ডাবল ছ্যাঁকা

ডাবল ছ্যাঁকা

ফ্রেন্ডলিস্টের একটা মেয়েকে খুব ভালো লেগে গেছে।। দুই দিন পর পর মিষ্টি মিষ্টি সব ছবি আপলোড করে, আবার সুন্দর সুন্দর স্ট্যাটাস দেয়।। সব দেখে মনে মনে একটা সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেললাম, আমাদের আলাপ আলোচনা জমে গেলে, নিজেদের মধ্যে ভালো লাগা হলে, তারপর আস্তে করে তাকে বউ বানিয়ে নিবো।। আমার আর এখন প্রেম-পিরিতির বয়স নেই।। মেয়েটার আইডি থেকে সব ইনফরমেশন হাইড করা, আমি এখন এমন এক অবস্থায় আছি, কাউকে আগ বাড়িয়ে নক করতে কেমন যেনো দ্বিধা লাগে।। তবুও ভালো লাগাকে অগ্রাহ্য করা যায় না, না হয় আমিই আগে নক করলাম।। মনে মনে ছক আঁকছি, কি ব্যাপার নিয়ে কথা বলা যায়, মেয়েটা আমার লেখায় প্রায়ই লাইক টাইক দেয়, আর কালে ভদ্রে কমেন্ট করে।। আমি ভাবলাম, আচ্ছা মেয়েটার নাম নিয়ে একটা গল্প লিখলে কেমন হয়, পরে তাকে নক দিয়ে বলবো, আপনার অমুক ছবি দেখে মনে হলো এবার আমার গল্পের নায়িকা এমন হওয়া উচিত।। আবার ভাবলাম, না বেশি ছ্যাবলামী হয়ে যায়, বরং গল্প লিখে দেখি না, সে নিজে থেকে নক করে কিনা।।

গল্পটা একটু রোমান্টিক হলে মন্দ হয় না, কিন্তু আমাকে দিয়ে রোমান্টিক গল্প হয় না।। কতবার রোমান্টিক গল্প লিখতে গিয়ে জগাখিচুড়ি পাকিয়ে সেখানে, হত্যা রহস্য, আত্মহত্যা কাহিনী, কত কি ঢুকিয়ে পুরো গোয়েন্দা কাহিনী বানিয়ে ফেলেছি।। আবার রম্য লিখতে গিয়ে রোমান্সের কথা বেমালুম ভুলে যাই।। সাতপাঁচ ভেবে, গুগল ডকে মেয়েটাকে নিয়ে খুব যত্ন করে গল্প লিখতে বসলাম।। ভাবলাম, এইবার আর পর্ব গল্প না, এই গল্প একপর্বে শেষ দিবো, গল্প রিচ হোক বা না হোক, রোমান্সের ছড়াছড়ি থাকবে।। শুরুতেই মেয়েটার নাম দিয়ে শুরু করলাম, গল্পের শুরুটাও এমন ছিলো, মেয়েটার ছদ্মনাম নামটা “ক” দিলাম এখানে, নইলে সে বুঝে যাবে।। আচ্ছা ক, আপনি ঠিক কতক্ষণ আকাশে উড়তে পারেন??

ক আমার দিকে বিষ্মিত চোখে তাকিয়ে বললো- আকাশে উড়বো মানে, বুঝলাম না আপনার কথা??
আমি একটু মুচকি হেসে বললাম- আপনাকে প্রথম দেখার পর থেকেই আমার আপনাকে মানুষ মনে হয় নি।। পরী ছাড়া কারও পক্ষে এতটা নিঁখুত সুন্দর হওয়া সম্ভব নয়।। তাই বলছিলাম, উড়তে পারার ক্ষমতা কতক্ষণের??
মেয়েটা মুক্ত বিহঙ্গের মত হাসি দিয়ে জবাব দিলো- সুন্দরী মেয়ে দেখলেই বুঝি এই লাইন ঝেড়ে দেন??
আমি অপরাধীর মত মাথা নিচু করে বললাম- হুম আজ ২৭ বছর ধরে কোন এক সুন্দরীর দেখা পেলে, এই লাইন বলবো ভেবে রেখেছি, ২৭ বছর ৬ মাস ৯ দিন ১৭ ঘন্টা পর আজ এই কথা বলার মত কোন সত্যিকারের সুন্দরী চোখে পড়লো।।

মেয়েটা ঘড়ি দেখে, সাথে সাথে বলে উঠলো- তারমানে, ১৯৯১ সালের ২৯ নভেম্বর ভোর ৫ টা ১৭ তে আপনার জন্ম।।
এবার আমি অবাক চোখে তাকিয়ে বললাম- আপনি যে পরী তার প্রমাণ কি জানেন, সুন্দরী মেয়েদের বিধাতা বুদ্ধিসুদ্ধি কম দেয়।। তাদের বোকাসোকা বানিয়ে ব্যালেন্স করে রাখে, কিন্তু চোখের পলকে আপনি যে হিসাব কষে দিলেন, তাতে দাঁড়ালো আপনি কোন সুন্দরী মেয়ে না, আপনি আসলে সুন্দরী একটা বুদ্ধিমতি পরী।।

মেয়েটা এবার উপরের ঠোঁট কামড়ে বললো- তো পরীদের সাথে তো জীনের কথা বার্তা হওয়া উচিত, আপনি কেনো এতসব বলছেন?? হুউ- আমি মেয়েটার কথার প্যাঁচে পেরে উঠতে পারছি না, একটু ভেবে বললাম- হুম, সুন্দরী মেয়েদের নাকি জ্বীনেরা অনেক সময় ডিস্টার্ব করে, আমি না হয় মানুষ হয়ে ডিস্টার্বের প্রতিশোধ নিতে সুন্দরী পরীদের একটু ডিস্টার্ব করলাম।। মেয়েটা এবার কেমন গোমড়া মুখের ভান করে বললো- কিন্তু মিস্টার আমি যে ডিস্টার্ব করা একদম পছন্দ করি না!! আমি এবার পুরো নির্বাক!!

থাক্ এখানে লিখে দিলে গল্পটা তো শেষ হয়ে যাবে, এমনিতেই এক পর্বের গল্প।। তো ভাবছিলাম গল্প লেখা তো শেষ, এবার পোস্ট করবো আজকালের মধ্যে।। এমনিই উনার আইডিতে গেলাম, যেটা মাঝে মাঝেই যাই- শুরুতেই দেখলাম ঘন্টা খানেক আগে একটা বাবুকে কোলে নিয়ে ছবি দিয়েছে, ক্যাপশন পড়ে আমার মাথায় বাজ পড়লো, বুকের ভিতর হাতুড়ি পেটা শুরু হলো।। কারণ ক্যাপশনটা ছিলো- আমার মেয়েটা বড় হয়ে যাচ্ছে, কাল ওর দ্বিতীয় জন্মদিন।।

আমি একদম স্তব্দ হয়ে গেলাম।। মাথা চক্কর দিতে থাকলো, মেয়েটা শুধু বিবাহিত না, রীতিমত দুই বছরের এক বাচ্চার মা!! এত কষ্ট করে কাকে ভেবে গল্প লিখলাম, নিজের উপরেই প্রচন্ড রাগ হচ্ছিলো।। একবার মনে হলো, রাগে দুঃখে ব্লক করে দেই তাকে, আর গল্পটা একদম মুছে দেই।। আবার ভাবলাম না থাক, গল্পটার নাম পরিবর্তন করে দিবো, একদম আনকমন সুন্দর একটা নাম দিবো।। যেই ভাবা সেই কাজ, বসে বসে গল্পে উনার নাম পরিবর্তন করে নিলাম।। কিন্তু, ভাবলাম গল্পটা এখন আর দিবো না, অন্যদিন দেয়া যাবে।।

পরদিন আমার হোমপেজে উনার আইডি থেকে মেয়ের জন্মদিন পালনের ছবি এলো কয়েকটা।। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ক্যাপশন পড়ে, আরেক দফা ধাক্কা খেলাম।। এইবার আমার খুশি দেখে কে, আসলে এইটা নাকি উনার বড় ভাইয়ের মেয়ে, ভাতিজিকে উনি নিজের মেয়েই বলেল।। এখন নিজেকে বোকা বোকা সুখী মানব মনে হচ্ছে।। সাথে সাথে মনে পড়লো, ধুর ঐ গল্পে কেন যে উনার নাম পরিবর্তন করতে করলাম।। আবার গিয়ে, আগের নাম মুছে উনার নাম দেয়া শুরু করলাম, প্রথমবার নাম পরিবর্তন করার সময় যতটা কষ্ট হচ্ছিলো, এবার তার দ্বিগুণ, না না বহুগুণ আনন্দ হচ্ছিলো।।

রাতে গল্পটা পোস্ট করে দিলাম, ভালোই সাড়া পেলাম।। অনেকে আমাকে বললো, এত মিষ্টি রোমান্টিক গল্প তারা খুব কম পড়েছে।। আমি অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছি, ইস্ মেয়েটা যদি নক করতো।। ঘন্টা দুয়েক পরে দেখলাম, উনি কমেন্ট করেছে- বাহ্ আমার নামে গল্প, আমার তো আবার প্রেমে পড়তে মন চাচ্ছে।। আমার সাথে সাথেই কমেন্টের রিপ্লাই দিতে ইচ্ছে করছিলো, কিন্তু কি রিপ্লাই দিবো ভেবে পাচ্ছিলাম না।। আবার ভাবলাম, সাথে সাথে রিপ্লাই দেয়া যাবে না, দাম কমে যাবে।। এদিকে ভাগ্য সহায় হলো, সত্যি সত্যি মেয়েটা প্রথমবারের মত আমাকে নক দিলো।। আমি ইনবক্সে হামলে পড়লাম।। উনি লিখেছেন- হ্যালো, ভাইয়া আপনার গল্পটা অনেক সুন্দর হয়েছে।। আমি স্বভাবতই ভাব নিয়ে জবাব দিলাম- ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা জানাই।। উনি লিখলেন- আসলেই আপনি অনেক সুন্দর গল্প লিখেন।। আমি লিখলাম- আচ্ছা, গল্পটা যে আপনার নাম ধার করে লেখা, তা কি জানেন??

-তাই নাকি, বলেন কি।। আপনি কি আমাকে ভেবেই লিখেছেন নাকি?? হ্যাঁ ধরে নিন, আপনার একটা ছবি দেখে মনে হলো, আমার গল্পের নায়িকার এমন হওয়া উচিত।।
-আচ্ছা, কোন ছবি?? বলবো নে অন্য একদিন, আগে বলুন কেমন আছেন??

– আরে বলেন না ভাই, কোন ছবি।। আমি আর ভালো থাকি কিভাবে, সংসার, জামাই, ছেলের পড়াশোনা সব মিলিয়ে আছি কোনরকম।। আমার বুকটা আবার ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।। কিসের সংসার, কার জামাই, কিসের ছেলের পড়াশোনা, কি বলে এই মেয়ে।। আমি কাঁপা কাঁপা হাতে লিখলাম- ও আচ্ছা, কার ছেলের পড়াশোনা, আপনার ছেলে নাকি??

-হ্যাঁ ভাই, আমার দুই ছেলে, একটা এবার ক্লাস ওয়ানে পড়ে, আরেকটার চার বছর, আগামী বছর স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিবো।।

আমি চ্যাট রেখে ইউটিউবে ঢুকলাম।। “মোস্ট স্যাড সং এভার” লিখে সার্চ দিলাম।। কিসে পুছু, হ্যাঁ এসা কিউ, বে জুবাছা ইয়ে জাহা হে- এই গান আসলো শুরুর দিকে।। সোজা এয়ারফোন কানে গুঁজে শোনা শুরু করলাম।।
মুরব্বিরা ঠিকই বলে, বিয়ের বয়সী ছেলেরা হলো ছাগলের মত, এদের নিয়ে শুরুতেই কনে দেখতে যাওয়া ঠিক না।। এরা যা দেখে তাই পছন্দ করে, এদের যদি ছাগীর সামনে নিয়ে বলে, কি রে বিয়ে করবি।। এরা বলবে মাশাল্লাহ্ করবো।।

গানটা শুনতে শুনতে আমার দিন কাটে, রাত কাটে।। আর গল্পটা ডিলিট করে দিয়েছি, এই গল্প থাকলে আমার হৃদয় পোড়ার গন্ধে টেকা যাবে না।। বুক ভরা জ্বালা নিয়ে, আমার রুমের জানালায় গিয়ে, একটা চিৎকার দিয়ে বললাম- দুই দুইটা ছেলের মায়ের প্রেমে পড়ে, তাকে নিয়ে গল্প লেখার মত বোকা লেখক এই দুনিয়াতে আমি ছাড়া আর কে আছে!! কে আছে!! অদ্ভুত ভাবে প্রাক্তনের গায়েবী কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম মনে হচ্ছে- তোর মত বান্দরের এমন শিক্ষার দরকার আছে!! দরকার আছে!!

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত