কষ্ট

কষ্ট

রাতে আম্মুর সাথে অনেক ঝগরা করে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকাল বেলাও ঘুম থেকে উঠলাম না আরো অনেক ঘুমাবো বলে। আম্মুও ডাকলোনা, কারন আম্মু জানে আমি একটু বেশি ঘুমাই। দুপুর হয়ে গেল, এবার আম্মু আমাকে অনেক ডাকলো কিন্তু তাও আমি উঠলাম না। আম্মু চলে গেল। একটুপর আম্মু এসে আমাকে অনেক বকা দিলো কিন্তু আমি তাও উঠলাম না। এইবার আম্মু আমার প্রতি অনেক রেগে গেল। তাই রাগে আমার শরিরে একটা থাপ্পর দিলো, কিন্তু তাও আমি উঠলামনা। এবার আম্মু আমার হাত ধরে টান দিলো সাথে সাথে আমার পুরো শরীর নড়ে উঠলো। তারপর আম্মু চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। এরপর দৌড়ে আব্বুর কাছে গেল আর আব্বুকে নিয়ে আসলো।

আব্বু এসেও আমাকে অনেক ডাকলো কিন্তু আমি তাও উঠলাম না। আব্বু আমার শরীরে হাত দিয়ে দেখে আমার শরীর পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। এবার আর কিছু না বলেই আব্বু চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিলো। কান্না করতে করতে বললো উঠ বাবা। তোকে আর কোনদিন কিছু বলবো না। তুই যেটা চাশ ওটা দিবো। আম্মু ও চিৎকার করতে করতে বলতে থাকলো তুই যতো ঘুমাস বাবা তোকে আর কোনদিন কিছু বলবোনা। উঠ বাবা তুই। ছোট ভাইবোন গুলোও কান্না করতে করতে বলছে- ভাইয়া উঠো প্লীজ। তোমাকে আর কোনদিন আমরা জ্বালাবোনা। আম্মুর কাছে তোমার নামে মিথ্যা নালিশ দিবোনা। অবাক হচ্ছি এটা দেখে যে- তারাতো কেউ কোনদিন এতো আদর করে আমার সাথে কথা বলেনি। আজকে তাহলে বলছে কেন। একটুপর আমি তাদেরকে বললাম কি হলো? তোমরা কান্না করছো কেন? তারা কেউ আমার কথার উত্তর দিলোনা। আমি উঠে বসতে চাইলাম। কিন্তু একি!! আমার শরীর কেমন যেন পাথরের মতো হয়ে গেছে৷ অনেক চেষ্টা করেও উঠে বসতে পারলাম না।

একটুপর আমাদের বাড়িতে অনেক মানুষ আসলো। সব আত্মীয়রা এসেছে আজ। ঐযে আমার মামা কেও দেখা যাচ্ছে। একটা কোনে বসে চুপচাপ কান্না করছে। মামাকে আমি চিৎকার করে ডাকলাম মামা কান্না করছো কেন তুমি? কিন্তু কোন উত্তর দিলোনা। একটুপর কয়েকজন এসে আমাকে আমার রুম থেকে বের করে নিয়ে গেল। আমি চিৎকার করে বলছি উহ আস্তে ধরো আমি অনেক ব্যাথা পাচ্ছি। কিন্তা তারা কেউ আমার কথা শুনলোনা। আমাকে রোদের মাঝে একটা শক্ত লোহার খাটে শুইয়ে দিলো। আমি চিৎকার করে বললাম প্লীজ আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও, আমি আর সহ্য করতে পারছিনা। খাটটা অনেক শক্ত। কিন্তু কেউ আমাকে এখান থেকে সরালোনা।

একটুপর দেখলাম আমার কয়েকটা বন্ধু আসলো। খুব পরিচিত মুখগুলো। এইযে গতকাল রাতে বাসায় আসার আগেও রেহানের সাথে আড্ডা দিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু রেহান এখন আমার দিকে তাকিয়ে কান্না করছে। আমি তাকে চিৎকার করে বললাম, দোস্ত প্লীজ আমাকে এখান থেকে সরিয়ে নে। খুব কষ্ট পাচ্ছি। কিন্তু রেহানও আমার কথা শুনলনা। কিছুক্ষন পর কয়েকজন এসে আমাকে এখান থেকে নিয়ে গেল। মনে মনে আমি অনেক খুশি হলাম এই ভেবে যে এবার আমাকে অনেক আরামে রাখবে।

কিন্তু তারাও একটুপর আমাকে অন্য একটা জায়গায় নিয়ে আসলো। জায়গাটা চারদিক দিয়ে আগলে রাখা কাপড় দিয়ে। তারা সেখানে এনে আমাকে আরেকটা খাটে শুইয়ে দিলো। আমি চিৎকার করে বললাম প্লীজ নিচে একটা চাদর দাও, আমার পিঠ পুড়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারাও শুনলোনা আমার কথা। একটুপর আমার মামা আমার কাছে আসলো। মামা কিছুক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তেআস্তে আমার পড়নের কাপড়গুলো খুলে নিলো। আমি মামাকে চিৎকার করে বললাম- মামা আমি প্রচন্ড ব্যাথা পাচ্ছি। প্লীজ আস্তে খোলো। কিন্তু মামা পাষন্ডের মতো আমাকে অনেক কষ্ট দিলো।

ওমা!! এবার দেখি মামা আমার দিকে গরম পানি নিয়ে আসছে। আমি দেখেই প্রচন্ড জোরে চিৎকার করতে থাকলাম। মামাকে বললাম- মামা প্লীজ আমাকে গরম পানি দিয়োনা। আমার শরীর জ্বলে যাবে। কিন্তু না মামা তাও আমার শরীরে গরম পানি লাগালো আর অনেক জোরে জোরে পুরো শরীরে ঢলতে লাগলো। আমি তখনও মামাকে বললাম- মামা তুমি আমার সাথে এমন করছো কেন?? আমিতো আর পারছিনা। প্লীজ আমাকে এতো কষ্ট দিয়োনা। একটু আস্তে স্পর্শ করো আমাকে, আমার পুরো শরীর ব্যাথায় ভরে যাচ্ছে।

সেখানে আমাকে গোসল করিয়ে তারপর একটা সাদা কাপড় পরিয়ে দিলো। এরপর যত্ন সহকারে আমাকে বের করে নিয়ে আসলো। এবার আমি অনেক খুশি হলাম। ভাবলাম এবার বোধহয় আমাকে আমার রুমে নিয়ে যাবে। কিন্তু না, এবারও তারা এনে আমাকে লোহার খাটে শুইয়ে দিলো। আমি আম্মুকে চিৎকার করে বললাম- আম্মু প্লীজ আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। আমি আর তোমার সাথে ঝগরা করবোনা। তোমাকে কষ্ট দিবোনা। আম্মুও শুনলনা আমার কথা।

কিছুক্ষন পর আমার মামা এসে আমার মুখ বেধে দিলো। আমি মামাকে বললাম- তুমি এতো পাষান কেন? প্লীজ আমার মুখের বাধনটা খুলো, আমি শ্বাস নিতে পারছিনা। কিন্তু কেউ খুললোনা। এরপর কয়েকজন এসে খাট সহ আমাকে কাধে তুলে নিলো। তখন আম্মু চিৎকার করে এসে তাদেরকে বাধা দিলো কিন্তু কয়েকজন আম্মুকে আটকে রাখলো। আর তারা আমাকে নিয়ে চলে যেতে থাকলো। পিছন পিছন অনেক মানুষ আসছে। আমি তাদেরকে কান্না করতে করতে বললাম- কোথায় নিয়ে যাচ্ছো আমাকে?? আমাকে আমার বাড়িতে রেখে যাও। আমার আম্মুর কাছে রেখে যাও। কিন্তু তারা তাও আমাকে নিয়ে আসলো।

আস্তেআস্তে তারা আমাকে অনেক লোকালয়ের মাঝে নিয়ে আসলো। অনেকেই শুনলাম আমাকে নিয়ে অনেক কথা বলছে। একটুপর সবাই সাড়িবদ্ধ হয়ে দাড়িয়ে গেল, তারপর ইমাম সাহেব জানাযার নামায পড়িয়ে নিলো।
তারপর কয়েকজন এসে আমাকে আবার কাধে তুলে নিলো। এবার পিছন দিকে তাকিয়ে দেখলাম ৩ভাগের ২ভাগ মানুষ চলে যাচ্ছে। আর এক ভাগ মানুষ আমার পিছনে আসছে। ভাবলাম এবার বোধহয় আমাকে বাড়িতে নিয়ে যাবে। কিন্তু সামনে তাকিয়ে দেখলাম তারা আমাকে আমাদের বাড়ির পিছনে নিয়ে যাচ্ছে। যেখানে আমি দিনের বেলা যেতেই ভয় পাইতাম। আমি আমার পাশের একজনকে ডেকে বললাম আমাকে ওখানে নিয়ো যাচ্ছো কেন?? সে কোন উত্তর দিলোনা। আমাদের বাড়ির বরাবর আসার পর দেখলাম আমার সব আত্মীয়রা বসে বসে কান্না করছে। আর আম্মু চিৎকার করে বলছে আমার ছেলেকে আমার কাছে দিয়ে যাও। আমিও চিৎকার করে বলছি- আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো তোমরা? আমাকে আমার আম্মুর কাছে নিয়ে যাও। কিন্তু তারা তাও আমার কথা শুনলনা। আস্তেআস্তে তারা আমাকে আমাদের বাড়ির পিছনে নিয়ে আসলো।

তারা এবার আমাকে কাধ থেকে নামালো। আমি তাকিয়ে দেখলাম সেখানে একটি মাটির গর্ত। আর আশেপাশে কতগুোলো বাশের ছোট ছোট অংশ। এবার আমার চাচা বলে উঠলো। আর দেরি করিসনা। এবার লাশটাকে কবরে রাখ। আমি চাচার কথা শুনে অবাক হলাম। চাচা কাকে লাশ বললো? এখানেত কোন লাশ নেই। কিছুক্ষণ পর কয়েকজন এসে আমাকে খাট থেকে নামালো। তারপর আমাকে মাটির গর্তটার দিকে নিয়ে যেতে থাকলো। আমি তাদেরকে কান্না করতে করতে বললাম প্লীজ ওদিকে নিয়োনা আমাকে। আমার খুব ভয় হচ্ছে। কিন্তু তারা তাও আমাকে গর্তটার দিকে নিয়ে আসলো। তারপর দেখলাম গর্তটায় আমার আব্বু সহ আরো একজন আছে। দেখে মনে মনে খুশি হলাম। যাক, আব্বু তাহলে আমার সাথে থাকবে। এবার আরো আমার কোন ভয় নেই। আস্তে করে আব্বু আর কয়েকজন মিলে আমাকে গর্তটায় শুইয়ে দিলো। জায়গাটাতো দেখছি অনেক ছোট। আব্বু কিভাবে যে থাকবে আমার সাথে এখানে এটাই ভেবে পাচ্ছিনা।

কবরে শুইয়ে দিয়ে তারপর ঐ ছোট ছোট বাশের টুকরাগুলো আমার উপর দিতে থাকলো। আর একজন একজন করে উপরে উঠতে লাগলো। ৩জনের মাঝে ২জন উপরে উঠে গেছে। শুধু আমার আব্বু এখনও আছে। আব্বুকে আমি ডেকে বললাম- আব্বু এইগুলো দিচ্ছো কেন? আর আমাদের এতো সুন্দর বাড়ি থাকতে এখানে বুঝি আসতে হয়?

কিন্তু একটুপর আমাকে অবাক করে দিয়ে আব্বুও উঠে গেল। এবার আমি চিৎকার করতে থাকলাম। আব্বু কোথায় যাচ্ছো তুমি? আমার খুব ভয় হচ্ছে যে। প্লীয যেয়না তুমি। তারপর দেখলাম কয়েকজন মিলে খুব দ্রুত আমার উপর মাটি দিতে থাকলো। আমি তখনও চিৎকার করে বললাম- তোমরা কি পাগল হয়ে গেছ?? আমার উপর কেন মাটি দিচ্ছ তোমরা?? আমার এখানে ভালো লাগছেনা। প্লীজ আমাকে নিয়ে যাও। কিন্তু তারা কেউ আমার কথা শুনেনি। মাটি দিয়ে পুরো গর্তটা চেপে দিয়ে চলে গেল। তারপর আমি অনুভব করলাম মাটির গর্তটা আরো চেপে আসছে। তারপর অনেক কষ্টে কাটলো আমার রাতটা।

পরদিন সকালেই দেখলাম আবার কয়েকজন হুযুর সহ আব্বু এখানে আসলো। আমাকে কিছুক্ষন দেখে তারা চলে গেল। আমি আব্বুকে চিৎকার করে বললাম- আব্বু আমাকে নিয়ে যাও এখান থেকে। আমি অনেক কষ্ট পাচ্ছি। কিন্তু আব্বু শুনলোনা আমার কথা। একটুপর আম্মু আসলো। এসে অনেক কান্না করলো। আমি ডেকে বললাম যে- আম্মু আমাকে নিয়ে যাও এখান থেকে। এতো কষ্ট আমার আর সহ্য হচ্ছেনা।  তারপর আমার ছোট ভাইবোন ও আসলো, তারাও কান্না করে চলে গেল। তাদেরকে চিৎকার করে বললাম, একটু পানি দে ভাইয়া আমাকে। আমার অনেক পিপাসা পেয়েছে কিন্তু তারা পানি দিলোনা।

তারপর দিন শুধু আব্বুই আসলো। হুজুররা আসেনি আর। আম্মুও এসে কিছুক্ষণ থেকে চলে গেল। ভাইবোনের মাঝে একজন আসলো অন্যজন আসলো না। সবাইকেই আমি চিৎকার করে বলি প্লীজ নিয়ে যাও আমাকে এখান থেকে। শুনেনা কেউ আমার কথা। এরপরদিন আর আব্বু আসলোনা। আম্মুও আসলোনা। ছোট ভাইবোনও আসলোনা। সবাই আমার পাশ দিয়ে চলাফেরা করে। আমি সবাইকেই ডেকে বলি- আমাকে নিয়ে যাও এখান থেকে। এতো কষ্ট আমি আর সহ্য করে পারছিনা। কিন্তু কেউ নেয়না আমাকে।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত