ভুল সিদ্ধান্ত

ভুল সিদ্ধান্ত

দেখ রাহি তোমার সাথে রিলেশন কন্টিনিউ করা আর সম্ভব হচ্ছে না আমার। তুমি কেমন যেনো একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছ। তোমার ভেতর আগের সেই স্পার্কটা আর নেই। প্রিয়া কে দেখ। কিছুদিন আগেও বেহেনজি টাইপ‌ ছিল ইদানিং দেখেছো কেমন বদলে গেছে। আবিদের গালফ্রেন্ড তো প্রতিদিনই অন্যরকম। আর নিজের দিকে দেখো সেই আদিকালের মেয়েদের মতো লম্বা চুল একটু স্টাইল করে কাটোও নি আবার একটু কালারও করা নেই। আর চোখে মোটা ফ্রেমের কালো চশমা আজকাল কে পরে বলোতো। সব মিলিয়ে তুমি জাস্ট অসহ্য হয়ে গেছো আমার কাছে সো প্লিজ আমাকে আমার মতো থাকতে দিলেই খুশি হবো।

তোমার খুশির জন্য আজ পর্যন্ত সবই করেছি শুভ আজ কেনো করবো না। এনি ভে ভালো থেকো।
বলে আর একমুহুর্ত দাড়ালোনা রাহি। এই সেই শুভ যে কিনা পাগলের মতো রাহির পিছনে ছুটেছে ওর মুখ থেকে হ্যা শোনার জন্য। যে কিনা সবসময় ওর চুলের নেশায় ডুবে থাকতো। যে কিনা বলতো ওর চোখের মায়া পরিমাপ করার ক্ষমতা শুধুমাত্র এই চশমাটিরই রয়েছে। আর আজ ওর সবকিছু এত অসহ্য লাগছে শুভর। ওর ভালোবাসার কি এতই কমতি ছিলো। ছিলো হয়তো। কিংবা শুভ ছিল ওর জীবনের ভুল সিদ্ধান্ত। শুভ না ওর কেয়ার করতো না ওকে কোনোদিন ভালোবাসতো। তাহলে কেনো তিনবছর ধরে এই শুভর পিছনেও এত সময় কেয়ার সর্বোপরি ভালোবাসা ব্যায় করেছে। যার কারণে বাবার আনা ভালো ভালো ছেলেকে অস্বীকার করে বাবার মনে কত কষ্ট দিয়েছে। এসব ভাবতে ভাবতেই বাড়ি ফিরলো রাহি। বাড়ি আসতেই রাহির বাবা রাহিকে বলল,
মা তোর জন্য খুব ভালো একটা সমন্ধ এসেছে এবার আর না করিস না।

বাবা আমাকে একটু সময় দাও? ঠিকাছে ছবিটা তোর ড্রয়ারে রাখছি দেখে বলিস। রাহির মা নেই তাই রাহিকে ওর বাবা খুব আদর দিয়েই বড় করেছে। রাহির সিদ্ধান্তর ওপর কখোনো দ্বিমত করেননি তিনি। আজও করলেন না। ছেলে রাহিদের কলেজেই পড়তো। কিন্তু বাবা মারা যাওয়াতে বাবার বিজনেস নিয়ে ব্যাস্ত সে। প্রায় তিনদিন পর কলেজে গেলো রাহি। ক্যাম্পাসে প্রিয়ার কাধে মাথা রেখে বসে আছে শুভ। এটা দেখে যতনা কষ্ট হচ্ছে তার থেকে বেশি ঘৃণা হচ্ছে রাহির নিজের প্রতি এই প্রতারকটা একসময় ওর কাধে এমন করেই মাথা রাখতো। রাহি আর একমুহুর্তও দাড়ালোনা ওখানে। বাসায় এসে বাবার কাছে গিয়ে বলল সে এই বিয়েতে রাজি।

শুভ আর প্রিয়ার রিলেশন তিনমাসের। এই তিনমাসে রাহির অনুপস্থিতি বেশ বুঝতে পেরেছে শুভ। ইদানিং কথায় কথায় প্রায়ই প্রিয়ার সাথে রাহির তুলনা করে বসে ও। প্রিয়া তখন বেশ রেগে যায়। তাতে শুভর আজকাল কিছুই যায়আসে না। প্রিয়া মেয়েটাকে বড্ড অসহ্য লাগে ওর। তিনমাসে ও মেয়েটার ওপর কম টাকা উড়ায়নি। প্রিয়ার প্রতি সপ্তাহে দামি গিফ্ট চাই। যেখানে রাহিকে ও যদি রাস্তা থেকে একটা বুনো ফুলও দিয়েছে তাতে রাহির খুশি দেখে কে।

প্রায় সবসমই দামি রেস্টুরেন্টে দেখা করতে হয় প্রিয়ার সাথে যেখানে রাহি সবসময় টং দোকানের চা, রাস্তার ফুচকা চটপটি খাওয়া, পার্কে , নদীর পারে এসব জায়গায়ই দেখা করতো ওর সাথে। আর কেয়ার সেটা সবথেকে বেশি মিস করছে শুভ। যেভাবে রাহি ওকে আগলে রাখতো। ঘন্টায় ঘন্টায় ওকে ফোন করে ওর খবর নিতো। পরীক্ষার সময় ও জেগে থাকলে রাহিও জেগে থাকতো। রাতে ওকে ফোন দিয়ে পড়া কতদূর হয়েছে জানতে চাইতো। অথচ এই মেয়েকে শুভই আগ বাড়িয়ে ফোন দেয়। আগের‌ মাসে শুভর একটা এ্যাসাইনমেন্ট ছিল যেটা কমপ্লিটের জন্য দুদিন ও প্রিয়ার সাথে দেখা করেনি। প্রিয়া একটা ফোন করে জানতে চাইনি সে দেখা করছে না কেনো। আর দুদিন পর যখন শুভ নিজেই দেখা করেছে প্রিয়ার সাথে প্রিয়া উল্টো রাগ দেখিয়েছে।

শুভ না আসার কারণ জানাতেই উল্টো আরো রেগে বলেছে আমি বেশি ইমপটেন্ট না তোমার এ্যাসাইনমেন্ট। আর অসুস্থ হলেতো কোনো কথাই নেই। যেখানে রাহি ওর একটু ঠান্ডা লাগলেই ঠিক থাকতে পারতো না সেখানে প্রিয়া ওর জ্বর হলে বলতো তুমি মেডিসিন খেয়ে রেস্ট নাও তাও ফোনে ব্যাস এটুকুই। আজ প্রিয়ার সাথে সম্পর্ক শেষ করে এসেছে শুভ। ঠিক রাহির সাথে যেভাবে শেষ করেছিলো। যেখানে প্রিয়ার ভাষ্যমতে প্রিয়া নিজেই শুভর সাথে রিলেশন কন্টিনিউ করতে চাইছিল না। ভালোই হয়েছে শুভ নিজে থেকে সম্পর্ক শেষ করেছে। এখন ও রাহির কাছে ফিরে যাবে। প্রায় অনেক্ষন যাবৎ রাহির ফোন নাম্বারে ডায়াল করে যাচ্ছে শুভ। কিন্তু প্রতিবারই রাহির ফোন বন্ধ পাচ্ছে ও। কিছুই বুঝতে পারছে না। রাহির বান্ধবীদের কাছ থেকে যেটুকু জানতে পেল যে রাহি প্রায় তিবমাস কলেজে আসে না। এর বেশিওরা কিছু বলেনি।

রাহির বাড়ির ঠিকানাও জানেনা শুভ। এভাবেই একমাস রাহির খোজে শুভর কেটে গেলো। একদিন রাস্তার ফুটপাত ধরে হাটছিলো শুভ। এমনসময় হঠাৎই ও রাহিকে দেখতে পেলো রাস্তার ওপাশে ফুচকার সামনে দাড়ানো অবস্থায়। দ্রুত এগিয়ে গেলো শুভ। রাহির সামনে দারিয়ে রাহিকে ডাকলো ও। শুভর কন্ঠ শুনে ওর দিকে চমকে তাকালো রাহি আর অবাক হয়েই বলল, শুভ তুমি! হুম তোমাকেই খুজছি গত একমাস যাবত। কেনো হঠাৎ আমাকে খুজেছো কেনো পুরোনো কোনো হিসাব বাকি ছিলো নাকি? আইএম সরি রাহি আমি বুঝতে পেরেছি আমি তোমাকে কত ভালোবাসি। আমি সত্যিই অন্যায় করেছি। প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও।

মানে কি এসবের শুভ?  আমি অনুতপ্ত রাহি। নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি আমি। আমাকে মাফ করে আমার কাছে ফিরে আসো রাহি। একমিনিট কিসের ভুল আর ফিরবোই বা কেনো? আমি সত্যিই অনুতপ্ত। অনুতপ্ত হতে বড্ড দেরি করে ফেলেছো তুমি শুভ। সাথে আমার ভুলটাও ধরিয়ে দিয়েছো। মানে? আমার বিয়ে হয়ে গেছে। আর ঐ তো আমার বর আসছে। চিনবে হয়তো আমাদের কলেজেই পড়তো। কি বলছ এসব বিয়ে করেছো মানে? আমাকে ছেড়ে তুমি বিয়ে করে নিয়েছো।  এই যে সেই শুভ নাকি?

বলতে বলতে রাহির পাশে দাড়ালো আয়ান।স্বামীর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লো রাহি। আর শুভ থমকে গেছে পুরো। ও ভাবতে পারেনি রাহি এমন করবে। তাই দেখে আয়ান বলল,
আমি তোমাকে ধন্যবাদ দিতে চাই শুভ।

আয়ানের কথা শুনে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালো শুভ। বুঝতে পেরে আয়ান বলল, তুমি সেদিন রাহিকে না ছাড়লে ওকে আমি আজ আর পেতাম না। আমি ওকে প্রথম যেদিন আমাদের কলেজে দেখি সেদিনই ভালো লেগে যায় কিন্তু সাহস করে বলা হয়ে ওঠেনি। ভেবেছিলাম একবারে বিয়ের প্রস্তাব দিবো। বাবা মারা যাওয়ার পর বাবার বিজনেস নিয়ে বিজি ছিলাম তাই ওর দিকে অতটা খেয়াল দিতে পারিনি।তাই একবারে‌ ওর বাবাকে প্রস্তাব পাঠিয়ে দেই।ওআমাকে বিয়ের আগেই তোমার সম্পর্কে সব বলে দেয়।তুমি ওকে না ছাড়লে আমি ওকে পেতামনা সো থ্যাংক ইউ। এবার রাহি বলল, আমিও তোমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি আমাকে আমার জীবনে নেওয়া সবথেকে ভুল সিদ্ধান্তটা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য।

তুমি সেদিন আমার চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলে তোমার ওপর শুধু শুধু আমি আমার ভালোবাসা ওয়েস্ট করেছি। আল্লাহকে ধন্যবাদসঠিক সময় সঠিক মানুষকে আমার জীবনে পাঠানোর জন্য। তুমি কি করতে আমার জন্য কিছুই না। কোনোদিন ফোন দিয়ে আমার খোজ নিয়েছো। আয়ানকে দেখো অফিসে গেলে ঘন্টায় ঘন্টায় ফোন করে জানতে চায় ঠিক আছি কিনা। কদিন আমাকে ঘুরতে নিয়ে গেছো। আমিই জোর করে তোমার সাথে ঘুরতাম। আর আয়ান নিজেথেকে আমাকে ঘুরতে নিয়ে যায়। আর তুমিতো কখোনো আমায় ভালোই বাসোনি শুভ। ভালোবাসলেও তোমার ভালোবাসা ছিল স্বার্থে ভরপুর। যেখানে কোনো কেয়ার ছিলোনা। না ছিল কিছু দেয়ার। যেখানে শুধু পাওয়াটাই আসল। আর আয়ান অনেক কেয়ার করে আমার। বিনিময়ে কিছু আশা করে না ও। কখোনো আমাকে বলেনি তুমি সেকেলে বা তোমার মধ্যে স্পার্ক নেই। বরং বলেছে রোজ তোমাকে দেখে নতুন করে প্রেমে পরে যাই।

তুমি কোনোদিনও নিজেকে বদলিও না। তুমি তোমাতেই অদ্বিতীয়া। আমার ইচ্ছা অনিচ্ছার দিকে কড়া নজর ওর। সবকিছু মিলে আমিও নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছি। আর সঠিক মানুষকে নিজের ভালোবাসা দিচ্ছি। বলেই রাহি আয়ানের হাত ধরে চলে গেলো। শুভ থমকে দাড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে কিছু ভুল সিদ্ধান্ত আমাদের শিক্ষা দিয়ে ভবিষ্যৎ সুন্দর করার সুযোগ দিলেও কিছু ভুল সিদ্ধান্ত আমাদের দ্বিতীয় বারের সুযোগ নষ্ট করে দেয়।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত