রেমিটেন্স যোদ্ধার লাশ

রেমিটেন্স যোদ্ধার লাশ

কিছু কাগজের মুদ্রা, তাদের নিজস্ব কোনো হাত পা নেই, প্রাণের অস্তিত্ব নেই তাদের মাঝে। তবুও তারা হাত বদল হচ্ছে পকেট বদল হচ্ছে, বদল হচ্ছে ব্যাংক। বদলে দিচ্ছে গোটা বিশ্বের রূপবৈচিত্র। এই কাগজের মুদ্রায় রাজত্ব করে যাচ্ছে সারা বিশ্বে। সৃষ্টির সেরা জীবকেও বদলে দিয়ে নিকৃষ্টতায় রূপান্তরিত করে দিচ্ছে দিনকে দিন। রংবাহারি এই মুদ্রার নাম রাখা হয়েছে টাকা, ইয়েন, দিনার, ডলার, রিয়াল, পাউন্ড, রূপিয়া, রিঙ্গিত সহ আরো অনেক নাম।

আধুনিক বিশ্বে মানুষের জীবনযাপনের জন্য এই মুদ্রার কোনো বিকল্প নাই। একটি শিশু দুনিয়াতে এসে একটুআধটু যখন বুঝতে শেখে তখনই সে প্রথম পরিচিত হয় এই মুদ্রার সাথে। বলা যায় জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্তই এই মুদ্রার প্রয়োজন। মুদ্রার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে আমাদের সুখদুঃখ হাসি-কান্না, আনন্দন বেদনা।

এই কাগুজে মুদ্রার জন্য মানুষ ছুটে যাচ্ছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও এই মুদ্রার পিছনে ছুটছে মানুষ। এ জড়বস্তু পরক্ষ ভাবে পাগলের মতো ছুটিয়ে বেড়াচ্ছে আমাদের। আমরা এই মুদ্রার পিছনে দৌড়াচ্ছি প্রতিনিয়ত ট্রেনের গতিতে। রক্তের বন্ধন ছেড়ে এক দেশ থেকে আর এক দেশে পাড়ি জমাচ্ছে মানুষ। মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রত্যাশা একটু সুখে দিনযাপন করা।

কাশেম মিয়া তেমনই মধ্যবিত্তের মধ্যে তার বর্তমান। বয়েস ষাটের কাছাকাছি, তিন ছেলেকে বিয়ে করিয়ে কিছুদিন বেশ সুখেই ছিলেন। ধীরেধীরে সংসারে বেঁধে যায় গোলযোগ। খুঁটিনাটি ব্যাপার নিয়েও মাঝেমধ্যে লঙ্কাকাণ্ড বেঁধে যেতো। তিন ছেলেকেই আলাদা করে দিয়েছিলেন তাদের সুখের কথা ভেবে। বয়সের সাথে দেহের শক্তির নতজানু পতন তাদের হাড় ছুয়েছিলো। কাশেম মিয়ার তিন ছেলের মধ্যে মিজান আর্থিকভাবে একটু সবল হলেও বাবা মায়ের প্রতি ততো দায়িত্বশীলতা ছিলোনা। অন্য দুই ভাইয়ের সংসার কোনো রকম টেনেটুনে চলছে। বছর দুয়েক বাদে কাশেম মিয়ে সকল কোলাহল থেকে মুক্তি নিয়ে এহলোক থেকে বিদায় নিয়েছেন। কাশেম মিয়া পরলোকগমনের পরেও মায়ের ভার কোনো ছেলে বহন করেনি। আলাদা পাতিলেই রান্না করে খেতেন মা। এ নিয়ে জনম দুঃখিনী মায়ের মুখে কেউ কখনো ক্ষোভ দেখেনি।

নিজের জমানো টাকা আর কিছু ধারকর্জ করে ইতালিতে পাড়ি জমিয়েছে মিজান, স্ত্রী ভক্ত মিজান। যাবার সময় মাকেও একবার বলে যায়নি। মা বৃদ্ধা মানুষ বলা না বলা সমান কথা, অথবা স্ত্রীর মোহ তাকে এতোটাই আচ্ছাদিত করে রেখেছিলো যে তার মাকে একটু সময় দেয়ার কথা কখনো মনেই হতোনা। অথচ মা, ছেলের বিদেশ গমনের সময় দিনরাত জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়ে আল্লাহ্‌ পাকের দরবারে ছেলের নিরাপত্তা কুশল কামনা করেছেন।

তিন বছর হয়েগেলো মিজানের প্রবাস জীবন। এই তিন বছরে আয়ের সব টাকাই তুলে দিয়েছে তার স্ত্রীর কাছে, জনম দুঃখী মায়ের কাছে কখনো টাকা পাঠিয়েছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। মিজানের টাকায় খুব সুখেই আছে মিজানের স্ত্রী আর তার শশুড়ের পরিবার। অথচ যে মা দশমাস দশদিন গর্ভে ধারণ করেছে সে মায়ের খোঁজ নেয়ার কথা কখনো মনে করেছে কী? আধুনিক যুগ ভিডিও কলে ছেলের মুখখানা কখনো দেখেছেন কি না তাও অজানা।

দীর্ঘপ্রবাস জীবনে অনেক বন্ধুবান্ধব জুটেছে তার। মিজানের চলাফেরা আচার আচরণ বেশ ভালো, সকলের সাথেই খুব সহজে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারে। বেশীরভাগ সময়েই মিজান তার স্ত্রীর প্রশংসা করে বেড়াতো বন্ধুদের সাথে। তার স্ত্রী পৃথিবীর অদ্বিতীয় নারী। যার ভালোবাসায় সে ধন্য। বন্ধুদের কেউ কেউ তাকে মসকারা করে বৌ পাগল বলতো, এতে তাকে কখনো রাগ বা অভিমান করতে দেখা যায়নি।

প্রতিদিন কাজ থেকে ফিরে রাতে ঘন্টার পর ঘন্টা স্ত্রীর সাথে ভিডিও কলে কথা বলে নিদ্রায় যেতো। আজো তার ব্যতিক্রম হলো না। আজ প্রথম কল দিয়েই বললো,

-মা কেমন আছে? কতো বছর হলো মায়ের সাথে কথা বলিনা।
-ওপাশ থেকে উত্তর আসলো, তোমার মা বেশ ভালো আছে,
-মা কি ঘুমিয়েছে? মাকে ডেকে দাও মায়ের সাথে একটু কথা বলবো, মায়ের মুখখানা দেখতে ইচ্ছে করে খুব।
-কিছুটা কর্কশ ভাবেই স্ত্রী বিরক্তি ভাব দেখিয়ে বললো, এতো রাতে আমি ওঘরে যেতে পারবোনা। কাল দিনে কল দিও। আর তোমার মা তো চোখেও ভালো দেখতে। পায়না।

মিজানের ভিতরটা কেমন যেনো মোচড় দিয়ে উঠলো। অনুভব করতে পারলো, অনেক বড় একটা ভুল করেছে। অন্য বন্ধুরা প্রতিদিন তাদের মায়ের সাথে কথা বলে অথচ আমি। ভাবতেই একটা দীর্ঘশ্বাস উড়িয়ে দিলো আকাশে। মনের ভিতরে কি যেনো দাগ কাটতে লাগলো পিপড়ার মতো। ওপাশ থেকে স্ত্রীর কণ্ঠস্বর।

-কি হলো চুপ করে আছো কেনো। কিছু বলো।
-কিছু ভালো লাগছেনা রাখি। কাল কথা বলবো।

ফোনের লাইন কেটে দিয়ে কক্ষের আলো নিভিয়ে দিয়ে নিদ্রায় যাবার চেষ্টা করলো। কিছুতেই ঘুম আসছেনা চোখে। মস্ত বড় একটা শূন্যতা তার চোখের পাতায় ভাসছে। মা চোখে ঝাপসা দেখে। সকালেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে বলবে মিজান। নির্ঘুমে অনেক পরিকল্পনা তার। এসব পরিকল্পনার তর্জমায় এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো মিজান। ঘুম থেকে জেগে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলো। অফিশে যাবার সময় যেনো পার হয়ে যাচ্ছে তড়িঘড়ি করে হাতমুখ ধুয়েই শূন্য পাকস্থলী নিয়ে বেড়িয়ে পরলো। তাড়াহুড়ো করে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ড্রাইভিং করতে গিয়ে এক্সিডেন্ট করে বসলো মিজান।

কার কখন সময় ফুরিয়ে আসে কেউ তা জানেনা। বন্ধুরা খবর পেয়ে হাস্পাতালে নিতে নিতে মিজান চিরো নিদ্রায় শায়িত হলো। হয়ত কিছু একটা বলতে চেয়েছিলো বন্ধু কাশেমের দিকে তাকিয়ে, তা আর স্পষ্ট শব্দ হয়ে তার কণ্ঠনালী থেকে প্রকাশ পায়নি। অপ্রকাশিত ই রয়ে গেছে মিজানের শেষ কথা।

হাস্পাতালের ডাক্তার মিজানকে মৃত ঘোষণা করলো। দুনিয়া থেকে বিদায় হলো একজন রিমিটেন্স যোদ্ধা। ভেঙে গেলো দেশের বিকল চাকা সফল রাখার একটি পিনিয়াম। হাস্পাতালের মর্গে রাখা হলো মিজানের লাশ। বন্ধুরা মিজানের মোবাইল থেকে নাম্বার নিয়ে মিজানের স্ত্রীর কাছে কল দিয়ে। মিজানের মৃত্যুর ঘটনা খুলে বললো, মিজানের স্ত্রী হালকা কান্নার শব্দ শোনা গিয়েছিলো এপাশ থেকে। কিন্তু যখন শুনলো লাশ দেশে ফিরিয়ে নিতে অনেক টাকা খরচ হবে। তখন মিজানের স্ত্রী বললো, যে যাবার সেতো চলেই গেছে, তার লাশ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আর কি হবে। লাশ ইতালিতে কবর দেয়ার ব্যবস্থা আছে কি না।

মিজানের বন্ধুরা অবাক হয়ে গেলো মিজানের স্ত্রীর কথা শুনে। মিজান এতো বছর যে স্ত্রীর এতো প্রশংসা করেছে আজ তার আসল রূপ প্রকাশ পেলো। মিজানের ভাইদের সাথে যোগাযোগ করলো মিজানের বন্ধুরা। বুঝতে পারলো ভাইদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় এতো টাকা খরচ করে তারা লাশ নিতে পারবেনা। এমন আলোচনায় কেটেছে তিন দিন, সবশেষে কথা হলো মিজানের মায়ের সাথে। এক তিনি তার সন্তানকে দেখতে চান। বিনিময়ে তার নিজের নামে যেটুকু জমি আছে সব বিক্রি করে দিবেন, তবুও সন্তানের মুখটা শেষবারের জন্য হলেও দেখতে চান।

মায়ের ভালোবাসার কাছে এই দুনিয়ার সব কিছুই হার মানে। যে মায়ের খোঁজ খবর নেয়নি, অথচ সেই মা তার সন্তানের লাশ দেশে ফিরিয়ে নিতে মৃত্যুশয্যায় ঝাপসা চোখেও আকুল আবেদনে আকাশ বাতাশ ভাড়ি করে দিলেন। মিজানের বন্ধুরা মিজানের মায়ের আকুতি মিনতি দেখে যুক্তি পরামর্শ করলো, যে ভাবেই হোক মিজানের লাশ। দেশে পাঠাতে হবে।

বন্ধুরা মিলে মিজানের লাশ দেশে পাঠানোর জন্য চাঁদা তুললো। চাঁদা তোলার শেষে হিসাব নিকাশ করে দেখলো। লাশ দেশে পাঠিয়েও বেশ কিছু টাকা তাদের হাতে অবশিষ্ট আছে। পরামর্শ করলো লাশের সাথে টাকা গুলো পাঠানো হবে। টাকা পাঠানো হবে মিজানের মায়ের নামে। লাশ দেশে পাঠানোর সকল সিদ্ধান্ত যখন চূড়ান্ত হয়েছে তখন মিজানের স্ত্রীর কল করে বললো।
-মিজানের লাশ আমার নামে পাঠাবেন।
-মিজানের বন্ধু কিছুটা কর্কশ ভাবে জিজ্ঞেস করলো, কেনো?
-আমি তার স্ত্রী তাই তার লাশের অধিকার আমার।
-বাহ! এ অধিকার আগে কোথায় ছিলো আপনার? এখন কি লাশের সাথে টাকার গন্ধ দেখতে পাচ্ছেন?
-এটা কেমন কথা বলেন।
-আপনি আর আপনার ভাই কখনো আমাদের নাম্বারে ফোন দিবেন না। লাশ যাবে মিজানের মায়ের নামে। লাশের কাগজপত্রের সব কাজ সমাপ্ত। আপনার আর কল দেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি কোনো প্রবাসীর স্ত্রী সেটা ভাবতেই আমাদের ঘৃণা হচ্ছে। আপনি সকল প্রবাসীদের স্ত্রী জাতির কলঙ্ক।

মা অপেক্ষায় ছেলের লাশের, লাশের অপেক্ষা মায়ের কাছে পৌঁছানোর।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত