কষ্টের মায়াখেলা

কষ্টের মায়াখেলা

একটা বাসা খুব আর্জেন্ট দরকার তাদের। তাদের বলতে আমার, রনি পিয়াস আর সৌরভের। কালকে এ বাসা ছাড়তে হবে। বাসাটার প্রতি অন্যরকমের মায়া জন্মে গিয়েছে। যদিওবা বাড়ীওয়ালা খারাপ ছিলো। তবে বাড়ীওয়ালী খুব ভালো ছিলো। মেয়েরা যেমন হয় আরকি। নম্র, ভদ্র, আবেগী আর দয়াশীল। সব মেয়ে আবার এমন হয়না। ভার্সিটির এক বড় ভাইয়ের সাহায্যে একটা ভালো বাসার সন্ধান মিললো। যদিওবা ফাহাদ ভাই’ই সব ঠিক করে দিয়েছে। হয়তো আপন রক্তের না। কিন্তু আপনের চেয়েও বেশী করেছে ফাহাদ ভাই তাদের জন্য। সৌরবের ব্যাপারে বলা যাক। অদ্ভুত ক্যারেকটার। বেশ লম্বা। চুলগুলোও লম্বা লম্বা। সৌরভ থেকে সভ্য হওয়ার কথা। কিন্তু না। এর মতো অসভ্য ছেলে ভার্সিটিতে আর একটিও নাই।পিয়াস। আহা এমন সোনার ছেলে বাংলাতে খুব কম। তার এতো এতো লজ্জা। যা কোন মেয়েরই নেই। পড়ালেখায় নাম্বার ওয়ান। সবসময়ই মুখে একটা কথা। দোস্ত পড়তে হবে। পড়া আর পড়া। রনি। এ হলো আরেক অদ্ভুত ক্যারেকটার।

সারাক্ষণই কি যেন ভাবে। কিন্তু কি ভাবে সে নিজেও জানেনা। সারাক্ষণই পড়ায় লেগে থাকে। কিন্তু দিনশেষে আণ্ডা।আর আমি খালিদ।উদাস বালক। আমার সম্পর্কে বলে শেষ করা যাবেনা। যারা চেনে তাদের কাছে পাগল। বেশ অভিমানী। কথা বেশি বলি তবে আপনদের সাথে। অপিরিচিত কারো সামনে গেলো একেবারে দুধের শিশু। খুবই ভদ্র।সবাইকে সম্মান করে চলি। নাম দিয়েই পরিচয় সেই তিনবছর আগে। মারামারি, হাসি কান্নায় বন্ধু ভাই। নতুন বাসায় এসে শিফট করলো। সবাই খুব উত্তেজিত। বাড়ীওয়ালার মেয়ে আছে কি না? কিছুক্ষণ পরপর এটা-সেটা অজুহাত নিয়ে দরজার বেল বাজানো পরে হবে পাগলা। এখন তো নতুন। এরা যে ভদ্র ছেলেপেলে বাড়ীওয়ালাকে বোঝাতে হবে না। একেকজন কবি হয়ে যাচ্ছে। আরে বাড়ীওয়ালার মেয়েকে পটাতে হবে তো। ছাদে যাওয়া নিষেধ। বড় দুঃখের ব্যাপার। যেভাবেই হোক ফাহাদ ভাইকে দিয়ে এই পারমিশনটা পাশ করাতেই হবে। কয়েকদিন সময় নিলেও পারমিশন পাশ। সারাদিন রুমে বসে কি থাকা যায়? পাঁচ তলার বাসা। আরো কয়েকজন বাড়াটিয়া দেয়া আছে।

মানুষকে বোকা বানাতে সৌরভ উস্তাদ। বাড়ীওয়ালার মেয়ের সাথে লাইন কানেক্ট করতে হলে বাসার টেইক কেয়ার আর দারোয়ানকে হাত করতে হবে। সে কি আলাপ শুরু করলো সৌরভ। পাশে খালিদ অবশ্য ছিলো। খালিদ আরম্ভ করলে আর থামবেনা। প্রথম কয়েকদিন বেশ ভালই খাওয়াদাওয়া হলো দারোয়ানের সাথে।চা, সিগারেট, বিস্কুট ইত্যাদি ইত্যাদি। দারোয়ানের নাম শরীফ। অষ্টম শ্রেণী পাশ। পেটের দ্বায়ে লেখাপড়া আর হয়নি। বাসার দেখাশোনা করে আরমান হক। মধ্যবয়সী। কিন্তু এখনো বিবাহ করেনি। বেশ অদ্ভুত বিষয়। পিছনে কাহিনি আছে অবশ্যই। পরে বলা যাবে। ভালই হাতে আনা গেলো। মানুষটা একটু ত্যারা প্রকৃতির। কিন্তু খুব আবেগী বোঝা গেলো। এতো কিছু যে বাড়ীওয়ালার মেয়ের জন্য করছে তারা বাড়ীওয়ালার মেয়ে আছে কি না এখনো এটুকুই জানা হলোনা। ও হ্যাঁ সবার প্রেমিকার ব্যাপারে বলা উচিৎ। সৌরভ। কত ছ্যাকা খেয়েছে। তার যত ক্রাশ সব বিবাহিতাদের উপর। তাকে নিয়ে বাকি সবাই চিন্তিত কারন যদি বাড়ীওয়ালীর উপর ক্রাশ খায় তো এ বাসায় আর থাকা হবেনা। পিয়াস। সারাক্ষণই পড়া নিয়ে থাকে তার কি করে প্রেমিকা থাকবে। রনি মিষ্টার যন্ত্রণা। তার বেশ প্যারাময় একজন প্রেমিকা আছে।

যদিও সে মাঝে মাঝে ভুলে যায় তার প্রেমিকা আছে কি না। তবে দীয়া রনিকে নিজের থেকেও বেশি ভালবাসে তা বাকি সবাইও জানে। খালিদ। যদি গল্পের নায়কের প্রেমিকা থাকে তাহলে গল্প সাজবেনা। তাই প্রেমিকা নেই। এখন পর্যন্ত মালিকপক্ষের সাথে কারো কথা হয়নি। সবই আরমান ভাইয়ের সাথে। পরিচিত হওয়া দরকার তো নাকি। তারা নাকি খুব শান্তশিষ্ট মানুষ। ঝামেলা, অতিরিক্ত কথা বলা একদম পছন্দ করেনা। সৌরভ থাকতে আর চিন্তা করতে হয় নাকি? ছাদের দোলনায় বসে আছি আমি। বিকেলের দুষ্টু বাতাস বেশ ভালই লাগে। ফোনে অদিত ফিচারিং তৌফিক ভাইয়ের বায়ান্ন গানটা চলছে। পরিবেশের সাথে গানের কোন মিল নেই। বাড়ির কথা মনে পড়ে মনটা কিঞ্চিৎ খারাপ হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পর ছোট্ট একটি মেয়ে আসলো দৌড়িয়ে। বাচ্চাদের মাঝে স্বর্গ থাকে আমি সবসময়ই বলি। মেয়েটাও কম নয় আমারো ইচ্ছে হচ্ছিলো টমেটোর মতো গালটালে একটু টানতে। বাচ্চা মানুষ দেখলেই কার না কোলে নিতে ইচ্ছে করে। ঠোঁট মুখ বাকা করে বললো মেয়েটা।

– আমার বড় আপুকে দেখেছেন? আমি একটু চুপ করে রইলাম। ভাবলাম একটু মজা করা যাক।
– হুম। মেয়েটার চোখে খুশির আকাশ।
– বলুন। কোথায় বলুন?
– আমি লুকিয়ে রেখেছি। শর্ত আছে বলতে পারি কোথায়।
– কি শর্ত?
– পরে বলি? আগে বলো তোমার নাম কি?
– অর্না।
– বেশ সুন্দর নাম তো। তার চেয়ে বেশি সুন্দরী তুমি জানো?
– বড় আপু কই?
– আহা বলছি তো। কিসে পড়ো তুমি?
– থ্রী’তে। আপু কই?
– তোমার বড় আপুকে তো দেখিনি। তোমার ছোট আপুকে এখানটায় আছে। আমি মজা করে বললাম। সত্যি তো কাউকেই চেনেনা। কথা শুনে মেয়েটা রাগ করলো। একটু দূরে গিয়ে বললো।
– মিথ্যে কথা বলেন কেন? ছোট আপুকে আমি রুমে দেখে এসেছি।
– তাই? তাহলে তোমার বড় আপুও ঐখানেই আছে যাও।

মেয়েটা কিছু না বলে রাগী চোখে তাকিয়ে চলে গেলো। আমি হাসছি। গানটা শেষ হয়ে পরের গান বাজতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর আবারো মেয়েটা আসলো। সঙ্গে আরেকজন। আমার মনে হলো ইনিই মনে হয় বড় আপু। অর্না সম্ভবত তার আপুর হাতে ধরে টেনে আনছে। আমি দোলনা ছেড়ে দাঁড়ালাম। সামনে এসে অর্না বললো।

– আপু দেখো। এই লোকটা বলেছিলো তোমাকে লুকিয়ে রেখেছে। আমি একটু মুচকি হেসে বললাম…
– পিচ্চি তো এজন্য একটু মজা করেছি কিছু মনে করবেন না। অর্নার বড় আপু সহজ সরল হাসি দিয়ে বললো।
– কোন ব্যাপার না।

বলে অর্নাকে নিয়ে চলে গেলো। মেয়েটার হাসি নজরকাড়া। আমি নিচে গেলাম। একজন রুমের কোণে বসে দীয়ার সাথে মিষ্টি মিষ্টি প্রেমালাপ আর ঝগড়া করছে। আরেকজন ফেসবুকে চ্যাটিং নিয়ে ব্যাস্ত। আরেকজন খুব ভাবছে। আমি গিয়ে বললাম

– মেয়েটা ভালই।  একথা শুনেই বাকি দুজন আমার দিকে কৌতহুল নিয়ে তাকালো।
– কোন মেয়ে রে?
– মনে হয় বাড়ীওয়ালার মেয়ে।
– কিহহ? আগে বলবিনা? কথা হইছে তোর সাথে? কিসে পড়ে রে।
– থ্রী’তে।
– ধুর শালা। এটা আবার এমন ভাবে বলছিস না আজিব। আমি হাসছি। হো-হো করে হাসছি। কিছুক্ষণ হেসে বললাম
– সবার ছোট থ্রী’তে পড়ে। আবারো দুজন হকচকিয়ে গেলো।
– আগে কবিনা বেটা। বিএফ আছে কিনা জিজ্ঞেস করছিস?
– করেছিলাম। আছে।
– তাহলে আর কি? আমি আবারো হাসছি। খুব হাসি পাচ্ছিল। তারপর বললাম
– একজনের মনে হয়না বিএফ আছে।
– বলিস কি? তোদের কিন্তু ভাবী হয়। ভাবী কিন্তু মা’য়ের সমান। মা ভেবে তাকাবি। কথাটা বললো সৌরব।
– বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বিএফ থাকবে কোথ থেকে? সৌরভের মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো।
– বিয়ে হয়েছে তো কি হয়েছে। বিবাহিত মেয়েরাই ভাল।
– আপনে আবার ক্রাশ খাইয়েন না যেন ঠিকাছে? তাহলে বাসা ছাড়তে হবে।

কথা শুনে রনি আর পিয়াস হাসছে। সৌরভ রেগে একাকার। রাকিবের মায়াবতী গানটা বাজছে। হেডফোন আছে কিন্তু আমি হেডফোন ছাড়াই শুনছি। ইদানীং কানে ব্যাথা হয় অতিরিক্ত গান শুনতে শুনতে। আমি দোলনা ছেড়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছি। কারণ প্রতিদিন অর্নার বড় আপু এসময়ে দোলনায় এসে বসে। এখনো নামটা জানা হলোনা। এসব ভাবতে না ভাবতে মেয়েটা আসলো। চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে মন খারাপ। মেয়েটা এসে দোলনায় বসলো। হঠাৎ মেয়েটার হাত থেকে ফোনটা মাঠিতে পড়ে যায়। মনে হয় স্কিনের। কাঁচটা ভেঙ্গে গিয়েছে। আমি গিয়ে ফোনটা দেখলাম। আরো বেশি মন খারাপ হয়ে গেলো মেয়েটার। আমি বললাম

– নামটা জানা হলোনা আপনার। মেয়েটা অস্ফুট স্বরে বলে।
– রিত্তি। আপনার?
– খালিদ। আপনি উপন্যাস পড়েন?
– নাহ তো কেন?
– কারন উপন্যাস যারা পরে তারাই এভাবে মন করে বসে থাকে । আপনিও ঠিক সেরকম।
-আচ্ছা আপনি কি য্যোতিষি নাকি? বুঝলেন কি করে
– মন বলছে আর মস্তিষ্ক তার সাপোর্ট করছে তাই
– আপনি উপন্যাস পড়েন?
– না। রনির কাছে আছে। রনিই বেশি পড়ে। আমি মন খারাপ হলে টুকটাক।
– ভালো।
– আচ্ছা আমি যাই তাহলে নিচে।
– আচ্ছা।

আমি নিচে চলে গেলাম।রিত্তির মনটা আরো বেশি খারাপ হয়ে গেলো। এভাবে প্রতিদিন টুকটাক কথা হয় আমাদের মধ্যে । প্রতিদিন বিকেলেই হয়। আজকে খুব বেশিই গ্রামের কথা মনে হচ্ছে আমার। গানও ভাল লাগছেনা। গান বন্ধ করে ছোটবেলার সোনালী মুহুর্তের কথা ভাবতে লাগলাম। আজকেও ঠিক সময়ে রিত্তি এলো। আমাকে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছি দেখে বললো।

– আপনার মনটা কি খারাপ? আমি নকল মুচকি হেসে বললাম….
– কই না তো। কেমন আছেন?
– ভালো। তবে আপনি ভালো নেই বুঝতে পেরেছি। চাইলে শেয়ার করতে পারেন।
– নাহ তেমন কিছুনা। গ্রামের কথা মনে পড়ছে খুব।
– তো গ্রামে যাবেন। কথাটা শুনে আমি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললাম।
– পারবোনা। রিত্তি বোধহয় কথাটা বুঝতে পারলোনা।
– কেন?
– সে অনেক কাহিনি।
– বলুন আমি শুনবো।
– শুধু শুধু সময় নষ্ট হবে আপনার।
– না হবেনা। আপনি বলুন আমি শুনতে চাই। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আমি বলতে আরম্ভ করলাম।
– আমি ছোটবেলায় খুব দুষ্টু ছিলাম।

লেখাপড়াটাও ঠিক করে করতাম না। মোটামুটি। অবশ্য স্যারেরা বলতো আমার মাথা ভালো। ছোটবেলার কিছু স্মৃতি আছে। যেমন শীতের খুব সকালে উঠে খেজুরের রস খাওয়া। স্কুল থেকে এসে শার্টটা খুলেই পুকুরে নেমে ডুবানো। বৃষ্টিতে ভেজা। ইত্যাদি ইত্যাদি। একটা বন্ধু ছিলো আমার অনিক। সবচেয়ে কাছের ছিলাম দুজন। তখন মাত্র এস এস এসি দিয়েছি। অনিক একটা মেয়েকে ভালবাসতো। মেয়েটাও বাসতো। আমাদের গ্রামে ক্লাব ঘরের মতো একটা রুম ছিলো যেখানে মানুষ যায়না পুরোনো। ধানক্ষেতের পাশে। সকালে বলেছিলো সন্ধার পরে ক্লাবটায় যেতে। আমিও গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি অনিক আর মেয়েটা বসে আছে। মেয়েটা কান্না করছে আস্তে আস্তে। আমারও বোঝার বাকি রইলোনা কি হয়েছে এখানে। কিন্তু এতোক্ষণে মানুষ আমাদের চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলেছিলো গ্রামের।

অনিক আমার পায়ে ধরে কান্নাকাটি করে বলেছিলো মেয়েটার দ্বায় আমি নিতে। তাহলে আমার খুব একটা বেশী কিছু হবেনা। কারন আমার বাবা সাবেক চেয়ারম্যান ছিলো। আর ওর বাবা ছিলো রিকশাওয়ালা। নিজের ঘাড়েই নিলাম। মেয়েটার অবস্থা দেখে সবাই বোঝতেই পেরেছে কি হয়েছে। আমি হলাম প্রধান আসামী অনিক হলো আমার সহকারী। অনিককে কয়েকটা থাপ্পড় দিয়েই দরবার থেকে বের করে দেয়। আর আমি হলাম সারাজীবনের জন্য গ্রাম হারা। বাবার সম্মান আর থাকে কই? দরবার থেকেই আমি এসে পরি ময়মনসিংহে। খালার বাড়ি। সে থেকে আর বাড়ি যাওয়া হয়নি। সবচেয়ে খারাপ লাগে প্রতি ঈদের সময়। মা’র সাথে শুধু ফোনে কথা হয়। একমাত্র মা’ই বিশ্বাস করে আমি অমনটা করতে পারিনা। যদিও দরবারে বলেছিলাম মেয়েটাকে আমিই আনি। বাবা এখনো রাগ করে আছে। যদিও টাকা পয়সা দেয় লেখাপড়ার জন্য মা’র কাছে। কথা হয়না বাবার সাথে। এই মুখ নিয়ে কিভাবে গ্রামে যাবো বলুন?  নিজের অজান্তেই আমি কাঁদতে লাগলাম। রিত্তি কি বলবে বুঝতে পারছেনা।

সবাই আজকে গ্রামে যাবে। পিয়াস, সৌরভ আর রনি। অনেক জুরাজুরি করেছে আমাকে কিন্তু যাবনা কারো বাড়িতেই। কয়েকদিন পুরো একা থাকতে হবে। আসলে কাছের মানুষগুলো দূরে গেলে তাদের মর্ম বোঝা যায়। পিঠাপিঠি করে থেকেছে এতোদিন। একদিন কেউ না থাকলেই খারাপ লাগে। এক সপ্তাহ তো থাকবেই কমপক্ষে। একয়েকদিন বাহিরেই খেতে হবে। সব ভেবে আজকে আরেকটি মন খারাপের দিন। প্রতিদিনিই মন খারাপ হয়। আজকে একটু বেশি। আজকে সে আসছেনা।অমার মনে হচ্ছিলো কারো সাথে কথা বললে হয়তো একটু ভাল লাগতো। কিছুক্ষণ পর আসলো ঠিক। আমার মন খারাপের ব্যাপারটা এখন জানে রিত্তি।

– দেখলাম বাকিরা কোথাও যেন যাচ্ছে।
– হ্যাঁ গ্রামের বাড়িতে।
– আপনি তো একা একয়দিন খাবেন কোথায় তাহলে?
– বাহিরে খেতে অসুবিধে হয়না আমার। চাচাকে না করে দিয়েছি একয়দিন এসে রান্না করে যেতে হবেনা।
– এটা কোন কথা হলো। যতদিন না আসে ততদিন বাহিরে খাবেন?
– আর আগেও খেয়েছি। আসলে কিছু একটা খেলেই হয়। খাওয়ার সময় বেশি মনে পড়ে তো এদের কথা।
– আমি আপনাকে রান্না করে দিতে পারি। যদি আপনার আপত্তি না থাকে। আমি কথাটা শুনে হাসলাম
– নাহ লাগবেনা। কেমন দেখায়। তাছাড়া আপনার যে মা মেরেই ফেলবে আপনাকে।
– শুধু মা’কেই দেখলেন? অর্পা কি মা’য়ের মতো? আমি কি মায়ের মতো? না অর্না?
– বুঝতে পারি আপনি আর অর্পার কলিজা অর্না।
– বাহ। আপনি সবসময় ঠিক বোঝেন। অবাক লাগে।
– একটা কথা বলুন তো। আপনার মা আপনার সাথে এমন ব্যাবহার করে মনে হয় আপনি উনার মেয়েই না। বাকি দুজন উনার মেয়ে। রিত্তি দির্ঘশ্বাস নিয়ে বললো।

– তেমন কিছুনা।
– তার মানে কিছু একটা। বলতে পারেন সমস্যা নেই।
– বাদ দেন মা’য়ের কথা।
– আমি তো আজকে বাদ দিবোনা। খারাপ লাগবে আমার না বললে।
– আসলে কেউ তো নিজের মেয়ের সাথে এমন ব্যাবহার করেনা।
– মানে কি? নিজের মেয়ে না মানে? আপনি ওনাদের মেয়ে না?
– হুম মেয়ে! ওনাদেরি মেয়ে। অর্পা আর অর্না দুজনের নামও আমি রেখেছি।
– আপনার কথা আমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। একটু খুলে বলুন তো।
– তখন আমার বয়স খুব কম। তবে কিছুকিছু বুঝি। আমার বাবা মা দুর্ঘটনায় মারা যান। বাবা প্রাইমারি স্কুলে নতুন শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলো তখন।
– মানে? বাবা মা মারা যায়? তাহলে এরা কারা ? আপনি না বললেন আপনি ওনাদের মেয়ে।
– বাবা মা নাকি প্রেম করে বিয়ে করে। তাই তারা মারা যাবার পর কেউ ছিলোনা আমার। আমিও কাউকেই চিনিনা। না মা’য়ের বাড়ির মানুষদের না বাবার বাড়ির মানুষদের। পালিয়ে বিয়ে ছিলো তো।
– কেমন কথা বলছেন এগুলো? আমি তো পাগল হয়ে যাচ্ছি। মাথায় কিছু ধরছেনা।
– ধরবে ধরবে। বাকিটা কাল বলি?
– আচ্ছা।

আমার যেন ত্বর সইছেনা। কি শুনলাম এটা। রিত্তি নাকি ওনাদের মেয়ে না! তাহলে বাড়ীওয়ালী মা হয়না কিভাবে? ঘুম আসছেনা আজ। এক গ্লাস পানি খেয়ে দিন পাড়। রাতে শুধুই রিত্তির কথা মাথায় ঘুরেছে। আজকে আমি বিকেল তিনটা বাজতেই ছাদে এসে রিত্তির জন্য অপেক্ষা করছি।সময় যেন থমকে আছে। রিত্তির ওযেন কিরকম লাগছে। আমার কাছে খুলে না বললে যেন ভীতর থেকে একটা চাপ যাচ্ছেনা। তাই আজকে একটু তারাতারি ছাদে এলো। আসতেই আমি তারাহুরু করে বললাম।

– বলুন। বাকিটা বলুন।
– অস্থীর হচ্ছেন কেন? কেমন আছেন?
– আছি ভালই। আপনি আপনার কথা বলুন।
– খেয়েছেন কি?
– সকালে হোটেল থেকে রুটি খেয়ে নিয়েছি। আপনি বলুন।
– আমি কেমন আছি জিজ্ঞেস করবেন না?
– ভালো নেই বুঝতে পারছি। তাই জিজ্ঞেস করবোনা। আপনি বলুন।
– আপনি আসলে ঠিকই বোঝেন।

বলেছিলাম না আমি তখন একা। আমি এখন যাকে বাবা ডাকি উনি বাবার থেকেও বেশি কিছু। তখন তিনি অবিবাহিত ছিলেন। আমাকে শহরে নিয়ে আসে গ্রাম থেকে। কিছুদিন পর বিয়ে করে। ব্যাবসায়ও ভাল উন্নতি হয়। তাই একসাথেই থাকতাম তখন থেকে একটা ছোট বাসায়। তারপর এই মা গর্ভবতী হয়। পরে বাসা পরিবর্তন করে এই বাসায় উঠি। তারপর অর্পা হলো। অর্পার নামও আমি রেখেছিলাম। তারপর থেকে মা যেন কিরকম হতে লাগলো। আসলে নিজের সন্তাত তো নিজের সন্তানই। তবে বাবা আগের মতোই ভালবাসতো। বলতে গেলে পৃথিবীতে আমি অনাথ। আজকে এ বাসা থেকে বের করে দিলে আমার যাওয়ার কোন যায়গা থাকবেনা।

অর্পা আর আমি আপন বোনের থেকেও বেশী আপন। আসলে খুব ছোট থেকেই আমি খাইয়েছি। স্কুলে দিয়ে এসেছি আবার নিয়ে এসেছি। অর্পা যখন জানলো আমি তার মা’য়ের পেটের বোন না। দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে অনেক কান্না করেছে। কিন্তু আমরা ঠিক আছি। তারপর থেকে এইতো আছি প্রতিদিন মা’য়ের বকা শুনে। বাড়ির সব কাজ আমাকেই করতে হয়। তারপর মা আবার গর্ভবতী। অর্না হলো। অর্পার নামের সাথে মিল রেখে নাম রাখলাম অর্না। আসলে মা’য়ের কথায় সবাই উঠে বসে। আর বাবাতো দেশের বাহিরেই থাকে। বছরে একবার আসে। এই তো এভাবেই আছি। এজন্যই মা আমার সাথে এমন ব্যাবহার করে। সে চোখের পানি মুছছে নিজের হাতে। আমিও এবার কি বলবে বুঝতে পারছিনা। মেয়েটার প্রতি অদ্ভুত এক মায়া জন্মে যায়। আমি বললাম।

– আমার না ক্ষিদে পেয়েছে।
– অহ।! আপনার বাসায় তো কিছু নেই মনে হয়। আমি আপনার জন্য রান্না করে নিয়ে আসছি ঠিকাছে? মাথা নাড়িয়ে বললো।
– ঠিকাছে।

দুজনেই মুচকি মুচকি হাসছিলাম। আরেকটা প্রেমের কাহিনি শুরু হচ্ছে আরকি। এভাবে পাঁচদিন চুরি করে রান্না করে দেয় আমাকে। হালকা হালকা করে দুজনের গল্প বাড়ে। প্রতিদিনিই সুখ দুঃখের আলাপ হয়। তারপর নাম্বার আদান-প্রদান। রাত জেগে কথা বলা। শেয়ারিং, কেয়ারিং, শাষন। একসময় দুজনেই দুজনের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ি। ব্যাপারটা সবাই লক্ষ করে। আমি ঠিক করি এবার প্রস্তাব দিয়েই দিব। কিন্তু কোনভাবেই পেরে উঠছেনা। রাত বারোট বাজে। হাতে কিছু গোলাপ ফুল নিয়ে ছাদে বসে আছি। ভাবছি ফোন দিব কি না। যরি ফিরিয়ে দেয়? তাহলে কি করব? কেমন লাগবে? এসব ভাবাভাবী বাদ দিয়ে ফোন দিলাম।

– এতো রাতে?
– আজকের চাঁদটা দেখেছেন? অনেক সুন্দর। আমি ছাদে বসে আছি।

বলেই আমী ফোন কেটে দেই। মনে মনে ধরে রেখেছি যদি রিত্তি আসে তাহলে বুঝব রিত্তিও তাকে ভালবাসে আর না আসলে ভালবাসেনা। অপেক্ষার প্রহর গুনার সময় সে এসে হাজির। ভয়ে কাঁপছে রিত্তি। আমি উঠে গিয়ে দোলনায় বসতে দিলাম তাকে। জোছনাকুমারী লাগছে যেন রিত্তিকে। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে বললাম।

– আজকের চাঁদটা অনেক সুন্দর না?
– হুম।
– কিন্তু আপনার সাথে তুলনা দিলে চাঁদ লজ্জা পাবে।সে চুপ করে বসে আছে। কয়েকমিনিটের জন্য দুজনেই নীরব। হঠাৎ আমি দোলনার সামনে হাঁটুগেরে গোলাপ ফুল দিয়ে প্রপোজ করে ফেললাম।সেখানে মধ্যে কিরকম হাওয়া বয়ে গেলো। এখন কিছু বলা ঠিক হবেনা। রাত হয়ে যাচ্ছে। তাই ফুলগুলো হাতে নিয়েই দৌড় দিলো।রিত্তির মিষ্টি হাসিতে আর বাকি রইলনা কিছু ফযরের আজান দিবে একটু পর। সবাই বেশ ঘুমে। বাজে একটি স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে গেলো অনন্যার। সিয়ামকে ফোন দেয়। ঘুমুঘুমু চোখে ফোনটা রিসিভ করলো। অস্ফুট স্বরে অনন্য বললো।

– ঘুমাচ্ছেন?
– না। ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো।
– নামাজে যাবেন না?
– দেখি। রাগী কণ্ঠে রিত্তি বললো।
– দেখি মানে কি? যাবেন না?
– হ্যাঁ উঠছি।
– সাথে যে তিন বান্দর আছে তাদেরকেও নিয়ে যান।
– আচ্ছা।
– একটা কথা বলুন তো।
– কি?
– আমার কথা এতো শুনেন কেন?
– বড়দের কথা শুনতে হয়।
– আমি কি বড়? তাছাড়া অন্য বড় কেউ বললেও শুনবেন না?
– সবাই কি আর জোছনাকুমারী হয়?
– হয়েছে বোঝেছি। নামাজ শেষে আবার ঘুমাবেন। রাখছি তাহলে।
– আচ্ছা। শুনো… কিছু একটা বলতে ফোন করেছো মনে হয়। বলে ফেলো সংকোচ করোনা। রিত্তি আশ্চর্যান্বিত হয়ে যায়। কিভাবে বোঝে খালিদ সব মনের কথা?
– না মানে….।
– ইচ্ছে না হলে বলোনা। কিন্তু যদি মন চাপ দেয় বলতে তাহলে দেরী করোনা।
– আমি মুখ দিয়ে বলতে পারবোনা।
– আমি একেবারে হারিয়ে গিয়েছি না?  রিত্তি থ হয়ে আছে। এতকিছু বোঝে ফেললো কিভাবে? স্বপ্নে কি দেখেছে সেটাও বোঝে ফেললো।
– না। একেবারেই না। এই কথা আর বলতে পারবেন না।
– চিন্তা করোনা। ঘুমাও পারলে। আমি কখনো হারাবোনা।
– রাখছি তাহলে।
– আল্লাহ হাফেজ।

ফোন রেখে দিলো রিত্তি। কিন্তু অজানা এক কাল ভয় হচ্ছে। কেন হচ্ছে সে নিজেও বোঝতে পারছেনা। আমার সাথে কথা বলার সময় অর্পা সব শুনে ফেলে।রিত্তির কাঁধে হাত রেখে বললো।

– কিছু হবেনা আপু। ঘুমাও।

রিত্তি অর্পার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কি বলবে বোঝতে পারছেনা। শুয়ে আছে তবুও ঘুম আসছেনা। পাখীরা কিচিরমিচির করছে। আমি বাকি তিন বান্দরদের নিয়ে অজু করে মসজিদের দিকে রওনা দিলাম। আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটছিলাম। তিনজন একটু সামনে চলে যায়। একটা মালবাহী গাড়ি আসে ভোর সকালেই। সামনের তিনজন সরে যায়। আমি বুঝে উঠার আগেই গাড়ির একপাশের ধাক্কা লাগে আমার মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে রক্ত ঝড়তে থাকে। ঠিক ঐসময় রিত্তির ভেতরে কিরকম যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। গাড়ি ব্যাবস্থা করার আগেই অনেক রক্ত ঝড়ে যায়। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। পরিচিত এক ডাক্তার চাচা ছিলো তাই সাজ সকালেই ঠায় হলো হাসপাতালে। রিত্তি আমার ফোনে ফোন দিলো। ফোন সৌরভের কাছে। রিসিভ করেই কাঁদতে লাগলো। রিত্তি বোঝতে পারলো খারাপ কিছু একটা হয়েছে। সৌরভের কণ্ঠ শুনে বললো।

– কি হয়েছে আপনার বন্ধুর? সৌরভ কাঁদতেই আছে।

– হাসপাতালে।

বলেই ফোন কেটে দেয় সৌরভ কথা বলতে পারছিলোনা আর। ফোনে টেক্সট করে হাসপাতালের ঠিকানা নিয়ে ছুটে আসে রিত্তি। এতোক্ষণে আমি আইসিইউতে [ICU] আমার মা বাবা বা গ্রামের কেউ তো জানেনা। আছে বলতে তিন বন্ধু। একেকজন একেকজায়গায় বসে আছে। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। রিত্তি কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এই ভয়টাই হচ্ছিলো।রিত্তির কাছে মনে হচ্ছে আমার এই অবস্থার জন্য সে নিজে দ্বায়ী। নামাজে না পাঠাতে বললে হয়তো দুর্ঘটনা’টা ঘটতোনা। মৃতুর সাথে পাঞ্জা লড়ছি আমি। চারজন বাহিরে কান্না করছে। কেউ কাউকে শান্তনা দেবার অবস্থা নেই। কেউই কান্না থামাতে পারছেনা। সবাই খুব অস্থীরতায় ভুগছে। আমার জ্ঞান ফিরেছে। শুয়ে আছি। এক পাশে তিন বান্দর চোখের পানি মুছছে বারবার। এক পাশে রিত্তি আমার বাঁ হাত ধরে কাঁদছে। কথা বলতে খুব অসুবিধে হচ্ছে আমার । তবুও কি যেন বলতে চাচ্ছি। রিত্তি মুখে চাপ দিয়ে বললো।

– এখন কিছু বলতে হবেনা। আপনার কিছুই হবেনা। কদিন পরেই কথা বলবেন। আমার চোখ দিয়েও পানি ঝড়ছে। এক মাস লাগবে পুরো সুস্থ হতে ডাক্তার বলেছে। রিত্তি , অর্পা, অর্না সহ চেনা জানা সবাই প্রতিদিন দেখতে আসে আমাকে। এখন একটু একটু কথা বলতে পারি। রিত্তি ঔষধ আর পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি হা করছিনা। রিত্তি বললো।

– হা করছেন না কেন?
– আর ঔষধ খেতে ভাল লাগেনা।
– এসব বললে হবেনা। আর তো মাত্র কয়েকদিন।

আমি অনিচ্ছাকৃত ভাবেই হা করলাম। ঔষধ আর পানি খাইয়ে রিত্তি এখন চলে যাবে। দূপুরে আবার আসবে। আমি হাত ছাড়ছিনা। সে হাতটা আরো শক্ত করে ধরে বললো।

– এখন ছাড়েন। নাহলে দূপুরে আসতে দিবেনা মা।
– তুমিই তো আরো শক্ত করে ধরে রেখেছো। তুমি কাছে থাকলে সময় এতো দ্রুত চলে যায় কেন বলতে পারো? রিত্তি হাতটা ছেড়ে বললো।
– জানিনা। এখন যাই দূপুরে আসবো।

আমি অসহায় চোখে তাকিয়ে আছি। আমার গ্রামের বাড়িতে কেউ কিছু বলেনি। বয়স্ক মা,বাবা। যদি কিছু হয়। মা’য়ের মন ঠিকই ছটফট করে। ফোনে পায়না। বন্ধুরা এটা-সেটা বলে কাটিয়ে দেয়। রনির প্রেমিকা দীয়া রনিকে বকাঝকা করছে। তাঁকে সময় দিতে পারছেনা। আমার খেয়াল রাখতে হয়। আমার কাছে থাকতে হয়। দীয়া ফোন দিলো রনিকে।

– কই তুমি?
– হাসপাতালে।
– খাইছো?
– হুম। তুমি?
– আমার খোঁজ নেয়ার সময় আছে তোমার? আছো তো খালিদকে নিয়ে।
– ভালো করে কথা বলো।
– মানে? আমি খারাপ করে কথা বলছি?
– খালিদকে নিয়ে আছি মানে কি?
– আমি তো সত্যই বলেছি।
– হাহ। তোমরা মেয়েরা এমনি।
– তুমি কি বলতে চাচ্ছো?

– তোমার সেমিষ্টার ফি’র কথা মনে আছে? একবার না দুবার না তিন তিনবার খালিদ তোমার টাকা ম্যানেজ করে দিয়েছিলো। তোমার হাতের ফোনটা আমি দেইনি খালিদের টাকার কেনা। আমার সাথে তোমার রিলেশন হওয়ার আগের কথা মনে পড়ে? ছিঃ আজ তুমি বলছো আমি খালিদকে নিয়ে আছি? এরপর আর ফোন দিবেনা।

– তাই না? ওসব আগের কথা।
– ঘৃণা হচ্ছে আমার আজ। খুব ঘৃণা হচ্ছে।
– আমি বড় না খালিদ বড়?
– গুড বাই।

রনি দীয়ার নাম্বারটা ব্লক করে দেয়। সব যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্লক করে দেয়। রনি ভাবছে আমি যদি শুনি দীয়া এসব বলেছে। বিশ্বাস করবনা। কিছু মেয়ে নিজের স্বার্থের জন্য নিখুঁতভাবে চোখের পানি ফেলতে পারে। রিত্তি এসে আবারো খাইয়ে যায় দূপুরে। রনি মুখ কালো করে বসে আছে। আমিম বোঝতে পারলাম কিছু একটা হয়েছে।

– কি হইছে রে?
– কিছুনা।
– দীয়ার সাথে ঝগড়া আবার না?।
– তুই কেন ঐ মেয়েটারে বারবার সাহায্য করিস বলতো?
– আমি জানি রে দীয়া তোরে ফোনে বকছে। আমার কাছে আছিস বলে তাইনা?
– তুই বোঝলি কিভাবে?
– আমারও একটা বোন ছিলো জানিস। বোন। কিন্তু আজ নেই রে। অনেক দূরে চলে গেছে- যেদিন ভার্সিটিতে ভাইয়া বলে ডেকেছিলো প্রথম। সেদিন থেকেই নিজের বোন ভেবেছি।
– খুব মহৎ কাজ করছিস। আজ সেই মেয়েই কিনা… । আমার মাথা ধরে আছে।
– বাসায় যা গিয়ে ঘুমা।
– থাপ্পড় চিনস? আবার আইসিইউর কাজ লাগবো।
– আচ্ছা ভাই তুই মাথা ব্যাথা নিয়েই থাক।
– তোর মাথা ব্যাথা করেনা? বেডে শুয়েও ঝগড়া করিস?
– তাই তো বেচে আছি রে।

দুজনেই খিলখিল করে হাসছে।আমি এখন পুরো সুস্থ। বাসায় ফিরিছি কাল। সৌরভ আর আমি আজ ছাদে বসে আছি। রিত্তি আসার পরে সৌরভ চলে যায়। রিত্তি বললো।

– অসভ্য চলে গেলো কেন?
– উম আমার আর তোমার মাঝে কোন অসভ্যতা করবেনা বলে হেহে।
– কি যে বলেন।
– তোমার হাতটা একটু ধরি?
– না। ছাদে কেউ আসলে?
– আসবেনা অসভ্য নিচে পাহারা দিচ্ছে।
– মানে কি?
– হুম।
– না তবুও ধরা যাবেনা।
– ঠিকাছে।  আমি একটু সরে বসলাম দোলনায়। অভিমান করেছি।চুপ করে আছি কথা বলছিনা। রিত্তি একটা হাত ধরে বললো।
– একটা আবদার করি?
– হুম। তখনই আমার ফোন বেজে উঠে। রিত্তি বললো।
– ফোনটা ধরেন।
– পরে ধরা যাবে। তুমি বলো।
– ফোনটা ধরেন আগে। ফোনটা রিসিভ করতেই দীয়া কাঁদতে থাকে।
– কি হলো কাঁদছো কেন?
– সরি ভাইয়া। আমি বোঝতে পারিনি।
– সে কিছুনা।
– রনি আমার নাম্বার সহ সব ব্লক করে রেখেছে।
– আমি দেখছি। বলে আমি ফোন কেটে দিলাম। রিত্তি বললো।

– কে?
– দীয়া।
– দীয়া কে?
– রনির গার্ল্ফেন্ড। তোমার আবদার টা বলো।
– আমাদের সম্পর্কটা তো মা মেনে নিবেনা।
– তোমার কি মনে হয় আমি তোমার বাবার টাকা’কে ভালবাসি?
– না। আমি কি সেটা বলেছি?
– তুমিই আমার পৃথিবী। আর কিছু চাইনা আমার।
– তবুও তো। সবাই তো জানে উনারাই আমার বাবা,মা।
– ভালবাসো? রিত্তি মাথা নাড়িয়ে বললো।
– হুম।
– বিশ্বাস করো? আবারো মাথা নাড়িয়ে বললো।
– হুম।
– তাহলে এসব চিন্তা বাদ দাও।
– আপনি কি কোনদিন গ্রামের বাড়ি যাবেন না?
– তোমাকে তো সবই বললাম।
– হুম। আচ্ছা আমি তাহলে আজ যাই।
– আসলেই যাইযাই করো কেন?
– আমার অনেক কাজ থাকে বোঝলেন?
– হ্যাঁ যাও।

রিত্তি চলে গেলো। আমি রনিকে কোনভাবেই বোঝাতে পারেলামনা। রনি কোনভাবেই আর দীয়ার সাথে সম্পর্ক রাখতে চায়না। আমি বললাম। এই শেষ বার। রনি তবুও রাজি হয়না। অনেক চেষ্টা করে নাম্বার আনব্লক করলো। দীয়া ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করলো। আবার তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। আমি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বাঁচলাম। রিত্তিকে ফোন দিলাম।

– কি করো?
– এইতো অর্নাকে পড়াচ্ছিলাম। আপনি?
– একটা মহৎ কাজ করেছি।
– হুম ভালো।
– আচ্ছা তোমার চাঁদমুখটা কি আজ আর দেখতে পাবোনা?
– নাহ। এতো দেখা লাগবেনা।
– না দেখলে যে আমার ভাল লাগেনা। মন মানেনা।
– ইশ। মন মানবে, মানবে।
– তুমি আসবে আসবে। আমি আর কিছু জানিনা।
– কোথায় আসবো?
– কেন ছাদে?
– পারবোনা সাহেব।
– আচ্ছা।

আমি ফোন কেটে দিলাম। মনটা খারাপ হয়ে যায়। তবুও ছাদে গিয়ে অপেক্ষা করছে। ব্যাস্ত শহরের ব্যাস্ত মানুষ। সবাই নিজের জন্য ছুটছে। গ্রামে মানুষ কম। তাই হয়তো সৌন্দর্য বেশি। এসব ভাবছি আনমনা হয়ে। হঠাৎ পাশ থেকে কে যেন বলে উঠলো।

– কি ভাবছেন? আমি না তাকিয়েই বললো।
– কাজী অফিস।
– বাব্বাহ। এতো তারাতারি?
– অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে।
– কেনো কেনো?
– তোমাকে ছাড়া যে আমার একটা মুহুর্তও কাটেনা।
– কাটেনা কেন?
– এতো প্রশ্ন করো কেনো?
– ভাল লাগে।
– কেন ভালো লাগে?
– জানিনা।
– মেয়েদের এই এক কথা জানিনা বলে সব উড়িয়ে দেয়।
– উড়তে দিবোনা আমি। লুকিয়ে রাখবো।
– কিভাবে?
– ভালবাসা দিয়ে।
– চলোনা বিয়ে করে ফেলি।

দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখে বলছি আমি ঘুমাচ্ছি। হঠাৎ রিত্তির ঠোঁটের স্পর্শে ঘুম ভাঙ্গলো।

– কি সাহেব? উঠার সময় হয়নি?
– না একটু পরে উঠবো।
– কেনো? অফিস যাবেনা?
– অফিসের অনেক সময় আছে।
– লেট করে গেলে তোমার বস তোমাকে বকা দেয় না?
– না। তোমাকে বকা দেয়।
– কেনো? আমাকে বকবে কেন?
– আমি বলি তুমি আমাকে ছাড়োনা। তাই আসতে দেরী হয়।
– মিথ্যে বলো কেন?
– আমি মিথ্যা বলি? তুমি আমাকে জড়িয়ে রাখোনা?
– না রাখিনা।
– সত্যি তো?
– এক সত্যি দুই সত্যি তিন সত্যি। আমি রেগে গিয়ে বললাম।
– যাও কাল থেকে তোমাকে আর জাগিয়ে দিতে হবেনা।
– কেনো? তাহলে কে জাগিয়ে দিবে? ঘরে বউ আরেকটা আছে? নাকী আরেকটা আনার শখ?
– থাপ্পড় চিনো?
– কেনো মারবে?
– হ্যাঁ। এসব কি বলো? আমি সহ্য করতে পারিনা।
– বা রে আমি কি সত্যি বলেছি নাকি?
– তাও এসব আর বলবেনা।
– ঠিকাছে। এখন উঠো। আমি নাস্তা রেডি করতে গেলাম। পাঁচ মিনিটের মধ্যে না উঠলে কিন্তু পানি ঢেলে দিবো।
– আরেকটু থাকোনা।
– নাস্তা করতে হবেনা?
– আচ্ছা আজকে নাস্তা করবোনা।
– রাখো তো এসব। আমি গেলাম।

রিত্তি নাস্তা রেডি করতে গেলো। আমি উঠে ফ্রেশ হলাম। খাবার টেবিলে বসে আছি। সে খাবার বেরে দিচ্ছে। আমি রিত্তির দিকে অপলকে তাকিয়ে আছে।

– এভাবে তাকিয়ে থাকো কেন?
– মন ভরেনা যে।
– প্রতিদিনই দেখো তাও ভরেনা?
– মনে হয়না এ জনমে ভরবে।
– ইশ রে। কত্ত পিরিত। এখন খাও তারাতারি অফিসে যেতে দেরী হবে।
– আমি কি একাএকা খাই প্রতিদিন?
– উম আজকে আমি খাবোনা। তুমি খাও আমি দেখি তোমাকে।
– কালকে দেখো। বসো তো আমার সাথে খাবে নাহলে আমি খাবোনা।

দুজনে একসাথে খেলাম। আমি অফিসে গেলাম। আমার যাওয়ার পাঁচ মিনিট পরেই রনি আর দীয়া আমার বাসায় ঢুকলো। রিত্তি অবাক। দীয়ার সাজুগুজো দেখে রিত্তির বোঝতে বাকি রইলোনা যে তারা মাত্র বিয়ে করে এসেছে। রিত্তি বলল।

– আমি যা ভাবছি তা কি ঠিক? রনি মাথা নাড়িয়ে বললো।
– হুম। রিত্তি আর কিছু বললোনা। দুজনের জন্য খাবার রুমে দিয়ে আটকিয়ে রাখলো। তারপর আমাকে ফোন দিলো।
– তোমাদের ভদ্র বান্দরটা তো মহৎ একটা কাজ করে ফেলেছে।
– রনি কি করলো আবার।
– বিয়ে।
– বিয়ে মানে?
– হুম বিয়ে। তুমি করতে পারো রনি করতে পারেনা?
– সিরিয়াসলি?
– হুম। দুজনকে গেষ্ট রুমে বন্ধি করে রেখেছি। তারাতারি বাসায় আসো তুমি।
– ও গড ।

আমি অফিস শেষ করে কিছু ফুল, একটা লাল বেনারসি আর পাঞ্জাবী নিয়ে বাসায় আসলাম। বাসায় এসে তাদেরকে গিফট করলাম। রনি কি বলবে বোঝতে পারছেনা। দীয়া কাঁদে। আসলে বড় সমস্যাটা হচ্ছে রনি মুসলিম আর দীয়া হিন্দু। দীয়ার বাড়িতে জানলে না জানি কি হয়। শেষ ভরসা আমি তাই আমার বাসায়ই আসা। অনেক ঝামেলা হলো। তবুও আমি সব সামলিয়ে তাদের এক করে দেই। রনি ডাক্তার। পাঁচটা বউ’য়ের খরচ চালাতে পারবে। কিন্তু দীয়া হিন্দু বলে যত সমস্যা হয়েছিলো। যাহোক এখন তারা খুব সুখে আছে। আজকে শুক্রবার।

– ঐ কই তুমি? শুক্রবারেও তোমার কাজ থাকে? রিত্তি একটু জোরে পাশের রুম থেকে বললো।

– ও সাহেব। এটা আপনার অফিস না যে শুক্রবারে ছুটি। সংসারটা সাজিয়ে রাখতে হয় বোঝলেন?

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত