শাস্তি

শাস্তি

বাসার গেইটের সামনে নেইমপ্লেটে খুব সুন্দর করে লেখা ডক্টর শ্রাবণী ইসলাম।উনার বাসার দরজার সামনে রিপোর্ট হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি।কিন্তু দরজা খোলার কোন নাম গন্ধ নেই।পরিচিত একজন বলেছিলো ডক্টর শ্রাবণী ইসলাম না কি খুব ভালো ডাক্তার। উনি না কি নিজের বাসায় রোগী দেখেন। তাই উনার বাসায় চলে এসেছি কিন্তু অনেকক্ষণ হয়ে গেলো কেউ দরজা খুলছে না। হঠাৎ ৫, ৬ বছরের একটা মেয়ে দরজা খুলে বললো,

-কাকে চাই?

মেয়েটার দিকে তাকিয়ে খুব অবাক হয়ে গেলাম। এত সুন্দর মেয়ে আমি কখনো দেখি নি।দেখে মনে হচ্ছে একটা পুতুল।কিন্তু খুব অবাক করা বিষয় হলো মেয়েটার চোখের সাথে সানজিদার চোখের খুব মিল। আমি বাচ্চা মেয়েটাকে বললাম,

–কেমন আছো মা?
-আমি ভালো কিন্তু আপনি কার সাথে দেখা করবেন?
–আমি ডাক্তার শ্রাবণী ইসলামের সাথে দেখা করার জন্য এসেছি।

কিন্তু আজ তো সোমবার।সোমবারে আম্মু কারো সাথে দেখা করে না। কারো সাথে ভালো করে কথাও বলে না। সারাক্ষণ রুমে একা বসে থাকে। এমন কি আমার সাথেও কথা বলে না।

— তাহলে মা আমি চলে যায় অন্য একদিন আসবো।
-আংকেল আপনি আমার হোমওয়ার্ক করার কাজে হেল্প করবেন?

বাচ্চা মেয়েটার মুখ থেকে কথাটা শুনার পর কিছুটা অবাক হয়ে গেলাম। আমাকে চিনে না জানে না তারপরেও আমাকে বলছে তার হোমওয়ার্ক করে দিতে। আমিও রাজি হয়ে গেলাম কেননা বাচ্চা মেয়েটার মাঝে সানজিদার একটা ছায়া খুঁজে পেয়েছিলাম। বাসার ভিতরে ঢুকে দেখি বাসাটা খুব সুন্দর করে সাজানো। আমি তখন বাচ্চা মেয়েটাকে বললাম,

–আসো মা তোমার হোমওয়ার্ক করে দেয়। বাচ্চা মেয়েটাকে যখন আমি হোমওয়ার্ক করাচ্ছি তখন কেউ একজন ভিতর থেকে বললো,
~নাযাহা কার সাথে কথা বলো?
-আম্মু এক আংকেল আমায় হোমওয়ার্ক

করিয়ে দিচ্ছে। এই কথা শুনে কেউ একজন ভিতর থেকে ড্রয়িংরুমে আসলো। তাকিয়ে দেখি সানজিদা। আজ প্রায় ৮ বছর পর সানজিদার সাথে দেখা।

~নাযাহা তুমি ভিতরে যাও। তোমার আংকেলের সাথে আমি কিছু কথা বলবো।

-কিন্তু আম্মু তুমিতো সোমবারে কারো সাথে কথা বলো না।
~তোমার এই আংকেলের সাথে শুধু সোমবারে কথা বলা যায়। সানজিদার কথা শুনে বাচ্চা মেয়েটা চলে গেল। সানজিদা আমার পাশেএসে বসলো। আমি অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে সানজিদাকে বললাম,

–নাম হঠাৎ করে পাল্টে ফেললে যে।
~ভিতরের আমিটাকেই তো পাল্টে ফেলেছি সেখানে নামে কি আসে যায়।
–তোমার মেয়েটা খুব সুন্দর হয়েছে।
~মেয়ের নামটা সুন্দর হয় নি?

আমি কিছু না বলে চুপ করে রইলাম।আজ থেকে ৮ বছর আগে আমি আর সানজিদা আমাদের বাচ্চার নাম রাখা দিয়ে খুব ঝগড়া করতাম।আমি বললাম বিয়ের পর আমাদের প্রথম সন্তান মেয়ে হবে আর তার নাম রাখবো নাযাহা আর সানজিদা বলতো নাম রাখবে তোয়া।

~কেমন আছো পিয়াস?
–হে ভালো।
~বিয়ে করেছ? আমি কিছু না বলে শুধু সানজিদার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিলাম।
~পিয়াস আজ আমার একটা উপকার করবে?
— কি?
~আজ অন্তত আমায় কিছু বলো।

তোমার যা ইচ্ছা তাই বলো। তোমার এই নিশ্চুপ থাকাটা আমার প্রতিটা রাত জেগে থাকার কারণ। আমি যা করেছি খুব খারাপ করেছি।তোমার সাথে রিলেশন থাকা অবস্থায় আমি সাকিবকে ভালোবেসে ফেলি। সাকিবের সামনে তোমায় মিথ্যা বলে খুব অপমান করি।কিন্তু তুমি শুধু আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলে। আমি বুঝতে পারি নি তখন তোমার চোখের ভাষা।

— আমি যায় এখন
~প্লিজ পিয়াস আজ আমায় খারাপ মেয়ে বলো, আমায় আঘাত করো তাহলে অন্তত আমি আমার পাপের কিছুটা শাস্তি পাবো। আমি সানজিদার দিকে তাকিয়ে আবার মুচকি হাসি দিয়ে বললাম,

— এখন কি শাস্তি কম পাচ্ছ?চাইলে অনেক কিছু করতে পারতাম কিন্তু তারপরেও কিছু করি নি এর চেয়ে কঠিন শাস্তি এই পৃথিবীতে নেই। সানজিদার বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় হাটছি। কেন জানি বুকের ভিতর সেই চিনচিন ব্যথাটা শুরু হয়েছে। ৮ বছর ধরে জমে থাকা কষ্টটা আজ বুক ফেটে বের হতে চাইছে। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো,

— হ্যালো…
~সানজিদা বলছি।
–নাম্বার কোথায় পেলে?
~তোমার রিপোর্ট কার্ডে পেয়েছি। হঠাৎ মনে হলো রিপোর্ট কার্ডটা ভুল করে সানজিদার বাসায় ফেলে এসেছি।
–কাঁদছ কেন?
~পিয়াস প্লিজ ফিরে এসো।

তুমি বিশ্বাস করো আমি তোমায় ভালো করবো। আজকাল ক্যান্সার ভালো হয়। এখনো সময় আছে প্লিজ তুমি ফিরে এসো। তুমি আমাকে শাস্তি দিতে গিয়ে নিজের জীবনটাকে এইভাবে শেষ করে দিও না। আমি ফোনটা কেটে দিলাম। সানজিদা বারবার আমায় ফোন দিচ্ছি কিন্তু ফোনটা আমি কখনোই রিসিভ করবো না। আজ খুব রোদ উঠেছে। হাটতে খুব কষ্ট হচ্ছে কিন্তু আমি তারপরেও হাটছি আর ভাবছি, আমি হয়তো কয়েকদিন পর একেবারেই মরে যাবো কিন্তু সানজিদা সে তো প্রতি রাতেই মারা যাচ্ছে। হাইরে দুনিয়া এইখানে সবারি তার কর্মফল ভোগ করতে হয়….

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত