হঠাৎ তুমি নেই

হঠাৎ তুমি নেই

দিনটা ছিল অাজকের মতই।সালটা ২০১৬।বিজ্ঞান পরিক্ষা শেষ করে বাড়ি ফিরছিলাম।মাঝপথে নিশির দেখা।ও অাসছিল অামার উল্টো দিক থেকে।অামার সামনে থেমে বলল- সেতু, কিছু কথা অাছে তোমার সঙ্গে।
বললাম- কি কথা? নিশি বলল- অনেক কথা।রাস্তার মধ্যে বলা যাবেনা।ওইদিকটাই চল।
– ঠিক অাছে চল।
এরপর অামি নিশির পিছন পিছন গেলাম।তারপর বলল- তুমি এখানে দাঁড়াও।অামি এক্ষুনি অাসছি।কোথাও চলে যেওনা অাবার।
অামি মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বললাম।এরপর নিশি সামনের দিকে লোকের ভিড়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল।

অামি যেখানে দাড়িয়ে নিশি অাসার অপেক্ষা করছিলাম সেটা ছিল একটা দোকান।পন্যহীন দোকান।দোকান বিক্রয় হয়েছে কিন্তু মাল তুলেনি এখনো।সামান্য সামান্য অন্ধকার ছিল রুমটা।হাতঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম দুপুর দেড়টার কাছাকাছি হয়েছে।পরদিন অাবার পরিক্ষা তাই একটু রেস্ট নেওয়া উচিৎ।কিন্তু নিশি তো এখনো অাসছেনা।ফাইল থেকে এমসিকিউ প্রশ্নটা বের করে একটু দেখার চেষ্টা করলাম।প্রায় ৩২ টার মত সিউর এসেছে।ওগুলো রাইট মার্ক করলাম।বাকি অাটটা দোটানায় রেখে দিলাম।গলা তুলে অারেকটু সামনের তাকিয়ে দেখলাম নিশির চিহ্ন নেই।

নিশির সাথে অামার পরিচয়টা হয়েছিল একদম অদ্ভুদভাবে।প্রায় ৪-৫ মাস অাগের কথা।অামি সকাল সাতটা নাগাদ স্যারের কাছে পড়তে যাচ্ছিলাম।হঠাৎ পাশ থেকে একটা মেয়ে এসে বলল- সাইফুল স্যার কোন রুমে পড়াই জানেন?
অামি বললাম- কোন সাইফুল স্যার, কোন সাবজেক্ট পড়ান উনি?
মেয়েটা বলল- ইংলিশ।
অাসলে সাইফুল নামে তিনটার বেশি স্যার এ চকবাজার এলাকায় পড়াই তাই অালাদা করে জানতে হল।
বললাম- অাসুন অামার সাথে।অামিও স্যারের কাছেই যাচ্ছি।
– তাহলে তো বেশ ভালোই হল।
সেদিন একটু অাধটু কথা বলে মেয়েটার নাম জানতে পারি, নিশি।তবে পুরো নাম বলেনি।

সাইফুল স্যার অামাকে ভালো করেই চিনত।কারন ব্যাচ শুরু করার দিন থেকেই অামি ওনার কাছে পড়ে অাসছি।তাছাড়া পড়ালেখাতেও অামি খুব একটা পিছিয়ে ছিলামনা।দিনের পড়া দিনে ক্লিয়ার করতাম।সেই হিসেবে স্যারের একটু প্রিয়ই ছিলাম বটে।সাইফুল স্যার নিশিকে বলল যে গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলা চলে গেছে সেগুলা ক্লাসের পরে অামার কাছ থেকে নোট করে নিতে।ক্লাস শেষে অামি ঠিকই বসে রইলাম কিন্তু নিশি কোথায় উদাও হয়ে গেল।হয়ত ভুলে গিয়েছে।অামি রুম থেকে বের হয়ে কতক্ষন এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম নিশি নেই।থাক! প্রয়োজন পড়লে কাল ধরে নিবে।

পরদিন ঠিকসময়ে ক্লাস শুরু হল কিন্তু নিশির দেখা নেই।ভাবলাম অার অাসবেনা।হয়ত স্যারের পড়া তার কাছে ঠিক পছন্দ হয়নি।অাসলে সাইফুল স্যারের পড়ানোর একটা অালাদা স্টাইল অাছে।ওনি বলেন বেশি লেখান কম।বারবার বলতে থাকেন যাতে কথাগুলা অামাদের মাথায় সেট হয়ে যায়।এ স্টাইলটা অনেকের কাছে পছন্দের না।এর অাগে বেশ কয়েকটা স্টুডেন্ট ছিটকে গিয়েছিল।তবে যারা স্যারের কাছে লেগে থাকে তারা ভালো রেজাল্ট করে।কি জানি অামার রেজাল্ট কেমন হয়।মনে তো হচ্ছে ভালোই হবে।ক্লাস শেষেও বসে ছিলাম একটু নিশির জন্য।একটা জিনিস মাথায় এলোনা প্রয়োজন ওর তাহলে ছটপটানি অামার কেন।

তার পরদিন দেখি অামার অাগেই নিশি ক্লাসে উপস্হিত।মুখে এক চিলতে হাসি ফুটল অামার।ভালোলাগার বার্তা বয়ে গেল শরীরের প্রতিটা লোমে লোমে।শুধুমাত্র কয়েক মিনিটের পরিচয়ে একটা মেয়েকে এতটা ভালো লেগে যায়, নিজের সাথে না ঘটলে হয়ত কখনও বিশ্বাসই করতাম না।ক্লাস শেষে পুরো রুম ফাঁকা হয়ে গেল।কেবল মেয়েদের সারিতে নিশি অার অামাদের সারিতে অামি বাদে অার কেউ নেই।দুজনেই চুপচাপ।তাই অামি ব্যাগ নিয়ে উঠে যাওয়ার সময় নিশি বলল- কোথায় যাচ্ছ নোট খাতাটা দিয়ে যাও।
ব্যাগের চেন খুলে অাবার নোট খাতা বের করে ওর হাতে দিতে দিতে বললাম- কাল ফেরত দিও।খুব দরকারি।

পরের ক্লাসে নিশি ঠিকঠিক অামার নোট খাতা ফেরত দিল।বাড়িতে এসে নোট খাতার অবস্হা দেখে অামি তো পুরো হতভম্ব।প্রতিটা পৃষ্টার নিচে নিশি কমেন্ট জুড়ে দিয়েছে।কাল সারারাত ধরে ও হয়ত এটাই করেছে।কিছুই নোট করেনি নিজের খাতায়।এরমধ্যে কয়েকটা কমেন্ট ছিল ঠিক এইরকম- এত সুন্দর কারো হাতের লেখা হয় নাকি; তোমার মনটাও কি তোমার হাতের লেখার মতই কিউট; অাপাতত লেখার প্রেমে পড়েছি।শেষ কমেন্টখানা পড়ে অামি একটু হাসলাম।জীবনে প্রথম কেউ অামার লেখার প্রেমে পড়ল।অামার হাতের লেখা সুন্দর এটা
সবাই বলে।একমাত্র হাতের লেখার কারনেই অামি স্কুলে বেশ খ্যাত।

নিশির প্রেমে পড়ার কথাটা অামার বিশুদ্ধ হৃদয়ে অাচড় কেটে বসল।নিজেও প্রেমে পড়ে গেলাম ওর।মেয়েদের প্রেম প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা বেশিরভাগ ছেলের নেই।যদি প্রথম অাবেদন হয় তাহলে তো অার কথায় নেই।নিশিকে ভালোবাসার কথাটা ঘুণাক্ষরেও বলিনি।তার কারন এরই মাঝে অামাদের একটা ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।নিশিকে একবার কথার ফাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ওর জীবনে কেউ অাছে কিনা?নিশি জবাবে বলল ” অাপাতত কেউ নেই।তবে হতে কতক্ষণ। অামি কি কম সুন্দরী নাকি তুমি বল।”নিশির এরুপ কথা শুনে অামার খুব হাসি পেল।কয়েক মিনিট অনবরত শুধু হেসেই গেলাম।

পুরোনো কথার অাড়মোড়া ভেঙ্গে বাস্তবে ফিরলাম।হাত ঘড়িতে দুপুর অাড়াইটার কাছাকাছি।দোকানটাই দাড়িয়েছি একঘন্টার বেশি তবুও নিশি ফেরার নাম নেই।সেই কখন থেকেই এখানে দাঁড়িয়ে অাছি।মেয়েটা কোথায় গেছে কেন গেছে কিচ্ছু বলে যায়নি।পরীক্ষার চাপে পরে ভুলেই গিয়েছিলাম অাজ ভালোবাসা দিবস।হঠাৎ মনে কু ডেকে উঠল।মনে হল যে নিশি কোন বিপদে পড়েছে।অামি সামনের দিকে কিছুদূর হেঁটে গেলাম।চোখে পড়ল অনেকগুলা মানুষ জোট বেঁধে এক জায়গায় দাড়িয়েছে।পুলিশের উপস্হিতিও চোখে পড়ছে।রাস্তার উপর নির্ঘাত কিছু একটা ঘটেছে।একটা যাত্রীশূন্য বাসকে পুলিশ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।

অামি ভীড় ভেঙ্গে সামনে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলাম।প্রথমে চোখে পড়ে একটা রক্তমাখা পরিক্ষার ফাইল।তার পাশেই বিন্যস্ত অাকারে ছড়িয়ে থাকা একগুচ্ছ গোলাপের পাঁপড়ি।রাস্তার উপর শুয়ে অাছে একটা স্কুল ড্রেস পরিহিতার নিথর দেহ।চেহারাটা ঠিক চেনা যাচ্ছেনা।ভয়ে অামার গলা বুক শুকিয়ে এল।অন্ধকার দেখছিলাল চারপাশ।অামি যেটা অনুমান করছি যদি সেটাই হয়।হঠাৎ কাঁধে কারো হাত রাখা অনুভব হল।অামি পিছনে ফিরে দেখি, নিশি দাঁড়িয়ে।হ্যাঁ এটা নিশিই।অামি ঘুরে ওর দুই বাহুতে ধরে বললাম- তুমি ঠিক অাছ নিশি।জানো কত চিন্তা করছিলাম তোমার জন্য।অামাকে না বলে অার কোথাও যেতে দিবনা তোমাকে। অামার অার বিশেষ কিছু মনে নেই।তবে সে সময় নিশিকে খুব সজোরে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিলাম।যার মধ্যে হারানোর ভয় নেই সে কখনও কাউকে ভালোবাসতে পারেনা।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত