চিঠি

চিঠি

অনেকদিন পর পাভেলের চিঠি পেয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম যে ওর সাথে দেখা করব।চিঠিতে ওর ঠিকানা ফোন নম্বর সবই ছিল কিন্তু আগে থেকে জানালাম না সারপ্রাইজ দিব বলে।ট্রেন থেকে নামতেই বুঝলাম যে ভুল কোন স্টেশনে এসে নেমেছি কিন্ত পকেটে হাত দিতেই মনে পড়ল চিঠি এবং মোবাইল দুইটিই ভুলে রেখে এসেছি। কি করব ভেবে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম বাসায় আর ফিরব না,অচেনা এই গ্রাম ঘুরেই যাব। ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলতে হবে এই জন্য যে, চলতি পথে এক ভদ্রলোকের সাথে দেখা হয়ে গেল যার নাম আলম; যিনি পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক, আমাকে তার বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।

আলম সাহেবের বাসাটা অনেক পুরোনো সেই ব্রিটিশ আমলের, স্যাঁতসেঁতে আর ঘরের ভিতর খুব একটা আলো বাতাস ঢোকেনা।তারপরও বাড়িতে কি যেন এক আকর্ষণ আছে, সম্ভবত একটা পুরনো ঐতিহাসিক বাড়ি বলে।
গ্রামাঞ্চল বলেই সম্ভবত এখানে বিদ্যুতের অবস্থা তথৈবচ, সারাদিনের মধ্যে বিদ্যুৎ খুব কম সময়ই থাকে।এমনাবস্থায় দুপুরে খাওয়ার পর একটু ঝিমুনির মত এসেছে, হঠাৎ লক্ষ্য করলাম আমার পাশে একটি অপরূপ সুন্দরী কিশোরী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগে সে বলে উঠলো, আমার নাম অনি, আলম আমার ভাই।আপনার জন্য হাতপাখা নিয়ে কতক্ষণ আর দাঁড়িয়ে থাকবো। আমি অনিকে বসতে বললাম, ওর সম্পর্কে আমি জানতে চাইলাম।

মেয়েটি হাতপাখাটি টেবিলে রেখে নিজের সম্পর্কে বর্ণনা করতে লাগলো।ও ক্লাস নাইনে পড়ে, লেখাপড়ায় অসম্ভব রকমের কাঁচা।সর্বশেষ অর্ধবর্ষ পরীক্ষায় সে ইংরেজি আর গণিতে ফেল করেছে। ওর বাবা মা কেউই নেই, একমাত্র ভাই আলমকে নিয়েই সংসার।বাসার রান্নাবান্না সব ওর ভাই করে তবে সে একটু আধটু সাহায্য করে। অনি তার বড় ভাইকে অসম্ভব রকমের ভয় করে, বাসার কোনো মেহমান তার সাথে দেখা করুক সেটা তার ভাই চায়না।এই জন্য অনি আমাকে অনুরোধ করলো যাতে ওর সাথে দেখা হওয়াটা যেন তার ভাইয়াকে না বলি, তাহলে সে হয়তো রাগারাগি করতে পারে।

কাছেই এক নদী আছে, যার পাড়ে আমি আর অনি প্রায়ই গভীর রাতে হাঁটাহাঁটি করি আর জ্যোস্না দেখি, যদিও এখন পর্যন্ত ওর ভাই এটা টের পায়নি। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে ওর ভাই আলম রাতে খেয়ে একদম দেরি করেনা, ক্লান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।মানুষটি অনেক ভালো, আমাকে বলেছে যতদিন ইচ্ছা আমি এখানে থাকতে পারবো,তার কোনো সমস্যা নেই। একদিন রাতে আমি আর অনি নদীর পাড়ে বসে জ্যোস্না দেখছি, হঠাৎ খেয়াল করলাম কে যেন দূর দিক দিয়ে এদিকে এগিয়ে আসছে।অনি কি করবে বুঝতে না পেরে দৌড় দিয়ে গাছের আড়ালে লুকিয়ে গেলো।

লোকটি কাছে আসতেই পোশাক দেখে নিশ্চিন্ত হলাম, উনি একজন নাইট গার্ড।নাম তার করিম, বয়স হবে ৫০-৫৫ এর মতন।লোকটি আমাকে জিজ্ঞাসা করলো এত রাতে এখানে কি করছি, আমি বললাম রাতে জ্যোস্না দেখি।তিনি আমার পরিচয় নিলেন আর বললেন ঐ যে বাসায় আছি ওটা নাকি একটি ভৌতিক বাড়ি, কোনো মানুষ সাহস করে যেতে চায়না। লোকটি আমাকে একটু জোড় করেই ঐ বাড়িতে এগিয়ে দিয়ে আসলো, আমাকে নদীর পাড়ে থাকতে দিলোনা।আমি অনির কথা বলতে সাহস পেলাম না,বিষয়টা দেখতে ভালো দেখায়না।

অনি সারাদিন আমার সাথে আর দেখা করল না, সন্ধ্যার পরে রুমে এসে শুধু বললো,আপনি কেমন পুরুষ? একটা মেয়েকে গভীর রাতে নদীর পাড়ে একা ফেলে রেখে চলে এসেছেন।এই কথা বলতেই সে কেঁদে দিল আর আমার রুম থেকে চলে গেল। কাজটা যে মহা অন্যায় হয়েছে তা বুঝতে পারলাম, মেয়েটির জন্য আমার অনেক খারাপ লাগলো আর মায়া হল। আমি ওকে কিছু না বলেই আবার নদীর পাড়ে যেতে থাকলাম।প্রথম তিনদিন সারা রাত একা একা নদীর পাড়ে কাটালেও চতুর্থদিন অনি ঠিকই নদীর পাড়ে আসলো।

অনি আমাকে বললো, সে নাকি এখানে আর আসত না, একটা কথা বলার জন্য এসেছে।আমি জিজ্ঞাসা করতেই ও বললো বিষয়টা ওর ভাইয়া আলমকে নিয়ে।ওর ভাইয়া নাকি আমাকে খুন করবে।আমি ওর কথা শুনে অনেক হাসলাম,বললাম এটা কি করে সম্ভব?তার মত এমন একজন ভালো মানুষ আমাকে খুন করবে! এটা হতেই পারেনা।আমি বললাম, সে আমাকে খুন করলে তার কোন লাভ নেই।তার সাথে আমার কোন দেনা পাওনা নেই।অনি বললো আমি যেন আমার বেদরুমটা ভালোভাবে খোঁজ করি, তাহলেই উত্তর পেয়ে যাবো। অনি নদীর পাড়ে আর বেশীক্ষণ থাকলোনা,ওর ভাই আলম যদি টের পায় সমস্যা হয়ে যাবে।আমিও কিছুক্ষণ পর নসির পাড় থেকে চলে আসলাম।মনের ভিতর কেমন জানি অস্থিরতা কাজ করলো।

আজ ঘুম থেকে উঠতেই প্রতিদিনের মত নাস্তা পাশের টেবিলে রাখা আছে।কিন্তু আমি উঠে দাঁড়াতেই খেয়াল করলাম দরজাটা বাইরে থেকে লক করা।আমি প্রচন্ড ধাক্কাধাক্কি করছি কিন্তু দরজা খুলছেনা।আমি চিৎকার করছি কিন্তু কারো কোন সাড়া শব্দ নেই।আমার ভয় লাগছে অনির সাথে যে আমি প্রতি রাতে নদীর পাড়ে হাঁটতে যাই, এটা আলম সাহেব সম্ভবত দেখে ফেলেছে।আমার চিন্তা এখন ওকে আমার মত আটকে রেখেছে কিনা! সন্ধ্যা হতেই আলম সাহেব আসলেন, প্রতিদিনকার মত আজ দুপুরে কোন খাবারও দেওয়া হয়নি।আলম সাহেব বললেন আর মাত্র তিনদিন পর অমাবস্যা, ঐদিন রাতেই আমাকে খুন করা হবে।আমি কারন জানতে চাইলাম, চিৎকার করলাম কিন্তু কোন লাভ হলো না।

তিনদিন ধরে আমি অনেক কাঁদলাম, অনেকটা বাচ্চাদের মত করে।দরজার নিচ থেকে প্লেটে মাছ মাংস সবই দেয় কিন্তু কিছু খেতে ইচ্ছা করেনা। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঘরটা বেশ বড়, ঘরের মধ্যে বিভিন্ন পুরোনো আমলের আসবাব পত্রে ভর্তি।হঠাৎ করে বিছানার পাশে থাকা তালা মারা আলমারির দিকে আমার নজর পড়লো। অতি আগ্রহের বসেই হোক কিংবা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে হোক আমি আলমারিতে জোরে ধাক্কা দিলাম।সম্ভবত অনেক বছরের ক্ষয়ে যাওয়া কাঠ ছিল বলে বোধহয় আলমারির সামনের অংশ ভেঙে গেল।আমি বাকি অংশ টেনে ফেলতেই অন্ধকারে উপলব্ধি করলাম যে কিছু ভারী বস্তু আমার গায়ে এসে পড়েছে।

আমি হাত বুলালাম এবং নিশ্চিত হলাম যে আলমারির ভিতর তিনটি কংকাল ছিল যা আমার গায়ের উপর এসে পড়েছে। আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম।এমন সময় লাইট জ্বলে উঠলো আর আলম ঘরে প্রবেশ করলো। সে হাসতে হাসতে বলে উঠলো, চিন্তা করো না বন্ধু।কিছুক্ষণ পর তোমার অবস্থাও ওদের মতোই হবে।আমি বললাম কি বলেন? আলম বললো, আমি শয়তানের পূজারী।গত কয়েক বছর ধরে আমি মানুষ সাধনা করছি যাতে অনেক শক্তির অধিকারী হয়ে অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।কিন্তু দুঃখের বিষয় হল আগের তিনজনকে বলি দিয়েও আমি পূর্ণ শক্তি অর্জন করতে পারিনি তাই অবশেষে তোমাকে বেছে নিলাম।

আমি বললাম,আমি তো আমার বন্ধু পাভেলের চিঠি পেয়ে বেড়াতে এসেছি।ভুলে মোবাইল আর চিঠিটা না আনতে পারায় তোমার এখানে এসে উঠেছি।আলম বললো, কালো জাদুর প্রভাবে তোমাকে পথ ভুলিয়ে এখানে আনা হয়েছে।আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমার সব কিছু শেষ করা হবে, তোমাকে শয়তানের উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া হবে। আমি আস্তে আস্তে অনুভব করতে লাগলাম, নিজের অজান্তেই আমি সিঁড়ি বেয়ে হেঁটেহেঁটে ছাদে চলে এসেছি। আমার শরীরের সব শক্তি নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে, হাত পা আর নড়াতে পারছিনা, চোঁখে আসছে অনেক ক্লান্তির নিদ্রা।চোখ বন্ধ করতে করতে শেষ বারের মত চিৎকার দিয়ে বলে উঠলাম, আল্লাহ আমার সহায় হউন।

আমার জ্ঞান ফিরতেই দেখি ছাদে অনেক মানুষের জটলা।আমাকে কয়েকজন ঘিরে বসে আছে।আমি খেয়াল করলাম সেই নাইটগার্ড করিমের হাতে পানি ভর্তি জগ, সম্ভবত আমার গায়ে পানি ছিটিয়েছে যাতে আমার জ্ঞান ফেরে। আমি করিমের কাছে কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করতেই সে বলল, মানিক জনবিচ্ছিন্ন মানুষ, সে কারো সাথে মিশে না।সবার ধারণা সে কালো জাদুর চর্চ্চা করে এবং খারাপ কোন কিছুর সাথে সে জড়িত।আপনার মত একজন ভদ্রলোক এখানে বেশকিছু দিন যাবৎ পড়ে থাকায় গ্রামের অনেকের মনে আপনাকে নিয়ে সন্দেহ হয়। আমি বললাম,ওর নাম আলম না? স্থাণীয় স্কুলের শিক্ষক? নাইটগার্ড করিম উত্তর দিল, না, ওর নাম মানিক।ও কোন শিক্ষকতা করেনা, সারা দিন বন জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় আর সন্ধ্যার পর দরজা বন্ধ করে ধ্যান করে।

আমি লক্ষ করি, প্রতিদিন আপনি গাভীর রাতে একা একা নদীর পাড়ে যেয়ে বসে থাকেন।আমি গ্রামের মানুষদের এটা জানাই।হঠাৎ করে রাতের বেলা আপনার নদীর পাড়ে যাওয়া বন্ধ হলে আমাদের আপনার নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ হয় আর রাতের আঁধারে আমরা বাড়ির চারপাশে ঘোরাফেরা করি।আপনি চিৎকার দিতেই আমরা ছাদে চলে আসি আর মানিক কেন জানিনা ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্বহত্যা করেআমি বললাম মানিকের না এক বোন আছে, ক্লাস নাইনে পড়ে, নাম তার অনি? করিম উত্তর দিলো কি বলেন? মানিকের তো কোন বোনই নেই আর অনি নামের কোন মেয়েই স্থানীয় স্কুলে পড়েনা।পড়লে তো আমি অবশ্যই জানতাম, এই গ্রামের মোটামুটি সবাই একে অপরকে চেনে।

গ্রামে অনেক খোঁজ করলেও অনি নামের মেয়েটিকে আর কোনদিন দেখা হলোনা।অনেকগুলি প্রশ্ন মনে রেখেই বাসায় ফিরে আসলাম।নিজের ভুলটি এখন খুব ভালো ভাবেই মনে পড়ছে।আমার মোবাইলটি আমি বেডের সাইড টেবিলের ড্রয়ের ভিতর রেখেছিলাম, চিঠিটির সাথে।পরে রওনা দেওয়ার আগে আর জিনিস দুইটি ভুল করে নেওয়া হয়নি। বাসায় ফিরে ড্রয়ার খুলে মোবাইলটা ঠিকই পেয়েছি তবে রহস্য একটাই, চিঠিটি আর কোনদিন খুঁজে পাইনি।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত