জীবন

জীবন

আমার নাম প্রেরণা ইস্থার। জন্মধর্ম একজন খ্রিষ্টান বলে সমাজে পরিচিত। একজন খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী হয়েও এক মুসলমান ছেলের প্রেমে পড়বো এমনটা কখনো ভাবিনি। কিন্তু মন যে এমন বাধাহীন তা জানা ছিলোনা। মন না কোন ধর্ম মানে, না মানে কোন সমাজ।

অনিক নামের ছেলেটির সাথে প্রথম পরিচয় ফার্মগেট মনিপুরী পাড়ায়। সবেমাত্র উত্তরা থেকে শিফট হয়ে ফার্মগেট আস্থানা গড়েছি। দিনের প্রথম সুর্য আর ডূবন্ত সুর্য দুটোই আমার অনেক পছন্দ। প্রতি রাতের নিশি চান্দের আলোয় অনেক অগোছালো কথা একে যাই মনেতে। অপেক্ষা করি ভোর রাত পর্যন্ত শুধুমাত্র এটা দেখার জন্য কিভাবে রাতের অন্ধকার কাটিয়ে পৃথিবীতে সুর্যের আগমন হয়। আর সন্ধ্যাবেলায় অপলক লাল আভা, আবছা নীল আকাশ, আর উড়ে যাওয়া সাদা মেঘের কোলেতে কিভাবে সুর্য ঢলে পড়ে। নতুন ভাবে জাগ্রত হবার অপেক্ষায়। এ দৃশ্য যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অপুর্ব দৃশ্য। এমন দৃশ্য দেখার জন্য হলেও বার বার মানুষ হয়ে পৃথিবীতে জন্ম নিতে ইচ্ছে হয়। যত কষ্ট কিংবা সুখ থাকুক না কেন, জন্ম যেন মানুষ রুপেই হয়।

প্রতিদিনের মত আজকেও ছাদের রেলিং ধরে পশ্চিম আকাশের দিকে এক পলকে তাকিয়ে রয়েছি। কানেতে ভেসে আসছে আযানের সুমধুর ধ্বনি। এরই মধ্যে আকাশ চিত্র পরিবর্তন হয়ে উঠেছে, লাল আভায় পশ্চিম আকাশ যেন বার বার জানান দিচ্ছে আবার আসবো নতুন আলো নিয়ে পুর্ব আকাশের হাত ধরে। এই সময়টাতে আমার সত্তা জুড়ে যা থাকে তা কেবলই এই প্রাকৃতিক খেলা দেখার প্রবল ইচ্ছা। ব্যস্ত এই নগরীর মাঝে আমি যেন কোন ব্যস্তহীন মানব। যার হাতে অঢেল সময় রয়েছে সন্ধ্যারাতির খেলা দেখার জন্য। নতুন বাসা কাউকে তেমন চিনিও না, তাই একা একাই ছাদে এসে অপেক্ষার প্রহর গুনে যাচ্ছি। আমার ভাবনার মনেতে যার প্রতিধ্বনি আচড় কেটে গেলো তাকে আমি চিনিনা কিংবা জানিও না।

শুধু কানেতে ভেসে আসলো “আকাশ কি খুব ভালোবাসেন?” কথাটি শুনে পেছন ফিরে তাকালাম। আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক একুশ বাইশ বছরের সুদর্শন যুবক। মুখে তে ঘোচা ঘোচা দাড়ি, চোখে চশমা, একটি আকাশীরং এর টিশার্ট ফুলপ্যান্ট পড়া এক মানব। হাতে ১৯৯৫ এর মডেল ক্যাসিও ঘড়ি হাতে। তাকে ভালোভাবে একনজর দেখে আবার আকাশমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার নীরবতা সে হয়ত মেনে নিতে পারেনি, তাই আবার বলে উঠলো “অচেনা মানুষদের সাথে বুঝি কথা বলেন না? ” আমি আবার ঘুরে তাকালাম আর বলতে লাগলাম, “আসলে তা নয়, আমি এখন অন্য কাজে ব্যস্ত আছি” কাছুমাছু কন্ঠে সে বলল “আমি অপেক্ষা করছি কাজ শেষ করুন।” আমি আর কথার প্রতিউত্তর করলাম না। আমার পশ্চিম আকাশে সুর্যের তলিয়ে যাবার দৃশ্য দেখায় মেতে উঠলাম।

এক সময় সুর্য তলিয়ে গেলো। আকাশের ঠিক মধ্যস্থানে অবস্থান করছে পুর্নিমা চাঁদ। মিটি মিটি তারা জেগে উঠতে লাগলো, আমি ছেলেটিএ দিকে একবার তাকালাম, সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আমার মতই আকাশে নতুন নতুন সাজ দেখছে। আমি তার সম্মুখীন হয়ে বললাম “কি যেন বলতে চেয়েছিলেন?” সে মুখে মুচকি হাসি নিয়ে বলতে লাগলো, “আকাশে সুর্যের তলিয়ে যাওয়া, অন্ধকার হতেই চাঁদ বের হয়ে আসা, মিটি মিটি তারা জোনাকির মত জলে উঠা সত্যিই অপরুপ তাইনা?”

— তা তো বটেই। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর আর মধুরতম দৃশ্য বোধ হয় এটাই।
০- হুম ঠিক বলেছেন। বাই দ্যা ওয়ে, আমার নাম অনিক। আপনার নাম?
— প্রেরণা ইস্থার।
০- সুন্দর নাম তো, নতুন এসেছেন বুঝি এই বাসায়।
— হ্যা। গতকালই এসেছি।

প্রথম পরিচয় বিনিময়ের সাথে আমাদের আলাপ হতে শুরু করলো। আমামার আর অনিক এর যে কাজটি মিলে গিয়েছিলো তা হচ্ছে দুজনেরই আকাশ নিয়ে বড্ড চাঞ্চল্যতা মনেতে। প্রতিদিন তার সাথে সন্ধ্যাবেলায় দেখা হতো শুধুমাত্র আকাশ দেখার বাহানায়। নতুন বাসায় মাস গড়িয়ে গেলো, একে একে ছয়মাস। আজকাল অনিক কে সাথে করে হাজার গল্প আর সুর্য আকাশের মিলিত হবার দৃশ্য না দেখতে পারলে মনে হয় কি যেন নেই। কিছু একটা বাদ পড়েছে যা কোনভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব না।

একদিন আমি আর অনিকক ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে নিজেদের গল্প করছিলাম। সেদিন শুক্রবার ছিলো, অনিক কথার তালে তালে আমাকে বললো “প্রেরণা ভালোবাসতে হলে কি দরকার হয়”। কিছুক্ষন ভেবে উত্তর দিলাম ভালোবাসতে শুধু একটি মন দরকার হয় পবিত্র মন।

— শুধু মন থাকলেই ভালোবাসা যায়?
০- হ্যা।
— তুমি কাউকে কখনো ভালোবেসেছো?
০- ভালো তো বাসি আকাশ কে, সুর্য কে, চাঁদ তারা নদী কে।
— প্রেমিক হিসেবে কাউকে?
০- সেরকম ভাবে ভেবে দেখিনি কখনো!
— আমাকে নিয়ে কি একবার ভেবে দেখবে?

কথাটি বলে অনিক আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো। আমি অবাক হয়ে গেলাম তার কথা শুনে। কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমি কিছু বলতে যাবো সে সুযোগ অনিক আমাকে দেয়নি আমার হাতে একটি কাগজের টুকরো ধরিয়ে দিয়ে সে হনহনিয়ে চলে গেলো। আমি অবাক হয়ে তার চলে যাওয়া দেখলাম। আকাশের দিকে মুখ করে একবার ভেবে নিলাম, সে কি তবে জানে না আমি খ্রিষ্টান ধর্মের মেয়ে। যদি জানতো তাহলে এভাবে অবশ্যই কথা বলতো না। এই কাগজের টুকরোতে কি রয়েছে সেটাও একবার দেখা উচিত। আসলে আমার দেখা কি উচিত হবে? ধুর উচিত অনুচিত পরে দেখা যাবে, পৃথিবীতে কতকিছুই তো কারন ছাড়া হয়। এটাও না হোক কোন কারন ছাড়া একবার পড়ে দেখা যাক কি রয়েছে এতে। অনেক অগোছালো প্রশ্নের ঝট মাথায় বেধে হাতে রাখা কাগজের পাণ্ডুলিপি খুলে চোখের সামনে ধরলাম। এক এক করে ভেসে উঠলো চোখের মধ্যে কাগজের মধ্যে লেখা অনেক আবেগ মিশ্রিত শব্দগুচ্ছ গুলো।

প্রেরণা ইস্থার, আমার কথায় হয়ত অবাক হয়েছো। অনেক প্রশ্ন হয়ত মাথায় ঝড় তুলেছে। তবে এটাই সত্য এতদিনে ধীরে ধীরে তোমার প্রতি অনেক দুর্বল হয়ে গিয়েছি। এই দুর্বলতার নাম জানিনা আমি, তবে এটুকু জানি এই দুর্বলতা তে শুধু তোমাকে পাশে চাই। অক্সিজেন ছাড়া যেমন নিশ্বাস নেওয়া যায়না তেমনি করে আমার দুর্বলতা তুমিহীনা কখনো কাটবে না।

ভেবো না আমি তোমার সম্পর্কে কিছুই জানিনা। তোমার সব খবরই নিয়েছি আমি তোমার ধর্ম আমার ধর্ম এক নয়। আজকের পর হয়ত তুমি আমাকে শুধুই ঘৃনা করবে, এতকিছু জানার পরেও আমি কেনই বা তোমাকে ভালোবাসার কথা বলতে গেলাম। না বলেও থাকতে পারছিলাম না। দম বন্ধ হয়ে মারা যাবার অবস্থা হয়েছে আমার, বুকের ভেতরেই কথাগুলো উইপোকা হয়ে কুরে কুরে আমার হৃদপিন্ড, কলিজা, হৃদয়কে খেয়ে যাচ্ছিলো। এ যন্ত্রনা আমি সইতে পারছিলাম না। তাই তোমাকে জানিয়ে দিলাম কথাগুলো। তোমার কাছে অনুরোধ আমাকে ভালো না বাসতে পারলেও ঘৃনা করিও না কোনদিন। তাহলে নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারবো না। রেলিং এর উপরে একটি ইট রাখা আছে যদি আমাকে মেনে নিতে পারো তবে সেই ইটখানা নিচে নামিয়ে দিবে। যদি আমাকে গ্রহন করতে না পারো ইটখানা আছাড় দিয়ে ভেংগে ফেলবে। আমি ভাংগা ইটের টুকরোতে খুজে নিবো হৃদয় ভাংগার টুকরো করে।
ইতি, অনিক।

অনিকের চিঠি পরে আমার উত্তর কি দেওয়া উচিত আমি বুঝতে পারলাম না। রেলিং এর পাশে গিয়ে ইট টা হাতে নিলাম। এটাকে নিচে নামাবো নাকি ভেংগে ফেলবো বুঝতে পারিনি। আমি যখন ভাবতেছিলাম আমার কি করা উচিত, এরই মধ্যে আমার ফুফু ছাদে এসে আমাকে বলতে লাগলো “প্রেরণা তাড়াতাড়ি নিচে আয়, তোর মায়ের অবস্থা ভালো না। এখনি হাসপাতালে নিতে হবে তোর বাবাকে ফোন দে” কথাগুলো কানে আসতেই যেন আমি নিথর হয়ে গেলাম, হাতে রাখা ইটের কথাও মনে নেই, কখন যে হাত থেকে তা পড়ে গিয়ে টুকরোটুকরো হয়ে গেছে বলতে পারলাম না। ছুটে গেলাম ঘরে। বাবা কে আর হাসপাতালের এম্বুলেন্স কে ফোন দিয়ে মাকে নিয়ে হাসপাতালে গেলাম। ছোটখালো মাইনর এট্যাক হয়েছে খুব শীঘ্রই মা সুস্থ হয়ে যাবে, ডাক্তার জানালো।

হাসপাতালের ওয়েটিং রুম এ বসে আমি অনিকের কথাই ভাবতে লাগলাম। মনে পড়ে গেলো ইট নিচে রাখার কথা কিন্তু তা ভেংগে গেছে নিজের ভুলের দোষেই। আমি আর ভাবতে পারছি না। অদ্ভুত এক কষ্ট হচ্ছে বুকেতে, নিশ্বাস নিতেও যেন আজ পৃথিবীতে অক্সিজেন এর কমতি রয়েছে। কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম অবুঝ মন আর নিঝর নয়ন দুটোই কেদে উঠলো এক সাথে। নয়ন কাঁদলে পানি ঝরে আর হৃদয় কাঁদলে ঝরে রক্ত। কোনটাতে যে কষ্ট বেশী বুঝতেই পারলাম না।

দুদিন পর মাকে নিয়ে বাসায় আসলাম। এই দুদিন আমি হাসপাতালেই ছিলাম, বাসায় এসে সর্ব প্রথম ছাদে গেলাম। সেখানে ইটের টুকরো গুলো নেই, কে যেন তা পরিষ্কার করে নিয়ে গেছে। আসলে কি সেটা সামান্য ইট ছিলো নাকি কারো বুকের মধে যে হৃদয় বসত করে তার জলজ্যান্ত একটি প্রতিচ্ছবি ছিলো। ইশ কিভাবেই না হৃদয় টাকে ভেংগে দিলাম, এই ভাংগা কি জোরা লাগবে আর কখনো?

মনেতে হাজারো প্রশ্ন উত্তর নেই একটাও। আমি ছাদেই অপেক্ষা করতে লাগলাম, দেখি অনিক আসে কিনা। এতদিনে তারপ্রতি যে আমার মায়া জমে যায়নি এমন না। যথেষ্ট দুর্বলতা আর ভালো লাগে রয়েছে তাকে ঘিরে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে কিন্তু অনিকের কোন খবর নেই। মনেতে অদ্ভুত সব প্রশ্ন বাসা বাধতে লাগলো, অনিক কি ভাংগা ইটের টুকরো দেখে আমাকে ভুল বুঝেছে? সে কি সত্যটা জানতে পেরেছিলো নাকি অভিমান এর বাসা বেধেছে সে?
সময় গড়িয়ে যেতে লাগলো অনিক আর আসেনি। একদিন দুদিন সপ্তাহ পেড়িয়ে গেলো অনিকের মান ভাংগেনি আর একদিন সাহস করে তার বাসায় গেলাম। আন্টির কাছ থেকে জানতে পারলাম সে তার চাচার বাড়িতে গেছে, সেখানে থেকে মালয়েশিয়ার ভিসা করতেছে। মালয়েশিয়া চলে যাবে। ব্যর্থ মন নিয়ে ফিরে আসলাম। আমি কোনভাবেই এই খবরকে মেনে নিতে পারছিলাম না। বালিশের বুকে মুখ ঘুচে দিয়ে কতক্ষন কেঁদেছি তা আমার জানা নেই।

প্রতিদিন একা এককা ছাদে ঘুরে বেড়াই আর অনিকের কথাই ভাবি। আসলে আমিও যে তার প্রেমে পড়েছিলাম। সেদিন যদি এই দুর্ঘটনা না ঘটতো তাহলে আমি অবশ্যই ভালোবাসার চিহ্ন হিসেবে ইটটা নিচে রেখে দিতাম। কিন্তু ভাগ্য যেন অন্যকিছুই চেয়েছিলো। তিনমায়া পর খবর পেলাম অনিক মালয়েশিয়া চলে গেছে কিন্তু সে একটিবারো আমার সাথে যোগাযোগ করতে চায়নি বা চেষ্টা করেনি। আমার নিসঙ্গ জীবন যেন আরো বিষয়াসক্ত হয়ে উঠলো। আজকাল এই আকাশ সুর্যের খেলাও দেখিনা। অন্ধকার চাই ঘোর অন্ধকার ঘেরা ঘর চাই। আমি থাকবো আর অন্ধকার থাকবে শুধু।

চার বছর কেটে গেলো এভাবেই অনির্দিষ্ট জীবনের পথে। অনার্স শেষ করে একটি চাকুরীর সন্ধান করছি। শেষ কবে আমি হেসেছিলাম তাও বলতে পারিনা। কেমন এই মন কেমন এর নিয়ম বুঝেই উঠতে পারলাম না। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকেনা, জীবন এর প্রতি অধ্যায় রয়েছে কিছু না কিছু না ভোলা ইতিহাস। আমার জীবনের প্রেম অধ্যায় প্রথম নাম লেখা হয়েছিলো অনিকেকের যদি সে তা জানতো তবে কতইনা ভালো হতো। অতিত স্মৃতি নিয়েই যখন আমার নিত্যনতুন দিনের শুরু সেই অতিত আবার মুছে দিয়ে নতুন এক স্বপ্ন যে বুনে দিয়েছিলো তার নাম অর্নব। কেউ মানুক আর না মানুক মানুষ ভালো থাকার জন্য বার বার প্রেমে পড়ে, প্রতিটি প্রেম প্রথম প্রেম হয়। কেউ ভুল বুঝে চলে গেলেও একটি সময় সেই ভুলবুঝে যাওয়া মানুষকে অতিতে ফেলে দিয়ে নতুন কাউকে খুজে নেয়, নতুন করে ভালোবাসে শুধু ভালোবাসার জন্য।

অর্নবের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো সংসদ ভবনের সামনে থেকে। সে একজন চিত্রশিল্পী ছিলো। সংসদ ভবনের সামনে যে শিল্পীগুলো ৩০০-৪০০ টাকায় ছবি একে দেয় তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে অর্নব। অনার্স শেষ হবার পর আমি প্রায় একা একা ঘুরে বেড়াতাম সংসদ ভবনের আশপাশ দিয়ে। হাজারো মানুষের আনাগোনা এখানে, প্রেমের জুটি থেকে শুরু করে পরিবার সহ মানুষ সময় কাটাতে আসতো এখানে। আমিও তাদের ভিড়ে মিশে যেতাম, অচেনা হয়েও কেন জানি খুব চেনা চেনা লাগতো নিজেকে। প্রায় আমার বসার স্থান ছিলো আমগাছের নিচে। এখানে বসলে এক নজরে প্রায় সবকিছুই দেখা যেতো। সামনে মেইন রোডে হাজারো গাড়ির আনাগোনা, পেছনে সংসদ এর মাঠ তার ওপাশে বিশাল ভবন, সিড়ির উপর বসে থাকা শত শত মানুষ। কেউ প্রেমে মগ্ন কেউ অভিমানে। ঠিক সামনের সিড়িগুলোতে চিত্রশিল্পী গুলো বসে অপেক্ষা করতো, আঁকিবুঁকি করতো কারো না কারো প্রতিচ্ছবি কে। তাই এই জায়গাটা আমার ভিষন প্রিয় ছিলো।

অন্যসব দিনের মত সেদিনো আমি বসেছিলাম। প্রায় এক ঘন্টা পর একটি ছাব্বিশ সাতাশ বয়সের এক যুবক আমার দিকে একটি জলছবি এগিয়ে দিয়ে বললো “আপনার জন্য” আমি অবকাতুর চোখে তাকালাম, সারামুখে দাড়িভরা। লম্বা বাবরি চুল চোখে কমন মডেলের একটি চশমা। আমি তার হাতের দিকে তাকিয়ে বললাম “এতো আমার ছবি এঁকেছেন আপনি।” মুখে মুচকি হাসি নিয়ে লোকটি বললো

— আমি রোজ দেখি আপনাকে, খুব ভালো লাগে আপনাকে দেখতে। বড্ড উদাসীন থাকেন সব সময়। আপনার ঠিক সামনেই আমি ছবি আকার জন্য বসে থাকি হয়ত আপনি লক্ষ করেন নি। সবসময় দেখি একধ্যানে কি যেন ভেবে যাচ্ছেন। কয়েকদিন ধরেই কাজের ফাঁকেফাঁকে আপনার ছবি একে যাচ্ছিলাম আজ গিয়ে তা শেষ হলো।

০- কিন্তু আপনি কেন আমার ছবি আঁকবেন?
— জানিনা কেন এঁকেছি ভালো লেগেছে তাই হয়ত।

তার এই কথা শোনার পর আমি আর উত্তর দিলাম না। সেখান থেকে চলে আসতে লাগলাম। কিন্তু সে আমার পিছু ছাড়েনি। আমি যখন ছবিটা নিয়েছি তখন সে দম ছেড়েছে। তারপর আমার ভালো লাগার আরেক বন্ধুর নাম অর্ণব। যখন অসময়ে কেউ পাশে এসে দাঁড়ায় তখন তাকেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী আপন মনে হয়। এত আপন হয়ে যায় সে যেন তাকে ছাড়া এক মুহুর্ত থাকা অতি কষ্টের। সেই আপন থেকেই অর্নব হয়ে উঠতে লাগলো আরো আপনজন। এত আপন যতটা আপন নিশ্বাস আর অক্সিজেন হয়।

অবসর সময় তার সাথেই কাটতে লাগলো, তার আঁকিবুঁকির ফাঁকেফাঁকে চলতো হাজারো না বলা কথার ঝুড়ি। অবশেষে যে অকল্যাণ আমি চাইনি তাই হয়েছে। আবার প্রেমে পড়েছি আমি। এবার আর ভুল করতে দিবোনা, হারাতে দিবোনা অর্নবকে তাই তাকে আমি নিজেই জানিয়ে দিয়েছি ভালোবাসার কথা। সাথে এটাও জানালাম আমি খ্রিষ্টান। আমার জীবনের দুই দুইটা পুরুষ আসলো দুজনেই হলো মুসলিম, এখানো ভাগ্যের খেলা শেষ হয়নি অবশিষ্ট রয়েছে আরো কিছু জীবন অধ্যায়।

অর্নব আর আমার ভালোবাসার সম্পর্ক ধীরে ধীরে গভীর হতে লাগলো। আমাদের মাঝে ধর্ম নিয়ে কোন সমস্যা নেই, তার কথা একটাই, কেউ কারো ধর্ম পরিবর্তন করতে হবে না। যে যার ধর্ম পালন করবো, আর ভালোবাসা ভালোবাসার জায়গায় থাকবে ধর্ম ধর্মের জায়গায়। তাই আমাদের মাঝে তেমন কোন সমস্যা ছিলোনা। একদিন লক্ষ করলাম, আমরা যে বাসায় থাকি সে বাড়ি সাজানো হচ্ছে নানা রংয়ের লাইটের আলোতে। আমি এক আন্টির কাছে কারন জানতে চাইলাম। সে আমাকে যে কথা জানিয়েছে তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। অনিক ফিরে আসছে দেশে আর কয়েকদিন বাদেই অনিকের বিয়ে তার মামাতো বোন সুমাইয়ার সাথে।

মাথা ঘুরে উঠলো, চারিপাশ কেমন জানি অন্ধকার হয়ে আসলো। বাসায় গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। বুকের ভেতর কু-কু করে কান্না উঠছে সমুদ্রের ঢেউয়ের জোরে। চোখের পানি থামাতে পারছিলাম না। এই অবস্থায় অর্নবের কাছে যাওয়া কি ঠিক হবে কিনা তাও ভাবছিলাম অবশেষে দুই তিনটা ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে আহুয়ে রইলাম।
আজ অনিকের বিয়ে পুরো ৬ বছর পর আজ অনিক কে দেখতে পেলাম। ছয় বছরে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে গেছে। মুখে মৃদু হাসি নিয়ে অনিকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম “কেমন আছো” বলে উত্তরের অপেক্ষা করলাম। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলতে লাগলো “ভালোই আছি পুরানো সব কিছু ভুলে। তুমি যখন এসেছো খাবার খেয়ে যেও”। অনিকের কথা শুনে খুব অপমানবোধ করলাম।

হয়ত সে আজো জানেনা সেদিনের কথা নয়তবা এমন কথা বলতে পারতো না। বুকটা যখন চৈচির মাঠের মত ফেটে যাচ্ছিলো তখনো আমার মুখে হাসি লেপ্টে নিয়ে বললাম “উইশ ইউ হ্যাপি ম্যারিড লাইফ”। সে ভুরু কুচকে আমাকে শুধু “থ্যাংক ইউ” বলে চলে গেলো। আমি সেদিনের মত আবার অবাক হয়ে তার চলে যাবার দৃশ্য দেখতে লাগলাম। সব কিছু পরিবর্তন হয়ে গেলেও তার চলে যাবার ধরন পরিবর্তন হয়নি। কি অদ্ভুত এই চলে যাবার অনুভুতি তাইনা? বুকেতে হাহাকার মুখে তে হাসি রেখে কাউকে চলে যেতে দিতে হয়। যেন এই চলে যাওয়া প্রয়োজন বড্ড প্রয়োজন। মানুষ পৃথিবীতে আসেও চলে যাবার জন্য। মৃত্যু নামের এক শব্দ মানুষের প্রান নিয়ে চলে যায়। তাইতো বলি চলে যেতেই হবে, চলে যাওয়ার জন্যই তো সকলের আসা।

অনিকের বিয়ে হয়ে গেলো, মাস খানেকের মধ্যে সে তার বউকে নিয়ে মালয়েশিয়া চলে গেলো, সবকিছু আগে থেকেই ঠিকঠাক ছিলো। সেদিনের পর থেকে অনিকের সাথে আর কথা হয়নি। আমিও চাকুরী পাচ্ছিলাম না। আমার আন্টির বিউটি পার্লার ছিলো সেখানেই লেগে গেলাম কাজে। যতদিন না চাকুরী পাই এখানেই কাজ করবো।
মোটামুটি ভালোই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি পার্লারের কাজ নিয়ে। পার্লার থেকে ফেরার সময় অর্নবের সাথে দেখা হতো। তার বুকে শুয়ে হাজারো কথা বলে যেতাম নির্দ্বিধায়। তার উষ্ণ ঠোটের ছোঁয়া যখন আমার কপাল ছুতো তখন নিজেকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সুখী মানুষ হতো। কিন্তু কতদিন কতদিন থাকে সুখ কপালে? এই প্রশ্ন আমি অনেকবার করেছি নিজেকে কিন্তু উত্তর পাইনি।

হঠাৎ দুপুরের দিকে অর্নবের ফোন, রিসিব করতেই সে হাফাতে হাফাতে বললো, “অপেক্ষা করিও আমি ফিরে আসবো”। কথাটি বলতেই অপর প্রান্ত থেকে ফোন কেটে গেলো। তারকন্ঠে সেদিন ভয় ছিলো, অসহায়ত্ব ছিলো, হাহাকার ছিলো।

সেদিনের পর থেকে অর্ণবের নাম্বার আর কখনো খোলা পাইনি। তাকে কখনো সংসদ ভবনের সামনে চিত্র আঁকতে দেখিনি। অনেক খোজ করেও তার সন্ধান পাইনি। সে বলেছিলো অপেক্ষা করো ফিরে আসবো। আজ পাচ বছর পেড়িয়ে গেলো, আমি প্রেরণা ইস্থার অপেক্ষা করে যাচ্ছি অর্নবের ফিরে আসার। কিন্তু আর বেশীদিন হয়ত অপেক্ষা করা হবেনা। আগামী সপ্তাহে আমার বিয়ে এবার আমি না পরিবার ঠিক করেছে। একজন খ্রিষ্টান ধর্মের পরিবারের ছেলের সাথে। চাকুরী পাইনি বলে বিউটি পার্লার খুলে বসেছি। নিজ ব্যবসা দিয়ে ভালোই ইনকাম হয়ে যাচ্ছে।

আমি এতগুলো বছর পরিবার কে মানিয়ে নিলেও আর মানাতে পারছিলাম না। অর্নব যদি একবার ফিরে আসতো তবে কিছু একটা করাই যেত। কিন্তু সে তো নিখোঁজ আজ পাচ বছর ধরে। সেদিন কি হয়েছিলো তার সাথে? কেনই বা হুট করেই হারিয়ে গেলো সে? বধু সেজে বসে আছি দুচোখের জল ছেড়ে দিয়ে শুধু একটি কথাই ভাবলাম “অর্নব ফিরে আসলে সেও কি আমাকে অনিকের মতই ভুল বুঝবে?” আমার জীবনের দুই না পাওয়া পুরুষ। যাদের বার বার পেতে চেয়েও পাইনি তারা কি কখনো সত্য কথা জানতে পারবে? আরো ভাবছি আগামী দিনগুলো কিভাবে যাবে, এই জীবনের পরবর্তী অধ্যায়তে কি রয়েছে? এরই নাম বুঝি জীবন, শত করে চাওয়া স্বপ্নগুলো হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট বুকে নিয়ে বেচে থাকার নাম জীবন।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত