চোখ বুজল অনিন্দ্য

চোখ বুজল অনিন্দ্য

অনির্বাণ অনেকক্ষন টানা বলার পর থামল। সবাই তখনো ওর দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মত চেয়ে আছে। কিছুক্ষন পর সবার যখন ঘোর কাটল, হাততালির শব্দে বড়ো কনফারেন্স রুমটা ভড়ে উঠল। সত্যিই তো , সদ্য প্রতিষ্ঠিত এই company টাকে দেশের অন্যতম সেরা করে তুলতে তিনি যে পরিশ্রমটা করেছেন, তার জন্য এই হাততালি তার প্রাপ্য। তার অসাধারন বাচনভঙ্গি আর ব্যাক্তিত্বের টানে সবাই অনির্বাণ বলতে পাগল।

—————

পুরুলিয়ার একটা অজ পাড়া গা। লালমাটির দেশ। এখানে হয়ত প্রকৃতির রুক্ষতা আছে, কিন্তু সেটা ঢেকে যায় মানুষগুলোর অমায়িক ব্যাবহারে। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজেও রুক্ষ মাটিতে ফসল ফলানোর দৃঢ় অঙ্গীকার দেখলে অবাক হতে হয় বৈকি। গ্রামটার পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে একটা ছোট্ট নদী। কোথা থেকে এটার শুরু , সেটা কেউ জানে না। গ্রামের বয়স্করা আজও রূপকথার গল্পে ঘুম পাড়ায় দস্যি ছেলে-মেয়েকে। এই গ্রামেরই বড় মাঠটার পূব দিকে ওই ছেলেটার বাড়ি। কোন ছেলেটা !! … আচ্ছা সে না হয় পরেই জানা যাবে। আর উত্তর দিকে ওই মেয়েটার বাড়ি। ওই মেয়েটার পরিচয়ও নাহয় পরেই জানবো আমরা।

—————–

অনুষ্ঠান থেকে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল। এখন প্রায় 2 টো বাজে। সাধারণত অনির্বাণ এত রাত করে না। সে যতই কর্পোরেট জগতের মানুষ হোক না কেন, সবসময় বিশ্বাস করে “Early Bed early rise , Keep healthy & wise”। ফিরেই প্রথমে মা কে ফোন করতে গিয়ে থমকে গেল। “নাঃ , এত রাতে মাকে ফোন করে লাভ নেই। নিশ্চই ঘুমিয়ে পড়েছে।” সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠল মার মমতাময়ী মুখটা। ভিতর থেকে কেমন যেন একটা কান্না ঠেলে উঠে আসল অনির্বাণের। আসলে মার সঙ্গে দেখা হয়নি প্রায় 2 বছর হয়ে গেল। মা বার বার আসতে বললেও কাজের চাপে বা বলা ভালো কাজের নেশায় বহুদিন বাড়ি ফেরা হয়নি।

হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল অনির্বাণের। আচ্ছা মাকে সারপ্রাইস দিলে কেমন হয়। একসপ্তাহের ছুটি নিয়ে বাড়ি গেলে মা যে কি খুশি হবে , সেটা তো ওই জানে। ব্যাস, যেমন ভাবনা , তেমনি কাজ। কয়েকজন অধস্তন কর্মচারীর সঙ্গে পরামর্শ করে নিয়ে ফ্লাইট এর টিকিট কেটে নিল। মুম্বাই টু কলকাতা , ইন্ডিগো , Airbus- 7488, সময় – 1:30 pm। অনির্বাণ মনে মনে কল্পনা করতে লাগল, ওর মা ওকে দেখে কি যে করবে !! কেমন যেন নাচতে ইচ্ছা করল অনির্বাণের। নেচেও নিল কিছুক্ষন। নাঃ , এইবার দেরি হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি তৈরি হতে হবে যে …..

—————

একদল দস্যি ছেলে স্কুল যাচ্ছে। মাঠের ধূলো উড়িয়ে, অর্ধেক পথ দৌড়িয়ে, কারোর বাগানের জামরুল পেরে নিয়ে যখন অবশেষে ওরা স্কুল পৌছালো , ততক্ষনে প্রেয়ার শুরু হয়ে গেছে। হেডমাস্টার মশাই একবার রক্তচক্ষু দিয়ে তাকালেন। তাতে অবশ্য দমবার পাত্র নয় তারা। বিশেষ করে এদের লিডার , ওই ছেলেটা। প্রেয়ার শেষ করে সবাই ক্লাসে গিয়ে বসল।

আবার সবাই একসঙ্গে হল টিফিনের সময়। ক্লাস টেন এর পরীক্ষা দেবে তারা , তাই স্কুলে তারাই সিনিয়র। জুনিয়র দের টিফিন না খেলে কি আর সিনিয়র হওয়া যায় !! স্কুলের করিডোর ধরে হাটছিল ওরা, হটাৎ দেখল মেঘনা , ওই মেয়েটা, ওদের দিকেই আসছে। বেশ দ্রুত পায়ে। এসেই ঝাঁঝিয়ে বলে উঠল — “এই তোরা কালকে আমাদের পোষা কুকুরটাকে ঢিল মেরেছিস কেন রে ? ও বেচারা এখন খোঁড়াচ্ছে”

— “যা বাবা , কুকুরটাই তো আমাদের দেখে ঘেউ ঘেউ করছিল, তাই দিলাম একটু শিক্ষা” , ছেলেটা বলে উঠল , কেমন যেন চ্যালেঞ্জের সুরে।

মেঘনা এবার বেশ রেগে গেছে, ফর্সা গালটায় লালচে আভা ফুটে উঠেছে, “শোন তোকে লাস্ট বার ওয়ার্নিং দিয়ে গেলাম, এরপর এরকম কিছু হলে তোকে ছাড়ব না”, বেশ জোর গলায় বলে গটগট করে চলে গেল।

নাঃ , এরপর ঘটনাটা আর বেশি দূর গড়াই নি। ছেলেটা ঢিলটা না জেনেই ছুড়েছিল কুকুরটার গায়ে। আসলে যদি ও জানত কুকুরটা মেঘনা দের , তাহলে এই কাণ্ডটা কখনই ঘটতো না। বরঞ্চ একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। ওই ছেলেটার মেঘনাকে ভালো লেগে গেল। মেঘনাকে সেই কথাটা বলতেও গেছিল বার তিনেক। কিন্ত বার বার ও ফিরে এসেছে। ফিরে আসবেই না কেন , একেই মেঘনার বাবা বড় পুলিশ অফিসার, তার ওপর মেঘনা হল এই গভর্মেন্ট স্কুলের ফার্স্ট গার্ল। ওর মতন বাপ মরা, গরিব, ফেল করতে করতে পাশ করে যাওয়া ছেলেকে মেঘনার মতন মেয়ে পাত্তা দেবে কেন !! কিন্তু ছেলেটার ভালোলাগা শুধু ভালোলাগাতেই থেমে রইল না, কখন যেন ভালোবাসায় পরিণত হল। ছেলেটা যেন পাল্টে গেল, কেমন যেন শান্ত হয়ে গেল। 1 বছর পর যখন মাধ্যমিকের পরীক্ষা হল, তার রেজাল্ট বেরোতে দেখা গেল , স্কুলে মেঘনা ফার্স্ট হয়েছে, কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ছেলেটা পঞ্চম হল।

—————

অনির্বাণ এয়ারপোর্ট এ পৌঁছেছে প্রায় মিনিট 20 হয়ে গেল। একটা ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাচ্ছে সে। একবার ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে নিল। নাঃ , এখনো প্রায় ঘন্টা দেড়েক বাকি ফ্লাইটের। আবার ম্যাগাজিনের পাতায় মনোনিবেশ করল সে। কিন্তু কিছুতেই মন বসছে না। আসলে ওর যেন আর তর সইছে না, কখন মাকে চমকে দেবে।

কিছুক্ষন পর ম্যাগাজিনটাকে ব্যাগে ঢুকিয়ে কফির খোঁজে বেরোল। গতরাতের ওত উত্তেজনা আর পরিশ্রমের ধকলটা এখনো কাটেনি। লম্বা করিডোরের শেষ প্রান্তে একটা বাঁক, তারপরই সারি সারি দোকান। একটা দোকান থেকে কফি নিয়ে সে পেমেন্ট করে ফিরতে যাবে, এমন সময় দূর থেকে এক ভদ্রমহিলাকে দেখে সে যেন ভূত দেখার মতন চমকে উঠল। তার হাত থেকে কিছুটা কফি চলকে শার্টে পড়ল। কিছুক্ষন হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল ভদ্রমহিলার দিকে …..

————–

প্রেসিডেন্সি উনিভার্সিটি তে ভর্তি হয়েছে অনিন্দ্য। বাণী বিদ্যাপীঠের সেই দুস্টু ছেলেটা , আজ অনেক শান্ত। অনেক বেশি মনোযোগী। মাধ্যমিকের পর উচ্চমাধ্যমিকেও যথেষ্ট ভালো রেজাল্ট করে সে মায়ের মুখের হাসি আরও চওড়া করেছে। প্রতিবেশীরাও ওকে খুব ভালোবাসে। আগে যারা গাছের জামরুল বা আম পড়ালে লাঠি হাতে তাড়া করত, আজ তারাই ডেকে নিয়ে গিয়ে যত্ন করে খাওয়ায়।

মাধ্যমিকে যথেষ্ট ভালো রেজাল্ট করলেও উচ্চমাধ্যমিকে সে আর্টস বেছে নিয়েছিল। কারন ওর সংগীতপ্রেম। ভবিষ্যতে একজন বড় সংগীতশিল্পী হওয়ার বাসনা নিয়েই সে কলকাতায় পা রেখেছে। কিন্তু এখানে আসার পর থেকে সে একাকিত্বে ভুগছিল। মা আর বন্ধুদের ছেড়ে এত দূরে থাকতে তার যেন দমবন্ধ হয়ে আসছিল।

প্রথম দিন ক্লাসে যাওয়ার সময় গেট দিয়ে ঢুকে দূর থেকে একজনকে দেখে চমকে গেল সে। মেঘনা …. । আগের থেকে আরো সুন্দরী হয়েছে । আসলে মাধ্যমিকের পর মেঘনা সায়েন্স নিয়ে অন্য স্কুলে চলে যায়। আর অনিন্দ্যও নিজের ভবিতব্য কে মেনে নিয়ে মেঘনাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ভুলতে পারিনি সে, সেটা আজ বুঝতে পারল। মনের মধ্যে আবার সেই ঝড়টা শুরু হল। নাঃ ক্লাসের দেরি হয়ে যাচ্ছে। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে ক্লাসে ঢুকল অনিন্দ্য …….

—————-

ফ্লাইট ল্যান্ড করেছে অনেকক্ষন হল। লাগেজ নেওয়ার জন্য ওয়েট করছে অনির্বাণ। কিছুক্ষন পরই লাগেজ পেয়ে যাওয়াতে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে আসল সে। আগে থেকেই এক বন্ধুকে বলে রেখেছিল সে। সেই বন্ধুটিই গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। অনেক দিন পর দুই বন্ধুর দেখা। কাজেই কিছুটা সময় কেটে গেল ঠাট্টা-ইয়ার্কি-খুনসুটিতে। তারপর তারা রওনা দিলো গ্রামের উদ্দেশে।

রাস্তায় যেতে যেতে বন্ধুটা অনর্গল বকে চলছিল। কিন্তু অনির্বাণের যেন সেদিকে হুস নেই। আসলে সে ভেবে চলছিল আজকের ঘটনাটা। ওই ভদ্রমহিলা যার সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল , সে হল মেঘনার প্রিয় বান্ধবী সুপর্ণা। অনির্বাণ চমকে গিয়েছিল , কারণ একটা বড়ো রহস্যের সমাধানের পথ সে যেন হটাৎ দেখতে পেয়েছিল। তার মনে সব ঘটনা গুলো একসঙ্গে জট পাকিয়ে যাচ্ছিল। “নাঃ এখন আর ভাবতে ইচ্ছা করছে না .. ” মনে মনে বলল অনির্বাণ। আবার মন দিল বন্ধুর বকবকানিতে।

যেতে যেতে দেখতে পেল আকাশে ঘুড়ি উড়ছে। আরে , সত্যিই তো খেয়াল ছিল না যে আর পাঁচদিন পরই সরস্বতী পুজো। তার মধ্যে আবার চনমনে ভাবটা ফুটে উঠল। কতদিন সে আর অনিন্দ্য মাঠে-ঘাটে দৌড়েছে ঘুড়ি লোটার জন্য। এইজন্য কত বকাই না খেয়েছে তারা। হাত-পা ছোড়েছে , একবার তো অনিন্দ্যর হাত মুচকে গিয়ে কি কেলেঙ্কারি !! …

আর যেইবার অনিন্দ্য প্রপোজ করল মেঘনাকে , ওরা দুজনেই তখন বেশ বড়। ভাবলেই হেসে লুটোপুটি খেতে ইচ্ছা করে। ফিল্মি স্টাইলে একটা হলদে-ঘিয়ে রঙা “পেটকাট” ঘুড়ির মধ্যে “তোমাকে ভালোবাসি” লিখে উড়িয়ে কত কায়দা করে যেই না মেঘনাদের বাড়ির ছাদে ফেলেছে , দেখে কাকু , মানে মেঘনার বাবা তখন বাড়ি ঢুকছে। তারা দুজনেই ওই মানুষটাকে যমের মতন ভয় পেত। তাই তাড়াতাড়ি ঘুড়িটাকে নামিয়ে নিয়ে পগার পার। কিন্তু মেঘনা এর মধ্যেই দেখে ফেলেছিল ঘুড়িটাকে। ওদের ওত পরিশ্রম বৃথা যায়নি। মেঘনাও এক রৌদ্রজ্জ্বল দিনে উনিভার্সিটির ক্যান্টিনে অনিন্দ্যকে নিজের ফোন নাম্বার দিয়ে গিয়েছিল। তারপর ওদের প্রেম এগিয়েছে গল্পের মতন। অনিন্দ্যও ডিপার্টমেন্টের টপ করেছে , তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মেঘনাও JAM ক্লিয়ার করে সোজা আই আই টি বোম্বাই। তারপরও তাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। রাতের পর রাত কেটে যেত ফোনের বার্তালাপে। সবই বলেছিল অনিন্দ্য অনির্বানকে।

কিন্তু তারপরই যে কি হল … এখনও পুরোটা রহস্য অনির্বাণের কাছে। এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যেয় সে অনিন্দ্যর বাড়িতে গেলে জানতে পারে অনিন্দ্য UK এর একটা টপ উনিভার্সিটি তে চান্স পেয়ে গেছে এবং সে ওখানেই চলে যাচ্ছে। খুব অবাক হয়েছিল অনির্বাণ, কারণ মেঘনা আর অনিন্দ্য – দুজনেই শপথ করেছিল যে বিদেশে যাবে না তারা, তাহলে একে অপরকে ছেড়ে বহুদিন থাকতে হবে যে। মেঘনার কথা জিজ্ঞেস করতে অনির্বাণকে দু-চার কথা শুনিয়ে দেয় অনিন্দ্য। অনির্বাণ ও আর কিছু জিজ্ঞেস না করে চলে এসেছিল সেই দিন। পরে জানতে পারে অনিন্দ্য সত্যিই UK চলে গেছে। ভেবেছিল অনিন্দ্য ফোন করবে কিন্তু নাঃ, সত্যিই যেন ছোটবেলার বন্ধুকে ভুলে গিয়েছিল ও। বহুদিন কোনো যোগাযোগই করেনি। শেষে অনির্বাণও হাল ছেড়ে দিয়েছিল।

মেঘনাকেও খুঁজে বার করতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বিধি বাম। দুজনেই কোথায় যেন মিলিয়ে গিয়েছিল। দু-বছরের মধ্যে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে অনির্বাণও ব্যাস্ত হয়ে পড়েছিল কর্মজগতে প্রবেশ করার জন্য। তাই অনির্বানের মনেও ওদের অস্তিত্বটা হালকা হয়ে আসছিল। তারপর ব্যাস্ত কর্মজীবনের চাপে মনের কোন গহন অন্ধকারে চলে গিয়েছিল সেইসব স্মৃতি , কে জানে।

এইসব ভাবতে ভাবতে আর বন্ধুর অনর্গল বকবকানি শুনতে শুনতে নিজের গ্রামে পৌঁছে গেল অনির্বাণ। ওই তো দূর থেকে সাদা রঙের দোতলা বাড়িটা তার কাছে পরিষ্কার হয়ে আসছে। সেই মাঠটা এখনো আছে। শিশুরা-কিশোর-যুবক সবাই খেলছে, হাসছে , দৌড়াচ্ছে। প্রাণ ভরে শ্বাস নিল অনির্বাণ। বিশুদ্ধ বাতাস। ওই তো বাড়িটা প্রায় চলে এসেছে। এইবার মাকে চমকে দেবে সে …….

————–

ঋতমের কাছ থেকে ফোন পেয়ে দ্রুত তৈরি হয়ে নিল অনিন্দ্য। আজকে ওর এতদিনের তৈরি করা প্ল্যানটা কাজ করতে চলেছে। তবে এরকম অবাভনীয় ভাবে সুযোগ চলে আসবে ভাবতে পারিনি সে। খুব দ্রুত তৈরি হয়ে অনির্বাণের বাড়ি পৌঁছে গেল। কাকিমাকে আগে থেকেই বলে রেখেছিল সে আসছে। তবে কাকিমাকে বলেনি অনির্বাণ আসছে। আর তারপর অনির্বাণ যখন ঘরে ঢুকল, মাকে দেখে চমকাবে কি , অনিন্দ্যকে দেখে অনির্বাণেরই ভিরমি খাওয়ার জোগাড় হয়েছিল। কাকিমাও চমকে গিয়েছিল ভীষণ, অনেকদিন পর নিজের ছেলেকে দেখতে পেয়ে। তাও আবার না বলে কয়ে আসা। তারপর আর কি, সেই সন্ধ্যাটা আবার জমিয়ে আসর বসেছিল অনির্বানের বাড়িতে। অনির্বানের বাবা কাজ থেকে ফেরার পর আরেক রাউন্ড অবাক হওয়ার পালা চলেছিল।

তারপর রাতে একসঙ্গে শুতে যাওয়ার সময় অনির্বাণ চেপে ধরে অনিন্দ্যকে। “শালা, এত বছর ছিলি কোথায় !! ” … দুই বন্ধুর মান-অভিমানের পালা শেষ হলে পরে অনির্বাণকে সব কিছু খুলে বলে অনিন্দ্য। সেই রাতটা যে কোথা থেকে কেটে গিয়েছিল, দুজনের কেউ বুঝতে পারেনি।

———–

“দ্যাখো, পাথরগুলো কি সুন্দর না।”– শিশুসুলভ আনন্দের সঙ্গে বলে উঠল মেঘনা। অনির্বাণ হেসে উঠল। সত্যি, পড়ন্ত সূর্যের নরম আলোয় মেঘনার নিষ্পাপ মুখে একটা অদ্ভুত লাবণ্য। ঢেউ গুলো এসে পা ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ কোথাথেকে একটা কাঁকড়া এসে গর্ত করে ঢুকে পড়ল। সেই দেখে মেঘনা পড়িমরি করে দৌড় শুরু করল। অনির্বাণ ও হাসতে হাসতে ওকে অনুসরণ করল। মোবাইলটা বিপ-বিপ আওয়াজ করে উঠল। একটা অচেনা নং থেকে একটা মেসেজ এসেছে — ” গান্ডু, আর কখনো ব্যাক্তিগত ডাইরি সবার সামনে রাখবি না। আমি তোকে কিন্তু পরের বার আর সুযোগ দেব না “। মুখে হাসি ফুটে উঠল অনির্বাণের। ও রিপ্লাই দিল — “পরের বারও মেঘনা আমার”, সঙ্গে একটা হাসির ইমজি।

রিপ্লাই পেয়ে হেসে উঠল অনিন্দ্য। বিকেলের পড়ন্ত আলোয় সে অনুভব করতে চেষ্টা করল মেঘনার হাসি মুখটা। ও নিশ্চিন্ত, মেঘনা খুব খুশি থাকবে অনির্বানের কাছে। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করল ওদের দুজনের হানিমুনটা যেন খুব ভালো কাটে। শুধু হানিমুনই নয়, গোটা জীবনটাই যেন কেটে যায় রূপকথার মতন।

ওর মনে পড়ে গেল, একদিন ক্রিকেট ম্যাচ খেলার সময় বল অনির্বানের হাতে লেগেছিল। সে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল অনির্বাণকে। তখনই অনির্বাণের পড়ার ডেস্কের ওপর দেখেছিল লাল মলাটের ডাইরিটাকে। আগে তো কোনোদিন দেখেনি সে। একটু কৌতূহল বশত সে তুলে নিয়েছিল হাতে। কিন্তু পাতা উল্টাতে গিয়ে থমকে গিয়েছিল। যা দেখেছিল তখন নিজের চোখে বিশ্বাস করতে পাড়েনি। প্রতিটা পাতা ভরে ছিল মেঘনার প্রতি তীব্রতম ভালোবাসার শব্দবুননে। বুঝতে পেরেছিল নিজের বন্ধুর ভালোবাসাকে সার্থক করতে মনের কষ্টকে মনেই চেপে রাখছে অনির্বাণ। খুব রাগ হয়েছিল অনিন্দ্যর। একইসঙ্গে কেমন যেন একটা কষ্ট। ওকে অনির্বাণ বললেই পারত।

তার কিছুদিন পরে হঠাৎ বুকের বা দিকটায় প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করে অনিন্দ্য। তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি অনেকগুলো টেস্টের নির্দেশ দেন। টেস্টের রিপোর্টে দেখা যায় অতন্ত্য বিরল গোত্রের Arrhythmia বাসা বেঁধেছে অনিন্দ্যর বুকে। ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছিল আর হয়ত 2-3 বছর। মার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও স্মিত হাসি হেসেছিল সে। বুঝতে পারছিল , মেঘনাকে যে ভাবেই হোক দূরে সরাতে এবার। ও যদি সত্যি জানতে পারে, তাহলে হয়ত বিয়ে না করেই সারা জীবন কাটিয়ে দেবে। প্রথমে সে মাকে রাজি করায় মেঘনাকে কিছু না বলার। তারপর একদিন মেঘনাকে যাচ্ছেতাই ভাবে অপমান করে। ওর সঙ্গে কোনো কারণ ছাড়াই ব্রেকআপ করে নেয়। শুনেছিল মেঘনা খুব ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু বিশ্বাস ছিল ওর, মেঘনা সব সামলে নেবে। শেষ চেষ্টা হিসেবে সে UK তে যায় অন্যতম সেরা ডাক্তার দেখাতে। কিন্তু সেই ডাক্তারও হার স্বীকার করে নেয়। এরপর নিজেকে গুটিয়ে নেয় সে। সবার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তাই 3 মাস পর সে আবার গ্রামে ফিরলেও কেউ কিছু জানতে পারেনি সে কোথায় আছে। কিন্তু তার মধ্যেই প্ল্যান করে নেয় অনির্বাণ আর মেঘনাকে মেলানোর।

কিন্তু সুযোগ পাচ্ছিল না, কারণ অনির্বাণ কবে আসবে সে এই ব্যাপারে কিছুই জানত না। আর মেঘনার দিক থেকে যে কোনো সমস্যা হবে না সেটা সে জানত। অনেকবার সে বুঝতে পেরেছে , অনির্বানের প্রতি মেঘনার একটা ভালোলাগা আছে। তবে সে এটাও জানে, মেঘনা ওকেই সত্যি ভালোবেসে ছিল।

তবে এসবের জন্য সে সমান কৃতজ্ঞ ঋতমের কাছেও। আসলে ওই ফোন করে খবর দেয় অনির্বাণ আসছে। অনির্বাণই নাকি ওকে ফোন করে গাড়ি নিয়ে এয়ারপোর্ট এ আসতে বলেছিল।

———–

সেই রাত্রে অনির্বাণ খুব কেঁদেছিল পুরো গল্পটা শোনার পর। অনিন্দ্য তাকে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিল তার কিছু হবার আগে সে বিয়ে করবে মেঘনাকে। আরও প্রতিজ্ঞা করিয়েছিল যে মেঘনাকে অনির্বাণ কিছুই বলবে না।

অনির্বাণ এয়ারপোর্ট এ সুপর্ণার কাছ থেকে জেনে নিয়েছিল মেঘনার এখনো বিয়ে হয়নি। সে নাকি এখন IAS এর জন্য জোরকদমে প্রিপারেশন নিচ্ছে। সুপর্ণার থেকে আর বেশি কিছু জানতে পারে নি সে। কারণ সুপর্ণার ফ্লাইট ছাড়ার সময় হয়ে গিয়েছিল। আজকে ওর সামনে পরিষ্কার হল পুরো ঘটনাটা।

সরস্বতী পুজোর পর একদিন অনির্বাণের বাবা-মা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয় মেঘনা দের বাড়িতে। এত বড় কর্পোরেট বিজনেসম্যান কে ফেরাতে পারেনি মেঘনার মা-বাবা। মেয়ের জন্য এর থেকে সর্বগুনসম্পন্ন কোনো উপযুক্ত পাত্র পাবে না জানত তারা। আর মেঘনার আগে থেকেই অনির্বানের প্রতি ভালোলাগা তো ছিলই। তার সঙ্গে কাজ করেছিল, অনিন্দ্যকে তাচ্ছিল্য আর অপমান করার ইচ্ছা।

তাই দুই বাড়ির সম্মতিতেই বিয়ের সানাই বেজে উঠেছিল। চার হাত এক হয়েছিল অগ্নিকে সাক্ষী রেখে।

———–

উফঃ, ব্যাথাটা আবার বাড়ছে। অনিন্দ্য পাশ ফিরে শুলো। চোখের কোনা দিয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। মুখের অক্সিজেন মাস্কটা খুলে একটু প্রকৃতির অক্সিজেন নিতে চেষ্টা করল। চারিদিকে মেশিনের বিপ বিপ শব্দ হয়ে চলেছে। নিজের সঙ্গে লুকিয়ে রাখা ফোনটাকে সুইচ অফ করল। ডাক্তার দেখতে পেলে খুব বকাবকি করবে। ওহঃ , ওই তো মেঘনা এই দিকে ছুটে আসছে মনে হচ্ছে। হওয়ায় ওর চুলগুলো উড়ছে। হাতের কাচের চুড়ির রিন-ঝিন শব্দ আসছে। মুখে সেই মিষ্টি হাসি। …..

হসপিটালের কাছেই কোথাও থেকে ভেসে আসছে ..
Bhula dena mujhe
Hai alvida tujhe
Tujhe jeena hai mere bina ………

চোখ বুজল অনিন্দ্য।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত