অপেক্ষা

অপেক্ষা

এক্সিউজ মি, কথাটা শোনে ঘুরে তাকাতেই দেখি, অপরিচিত একটা মেয়ে, সে পাশে এসে চেয়ার টানতে টানতে বললো আমি কি এখানে বসতে পারি ভাইয়া? আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক বোঝালাম। মেয়েটি তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমি নিলীমা, আমি তার হাত স্পর্শ না করে আমি তন্ময় বলে কফির মগে একটা চুমুক দিলাম। মেয়েটি কি মনে করলো তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি প্রতিদিনের মত আমার কফি শেষ করছি। করেই উঠে যাবো। মেয়েটি বলতে শুরু করলো আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি?

আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক বুঝালাম। মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলো শেষ ছয় মাস ধরে আমি এই সময় এই কফিশপে আছি। আর আপনিও একই সময় আসেন। আমি বললাম হয়তো সময়টা মিলে যায়। মেয়েটি আবার ও বলতে শুরু করলো হ্যাঁ সময় হয়তো মিলে যায়। কিন্তু প্রতিদিন আপনি কেন এই টেবিলটায় বসেন? আমি এসে ফাকা পাই আর এই সাইডটায় কেউ আসে না তাই বসি, আমার ভাল লাগে নিরবিলি। মেয়েটা আবার বলতে শুরু করলো। সব ঠিক আছে কিন্তু আপনি দুই কাপ কফির অর্ডার করেন আর এক কাপ কফি সামনে রেখে দিয়ে এক কাপ খেয়ে চলে যান এটার কি কোন স্পেশ্যাল কারণ আছে।

এবার এমন এক প্রশ্ন করেছে যা আমি বিগত এক বছর যাবৎ ভুলে যেতে চাই। আমি চুপ করে বসে রইলাম কি বলবো মেয়েটাকে আজও আমি কারো আসার অপেক্ষা করে বসে থাকি যে বলেছিল পাঁচ মিনিট লাগবে আর তুমি কফির অর্ডার করো আমি চলে আসছি। অথচ সে আমাকে ঠকিয়েছে কিন্তু আমি বিশ্বাস করি সে আসবে।

মেয়েটি আমার উত্তর না পেয়ে আবারও বলে উঠলো, আমি কি কোন ব্যাক্তিগত প্রশ্ন করে ফেললাম তাহলে দুঃখিত। আমি এবার মুখ খুলে বললাম। আসলে কি জানেন নিলীমা আমি ছয় মাস নয় প্রায় এক বছর এখানে এভাবে বসে থাকি। কেউ একজন আমাকে বলেছিলে পাঁচ মিনিটের ভিতর সে আসছে। তার সাথে আমার কখনো দেখা হয়নি, শুধু তার নামটাই আমার জানা, অথচ তার পাঁচ মিনিট এখনো শেষ হয়নি।

সেদিনের পর তার নাম্বারটাও বন্ধ আমি এখনো বিশ্বাস করি সে আসবে হয়তো কোন একদিন। তাকে আমি দেখতে পাবো। আমি পকেট থেকে আংটির বক্সটা বের করে বললাম দেখুন নিলীমা আমি তানহার জন্য এই আংটিটা কিনে রেখেছি ও যেদিন আসবে আমি ওর আঙ্গুলে পড়িয়ে দিয়ে বলবো তুমি কি আমার হবে? জানি না ও কখনো আসবে কিনা, তবুও আমি ওর আসার অপেক্ষায় বসে থাকি রোজ রোজ এই সময় যেন ও এসে ফিরে না যায়। নিলীমা একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ভাইয়া একটা কথা বলবো? আমি হুম বলুন। আপনি কি আমার সাথে একটু যেতে পারবেন? আমি কোথায়? আর কেন যাবো আমি আপনার সাথে। নিলীমা ভাইয়া দরকার আছে একটু আমি আপনার তানহাকে চিনি, চলেন আপনাকে নিয়ে যাবো।

আমি আপনি কি সত্যিই তানহাকে চিনেন? নিলীমা হুম সত্যিই চিনি, আপনি চলুন আমার সাথে। আমি আর কথা না বাড়িয়ে নিলীমার সাথে কফিশপ থেকে বের হয়ে গেলাম। নিচে নেমে একটা রিক্সা ডাক দিলো নিলীমা। দুজনে রিক্সায় চড়ে রওনা হলাম। অল্প সময়ের ভিতরে একটা বাড়ির সামনে এসে রিক্সা দাঁড়ালো। আমি বললাম এখানে কেন? নিলীমা এখানেই তানহা আছে। চলেন আমার সাথে। আমি নিলীমার সাথে বাড়ির ভিতরে ঢুকলাম। নিলীমা আমাকে নিয়ে বাড়ির পেছনের দিকে চললো হেঁটে।

বাড়ির পেছনে যেতেই একটা কবর স্থান দেখিয়ে বললো ঐতো আপনার তানহা ঘুমিয়ে আছে শান্তিতে বলেই হাউমাউ করে কান্না করে দিলো নিলীমা। আমি কি বলবো বুঝে উঠতে পারছি না। এতোদিন না হয় একটা আশা নিয়ে বেঁচে ছিলাম কোন একদিন আমি আমার তানহাকে দেখবো। কিন্তু এমন পরিস্থিতি আমার সামনে আসবে তা আমি কখনো কল্পনাও করিনি। নিলীমা কান্না করতে করতে বললো ভাইয়া আপু আপনাকে ঠকায়নি, আপু আমাকে বলে গিয়েছিল আপনার সাথে দেখা করবে। বের হবার সময় বার বার করে বলেছিল আপনাকে না দেখেই আপু ভালবেসে ফেলেছে। ভাগ্য কতটা খারাপ আপু আপনাকে না দেখে ভালবেসেই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল।

সেদিন রিক্সা থেকে নামার সাথে সাথেই একটা গাড়ি এসে আপুকে ধাক্কা মারে, হাসপাতালে নিতে নিতেই আপু মারা যায়। আপনি একটু দাঁড়ান আমি আসছি, বলে নিলীমা বাড়ির ভিতরে চলে গেল, আমার দু’চোখ বেয়ে তখনো অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। আমি তানহার কবরের দিকে চেয়ে আছি। মনে হচ্ছে তানহাও আমার দিকে চেয়ে আছে। কিছু সময়ের ভিতরে নিলীমা একটা প্যাকেট এনে দিয়ে বললো, ভাইয়া এটা আপনার জন্য আপু কিনেছিল। আমি প্যাকেটটা খুলে দেখি নীল একটা শার্ট। তানহা জানতো নীল রং আমার খুব প্রিয় আমি নীল শার্ট পছন্দ করি, ও বলেছিল আমাকে নীল শার্ট কিনে দিবে। ও কিনেছিল কিন্তু দিতে পারেনি।

আমি শার্টটা হাতে নিয়ে হাউমাউ করে কান্না করে দিলাম। নিলীমা আমার পিঠে হাত রেখে বললো ভাইয়া কান্না করবেন না প্লীজ তাহলে যে আপুর আত্মা কষ্ট পাবে। আর আপনি ভেঙে পড়বেন বুঝেই এতো দিন আপনাকে এই কথাটা বলিনি। আমি আপনাকে আপু মারা যাবার পর থেকেই ফলো করে চলেছি ছয় মাস না, কিন্তু বলার মত বা আপনাকে শান্তনা দিবে কি বলে এটাই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কাল আমার বিয়ে হয়তো আর সময় পেতাম না, আপনি আপুকে সারা জীবন দোষী ভাবতেন। তাই আজ আপনাকে সত্যি কথাটা বললাম। আপনি আর আপুর জন্য ঐখানে অপেক্ষা করবেন না কারণ আপু যাবে না।

আপনার সারাটি জীবন পড়ে আছে। একটা বিয়ে করে নতুন করে জীবনটা সাজান। আর আপুর জন্য দোয়া করবেন আপুযে আপনাকে অনেক ভালবাসতো। আমার আর কিছু বলার মত শক্তি ছিল না। কান্না করতে করতে পকেট থেকেকে আংটিটা তানহার কবরের পাশে রেখে এক সময় সেখান থেকে চলে আসলাম। আমার অপেক্ষা হয়তো এখন আরও দীর্ঘ হলো, হয়তো এ অপেক্ষা অনন্তকালের।।।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত