ছ্যাকা

ছ্যাকা

বাপের হুকুম এ বাজারে গেছিলাম আটা কিনতে। আটা নিয়ে বাড়ি ফিরবার সময় হাঁটুর বয়সী এক  বালিকা আমার শার্টের কলার ধরে চেপে ধরলো!  আমি সামনে পিছনে তাকিয়ে দেখলাম কেউ আছে কি না! যাই হোক মান সম্মানের ব্যাপার তো!  বালিকা আমার চোখে চোখ রেখে বললো, আপনার ভাতিজা রে সাবধান কইরা দিয়েন!

এই কথা শুনে মন টা ই খারাপ হয়ে গেলো। ভাতিজা পড়ে মাত্র থ্রিতে,আর আমি যুবক একটা পোলা! আমারে সাবধান করার কোনো নাম নাই! সাবধান করতে এসেছে আমার ভাতিজা কে!  দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, আফা তোমার নাম কী? আর হেতি আন্নের কী করেছে? সে আবার একটা ঝারি দিয়ে বললো, নাম ময়না , জাইনা রাখেন। আর এটা ও জাইনা রাখেন আপনার ভাতিজা টা কিন্তু বেশি বাইড়া যাইতাছে! আগে সপ্তাহে একবার চিঠি দিতো, আর এখন প্রত্যেকদিন দেয়। আমি কিন্তু এবার স্যারের কাছে নালিশ পাঠামু। আমি মনে মনে ওঁয়া ওঁয়া করে কেঁদে দিয়ে বললাম, এতোদিনে ও বিচার দেন নাই কেনো আফা? তারমানে তো আপনি ও ডুবে ডুবে পানি গেলতেছেন।

আর কষ্ট করে বলবেন যে আমার অপরাধ কী? আমার শার্টের কলার ধরলেন কেনো? আমি তো চিঠি দেই নাই আফা। বালিকা তখন কলার ছেড়ে নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। আর কোনো কথা হয় নাই।  আমি সোজা বাড়িতে এসে ভাতিজা কে রাজকাহিনী টা শুনালাম। ভাতিজা এমন এক দীর্ঘশ্বাস নিলো, মনে হচ্ছে দেবদাস হয়ে গিয়েছে! হাতে একটা কলম নিয়ে বললো, জানিস চাচা, এই কলম। হ্যাঁ এই কলম দিয়ে ময়না পরীক্ষা দিছে। এই কলম না দেখলে আমার রাতের ঘুম হয় না!  আমি মকলেস হয়ে গিয়ে বললাম, ভাতিজা তোর তিন দিন হইলো পাতলা পায়খানা ও হয় না। এটা কিন্তু আল্লাহর একটা নিয়ামত। সে ঝারি দিয়ে কইলো, যখন তখন তোমার এই কথা টা বলা লাগে? এটা কী আমার দোষ? না আমার পেটের দোষ? আচ্ছা শোন না, ও কী ড্রেস পরে আসছিলো রে চাচা? ওরে কিন্তু নীল কাপড়ে হেব্বি লাগে। সমস্যা হইলো এমন জেদি মাইয়া স্কুলে আর ২টা নাই। কী করি বল তো চাচা?

আমি ভাতিজার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ!  মাথা ঘুরছে! মনে হচ্ছে আমি তাঁর থেকে ১০বছরের ছোট! এক গ্লাস পানি পান করে বললাম, নাম্বার আছে না ভাতিজা?  ও কথা টা শুনেই বললো, ০১৮৮২৭০৭৬৫৪! একেবারেই মুখস্থ দেখছি! বাপের নাম,দাদার নাম জিজ্ঞেস করলে ও মনে হয় না এতো তাড়াতাড়ি বলতে পারতো! বললাম, তোর বয়স কত?সে বিরক্ত হয়ে বললো,  বয়স দিয়া কী আসে যায়?  যদি মনে মন মিলে যায়? আমি, হ ভাতিজা, তাইলে এক কাজ কর, এক্ষণি প্রপোজ করে ফেল। আমার ফোন দিয়েই। বলে আমার ফোন টা ওর হাতে ধরিয়ে দিলাম।

সে আর দেরি করলো না!  কী আজব ব্যাপার, কিছুক্ষণ পর ফিরতি বার্তা আসলো, আই লাভ ইউ টু কুদ্দুস! ও এক লাফে খাট ভেঙ্গে ফেলেছে! আমি হিংসায় ওর রুম থেকে বেরিয়ে আসলাম। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো পরের দিন ময়না ওকে এক থাপ্পড় দিয়ে গাল সাদা করে দিয়েছে! কারণ নাম্বার টা ময়নার মায়ের, আর ময়নার বাবার নাম কুদ্দুস। উনি মনে করেছিলেন এই বার্তা কুদ্দুস ছাড়া আর কেউ দিবে না!  বেচারা ছ্যাকা খেয়ে ব্যাকা হয়ে গেলো ।  আজকে সন্ধ্যায় দেখলাম কলম কামড়াচ্ছে আর কবিতা লিখছে, ময়না, আমি তোমার হৃদয়ের হার্টবিট ছিলাম, তুমি কেনো বুঝলে না? ভালোবাসায় আমি পূর্ণ ছিলাম,  কেনো তুমি খুঁজলে না!  সে আবার এই বিষয়ে পাক্কা,  কিছু না হতেই খাতা কলম  নিয়ে বসে পরে।

ভাতিজার এই দুই লাইন কবিতা আমার ভালো লেগে গেলো মুহুর্তেই। যে কারণে ফেসবুকে এই দুই লাইন কবিতা টা লিখে পোষ্ট দিলাম। তারপর এক অবাক কাণ্ড ঘটলো! একটা মেয়ে আমাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট দিয়েছে! ভাবা যায়? একটা মেয়ে! যে মেয়ের চুল লম্বা লম্বা, চোখ দুটো কালো কালো, গালগুলো কমলালেবু, নাক টা হলো পৃথিবীর গোলার্ধ! প্রোফাইলের ফটো দেখে আমি কাত হয়ে শুয়ে পড়েছি! কোনো সুন্দরী বালিকা আমাকে রিকুয়েস্ট দিয়েছে! ভাবতেই কেমন ভালো লাগে! এই অধমকে ছেলেরা ই রিকুয়েস্ট দেয় না, সেখানে আবার সুন্দরী মেয়ে!  গরীবের কপালে প্রেম সয় না, তাড়াহুড়ো করে রিকুয়েস্ট গ্রহণ করতে যেয়ে মুছে ফেলেছি! ডিলিট অপশনে কীভাবে যে চাপ লেগে গেলো বুঝলাম ই না!

সাথে সাথেই ম্যাসেঞ্জার টিং করে শব্দ উঠলো! সে কী! সেই বালিকা টা ই তো ম্যাসেজ দিয়েছে! আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে, ম্যাসেঞ্জারে! মেয়ে টা লিখেছে, দুই লাইন ছন্দ লিখতে পারেন বইলা কী নিজেরে কাজী নাজমুল ইসলাম ভাবা শুরু করে দিছেন? কারো রিকুয়েস্ট একসেপ্ট করা যায় না?  আমি কী উত্তর দিবো বুঝতে পারছি না! এই দুই লাইন ছন্দ ও যে আমি লিখি নাই! বুদ্ধি খাটিয়ে আমি বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠিয়ে নীরব থাকলাম। মেয়ে টা সাথে সাথেই গ্রহণ করে বললো, থ্যাংকস! আপনার ছন্দগুলোর প্রেমে পরে গেছি, আবার ভাববেন না যে আপনার প্রেমে পরেছি।

আমি, না না। বলেই থেমে গেলাম। মেয়ে টা আবারো বললো, খাবো এখন, টা টা। এখন থেকে কিন্তু রোজ বিরক্ত করবো।  এতো খুশি আমি রাখবো কোথায়? ওরে পাগলা কই তুই, বুকে আয়। বলে দৌড় দিয়ে গিয়ে ভাতিজা রে কোলে নিয়ে নাচতে শুরু করলাম। সে এই সুযোগে ৫০০ টাকা ঝেড়ে নিলো আমার থেকে! ময়নার সাথে ওর থাপ্পড়থুপ্পড় চলছে আর আমার সাথে ঐ মেয়েটার। আর হ্যাঁ ঐ সুন্দরী মেয়েটার নাম নচিমন। নচিমন, তুমি আসলে তবে, বহুদিন পরে.. কতো স্বপ্ন বিলাসিতা তবু ও হয়নি শেষ! একবার দেখলে তোমার  ঐ দুই চোখ,  সারাদিনে ও কাটে না যে সেই রেশ!

ইত্যাদি ইত্যাদি কবিতা লিখে লিখে মেয়েটাকে পটানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। একটু একটু কাজ হচ্ছে। এভাবে আমাদের কথা চলছে, আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব। তারপর প্রপোজ, তারপর প্রেম। এভাবে কেটে যায় আরো নয় টি মাস। নচিমন আমাকে নাম্বার দিতে চেয়েছিলো, আমি নেইনি। ফোনে কথা বললে যে টাকা লাগে, সেই টাকা আমার বাবায় যে দেয় না। যে টাকা দেয় সব ভাতিজা ঝেড়ে ঝেড়ে নিয়ে আমাকে ফকির বানিয়ে দেয়।  কিন্তু আজকে আমার মন টা খারাপ। নচিমন না কি আমাকে বিয়ে করবে না! কেনো নচিমন? আমি কি প্রেমিক হিসাবে খারাপ? দেখতে যে খারাপ তা তো আগেই বলেছি! আগে আমি ছন্দ লিখতাম না সত্য। কিন্তু তোমার প্রেমে পরে তো শিখে গেছি, হোক না তা কচুর ডগার মতো কবিতা! তবু ও তো তোমার জন্য!

নচিমন আমার ম্যাসেজ দেখে চলে গেলো! কোনো উত্তর নেই। হঠাৎ রাত চারটে বাজে নচিমন আমার নাম্বার চাইছে! আমি ও দিয়ে দিলাম। সে না কী শুধুমাত্র আমার সাথে কথা বলবে বলে লুকিয়ে ছাদে গিয়েছে! ভাবা যায়? আমার জন্য! এরকম সস্থির অস্থির আমার আগে কখনো লাগে নাই! কিন্তু রাত পাঁচ টা বেজে গিয়েছে! নচিমন এখনো ফোন দেয় না! নচিমন আর ফোন দেয় ই নাই! নচিমন তারপর ম্যাসেজে ই আমাকে বলেছে আমাকে সে বিয়ে করবে। আমি বাড়িতে বলে দিয়েছি। প্রথমে বকাবকি করলে ও পরে নচিমন কে দেখতে যাবে বলে ঠিক করেছে সবাই।

বিয়ে! আমার? বাসর ঘর, আমার? তাহলে অন্য কেউ বাসরঘর সাজাবে কেনো? আমি আগে থেকেই বাসরঘর সাজিয়ে রেখেছি, বিয়ে তো আজ না হয় কাল হবেই। এর মাঝেই নচিমনের নাম্বার আমাকে দিয়েছে। কিন্তু ফোন দিতে মানা করেছে। মাত্র ফোন টা টিং টিং করে বাজতেই দেখি নচিমন ফোন দিয়েছে! আমি দৌড় দিয়ে ফোন টা নিয়ে বাগানে চলে গেলাম। ততক্ষণে ফোন টা কেটে গিয়েছে!

নচিমনের গলার কণ্ঠ টা আর শুনা হলো না! না না, নচিমন আবার ফোন দিয়েছে! এবার খপ করে ধরে ফেলেছি। কিন্তু অপরপাশে নচিমন নীরব!  দুইবার নচিমন, নচিমন বলে ডাকতেই বললো, সরি ভাই, আমি নচিমন না,আমি নুরু শেখ। ছেলেদের ম্যাসেজের কেউ উত্তর দিতে চায় না, তাই ফেইক আইডি দিয়ে একটু দুষ্টুমি করলাম! বলেই ফোনটা কেটে দিলো , আমি তারপর থেকে দুই চোখে সব ঝাপসা দেখছি!

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত