অবিশ্বাস

অবিশ্বাস

৫ বছরের সম্পর্কের পর শ্রাবন্তীর সাথে আমার নতুন একটা সম্পর্ক হয়! ভালোবাসার পরিপূর্ণতা আসে দুজন মানুষ একই ছাদের নিচে থাকার বৈধ অধিকার পাওয়ার মাধ্যমে! আমি আর শ্রাবন্তী দুজন দু ধর্মের থাকার কারনে পারিবারিক ভাবে আমাদের সম্পর্কটা কেউই মেনে নিচ্ছিলো না! আমরা পালিয়ে বিয়ে করেছিলাম! শহর থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে পালিয়ে ছিলাম ১৬৭ দিন! আমাদের মাঝে ভালোবাসার কমতি ছিল না কখনোই! এক প্লেটে ভাত মাখিয়ে একজন অন্যজনকে খাইয়ে দেওয়া, একই বালিশে মাথা রেখে বিপরীত মানুষটার নিশ্বাসের শব্দ অনুভব করা, একজনের মন খারাপে অন্যজন বিষন্ন হয়ে যাওয়া, সবই হয়েছে বছরের পর বছর!

সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিলো! বিয়ের ৯ বছর পর শ্রাবন্তী কেমন বদলে যেতে লাগলো! আগের মতো অতটা যত্ন এখন আর তার কাছে পাওয়া যায়না! একদিন রাতে ঘরে ফিরে সিগারেটের গন্ধ টের পেলাম! আমি এবং শ্রাবন্তী দুজনের কেউই সিগারেট খাই না! তবে ঘরের ভেতর কে প্রবেশ করলো! নিশ্চয়ই আমার ঘরে কোন পুরুষ মানুষ প্রবেশ করে! পরদিন আবার অফিস থেকে ঘরে ফিরে সিগারেটের গন্ধ টের পেলাম! শ্রাবন্তীকে না জানিয়েই ঘর তল্লাশি করলাম! খাটের নিচে দুটো সিগারেটের ফিল্টার পেলাম! আমার সন্দেহ আজ প্রায় সত্যি হলো! শ্রাবন্তী কি তাহলে অন্য পুরুষের সংস্পর্শে যায়! নাহ, আমি এসব একদমই ভাবতে পারছি না! যাকে ভালোবাসি তার মন এবং শরীর অন্য কারো সাথে শেয়ার করার কথা কল্পনায়ও ভাবা যায়না!

আজকাল শ্রাবন্তীকে বড্ড অসহ্য লাগে! ঘরে- বাইরে কোথাও আমি স্থির হতে পারছিনা! আমার নিজেকে খুব অসহায় লাগছে! এতবছর পর এসে শ্রাবন্তী আমাকে ঠকাবে, এটা মেনে নেওয়া কঠিন! ক’দিন যাবত অফিস শেষে ঘরে ফেরার পর্যাপ্ত কারন খুজে পাইনা! সেদিন শাহবাগ মোড় থেকে ১৩ প্যাগ হুইস্কি খেয়ে ঘরে ফিরলাম! জীবনটাকে ভীষন অসহ্য লাগছে! তারচেয়েও বেশি অসহ্য লাগছে শ্রাবন্তীকে! ঘরের দরজা খুলে রুমে প্রবেশ করার পর নাকে সিগারেটের গন্ধ আসতে লাগলো! বন্ধ রুমে বসে কেউ সিগারেট খেলে তার গন্ধটা খুব বাজে হয়! শ্রাবন্তী খাটের উপর শুয়ে আছে!  রান্নাঘর থেকে ছুরিটা হাতে নিয়ে রুমে ঢুকলাম! শ্রাবন্তীর মুখটা চেপে ধরে গলায় ছুরি চালিয়ে দিলাম! গলার চামরা এত মোটা যে সহজে কাটতেই চায়না! শ্রাবন্তী হাত-পা ছোড়াছুড়ি করতে শুরু করলো! আমি তার গলায় ছুড়ি চালিয়ে যাচ্ছি অনবরত! আর মুখে বলে চলেছি ” শুয়োরের বাচ্চা, আমারে ঠকিয়ে অন্য বেডার লগে বিছানায় যাস”! শ্রাবন্তীর গলায় ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে! রক্তের রং লাল! একটু পর শ্রাবন্তী হাত-পা নাড়াচাড়া করা বন্ধ করে দিল! তার নাকের কাছে হাত রেখে নিশ্চিত হলাম, খানকির বাচ্চা মারা গ্যাছে!

ফ্লোরে লাল হয়ে লেগে থাকা রক্তের ছোপ ছোপ দাগ দেখে আমার নেশা কাটতে শুরু করলো! নেশা যখন সম্পূর্ন কেটে গেলো তখন বুঝতে পারলাম, এটা কি করেছি! যার কন্ঠনালী থেকে বের হওয়া শব্দ না শুনলে আমি বাঁচতে পারিনা, তার কন্ঠনালীর উপরই কি নিষ্ঠুরভাবে ছুরি চালিয়ে দিয়েছি! যাকে ভালোবাসি, তাকে হত্যা করার কথা মাথায় আসাটাও পাপ! কিভাবে কি করে ফেললাম, জানি না! শ্রাবন্তীকে একবার অন্তত সিগারেটের ব্যপারটা জিজ্ঞেস করার দরকার ছিল! আমার বুক ফেটে চিৎকার করতে ইচ্ছে হচ্ছে! আমার চোখ বেয়ে টপ টপ করে জল পরছে ফ্লোরে! শ্রাবন্তীর রক্ত মাখা মাথাটা তার শরীর থেকে আলাদা হয়ে ফ্লোরে পরে আছে! আমি ফ্লোর থেকে শ্রাবন্তীর মাথাটা হাতে নিয়ে বুকের ভেতর জরিয়ে ধরলাম।

মেয়েটার চোখ দুটো এখনো আমার দিকে মায়া নিয়ে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে! আমার চোখের সামনে শ্রাবন্তীর প্রথম দিনের দৃশ্য ভেসে উঠলো! নিশ্পাপ একজোড়া চোখ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ভালোবাসি বলেছিলো! এতগুলো বছর একসাথে থাকার পরও মানুষটা কোনদিন বিরক্তির কারন হয়নি! হঠাত করে শ্রাবন্তী কেন আমার সাথে প্রতারণা করলো? আমি শ্রাবন্তীর মাথাটা বুকে চেপে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম! সারারাত শ্রাবন্তীর মাথাবিহীন লাশের পাশে বসে কাটিয়ে দিলাম! সকালে পুলিশ এসে লাশ ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠালো! আমাকে গ্রেফতার করা হলো! সমস্ত ঘরের জিনিসপত্র পুলিশ জব্দ করলো! আমাকে টেনে হিচরে জেলে পাঠানো হলো! ৪৭ দিন পর আমার বিচার কার্য শুরু হলো! আমি জানি আমার শাস্তি হবে মৃত্যুদন্ড। এবং এই শাস্তির জন্য আমি প্রস্তুত! শ্রাবন্তীকে ছাড়া বেঁচে থাকাটা অর্থহীন! আবার একটা প্রতারক শ্রাবন্তীর সাথে বেঁচে থাকাটাও অর্থহীন হয়ে দাঁড়িয়েছিলো!

আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়েছে! সাক্ষ্য- প্রমাণ অনুসারে আমি দোষী! আমার ঘর থেকে শ্রাবন্তীর লেখা একটা ডায়েরী পাওয়া গ্যাছে! ওটাতে লিখা একটা চিঠিও সবার সামনে পড়ে শোনানো হলো! প্রিয় অনিমেষ, তোমার সাথে সারাজীবন কাটিয়ে দেওয়ার কথা রাখার জন্য পরিবার ছেড়ে তোমার কাছে চলে এসেছিলাম! মা- বাবাকে খুব মনে পরে জানো! কতবার মিলিকে ফোন দিয়ে বাবার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছি, তুমি জানো না! কিছুতেই বাবা কথা বললো না! আমি যে তাদের মেয়ে, তারা এই পরিচয়টাই দিতে চায় না! তুমি রাতে ঘুমিয়ে পরলে, আমি বারান্দায় বসে কতরাত কান্না করি!

আজকাল চোখের জল ও কেমন শুকিয়ে এসেছে! পরিবার ছাড়া তোমাকেই একমাত্র আপন করে পেয়েছি!
অথচ দ্যাখো, এই ৯ বছরেও তোমাকে একটা সন্তান দিতে পারিনি! একটা মেয়ে হয়ে সন্তানের মা না হতে পারার যে কি যন্ত্রণা, তা তোমাকে বুঝাতে পারবো না! আমি জানি, তোমারও একটা সন্তানের খুব অভাববোধ হয়! শুধু আমাকে ভালোবাসো বলে কখনো কিছু বলনি! স্বামী হিসেবে তুমি ততোটাই ভালো, যত’টা ভালো প্রেমিক হিসেবে ছিলে! আমি খুব ভাগ্যবতী জানো, ভাগ্যবতী না হলে তোমার মতো এত ভালো একটা স্বামী কিছুতেই পেতাম না! তুমি খুব দূর্ভাগা, আমাকে বিয়ে করারর কারনে বাবা হওয়ার তৃপ্তিটাই পেলে না!

আজকাল খুব বিষন্নতায় দিন কাটছে! ঠিক মতো ঘুমাতে পারিনা! তোমার মুখের দিকে তাকালেই নিজেকে অপরাধী লাগে! ক’দিন যাবত, সিগারেট খাচ্ছি খুব! নিচের দোকান থেকে কিনে এনে রেখেছি! তুমি বাসায় আসার আগেই রুম স্প্রে করে রাখি! আমি বুঝি, সিগারেটের গন্ধটাও তুমি একটু একটু টের পাও! শুধু ভালোবাসো বলে কিছু বলোনা! এরকম মাতৃত্বহীন একটা জীবন নিয়ে বেঁচে থাকাটা ভীষন কষ্টের, অনিমেষ! মাঝে মাঝে খুব মরে যেতে ইচ্ছে হয়! তোমার মুখের দিকে তাকালে আরো একজীবন বেঁচে থাকতেও ইচ্ছে হয়!
কি এক দোটানার জীবন আমার!

আজই শেষ সিগারেটটা জ্বালালাম! প্যাকেটে একটাই সিগারেট ছিলো! আর কখনোই সিগারেট খাবো না! আজ পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে আনন্দের দিন! একটু আগেই চেকআপ করে দেখেছি, আমার গর্ভে তোমার সন্তান! সৃষ্টিকর্তা এতদিন পর আমাদের মুখের দিকে তাকিয়েছে! তোমার ঘরে ফেরার অপেক্ষায় আছি! তোমার তৃপ্তির হাসি মাখা মুখটা দেখিনা কত দিন! আজ তোমার হাসিটা দেখবো! আজ পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ হবো!

ইতি,
তোমার শ্রাবন্তী!

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত