রোগ

রোগ

প্রচন্ড শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেলো তন্দ্রার। সাথে সাথেই পাশে ঘুমিয়ে থাকা নীলকে ডাকলো সে। অপ্রস্তুত ভাবে ঘুম থেকে উঠে তন্দ্রার ভয়ার্ত চোঁখে তাকিয়ে থাকা দেখেই সোজা পাশের রুমের দিকে দোঁড় দিলো নীল। কারণ পাশের রুমে তাদের একমাত্র ৪ বছরের মেয়ে প্রশ্ন ঘুমিয়ে আছে। রুমে যেয়ে নীল এবং তন্দ্রার ভয়টা আরো বেড়ে গেলো কারণ প্রশ্ন রুমের ভেতরে নেই। গত কয়েকদিন ধরেই তাদের সাথে এইসব অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। নীল এবং তন্দ্রা উভয়ই প্রশ্নকে খুঁজতে লাগলো এবং একই সাথে ডাকতে থাকলো। খুঁজতে খুঁজতে তারা দেখতে পেলো প্রশ্ন ছাদের রেলিং এর উপর বসে আছে। অনেকটা আতংক নিয়েই নীল প্রশ্নকে নামিয়ে আনলো।

নামিয়ে আনার পর নীল যখন প্রশ্নকে জিজ্ঞাস করে কেনো সে ওখানে গিয়েছিলো তখন প্রশ্ন তাকে বলে তার একটা ছোট ভাইয়ের সাথে খেলা করতে। নীল এবং তন্দ্রা আবারো অবাক হয়ে যায় কারণ এতো রাতে ছাদের রেলিং এ ছোট ভাই কোথায় থেকে পেলো প্রশ্ন। শুধু যে প্রশ্নের সাথে এইসব ঘটছে তা না নীল এবং তন্দ্রার সাথেও এমন অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। এই যেমন নীল গোসল করতে গেছে হঠাৎ করেই ট্যাপ থেকে অনার্গল রক্ত পড়তে লাগলো। আবার তন্দ্রা মাঝে মাঝে একাই থাকলে কান্নার শব্দ শুনতে পারে তবে সে নিজের চোঁখে কখনো কিছু দেখেনি। প্রায় সময়ই নীল এবং তন্দ্রার প্রশ্নকে নিয়ে চিন্তায় থাকতে হয় কারণ হঠাৎ করেই প্রশ্ন উধাও হয়ে যায় এবং তাকে খুঁজে পেলে বলে তার ছোট ভাইয়ের সাথে ছিলো। যত দিন যেতে গেলো নীলের সাথে আরো ভয়ংকর ভয়ংকর ঘটনা ঘটতে লাগলো। নীলের যেন নিজেকে মানষিক রোগী মনে হতে লাগলো। . (২) . রিন্তির কপালে চুমো খেয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে গেলো রিয়ান।

রিন্তি এবং রিয়ান সদ্য বিবাহিত কাপল। যার ফলে তাদের মাঝে ভালোবাসাটাও অনেক গভীর। রিয়ান যাওয়ার আগে রিন্তিকে সাবধানে থাকতে বললে। কারণ রিন্তি এখন মানষিক ভাবে অনেকটাই বিপর্যস্ত। গত সপ্তাহে রিয়ান এবং রিন্তি ডাক্তারি টেষ্ট করতে গিয়েছিলো সেখানে জানতে পারে রিন্তি কখনো মা হতে পারবে না,সে মা হওয়ার ক্ষমতা চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলেছে। তারপর থেকেই রিন্তি যেন অন্যরকম হয়ে গেছে। মা হতে পারবে না জেনেও রিয়ান রিন্তিকে আগের মতোই ভালোবাসে। রিন্তি রিয়ানকে প্রায় সময়ই বলে যে সে তার সন্তানের কান্নার আওয়াজ শুনতে পারে। তার সন্তান তাকে ডাকছে। আবার অনেক সময় কিছু ভূতুরে কাহিনীও নাকি তার সাথে ঘটে। রিয়ান রিন্তির কথায় তেমন গুরুত্ব দেয়না কারণ সে ভাবে রিন্তি হয়তো তার মা না হওয়ার সত্যটা মেনে নিতে পারছে না তাই এমন করছে। কিন্তু রিন্তি বুঝতে পারে এটা তার মানষিক সমস্যা নয় নিশ্চয় তার সাথে এমন কিছু ঘটছে যা কাঙ্ক্ষিত নয়।

রিন্তি এখন অনেকটাই ভয়ে ভয়ে দিন রাত পার করে। রিয়ানকে বলেও কিছু হয়না কারণ রিয়ান রিন্তির কথায় কোনো পাত্তাই দেয়না। এইতো সেই দিন সবজি কাটতে কাটতে রিন্তি দেখে তার হাতের সব আঙ্গুল সে কেটে ফেলেছে আর রক্তে সব মেখে গেছে। রিন্তি ভয়ে চিৎকার দেওয়ার সাথে সাথেই রিয়ান দোঁড়ে আসে আর ঠিক তখনি রিন্তি দেখে সবকিছু আগের মতোই আছে। আবার একদিন খুব জোড়ে ছোট বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনে বাথরুমে যেয়ে দেখে বাথরুমের পুরা মেঝে রক্তে মেখে আছে। প্রতিটি রাতেই কোনো না কোনো ভৌতিক ঘটনা তার সাথে ঘটতেই থাকে। যা রিন্তির জীবনকে পুরাই অতিষ্ট করে তুলেছে।

রিন্তি না পারছে রিয়ানকে কিছু বিশ্বাস করাতে না পারছে এইসব সহ্য করতে। . (৩) .তন্দ্রার ফোন পেয়ে নীল সাথে সাথে বাসায় চলে আসে। তন্দ্রা প্রশ্নকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে গিয়েছিলো সেখান থেকেই প্রশ্নকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নীল এবং তন্দ্রা প্রশ্নকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াতে লাগলো। এদিকে বিকাল গড়িয়ে রাত অনেকটাই গভীর হতে লাগলো। তবুও প্রশ্নের কোনো সন্ধান নেই। এতদিন প্রশ্ন কোথাও গেলে সাথে সাথেই খুঁজে বের করতো নীল অথবা তন্দ্রা কিন্তু আজকে তারা প্রশ্নকে খুঁজে পাওয়ার কোনো সম্বাবনাই দেখছে না। নানা অজানা ভয় এবং আতংক বিরাজ করতে লাগলো নীলের মাঝে। অন্যদিকে রিন্তিও অস্তিবোধ করতে লাগলো। রিয়ানকে বারবার ফোন দেয়ার পরেও সে ফোন ধরছে না। একে একে তার রুমের লাইট সব বন্ধ হয়ে গেলো। রুমের জানালা এমনি এমনি বার বার খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে। হঠাৎ করেই তার জরায়ু দিয়ে রক্ত বের হয়ে পুরা মেঝে ভেসে যাচ্ছে। আশ্চার্যের ব্যাপার সেই রক্ত গুলা লাফালাফি করছে আর রক্তের মাঝে থেকে মা ডাকটা বার বার ভেসে উঠছে। রিন্তি ভয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও বারবার ব্যর্থ হচ্ছে তল পেটের ব্যাথায়। অনুশোচনা এবং ভয় তার কণ্ঠে বিরাজ করছে।

রিন্তির মনে হতে লাগলো তবে কি সে আবার ফিরে এসেছে? . (৪). . হঠাৎ নীলের মনে পড়লো সেই জায়গার কথা। কারণ প্রশ্ন এর আগে বহুবার ওই জায়গায় যেতে চেয়েছে নীল তাকে যেতে দেয়নি। নীল আর কোনো কিছু না ভেবেই চলে গেলো গোরস্থানের পাশে তাদের পুরানো বাড়ীতে। সেখানে যেয়ে প্রশ্ন বলে চিৎকার করতেই উচ্চস্বরে হাসির শব্দ শুনতে পেলো সে। আর একটু কাছে যেতেই প্রশ্ন বাবা বলে চিৎকার দিতে লাগলো। নীলও তার অবস্থান জানিয়ে বারবার প্রশ্ন বলে ডাকতে লাগলো। একটা ভাঙ্গা চৌকাঠ ঠেলে ভেতরে যেতেই দেখে প্রশ্ন একটা ধারালো ছুড়ি নিয়ে তার গলায় ধরে আছে। নীল তৎক্ষণাৎ ছুড়িটা ফেলে দিয়ে প্রশ্নকে কোলে তুলে নেয়। প্রশ্ন নীলকে জিজ্ঞাস করে বাবা তুমি প্রশ্নকে ভালোবাসো? নীল আতংকের মাঝেই উত্তর দেয়, হ্যাঁ। প্রশ্ন আবারো জিজ্ঞাস করে তাহলে আমি কি দোষ করেছিলাম যে আমায় ভালো না বেসে মৃত্যুর পথে ফিরিয়ে দিয়েছিলে? কথাটা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই নীল দেখে তার হাতে একটা রক্তাক্ত ভ্রুণ।

আর প্রশ্ন ঠিক তার আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। নীলের আর বুঝতে বাকী রইলো না কেনো তার সাথে এইসব ঘটছে? প্রশ্নই বা এতদিন কার সাথে দেখা করতো। অতীতের সব ঘটনা যেনো তার চোঁখের সামনে ভাসতে লাগলো। . . ২ বছর আগের ঘটনা— . নীল এবং রিন্তি একে অপরকে অনেক ভালোবেসে ফেলে। পরিচয়টা হঠাৎ করে হলেও ভালোবাসার কমতি ছিলো না তাদের মাঝে। মন প্রাণ উজার করে ভালোবেসেছিলো তারা। শুধু মন না শরীরটাও উজার করে ভালোবেসেছিলো। তাইতো খুব অল্প সময়েই খুব কাছাকাছি চলে আসে তারা। চলতে থাকে নিয়মিত একের পর এক শারীরিক সম্পর্ক।

প্রতিবার সতর্ক থাকলেও হঠাৎ করেই একবার ভুল হয়ে যায় তাদের। ভুলের ফসল আসতেও দেরি করে না। যথাসময়েই রিন্তি প্রেগন্যান্ট হয়ে যায়। রিন্তি প্রেগন্যান্ট কথাটা শোনার পরেই নীল খুব চিন্তিত হয়ে পড়ে কারণ তার অলরেডি তন্দ্রার সাথে বিয়ে হয়ে গেছে এবং তার মেয়ে প্রশ্নও আছে। নীল রিন্তিকে এবোরশন করতে বলে। রিন্তিরও মা হওয়ার ইচ্ছা এত তাড়াতাড়ি ছিলো না তাই সেও খুব সহজেই রাজী হয়ে যায়। . এবোরশন রুমে যাওয়ার পর ডাক্তার নীলকে রুমের বাইরে বের করে দিয়ে তার কাজে লেগে পড়ে। এবোরশন রুমের যন্ত্রণা যে এত কষ্টের আগে জানলে রিন্তি কখনোই রাজী হতো না। পুরা রুম রিন্তির চিৎকারে কেঁপে কেঁপে উঠছে। জরায়ু দিয়ে অনার্গল রক্ত পড়ছে। যা পুরা রুম ভেসে যাচ্ছে। রিন্তির যেন মনে হচ্ছে মৃত্যু তার অতি নিকটে। জরায়ু টেনেই বড় করা হচ্ছে বারবার। ভিতরের নাড়ীভুঁড়ি যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে তার। অবশেষে এই মৃত্যু যন্ত্রণা থেকে রিন্তি যখন মুক্তি পেলো ততক্ষণে সে তার জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।

সেই সাথে হারিয়ে ফেলে একটি নিষ্পাপ জীবন। হারিয়ে ফেলে মা হওয়ার সুখ চিরদিনের জন্য। যা ভবিষ্যৎ এ তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে। এর কিছুদিন পরেই রিন্তির সাথে নীলের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। প্রথমে রিন্তি কিছুটা ভেঙ্গে পড়লেও পরে ঠিক নিজেকে সামলে নেয় এবং এর কিছু দিন পরে বাবা মার ঠিক করা রিয়ানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। . কথা গুলা মনে পড়তেই শিউরে উঠে নীল। পাশের গোরস্থানেই তো সেই ভ্রুণকে মাটি দেয়া হয়েছে। আর এই বাড়ীতেই তো তারা ঘনিষ্ঠময় সময় কাটাতো। পাশে তাকাতেই প্রশ্ন বলে উঠে তোমার অপরাধের শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে বাবা। আমাকে হত্যা করানোর শাস্তি পাবেই পাবে তুমি। প্রশ্নর কথা শুনে সাথে সাথেই প্রচন্ড শরীরের ব্যাথায় অজ্ঞান হয়ে যায় নীল। আর অন্যদিকে সেই রক্ত থেকে ভেসে আসা শব্দ রিন্তিকে বার বার প্রশ্ন করতে লাগলো কেনো তুমি আমাকে গ্রহণ করলা না?মেরে ফেলবাই যখন তাহলে কেনোই বা জন্ম দিয়েছিলে?

কেনো আমাকে তোমার কোলে কাঁদতে দিলে না? কেনো এই সুন্দর পৃথিবীর আলো দেখার আগেই আমাকে মেরে ফেললে? কেনো আমার ছোট্ট শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেললে? কেনো তোমাদের পরিবারের সদস্য আমাকে হতে দিলে না? কেনো আমাকে এই তীব্র যন্ত্রণার মৃত্যু দিলে?? কেনো মা কেনো?? আর কেউ না বুঝলে তোমার তো বুঝার উচিৎ ছিলো কারণ তুমি তো আমার মা। রিন্তি একটা প্রশ্নেরও সঠিক উত্তর দিতে পারলো না। সাথে সাথেই মুখ বাঁকা হয়ে মেঝেতে পড়ে গেলো তার দেহ। . ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করেও নীল এবং রিন্তির রোগ ধরতে পায় না। দুজনে শুধু চোঁখ মেলে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না। যেহুতু দুইজনার একই সমস্যা তাই তাদের এক রুমে রাখা হয় চিকিৎসার সুবিধার্থে। মাঝে মাঝে ওই রুম থেকে ছোট্ট এক শিশুর হাসির এবং খেলাধুলার শব্দ শোনা যায়। হয়তো মা, বাবা এবং সন্তান নিয়ে বেশ ভালোই আছে নতুন এই পরিবারটি।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত