এক বিয়ে সারা জীবনের কান্না

এক বিয়ে সারা জীবনের কান্না

আমি ছোটবেলা থেকেই খুব চঞ্চল আর প্রানবন্ত একটা মেয়ে ছিলাম। পাখির মত উড়ে বেড়াতাম।
কারো শাসন বারণ মেনে চলতাম না । আমার
যখন যা ইচ্ছে করতো আমি তাই করতাম।

তবে আমি পড়াশুনা, খেলাধুলা আর দুস্টামিতে খুব ভাল ছিলাম।

আমাদের ছোট্ট সংসার এবং বেশ সচ্ছল। আমরা সব ভাই বোন মাস্টার্স কমপ্লিট করে ভাল পোস্টে চাকরি করতাম । আমি বেতন যা পেতাম তা দিয়ে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম আর অনেক শপিং করতাম ।

বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া , এখানে সেখানে ঘুরতে যাওয়া, শপিং করা ।
সবার সাথে দুষ্টামি করা, সব সময় হাসিখুশি
থাকা এমন ছিল আমার জীবনটা ।

এরপর হঠাৎ করে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। তা আবার মাত্র সাত দিনের মধ্যে। আমি বরকে সরাসরি দেখতে পাইনি। আমিও তেমন আর সরাসরি দেখতে আগ্রহী হয়ে উঠনি । কারণ আমার অভিবাবক আর আত্মিয় স্বজনরা সবাই ছিলো ।

আমি ভাবলাম সবাইতো আছে তারা আমার
কখনো খারাপ চাইবেনা।

আমি অন্যের উপর ডিপেন্ড করার মত মেয়ে নই,
কিন্তু বিয়ের ব্যাপারে সবার উপর ভরসা করলাম । আর সেটাই আজ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

আমি হলাম মা বাবার একমাত্র মেয়ে , তাই বিয়ে বড় অনুষ্ঠান করে হবে কথা ছিলো ।
কিন্তু বর পক্ষের তাড়াহুড়ো ছোট করে অনুষ্ঠান হয়ে আমার বিয়ে হয়ে গেলো।

বিয়ের পরে বর কে দেখেই আমি হাই ভোল্টেজের জাটকা খেলাম । তার বয়স ৫০ এর মত হবে । দেখতে ভালো না , দেখতে ও খুবই জঘন্য ।এরপর কি আর করার বিয়ে যখন হয়ে গেছে ,এখন আমাকে মেনে নিতে হবে , তাই মেনে নিলাম ।

বিয়ের কয়েকদিন পর আমি বুঝতে পারলাম ,
আমার বর পক্ষ অনেক বড় রকমের একটা ধোকা বাজ। আমার বরের শারিরীক ও মানসিক সমস্যা । এবং কোন কাজ কর্ম করেনা।

তাদের ঢাকায় পাঁচতলা বাড়ী। তাই দেখে তাদের পরিবার সম্পর্কে বা ছেলের সম্পর্কে কিছু জানার বা খোঁজখবর ‌নেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি আমার আত্মীয় স্বজনরা ।

বলা বাহুল্য ঘটক ছিলেন আমার এক মামাত ভাইয়ের বউ। কথায় আছে ভাইয়ের বউ আর বোনের জামাই কখনও আপন হয় না। তার
এখন প্রমান পেলাম ।

বিয়ের কথাবার্তা বলার সময় আমার মা বাবা কে কোন কথাই বলতে দেয়া হয়নি। কারণ তাদের বয়স হয়েছে বুড়ো বয়েসের তাই ।

যখন আমি সব জানলাম ,আমার আত্মীয় স্বজনদের জানালাম । তখন তারা বললো – বিয়ে যখন হয়ে গেছে , এখন সব মেনে নিতে ।

আমাকে সব মেনে নেওয়ার জন্য সবাই আমার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে লাগলো । তার বয়স বেশি দেখতে ভালো না , এসব না হয় মেনে নিয়েছি ।

কিন্তু তার শারিরীক সমস্যা মানসিক সমস্যা এটা কি করে মেনে নিবো । আমার পক্ষে তা
কোন ভাবেই সম্ভব না । শুধু আমি কেন পৃথিবীর কোনো মেয়ে এটা মেনে নিবে না ।

বাবার একমাত্র মেয়ে বলে , আমার বাবা আমাকে ভীষন ভালবাসতেন । বাবা যখন আমার এসব কথা শুনলেন সাথে সাথে স্ট্রোক করলেন । বাবা কে নিয়ে হাসপাতালে অনেক ছুটাছুটি করি এবং অনেক টাকাও খরচ করি । কিন্তু বাবাকে বাঁচাতে পারলাম না ।

দুই মাস মৃত্যুর সাথে লড়াই করে , চার জুলাই রাত দুটোর দিকে মৃত্যু বরণ করেন ।

বাবার মৃত্যু আমি কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারিনি। তাই আমি আত্মীয়দের কথা না শুনে আমার বরের বিরুদ্ধ ডির্ভোস লেটার ফাইল করি।

আমাদের ধোঁকা দিয়ে বিয়ে , আর তাদের কারনে আমার বাবা মারা যান ।তাই তাদের বিরূদ্ধে আমি কেস করতে চেয়েছিলাম ।

কিন্তু সবাই বললো – এতে আমারই নাকি বেশি বদনাম হবে, আমার জন্য ভালো হবে না ।
তাই আর তাদের বিরুদ্ধে কেস করা হলনা।

সারা জীবনে যা সঞ্চয় ছিলো ( মান সন্মান, ইজ্জত ) সব কিছু এক বিয়েতে শেষ হয়ে গেলো। আমার সাজানো জীবনটা নস্ট হয়ে গেলো।
আমার ডানাটা কে যেন কেটে দিল। আমি এখন আর আগের উড়তে পারিনা। নিঃস্ব হয়ে গেছি।
আগের মতো ঘুরে বেড়াই না দুষ্টামি করিনা । আগের মতো হাসিখুশি থাকতে পারি না ।
আমার সব কিছু আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে শুধু একটা বিয়ে , একটা ভুলে ।

এই সুন্দর পৃথিবীর মানুষ গুলো অনেক খারাপ অনেক । ওদের মাঝে থাকলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে ।তাই আমি এখন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি , খুব তাড়াতাড়ি যেনো এই পৃথিবীর থেকে বিদায় নিতে পারি ।এই খারাপ মানুষ গুলো থেকে অনেক দূরে চলে যেতে পারি ।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত