকে ধরে অানতে, নাঈমের সাথে অামার বিয়ে দিবে। না, অামি এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারব না। একটা পবিত্র সম্পর্ককে কলঙ্ক দিয়ে বিয়েতে রুপ দিবে সেটা হতে পারে না।  নাঈমকে ফোন করে বলে দিলাম সে যেন ফার্মেসী ছেড়ে চলে যায়।  নাঈমকে না পেয়ে রায় হলো অামাদের এলাকায় যেন নাঈমকে অার দেখতে না পায়। এই ঘটনার পর অামার বাবা অামাকে খারাপ ব্যবহার করে নানীর বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।

টেস্টের রেজাল্ড এসেছে ৪.৭৫। কিন্তু খুশিতে অার থাকা গেল না। হুট করে একদিন কিছু লোক আসল অামাকে দেখতে। দেখে ওরা বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে চলে গেল।  অামি তখন নানী বাড়িতে ছিলাম। মামা, মামী অার অামার বাবা মিলে অামার এই দ্বিতীয় বিয়ের ব্যবস্থা করেন।  যখন বাবা বাড়ি থেকে খারাপ ব্যবহার করে নানী বাড়ী পাঠায় তখনই অামার মোবাইল অার সিমকার্ড রেখে দেয়। অামার কাছে নাঈমের নাম্বার অাছে কিন্তু কোনো মোবাইল নেই। পাশের বাড়ির এক মেয়ের কাছ থেকে গোপনে মোবাইল এনেছি।  নাঈমকে ফোন দিয়ে বললাম অামার বিয়ে ঠিক হয়েছে। শুরু হয়ে গেল নাঈমের কান্না। কেঁদে কেঁদে বলেছিল সে অামাকে ভালোবাসে। অামি যেন তার সাথে পালিয়ে যাই। অামি না করে দিয়েছি। না নাঈম অামি পারব না সবার সম্মান নষ্ট করতে। অামাকে মাফ করে দাও।  যার সাথে অামার বিয়ে তাকে সবাই এক নামেই চিনত। অনেক ধনী পরিবারের একমাত্র ছেলে।

যার সাথে অামার বিয়ে হচ্ছে তাদের দু’তলা বাড়ি অাছে, গাড়িও অাছে। চৌদ্দ ভরি স্বর্ণ অার দশ লক্ষ টাকা কাবিন দিয়ে অামাকে বিয়ে করে নিয়ে যাবে। কিন্তু বয়স অামার দুই গুন বড়।  অামি বলেছিলাম অামি বিয়ে করব না। যতবারই করব না বলেছি ততবারই অামাকে অার নাঈমকে জড়িয়ে নোংরা কথা শুনতে হয়েছে।  এক প্রকার বাধ্য করানো হয় অামাকে। বারবার নাঈমের কান্নার শব্দ কানে বাজছে। ফোনে সেদিন কেঁদে কেঁদে বলেছিল অামাকে ছাড়া বাঁচবে না, মরেই যাবে।

চল্লিশ মিনিট অপেক্ষা করেও কাজী সাহেব আর সাথের জনেরা অামাকে কবুল বলাতে পারেনি।  শেষে আমার মা, নানী, মামী ওরা বুঝানো শুরু করল। বাড়ি ভর্তি মেহমান, অামি এমন করলে কারো মান সম্মান থাকবে না।  অামাকে দ্বিতীয় বারের মত বউ হতে হলো। আমার কান্না যদি পাখি, আকাশ বাতাস শুনত তারাও কান্না করত।  “সবাই লাল শাড়ী পড়ে বউ সাজে না। কেউ কেউ লাশও সাজে, জীবন্ত লাশ।  অামি গাড়ীতে বসা লাল শাড়ীর মোড়কে পেঁচানো এক জীবন্ত লাশ। ” অাবার বাসর ঘর। অবার চোখের জল। আমার দ্বিগুন বয়সের লোকটি তার মনোবাসনা পূর্ণ করতে ঔষধ খেয়ে অামার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। ব্যথায় আর ভয়ে মৃত্যুর মুখে চলে গিয়েছিলাম। যদিও ঔষধ সেবনের কথাটি আমি পরে জানতে পারি। পনেরো বছরের মেয়েটি দ্বিতীয়বারের মত বউ হলো।

বিয়ের দুদিন পর নাঈমের ফেইসবুক স্টেটাস দেখে না কেঁদে থাকতে পারলাম না। ছেলেটা অনেক ভালোবাসত আমাকে। কিন্তু অামার ভাগ্যে নাঈমের ভালোবাসা ছিল না। নাঈমকে ফোন দিয়েছিলাম। রিসিভ করে কথা বলেনি। মোবাইলের ওপারে ফুপিয়ে কান্না করছিল ছেলেটি। আর এপারে কান্নায় রত আমি। যেন এই ভালোবাসা কান্না দিয়েই রচিত, আর কান্না দিয়ে রচিত আমার জীবন কাহিনী।

পাপ কখনো গোপন থাকে না। অাস্তে আস্তে জানতে পারি আমার স্বামী অাগেও একটি বিয়ে করেছে। অামি হলাম এই বাড়ির দ্বিতীয় বউ। অাগের বউ চলে গেছে। কারো স্বামি যদি রাতের পর রাত নেশা করে হোটেলে মেয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে থাকে সে বউ কিভাবে সংসার করবে? নেশাগ্রস্থ মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। রাতের পর রাত তো বাড়ি ফিরতই না। কখনো গভীর রাতে ফিরলে কোন কিছু প্রশ্ন করা যাবে না। প্রশ্ন করলেই মারধোর শুরু করত। শ্বশুর শাশুড়ীকে জানালেও বকা খাওয়ার ভাগীদার আমি নিজেই।

একটি ননদ ছিল। ননদের স্বামীটার চরিত্র ভাল ছিল না। অনেক নোংরা মনের অধিকারী ছিল। এই বাড়ির দামী দামী গহনা, দামী শাড়ীতে অামার দম বন্ধ হয়ে অাসত।  ছাদের দক্ষিনা বাতাসেও অামার শান্তি লাগত না। শ্বশুর বাড়ির লোকজন অামাকে বাচ্চা নেয়ার জন্য চাপ দিত। বলত একটা সন্তান হলে সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে আমার স্বামী ভাল হয়ে যাবে।  কিন্তু সন্তান হচ্ছে না। বাধ্য হয়েই অামি অার অামার স্বামী ডাক্তারের কাছে গেলাম। দুজনেরই পরীক্ষা করা হলো। কিন্তু আমার গুনধর স্বামী কোনোদিন বাবা হতে পারবে না।  অতিরিক্ত নেশা আর উচ্চ মাত্রার ট্যাবলেট সেবন করে মেয়ে মানুষ নিয়ে রাত কাটানোর ফলে তার বাবা হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে গেছে। কিন্তু ডাক্তারের কাছ থেকে ফেরার পথে আমাকে চোখ রাঙ্গিয়ে বলে দিল এই কথা যেন কিছুতেই আমার শ্বশুর শাশুড়ীকে না বলি।

স্বামী বাড়ি থেকেই এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। রেজাল্ড আসল ৪.৬০। কিন্তু তারা অামাকে অার পড়াতে রাজী না।  বাপের বাড়ি গিয়েছিলাম। যখন তারা জিজ্ঞেস করত অামি কতটা সুুখে অাছি? আমি মুচকি হাসি দিয়ে বলতাম, অনেক ভালো অাছি।  কিন্তু অামার মা দেখে ফেলে অামার গায়ে মারের চিহ্ন।  লোকটি নেশা করে কোমড়ের বেল দিয়ে আমাকে পিটাইত। মারের দাগ তো থাকবেই। মা সবাইকে ডেকে দেখাল, অামাাকে সুখী করতে তারা কোন নরকে বিয়ে দিল।  এই প্রথমবার অামার শরীরে মারের দাগ দেখে সবার মায়া হলো। সবাই স্বামী বাড়ি থেকে অামাকে নিয়ে আসতে চায়। অর্ধমৃত অামাকে এতদিনে মুক্তি দিতে চায়।  পরেরদিন অাবার রওনা দেই শ্বশুর বাড়ি।

বাবা স্ট্রোক করেছে শুনে ছুটে গেলাম বাড়িতে। স্ট্রোক করার কারন অবশ্য আছে। বাবা আমার ছোট বোনটিকে অনেক ভালোবাসত। সে বোনটি এক ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে গেছে। যাওয়ার সময় চিঠিতে লিখে গেছে, “আমি আপুর মত বোকামী করতে চাই না। তাই নিজের পথ নিজেই বেছে নিলাম”  বিশ পঁচিশ দিন হয়তো লেগেছিল সেবা যত্ন করে বাবাকে সুস্থ্য করতে। কিন্তু এর মধ্যে অামার শ্বশুর বাড়ির কেউ অাসা তো দূরের কথা, আমাকে একটি ফোন পর্যন্ত দেয়নি।  কেন যোগাযোগ করেনি সেটা অবশ্য পরে জানতে পেরেছি যখন তালাক নামার কাগজ অামার হাতে এল।  অামার স্বামী বাড়িতে শুনিয়েছে পরীক্ষা করে জানতে পেরেছে অামার সমস্যা। অামি কোনোদিন মা হতে পারব না।  পারতাম মামলা করে কাবিনের টাকা উদ্ধার করতে। কিন্তু যেখানে অামার সংসারই টিকল না সেখানে কাবিনের টাকা দিয়ে কী করব? অনিশ্চিত জীবন নিয়ে অাবারো আমি বাপের বাড়ি।

নাঈম জানতে পারে সব। অাবারো নাঈম পাগলামি শুরু করে। অামাকে ফোন করে কেঁদে কেঁদে বলে অামাকে বিয়ে করবে। কিন্তু অামি রাজী নই।  নাঈমের পাগলামি দেখে নাঈমের বাবাও এসেছিল আমার কাছে। কিন্তু অামি ফিরিয়ে দিয়েছি।  এই বিয়ে বিয়ে খেলা অামি অার খেলতে চাই না।  সবচেয়ে বড় কথা আমার দেহের ভিতরের রোগগুলো লালিত হতে থাকে। বাপের বাড়ি অাসার পরতো অামার চিকিৎসা একদমই বন্ধ। শরীরটা পাটকাঠির মত শুকিয়ে যাচ্ছে। দেহের রক্ত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসা না করালে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা ষাট ভাগ সেটা ডাক্তার পনেরো মাস অাগেই অামাকে জানিয়েছিল অনিশ্চিত জীবন নিয়ে নাঈমকে অামি ঠকাতে পারব না।

নাঈম যখন প্রতিনিয়ত লোক পাঠাত অামাদের বাড়ি। অামি উপায় না পেয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি।  এক পরিচিত অাঙ্কেলকে দিয়ে একটি মার্কেটের অভ্যর্থনা কক্ষে চাকরী নিয়েছি। যে বেতন অাসে সেটা দিয়ে রুম ভাড়া খানা খেয়েও কিছু হালকা চিকিৎসা, অর্থ্যাৎ ঔষধ খেতে পারি। মোবাইলের সীম কার্ড পরিবর্তন করে ফেলেছি।
কারো সাথে কোন যোগাযোগ নেই। অামার দুঃখের ভেলা নিয়ে অামি একা অনেক সুখে আছি।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত