মৃত্যু

মৃত্যু

২৬ মে ২০১৭, আমি সুইসাইড করতে যাচ্ছিলাম ব্যারাকপুর স্টেশনে চলন্ত থ্রু ট্রেনের সামনে লাফ দিয়ে। আমি লাফ দিতে যাবো ট্রেনের সামনে ঠিক সেইসময়ে একটা মেয়ের ডাকে পেছন ফিরি আর পেছন ফিরে দেখি এ যে নীলা ঠিক তখনি আমার তখন ছ – মাস আগের কথা মনে পড়ে গেলো।

সেদিন দশটায় ক্লাস ছিলো। তাই একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়েছিলাম। কারণ ৯.০০ টার পরের বাসগুলো ভীষণ ভীড় হয়। সেইদিন-ই বাসে প্রথম দেখেছিলাম নীলা কে। সাদা ফ্রেমের একটা চশমা। নীল রঙের একটা চুড়িদার আর হাল্কা নীল রঙের জিন্স প্যান্ট। মেয়েটা লেডিস সীটে বসে ছিলো। আর মেয়েটার পাশে একটা ছোটো বাচ্ছা মেয়ে তার মায়ের সাথে বসে ছিলো।মেয়েটার ওই বাচ্ছা মেয়েটার সাথে আহ্লাদে স্বরে কথা বলছিলো। আমাকে দেখামাত্র চুপ করে বসে পড়লো। মেয়েটা ব্যাগ নিয়ে ছিলো। বুঝলাম মেয়েটা স্টুডেন্টস। চেহারা দেখে অনুমান করলাম বয়স বেশী না ১৮-১৯ হবে। আমার একটা দোষ আছে। আমি একটু বেশী আগেভাগে ভেবে বসি।

বাস চলছে স্বাভাবিক ভাবে। কিন্তু সময় কিভাবে কেটে যাচ্ছিলো সেটা বুঝতেই পারছিলাম না। হঠাৎ দেখলাম মেয়েটা ব্যাগ বুকের সামনে নিয়ে বাস থেকে নামবে বলে উঠে দাঁড়ালো। মেয়েটা ওই একবার-ই আমার দিকে তাকিয়েছে। তারপর আর তাকাই নি আমার দিকে। মেয়েটা যখন আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো তখন তার চুল থেকে বের হওয়া একটা ঘ্রাণ আমাকে পাগল করে দিলো। ঠিক সেইসময় ওই মেয়েটার এক বান্ধবী মেয়েটাকে উদ্দেশ্য করে বললো কিরে নীলা একটু দাঁড়া। এতোই তাড়া যে আজ। তখনি মেয়েটার নাম জানলাম – নীলা। আহা বেশ খাসা নাম। নীলা বললো – তোর আর হুস থাকেনা। চিড়িয়ামোড় ছাড়িয়ে গেছে জানিস তো এবার ব্যারাকপুর স্টেশন আসবে। তবুও তুই সেই সবার শেষে হুড়হুড়ি করে নামবি। নীলার বান্ধবী – তুই থাম তো। সেই শ্যামনগর থেকে উঠেছি। কে জানে বাবা সকাল সকাল এতো ভীড় হবে। নীলা – আচ্ছা থাম তুই কি একাই উঠেছিলিস আমি উঠিনি। আমি মনেমনে -তারমানে নীলা শ্যামনগর থাকে।

দেখতে দেখতে ব্যারাকপুর এসে যায় নীলা ও নীলার বান্ধবী চলে যায়। ব্যারাকপুর আসামাত্র অর্ধেক বাস ফাঁকা হয়ে যায়। কারণ বেশিরভাগ লোকজন সকলে স্টেশনেই নেমে যায়। আমি তখন হঠাৎ খেয়াল করলাম নীলা যেইখানে বসে আছে সেইখানে একটা মোবাইল পড়ে আছে। আর একমিনিট ও দাঁড়ালাম না। মোবাইল টা নিয়ে স্টেশনে ছুটলাম। না..নীলাকে দেখতে পেয়েছিলাম। দৌড়ে নীলার কাছে চলে গেলাম। নীলা কে বললাম – এই নাও তোমার মোবাইল – টা বাসে ফেলে এসেছিলে। ঠিক তখনি নীলা আমার দিকে তাকায়।

আমরা দুইজন সামনাসামনি হই। নীলার কালো চোখের ভেতর স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম একটা ব্যাস্তটার ছাপ। নীলা – আমার থেকে ফোন – টা নিয়ে ওর বান্ধবীর হাত ধরে সোজা দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে চলে গেলো। পেছন থেকে দাঁড়িয়ে একটা কথাই চিন্তা করছিলাম ভগবান আমাদের কি আর দেখা হবেনা। এইকি শেষ দেখা। আর কোনোদিন ও কি আমাদের চোখাচোখি হবেনা। আর কোনোদিন কি সেই চুলের ঘ্রাণ আমি পাবোনা। আর কোনো দিন ও কি সেই মায়াবী দৃষ্টি দেখতে পাবোনা। আমি আর দাঁড়ালাম না। মনে মনে ভাবলাম মেয়েরা কারুর উপকার মনে রাখেনা। একটা “Thanks” তো বলতে পারতো আমাকে।

যাইহোক আমি ফের বাস ধরে কলেজ চলে যাই। কিন্তু সেইদিন আমার পড়াতে মন ছিলোনা। এরপর থেকে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এলো আমার মধ্যে। আমি সারাদিন নীলার চিন্তায় বিভোর থাকতাম। ওই মায়াবী হাসি আমার চোখে ভাসতো। একমাস দুইমাস তিনমাস সারাদিন খালি ওর কথাই মনে পড়তো আমার। কলেজ টেষ্টে আমার রেজাল্ট অনেক খারাপ আসে। আমার মাথায় নীলা ছাড়া অন্যকিছু আসতো না।

আমি এতোটা ভালোবেসে ফেলেছিলাম যে। সারা ফেসবুকে তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। কিন্তু কোথায় নীলা। আমি নীলার দেখা পাইনি। হাসিখুশি ইয়ার্কি যেখানে আমার জীবন সেইখানে নীলা আমার সবকিছু হয়ে দাঁড়ালো। আমি ধীরেধীরে অসুস্থ হয়ে যাই। আজ কতদিন না খাওয়া আমি নিজেও জানিনা। চোখ থেকে জল বেয়ে পড়ে সর্বক্ষণ। আমার বন্ধুবান্ধব আগে আমার বাড়িতে খোঁজ নিতে আসতো। এখন আর কেউ খোঁজ নেইনা। পাড়াতে একটু বেড়োলে চেনাচেনা কাকিমা,জেঠিমা-রা আমাকে পাগল বলে ডাকতো। এমন কি কেউ কেউ তো নিজের ছেলে মেয়েদের কে মারতে মারতে ঘরে নিয়ে যেত। যেইনা দেখতো কেউ আমার সাথে কথা বলছে।

দিন-টা সারাজীবন আমার মনে থাকবে ২৫ মে, ২০১৭। আমার অবস্থা এতোটা খারাপ হয়ে গেছিলো যে পাড়ার ছেলে – মেয়েরা আমাকে দেখে ঢিল ছুঁড়ে মারতো। এমন কি আমার বাড়িতেও ইট ছুঁড়ে মারতো। তাই এই অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে আমি ঠিক করলাম ওইদিন সুই-সাইড করবো। কিন্তু সুইসাইড করবার আগে শেষবারের জন্য হলেও ব্যারাকপুর যাবো। গায়ে জোড় নেই তবুও বাড়ির ওপাশ দিয়ে লোক চক্ষুর আড়ালে পালিয়ে চললাম ব্যারাকপুর স্টেশনে। মানিক তলা বাস স্ট্যান্ড দিয়ে বাস ধরে চললাম ব্যারাকপুরের উদ্দেশ্য।

আমার হাত – পা ততদিনে নিস্কিয় হয়ে গেছিলো। অতিরিক্ত রোগা হওয়ার ফলে বাসে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো আমার। কিন্তু নীলার কথা ভেবে নিজেকে শক্ত করে রেখেছিলাম। ধীরেধীরে বাস এসে ব্যারাকপুর থামলো আমি দৌড়ে স্টেশনে গেলাম। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না। আমি প্রায় ৭-৮ ঘন্টা অপেক্ষা করেছিলাম। কিন্তু তাতেও না দেখা নীলার দেখা না পেয়ে এবার ভাবলাম নিজেকে শেষ করে দেবো। স্টেশনের মাইকে তখন ঘোষণা করলো “থ্রু” ট্রেনের। আমি তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে ল্যাংড়া তে ল্যাংড়া তে গেলাম। ওইদিক থেকে ট্রেন আসছে আমি এদিকে লাফ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

শেষ করে দেবো নিজেকে আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এইজন্য জীবনের কতগুলো স্মৃতির কথা মনে করে একটু নিজেকে শান্তনা দিচ্ছিলাম। ট্রেন প্রায় অনেক কাছেই এসে গেছে ঠিক তখনি পেছন থেকে কে যেন বলে উঠলো – একি করছেন দাদা আপনি। এই গলা যে আমার ভীষণ চেনা। পেছন ফিরে দেখি – নীলা তবে সে আজ একা নেই তারসাথে আছে আমার থেকে দশগুণ জেল্লাদার হ্যান্ডসাম এক সুপুরুষ। নীলা আমাকে চিনতে পেরে তাড়াতাড়ি ওর বয়ফ্রেন্ড কে নিয়ে দূরে চলে গেলো।

না আমার আর মরা হলোনা। কেন মরবো আমি। যে আমার জন্য কোনোদিন চোখেরজল ফেলেনি। যে কোনোদিন আমার ছিলোনা তাকে মনে করে আমি এই ছ – মাসে মৃত্যু পথে পা বাড়াচ্ছিলাম। সেইদিন আমার কাছে বাস ভাড়া ছিলোনা। আমি সারারাস্তা হেটে হেটে বাড়ি এসেছিলাম। খুব কেঁদেছিলাম আমি।জানিনা এতো কমজোর গায়ে কিভাবে শক্তি পাচ্ছিলাম। আমি বাড়ি আসি। মা বাবা এদিকে তো সাড়া পাড়া ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছিলো।

আমাকে দেখে তারা কত আনান্দ হলো। আমি সেইদিন বুঝলাম বাবা-মার থেকে কেউ বেশী আপন হয়না। তাই বিয়ে যদি করতে হয়। তাহলে বাবা মার পছন্দের মেয়ে কে বিয়ে করবো। আমি এরপর আর নীলার কথা কোনোদিন চিন্তা করিনি।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত