বিচ্ছেদ

বিচ্ছেদ

বেলা তখন সাড়ে এগারোটা। মাইমুনা বারান্দায় বসে আছে। তার মন খারাপ। কিছুই ভালো লাগছে না। মনের ভেতর অস্থির অস্থির লাগছে। খোঁচ খোঁচ করছে। টেনশন হচ্ছে। অযথাই টেনশন। টেনশনের পেছনে যৌক্তিক কারণ না খুঁজে পাওয়ায় আরো বেশি অসহ্য লাগছে। মাইমুনা কখনই ভরদুপুরে একা একা বারান্দায় বসে সময় কাটায়নি। আজ কাটাচ্ছে। অকারণেই। অনিচ্ছায়। ওর ভেতরটা ভালো নেই। ভেতরটা ভালো না থাকলে বাইরেরটা পাগলামো শুরু করে দেয়। বেখেয়ালি চালচলন শুরু হয়। বাইরের সব কিছু অগোছালো লাগে। অসহ্য লাগে। বিশেষ করে আজকের দুপুরটা। দুপুরটা বড় অগোছালো লাগে ওর কাছে।

কেমন একটা খিটখিটে ভাব চলে আসে। মেজাজ গরম হয়ে থাকে। মাইমুনার এখন মেজাজ গরম হয়ে আছে। রাগ উঠছে। তার একটি কারণ এই উত্তপ্ত দুপুর। এবং প্রধান কারনটি হলো সোহাগ। সোহাগ হচ্ছে মাইমুনার একটা পৃথিবী। তার আবেগ, ভালো থাকা, এবং ভালোবাসা। কাল সেই সোহাগের সাথে ওর বিচ্ছেদ ঘটেছে। দীর্ঘ এক বছর পর কাল তাদের প্রথম বিচ্ছেদ হয়। এক্ষেত্রে মাইমুনার ভূমিকা ছিল প্রধান। মাইমুনাই বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। তারও একটা কারণ আছে। খুব কমন একটি কারন। মাইমুনা চোখ বন্ধ করে সেই কারনটির কথা চিন্তা করল। সেটির কথা চিন্তা করতেই কাল ঘটে যাওয়া বিচ্ছেদের ঘটনাটাও চোখের সামনে ভেসে উঠল। ভেসে উঠা ঘটনাটি হলোঃ

-সোহাগ, শোনো, তোমার সাথে আমার একটা ইম্পরট্যান্ট কথা আছে। মাইমুনা একদম সিরিয়াস ভঙ্গিতে কথাটা বলল। এবং পরবর্তী কথার জন্যে প্রস্তুত থাকল। অনেক গুলো কথা বলবে আজ। বাড়ি থেকে প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। মাইমুনার কথা শুনে সোহাগ প্রথমে হাসল। তারপর মাইমুনার সিরিয়াসনেস দেখে চুপ হয়ে গেল। এই ছেলের এই এক সমস্যা। চুপ হয়ে গেলে একদম চুপ হয়ে যায়। প্রয়োজনে দু একটা কথা বলবে। এছাড়া আর একটা কথাও বলবে না। মাইমুনা সেটা চায় না এই মূহুর্তে। ও চায় সোহাগ কথা বলুক। একটা বৃহৎ ঝগড়া হোক। তাই জলদি করে বলল,

-শোনো,আমি খুব সিরিয়াস। খুব। যা বলব মন দিয়ে শুনবে এবং কথার পালটা জবাব দিবে। চুপ করে থাকবা না। তোমার তো আবার ফালতু একটা সমস্যা আছে। চুপ থাকা। একদম চুপ থাকবা না। আমরা ঝগড়া করব। আমার সাথে গলায় গলা মিলিয়ে ঝগড়া করবে তুমি। তুমুল ঝগড়া হবে। তারপর আমাদের বিচ্ছেদ হবে। প্রেমের বিচ্ছেদ। আর কখনই আমাদের কথা হবে না। দেখা হলেও কথা হবে না। চোখাচোখিও না। তোমার তো আবার বাজে একটা অভ্যাস আছে। আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকা। আজকের পর থেকে আর আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে না। একটুও তাকাবে না। বিচ্ছেদ মানে বিচ্ছেদ। বুঝতে পেরেছো?

সোহাগ এক দৃষ্টিতে মাইমুনার দিকে তাকিয়ে ছিল। কিছু বলছিল না। তার কিছু বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। সে মাইমুনাকে দেখায় ব্যাস্ত। তার কাছে তখন পুরো পৃথিবীটাকেই অপার্ধিব লাগছিল। ওপাশের সমগ্র পৃথিবী যদি তলিয়েও যেত তার খেয়াল থাকত না। সে কেবল মাইমুনাকে দিকে তাকিয়ে থাকাটাকেই যেন তার প্রধান কাজ ভেবে নিয়েছিল। মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য যেন মাইমুনার মুখে এসে লেপ্টে বসে আছে। মিশে আছে তার সাথে। তার প্রতিটি কর্কশ শব্দে। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলা প্রতিটি শব্দ উচ্চারণে। গোল গোল কাজল চোখ গুলো ছোট ছোট করে বলা প্রতিটি কথায় যেন চরম সৌন্দর্য মিশে ছিল। ভালো লাগা মিশে ছিল। এরচে সুন্দর আর কিছু সে কল্পনাও করতে পারে না। সে সৌন্দর্য উপভোগ করতে ব্যস্ত। এদিকে সৌন্দর্যময় সেই চেহারা রেগে আটখানা। সে যা ভেবেছিল তাই হয়েছে। সোহাগ চুপ হয়ে গেছে। সে আর কথা বলবে না। মাইমুনা রাগ চরম পর্যায়ে পৌঁছালো।

-সোহাগ, তুমি কথা বলছো না কেন? তোমাকে না বলেছি কথা বলতে?  সোহাগ এবারেও কিছু বলল না।

-আশ্চর্য! মানুষ এভাবে কিভাবে চুপ করে থাকতে পারে। আমি তোমার সাথে ব্রেকাপ করছি অথচ তুমি কোনো রেসপন্সই করছো না? সোহাগ মাথা নামিয়ে নিল। ব্রেকাপের কথা শুনতেই মন খারাপ হয়ে গেল তার। কী বলবে ভেবে পেল না। চুপ করে থাকল। এমনিতেই সে কথা কম বলে। এখন ব্রেকাপের কথা শুনে কথা বলার ইচ্ছেটাই মরে গেল। মাইমুনা চিৎকার করে বলল,

-এই হারামজাদা কথা বলছিস না কেন হু? বল, কথা বলছিস না কেন? তোর মুখে কী হয়েছে? তালা মেরেছিস কেন? ও বুঝেছি, আমার সাথে তো এখন আর কথা বলতে ভালো লাগে না। ওই রিমা, টিনাদের সাথে কথা বলতে ভালো লাগে। খুব তো দেখি তাদের সাথে গলায় গলায় কথা বলিস। কেবল আমার সামনে এলেই বেড়ালের মতো হয়ে যাস। বুঝি তো আমি। আর তোকে কাল দেখা করতে আসতে বলেছি, এলি না কেন? জানিস আমি কতক্ষণ অপেক্ষা করেছি? জানবিই বা কিভাবে? আমার কোনো খবরই তো রাখিস না। আমারই ভুল, তোর মতো গাধার সাথে আমি রিলেশন করেছি। তোর ভাগ্য ভালো। আমার মতো মেয়ে পেয়েছিস। যাক, যা হবার হয়েছে। আমি আর পারছি না। আমাদের নিজেদের মতো করে থাকা উচিৎ। এবং সেটা আজ থেকেই। আমাদের মাঝে আর কোনো প্রকার যোগাযোগ থাকবে না। বুঝেছিস?

এই কথা বলেই মাইমুনা চলে সেখান থেকে। সোহাগ চুপচাপ বসে থাকল। নড়ল না। দুপুর ঘনিয়ে এলেও সে নড়ল না। ঠিক বেলা তিনটা বাজতেই ওখান থেকে উঠে বাসায় ফিরে এলো। এসেই শাওয়ার নিলো। না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ল সে।  মাইমুনা এখনও বারান্দায় বসে আছে। তার মেজাজ চরম পর্যায়ে খারাপ। ওর মেজাজ খারাপ হলে চা খেতে ইচ্ছে হয়। এখনও হয়েছে। সে রেহানাকে ডাক দিল। রেহানা ওদের বাসার কাজের মেয়ে। অনেক আগ থেকেই এই বাড়িতে আছে। বয়সে মাইমুনার সমান হলেও মাইমুনা রেহানা আপা বলে ডাকে। মাইমুনা বেশ জোরালো কণ্ঠে ডাক দিলো।

-রেহানা আপা? এই রেহানা আপা? রেহানা রান্না ঘর থেকে সায় দিলো।
-আসছি! কিছু সময় পার হওয়ার পরেও রেহানা এলো না। মাইমুনার মেজাজ আরো গরম হলো।
-এই রেহানা? রেহানা?  মেজাজ গরম হলে তার মাথা ঠিক থাকে না। যাচ্ছেতাই বলে। রেহানা বুঝল, অবস্থা সুবিধের না। হাতের কাজ রেখে দৌড়ে এল। বলল,

-কী হইছে আপামনি? চিল্লাইতেছেন ক্যান?
-কীহ? আমি চিল্লাইতেছি? তোমার কত বড় সাহস তুমি আমাকে বলছো আমি চিল্লাইতেছি? রেহানা আপা তুমি দিন দিন খুব বাজে বিহেভ করছো আমার সাথে। এসব ঠিক না কিন্তু।

-হ, জানি ঠিক না। এহন কি লাগব হেইডা কন?
-ছিহ! কি বাজে ভাবে কথা বলছো। তোমাকে না বলেছি এভাবে কথা না বলতে? শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারো না?
-না, পারি না।
-তাহলে কী পারো? ঘোড়ার ডিম?
-নাহ। হেইডাও পারি না। আপা, আপনার কী হইছে কন তো? এইভাবে কতা কইতাছেন ক্যান?
-আগে তুমি তোমার কথা বলার স্টাইল চেঞ্জ করো। তারপর তোমার সাথে কথা বলবো আমি।
-পারুম না আপা। নাড়ির টান। বুঝলেন। চইলা আহে। ছাড়তারুম না।
-না পারলে তুমি মুরি খাও। যাও এখান থেকে। আমার জন্যে এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসো। নাহ, চা খেতে ইচ্ছে করছে না। চা বাদ। তুমি বরং কফি বানিয়ে আনো।

-এই ভরদুপারে এমুন ভ্যাপসা গরমে আপনে চা খাইবেন? আপা, আপনার মাথাটাথা গেছে নাকি?
-হ্যাঁ। পুরাই গেছে। আমার মাথা একদমই ঠিক নেই। তুমি যাও। যা বলেছি তাই করো।
-আপা, ভালার জইন্যে কই। চা খাইয়েন না। ফিরিজে জুস আছে। জুস দেই? আপনে চাইলে লেবুর শরবত বানায় দিতে পারমু। শরবত বা জুস যেইডাই খান দেখবেন মাথা একদম বরফের মতো ঠান্ডা হয়া যাইবে। কোনটা দিতাম কন?

-রেহানা, আর একটা কথা যদি বেশি বলছো তাহলে তোমার মাথা ফাটিয়ে ফেলব আমি। তোমাকে যা বলেছি তাই করো। যাও এখান থেকে!
-আইজকাইল মাইনসের ভালা চাইতে নাই।

রেহানা বিরক্ত হয়ে বিদায় নিলো। রান্না ঘরে এসে দেখল ডাল উত্তপ্ত হয়ে বুদবুদ তৈরি হচ্ছে। কিছুটা ডাল পড়েও গিয়েছে। সে হায় হায় করতে করতে রান্না ঘরে ঢুকল। মিরাকে বকতে শুরু করে দিল। নিজেই নিজেই কথা বলতে থাকল। এটা তার অভ্যাস। নিজে নিজে কথা বলে সে। তারপর অনেক্ষন পরে যখন কফি নিয়ে মাইমুনার রুমে গেল তখন দেখল মাইমুনা রুমে নেই। বারান্দাতেও নেই। বাথরুম থেকে পানি পড়ার আওয়াজ আসছে। রেহানা কফির মগ টেবিলে রেখে বলল,

-আফা, কফির মগ রাইখা গেছি। খাইয়া লইয়েন।

ওপাশ থেকে কোনো আওয়াজ এলো। রেহানা রান্নাঘরে চলে গেল। রান্না শেষে ঘর ঝাড়ু দিতে এলো মাইমুনার রুমে। দেখল মাইমুনা মরার মতো পড়ে ঘুমোচ্ছে। যেন অনেকদিন মেয়েটা ঘুম যায়নি। রেহানা কিছু সময় তাকিয়ে থাকল তার দিকে। খুব মায়া হলো তার। মনে মনে বলল,

-আফার যে আইজ কী হইছে?

টেবিলের দিকে চোখে যেতেই দেখল কফির মগটা যেভাবে রেখে গিয়েছে সেভাবেই আছে। তারমানে আফা কফি খায়নি? রেহানা এবার সত্যি সত্যি চিন্তায় পড়ে গেল। সে এক মনে ভাবতে থাকল যে তার আফার আসলে হয়েছে কী। তারপর বাথরুমের দিকে চোখে যেতেই দেখল দরজা খোলা। রেহানা দ্রুত বাথরুমের সামনে গেল। আফা ঘুম থেকে উঠে দরজা খোলা দেখলে আবার রাগারাগি করবে। দরজা আঁটকাতে যাবে ঠিক তার আগেই দেখল মাইমুনার জামা কাপড় পড়ে আছে। ধোঁয়া হয়নি। রেহানা ঝাড়ু রেখে হাত ধুয়ে জামা গুলো ধুতে থাকল। আর গুনগুনিয়ে গান গাইতে থাকল। মাইমুনার ঘুম ভাঙ্গল সন্ধ্যায়। বিছানা থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিলো। বসার ঘরে আসতেই দেখল রেহানা টিভি দেখছে। মাইমুনা গিয়ে সোফায় বসল। মাইমুনাকে দেখতেই আড় চোখে তাকালো রেহানা। মাইমুনা সেটা দেখে ফেলল। বলল,

-এভাবে তাকাচ্ছো কেন রেহানা আপা?

খুব শান্ত ভাবে কথাটা বলল। রেহানা বেশ অবাক হলো। আশ্চর্য! হঠাৎই এতো নরম স্বরে কথা বলছে কেন? মাইমুনা আবার বলল,

-কী হলো? জবাব দিচ্ছো না যে? রেহানা মুখ খুলল। বলল,
-আপনের কি ওইছে আফা?
-আমার আবার কী হবে? আমি তো ঠিকই আছি। আচ্ছা, দুপুরে যে খারাপ ব্যাবহার করলাম তাতে তুমি কষ্ট পাওনি তো? আসলে তখন মাথা ঠিক ছিল না। তাই কি না কি বলেছি নিজেও বুঝতে পারিনি। রেহানা হাসল। বলল,

-আপা, কি যে কন না! আমি রাগ কইরতে যামু ক্যান? এসব রাগ টাগ আমি করি না। আমি একদম ফিরি মাইন্ড।
মাইমুনা হাসল। তার খানিকটা ভালো লাগল। সে বলল,
-চা খাবে?
-আপনে খাবেন? তাইলে কন, আমি বানায় নিয়া আইসি।
-তোমাকে বানাতে হবে না। আমি যাচ্ছি। তুমি খাবে কি না বলো?
-খাবো।

মাইমুনা উঠে চা বানাতে গেল। রেহানা সিরিয়াল দেখায় মনযোগ দিল। চা বানিয়ে এক মগ রেহানাকে দিয়ে এলো। নিজের মগ নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসল। চুপচাপ বসে থাকল। মাঝে মাঝে চায়ে চুমুক দিল। এমন সময় রেহানা পাশে এসে বসল। মাইমুনা হাসল খানিকটা। বলল,

-বাবা আসেনি এখনও?
-আফা, আপনের কী হইছে কন তো?
-কী হবে আবার? কিছুই হয়নি।
-কিছু তো হইছেই।

কাইল থেইকা দেখতাছি আপনের মনডা খারাপ। রাতে খাইয়া ঘুমাইলেন না। সকালে রুটি খাইলেন একডা। দুপারে ঝগড়া কইরা ঘুমাইলেন। উঠলেন সন্ধ্যায়। দুপারেও খাইলেন না। এহন কইতাছেন আপনের বাপ আইছে কিনা? আফা, আপনে কি জানেন না হে যে রাইত আটটার আগে আহে না? জানেন ত। তাইলে জিগাইলেন যে?  রেহানা একটু থেমে আবার বলল,

-আমি বুঝছি যে আপনের মন খারাপ। তয় ক্যান খারাপ তা কইবার পারিনা। আপা, আমারে কি কন যাইবো? মাইমুনা কিছু বলল না। চুপ করে থাকল। রেহানা বলল,
-সোহাগ ভাই কি কিছু কইছে?

সোহাগের ব্যাপারটা রেহানা জানে। কারণ ঘরে কেবল এই একজনের সাথেই ওর সময় কাটে বেশি। তার বাবা ব্যবসায়ীক কাজে ব্যস্ত থাকে। মা গত হয়েছেন কবছর আগে। তাই কেউকে না পেয়ে মনের কথা গুলো রেহানার সাথে শেয়ার করে। নিজের বোন ভাবে ওকে। মাইমুনা মাথা নেড়ে বলল,

-না। কথাটা বলার পরই তার মুখে মেঘ জমতে থাকল। বিষন্নতায় ঘিরে ধরতে থাকল। রেহানা আবার বলল,
-তাইলে? ঝগড়া হইছে?
-না।
-তাইলে?
-আমি ওর সাথে ব্রেকাপ করেছি আপা।
-কীহ? ক্যান করছেন?
-ও ভালো না। একদমই ভালো না। আমার একটুও খেয়াল রাখে না। আমার সাথে ঠিকভাবে কথা বলে না। এসব আমার খারাপ লাগে না বলো? মাইমুনা কান্না করে দেয়। রেহানাকে জড়িয়ে ধরে। জড়িয়ে ধরে ফোঁপাতে থাকে। কান্না মিশ্রিত কণ্ঠে বলে,

-জানো সেদিন কি করেছে ও? আমাকে পাক্কা তিন ঘন্টা বসিয়ে রাখার পর ফোন দিয়ে বলে সে আসতে পারবে না। কেমন লাগে বলতো? তারপর এরপরের দিন আমি নিজেই দেখলাম সে একটা মেয়ের সাথে করে রিক্সায় চড়ে কোথাও যাচ্ছে। অথচ আমার সাথে দেখা করার সময় সেই তার। এগুলো কোনো মেয়ে মেনে নিবে বলো? মেনে নিবে?  মিরা কান্না করতে থাকে। বাচ্চাদের মতো কান্না করে। রেহানা ওকে ছাড়িয়ে নেয়। চোখ মুছে দিয়ে বলে,

-এমুন একডা ছুডু কারণে আপনে তারে ছাইড়া দিলেন?
-তো কি করব? ধরে রাখব? যার কাছে আমার কোনো মূল্য নেই আমি কেন তার কাছে পড়ে থাকব?
-পোলারা একটু বেখেয়ালিই হয় আফা। এগোরে ভালা কইরা টাইট দিতো অয়। নইলে এরা যে কই যাইবো তার কুনু হদিস পাওয়া যাইবে না।

-কী বলছো এসব? টাইট দিবো মানে?
-মানে হইতাছে কড়াকড়ি দিবেন আরকি। আর হুনেন, ভালাবাসার মানুসের উপ্রে বিশ্বাস থাওন লাগে। বুঝলেন?
-তুমি বলতে চাচ্ছো আমি ওকে বিশ্বাস করি না? রেহানা আপা, কিসব বলছো তুমি? আমি কেন ওকে বিশ্বাস করব না। আমি তো ওকে বিশ্বাস করি।
-তাইলে বেরেকাপ কইরলে ক্যান? মাইমুনা সাথে সাথে জাবাব দিতে পারল না। চুপ করে থাকল। কিছু সময় ভাবল। তারপর মাথা নিচু করে বলল,
-ও আমার সাথে সেদিন দেখা করতে আসেনি কেন? তারপর মেয়েদের নিয়ে রিক্সায় করে ঘুরে। কত বড় সার্থপর বুঝতে পারছেন?
-হ, বুঝতো পারছি আপা আপনে আসলেই একটা গাধি?
-কিহ? কি বললা তুমি?
-হ, ঠিকই কইতাছি।

এসব কারণে কেউ কাউরে ছাইড়া দেয়? কন দেয়? হের তো কুনু সমিস্যাও হইতে পারে? পারে না? আপনে কি হেরে জিগাইছেন? একবার জিগাইতেন। এহন কি ওইছে? হেরে ছাইড়া আপনে নিজেও কষ্ট পাইতাছেন। রেহানা তার জ্ঞান বানী শুনিয়ে যেতে থাকল। মাইমুনা চুপচাপ কেবল তা শুনে গেল। খানিকটা ভাবনায় পড়ে গেল। ওর এখন মনে হচ্ছে অহেতুক ব্রেকাপ করাটা একদমই ঠিক হয়নি। অন্তত একবার জেনে নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কী করবে ও? রাগ উঠলে পুরো মাথাটা ঘোলাটে হয়ে যায় ওর। কি না কি করে কিছুই বুঝতে পারে না। মাইমুনার আপসোস হতে থাকল।

মাইমুনা ক্লাসে ঢুকতেই দেখল সোহাগকে। সে চুপচাপ মাঝখানের সারির মাঝের দিকে বসে আছে। মাইমুনা ঠিক তার সামনে বসল। সোহাগকে বুঝতে দেওয়া যাবে না যে তার রাগ পড়েছে। তার হৃদয় আপসোস করছে। ওকে মিস করছে। মাইমুনা শক্ত হয়ে বসে থাকল। তবুও বুকের ভেতর কেমন জানি করতে থাকল ওর। সোহাগকে দেখার ভীষন ইচ্ছে জাগল। বুকের ভেতরটা কেমন পাগল পারা হয়ে উঠল। খুতখুত করতে থাকল। ঠিক তখনই ঢংগি মেয়েটা ক্লাসে ঢুকল। তার নাম টিনা। সেদিন টিনার সাথেই ঘুরতে দেখেছে সোহাগকে। মাইমুনার বুকের ভেতরটা জ্বলে উঠল যেন। ইচ্ছে করল গিয়ে মেয়েটার চুল ছিড়ে দেয়। বহু কষ্টে বসে থাকল। নিজেকে নিয়ন্ত্রনে রাখল। মনে মনে দোয়া করতে থাকল যেন মেয়েটা সোহাগের পাশে না বসে। দোয়া কাজে লাগল না। টিনা সোহাগের পাশেই বসল। সোহাগের সাথে হেসে হেসে কথা বলল। মাইমুনার তা সহ্য হচ্ছে না। কেবল দম বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। কিছুই বলতে পারছে না।

অল্প কিছু পর অনুভব করল তার কানের গোড়া গরম হয়ে যাচ্ছে। গা দিয়ে আগুন বের হচ্ছে যেন। একটু পরই মাইমুনা দেখল তা হাত কাঁপছে। থরথর করে কাঁপছে। মাইমুনা উঠে দাঁড়ালো। কোনো মতে দৌড়ে ওয়াশ রুমে গেল। ট্যাপ ছেড়ে দিয়ে কান্না শুরু করে দিল। কান্না করতে থাকল আর মুখে পানি মারতে থাকল। কান্না থামিয়ে বেরিয়ে এলো। ক্লাসে গেল না আর। বাইরে একা একা হাঁটাহাঁটি করল। হাঁটাহাঁটি করতেও ভালো লাগছে না। সে বসে পড়ল। অনেক্ষন বসে থাকল। চুপচাপ বসে থাকল। মন ভীষন খারাপ। কান্না আসছে কেবল। যতবার টিনার কথা মনে হচ্ছে ততবারই কান্না আসতে থাকে ওর। নাহ। এখন কান্না করতে হবে। কান্না না করলে শান্তি মেলবে না। সে উঠে দাঁড়ালো। গেইটের কাছে যেতেই কি বুঝে পেছনে তাকালো একবার। তাতেই পাপ হলো যেন। দেখল টিনা আর মিহির আসছে। দুজনেই এক সাথে হাঁটছে। হাসছে। কথা বলছে। মাইমুনার বুকের ভেতর আবার সেই অনুভূতিটা ফিরে এলো। কষ্ট হতে থাকল। চুপচাপ রোবটের মতো দাঁড়িয়ে থেকে দেখে গেল কেবল। সোহাগকে ক্রস করার সময় টিনা বলল,

-কী ব্যাপার মাইমুনা? ক্লাস করলে না যে?  মাইমুনা ফ্যাকাসে হাসি দিলো।বলল,

-এমনিই। ইচ্ছে করছিল না। ততক্ষণে সোহাগ আগে চলে গেল। মাইমুনার দিকে একবার ফিরে তাকিয়েও দেখল না। টিনা যাওয়ার সময় হেসে দিয়ে বলল,

-থ্যাংকস। মাইমুনা অবাক হয়ে বলল,
-থ্যাংকস কেন?
-এই যে,

সোহাগের সাথে ব্রেকাপ করলে! তুমি জানো না, তোমাদের ব্রেকাপ না হলে আমি আমার জীবিনের অনেক গুলো আনন্দের সময় মিস করতাম। আচ্ছা যাই, ওকে নিয়ে এখন বাসায় যেতে হবে। পরে সব বলব কেমন?
মাইমুনার চোখে মুখে দিয়ে আগুন বের হতে থাকল। কেবল স্তব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল সে। কিছু বলার সাহস পেলো না। টিনারা রিক্সায় চড়ে বিদায় নিলো। মাইমুনা আনমনে হাঁটতে থাকল। চোখে জল জমতে থাকল। রেহানা আপার কথাটা মনে পড়ে গেল ওর। পুরুষদের টাইট দিয়ে রাখতে হয়। তা না হলে এরা তোমার হাত থেকে ছুটে যাবে। আর একবার ছুটলেই তার হদিস পাওয়া যাবে না।

মাইমুনা ভেবে পেল না। নিজের প্রেমিককে আর কী টাইড দিবে? প্রেমিক-প্রেমিকার দায়িত্বই তো হলো একে অপরের কেয়ার করা। ভালোবাসা। এখানে টাইড দেওয়ার কি আছে? মাইমুনা ভেবে পেল না। একবুক কষ্ট নিয়ে বাসায় ফিরে এলো। রুমে গিয়ে কান্না শুরু করে দিল। কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে গেল টের পেল না। ঘুম ভাঙ্গল রাত আটটার দিকে। ফ্রেশ হয়ে বারান্দায় বসল। রেহানাকে কফি নিয়ে আসতে বলা হলো। সে কফি দিতে নারাজ। বলছে, খালি পেটে কফি খেলে পেট খারাপ করবে। মাইমুনা জেদ ধরল। সে কফি খাবেই। তার আর কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না। রেহানা শেষমেশ কফি নিয়ে এলো। দুজনেই কফি খেল। একটু আধটু কথা বলল। একসময় রেহানা চলে গেল। কিছু কাজ বাকি আছে তার। মাইমুনা বসে থাকল। চুপচাপ বসে থাকল। একটু একটু জল জমল চোখে। কষ্ট হতে থাকল। তার কষ্টে যেন আকাশ কষ্ট পায়। গর্জে উঠে। একসময় টুপটাপ বৃষ্টি পড়তে থাকে। মাইমুনা বৃষ্টি দেখে। দেখতে দেখতে কান্না এসে যায় ওর।

সোহাগের কথা মনে পড়ে। আরো খারাপ লাগা বাড়ে। মাইমুনা কষ্ট পায়। গান ধরে। ‘আমার একলা আকাশ থমকে গেছে অনেকক্ষন বৃষ্টি হয়। বৃষ্টি যখন একটু একটু থামে ঠিক তখনই একটা অবয়ব দেখে থমকে যায় সে। কেবল এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। অবয়বটা একটু সরে দাঁড়ায়। লাইটের আলো পড়ে তার চেহারায়। চেহারা স্পষ্ট হয়। মিরার গায়ের কাঁপন বাড়ে। বুকের ভেতর অস্থিরতা বাড়ে। শিনশিনে একটা শীতল অনুভূতি হয়। সে কেবল জল ভরা দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। তারপর কি মনে করে হুট করে এক দৌড় দেয়। গেইট দিয়ে বের হয়ে দৌড়ে তার কাছে যায়। সোহাগ তখন ভিজে চুপসে গেছে। মাইমুনা ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সোহাগ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মাইমুনার বুকের ভেতরটা উন্মাদ হয়ে উঠল। সোহাগকে জড়িয়ে ধরার প্রচণ্ড ইচ্ছে জাগল ওর। সেই ইচ্ছেকে চাপা দিয়ে শক্ত গলায় বলল,

-এখানে কী? সোহাগ জবাব দিলো না। চুপ করে থাকল। মাইমুনা আবার বলল,
-কী করতে এসেছে এখানে? কেন এসেছো? সোহাগে গলা ধরে এলো। ভেজা গলায় বলল,
-আমি আর পারছি না। দম বন্ধ হয়ে আসছিল আমার।
-কি পারছিলে না তুমি?

-তোমাকে না দেখে থাকতে। আমার কেমন জানি লাগছিল। মাইমুনা বিশ্বাস করো আমি পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। আমার নিয়মিত মানুষটি হঠাৎ করে অনিয়মিত হয়ে গেল। হারিয়ে যেতে থাকল। এটা আমি নিতে পারিনি। মোটেও নিতে পারিনি।

-কেন? কেন পারোনি? আর তোমার তো অনেকেই আছে। তাদের সাথে গিয়ে সময় কাটাও। তাদের বাসায় যাও। এখানে কী?

-এখানে আমার অক্সিজেন। সেখানে আমার অক্সিজেন নেই। তুমিই বলো আমি আমার অক্সিজেন ছাড়া বাঁচি কী করে? আর রইলো বাসায় যাওয়ার কথা। মাইমুনা, পুরো ব্যাপারটাই তুমি ভুল বুঝেছো। সেদিন আমি তোমার সাথে দেখা করতে আসিনি তার একটা কারণ তো অবশ্যই আছে। হ্যাঁ আমি জানি আমি বড্ড বেখেয়ালি। কিন্তু বিশ্বাস করো সেদিন আমি আসতেই চাচ্ছিলাম। অনেক জ্যাম পার করে প্রায়ই এসে গেছি। ঠিক তখনই টিনা ফোন দিল। বলল যে ওর এক ব্যাগ রক্ত লাগবে। রক্তের খুবই প্রয়োজন। কারন ওর এক কাজিনের বাচ্চা হবে। আমাদের ব্লাডব্যাংক গ্রুপ থেকে জানল যে আমার সাথে ওর কাজিনের রক্তের মিল আছে। তাই আমাকে ফোন দিয়ে নিয়ে গেল। তুমি বিলিভ না করলে রাসেলকে বলতে পারো।

কারন টিনা যখন ফোন করেছিল রাসেল তখন সাথেই ছিল। এই কারণেই আমি তোমার কাছে আসতে পারিনি। এরপরের দিনে যে দেখলে সেদিন ও আমাকে ট্রিট দিতে নিয়ে যায়। মেয়েটা আসলেই একটু ঢংগি টাইপের। আমাকে জোর করে নিয়ে গেল। আর ফ্লাট করে খুব। এরপর কাল যখন দেখলে তখন আমরা ওর সেই কাজিনদের বাসায় যাচ্ছিলাম। তারা আমাকে আর ওকে দাওয়াত করলেন। যেনতেন দাওয়াত নয়। একদম আমার বাসায় এসে দাওয়াত দিয়ে গেলেন ওর কাজিনের হাজব্যান্ড। খুব করে বললেন আমি যেন যাই। তাইই গেলাম। বিশ্বাস করো আমি মোটেও ইচ্ছে করে কিছু করিনি। এগুলো জাস্ট হয়ে গেছে। এখানে আমার দোষ কী বলো? কেন আমাকে কষ্ট পেতে হবে? মাইমুনার বুকের ভেতরটা হালকা হলো। রাগ ঝরে পড়ল। অভিমানের পাহাড় ভেঙ্গে গেল। অনেক বড় বোঝা যেন মাথা থেকে নেমে গেল। তবুও সে মুখ শক্ত করে বলল,

-এগুলো এখন বলে আর লাভ নেই? যা হবার তা হয়েই গেছে। তুমি চলে যাও এখান থেকে। আর কখনই এখানে আসবে না। সোহাগ কিছু সময় তাকিয়ে থাকল ওর দিকে। তারপর বলল,
-সত্যিই চলে যাবো?
-হ্যাঁ যাও।
-আচ্ছা। যাচ্ছি। সোহাগ যাচ্ছি বলেও গেল না। দাঁড়িয়ে থাকল।
-কই। যাচ্ছো না যে?
-এই তো যাচ্ছি।
-কই? যাও না কেন?
-যেতে দেয় না যে!
-কে যেতে দেয় না?
-চোখ।

-চোখ? কিসের চোখ?
-তোমার চোখ। আমাকে খুব শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে। যেতে দিচ্ছে না। এখন তুমিই বলো যাই কী করে?
-তুমি চোখের ভাষা বুঝো?
-বুঝি।
-কচু বুঝো। ঘোড়ার ডিম বুঝো।
-ঘোড়ার ডিম বুঝার দরকার নেই। তুমি আর তোমার চোখকে বুঝলেই হবে।
-আসছে। আমার প্রেমিক পুরুষ। হুহ!  সোহাগ হাসল কেবল। মাইমুনা কাছে এসে জড়িয়ে ধরল ওকে। একটি প্রশান্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। বলল,
-উফ! এখানে এত শান্তি কেন বলতে পারো? কী এমন আছে এখানে? এই মানুষটার মাঝে কী আছে যে তাকে না দেখে আমি থাকতে পারি না। কী আছে?

-ভালোবাসা আছে। বুঝলে? একবুক ভালোবাসা আছে মাইমুনা হাসল। খানিকটা শব্দ হলো। চোখে খানিকটা জল জমল। ভেজা গলায় বলল,
-কচু আছে এখানে। হুহ! সোহাগ কিছু বলল না। কেবল ওকে জড়িয়ে ধরে থাকল।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত