বসন্তের বিষাদ সন্ধ্যা

বসন্তের বিষাদ সন্ধ্যা

সব গল্প গুলোই গল্প থাকে না। বেশ কিছু গল্পেই কড়া বিষাদের মাতাল করা ঘ্রাণ থাকে, আবার অনেকগুলোতেই আনন্দের পচাঁ দুর্গন্ধ থাকে। একটা জরাজীর্ণ মস্তিষ্কে কখনোই প্রদীপ্ত বুদ্ধি উদিত হবে না, যেমনটা গ্রীষ্মে কখনোই বসন্ত নিয়ে কথা উঠবে না, কবিতা হবে না, গল্প হবে না, না হবে উপন্যাস। ভুল ধরলেন তো? জরাজীর্ণ মস্তিষ্কও মরচে পড়া, ঘুনে ধরা হাজারো চিন্তার অস্ত নামিয়ে দেয় আবার প্রদীপ্ত বুদ্ধিবৃত্তির লাল বৃত্ত একেঁ দেয় এক প্রভাতের পুবাকাশে।

একটু বলি তাহলে আবীরকে নিয়ে এক বসন্তের গল্প। পচাঁ মস্তিষ্ক,ঘুনে ধরা চিন্তা নিয়ে প্রতিদিন বিকালে ভাঙা প্রাইমারী স্কুলটার ছাদে বসে শিস বাজাতে বাজাতে ভিজে যায় মহাশুন্যের জলকণাতে। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মহেশখালী বিলের নীলাভে তার মন বসে না। মন তো থাকে সবসময়ই পাশের স্থির দাড়াঁনো কৃষ্ণচূড়া গাছটায়। গত একবছর যাবত সঙ্গী সে আর গাঁজা পাতা। কৃষ্ণচূড়া গাছটা সেদিন নাকি বলছিলো তাকে – – এসব শরীরের জন্যে ক্ষতিকর! কেন খাও তবুও?

– হাহাহ! বোকা কৃষ্ণচূড়া, ভুলে গেছো কি করে গত বছরের এ বসন্তের এক মৃত্যুর কথা? সেদিন থেকে ভেতরের হাড় গেলো যে সব ভেঙে আর এ গাজা ভাঙা হাড় জোড়া লাগাতে সাহায্য করে,শুনোনি নাকি? তাই হাড়গুলোকে জোড়া লাগানোর প্রয়াস চালিয়েই যাচ্ছি।

রক্তিম ফুলগুলোও হয়ে গেলো বির্বণ ক্ষণিকেই। পানি এসে ধাক্কা দিচ্ছে পুরনো দেয়ালে, শ্যাওলাগুলো প্রাণপণ চেষ্টা করছে দেয়ালের সাথে আরো কয়েক আলোকবর্ষ পার করে দিতে, পানি যেন টেনে নিতে চাচ্ছে বারবার। কিন্তু সব কি আর আকঁড়ে ধরে রাখতে পারে প্রিয় সবকিছুকে? না পারেনা, তাই জন্যেই পারেনি আবীরও আটকে রাখতে তার প্রিয় মানুষটাকে। ওই দিনের বসন্তের বিকালে লাল টুকটুক করা রক্তিম কৃষ্ণচূড়া ফুলগুলোর সাথে পাল্লা দিচ্ছিল পশ্চিমের লালচে আকাশ। অবন্তীর অপেক্ষায় ছিলো সে স্কুলের বারান্দায়। হাত পেতে স্বপ্ন বুনতে বুনতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো, অবন্তীর আসার কথা ছিলো, হাতে বেলোয়ারের চুড়ি, কপালে কালো টিপ পড়ার কথা ছিলো কিন্তু এলো না সে। রাতটা আবীর কাটিয়েছিলো স্কুলের বারান্দাতেই, বিশ্বাস শুধু অবন্তী আসবে। কিন্তু অন্ধকারেই সব স্বপ্ন হারিয়ে গেলো, এ বসন্তের প্রথম রাতটাই রক্তাক্ত হলো অবাধ্য কিছু চিন্তায়।

ওদিন দেখেছিলো এক গাংচিল ক্রন্দনাসক্ত চোখদুটো আবীরের। এখনো প্রায়ই আসে কৃষ্ণচূড়ায় বসে বিকেলের অবসর কাটাতে। অবন্তীকে বরপক্ষ দেখতে এসেছিলো। অবন্তীর বাবা প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক কখনোই পছন্দ করতেন না আবীরের মতো উদ্ভট ভবঘুরের সাথে অবন্তীর চলাফেরা। কদিন পর আবারো ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন হয় অবন্তীর বাড়িতে। বিয়ের দিন রাতে দরজায় খিল দিয়েই ঝুলে পড়ে ফ্যানটার সাথে…ধুমধাম বিয়ে বাড়ি হয়ে পড়ে নিস্তব্ধ।

অন্যদিকে শুরু আবীরের নতুন জীবন। আবীর ব্যস্ত হয়ে পড়ে বিষাক্ত তামাকের ধ্যানে আর তার মহাশুন্যের ক্যানভাসে কল্পিত কলমে তৈরি করে গত সব স্মৃতিচারণ রক্ত কাব্য। রক্তাক্ত চিত্র পছন্দ হয় না ঈশ্বরের, কালো মেঘের বর্শা ছড়িয়ে দেয়, ছিড়ে ফেলে তার সাজানো ক্যানভাস। অসুস্থ বাবাটাও চলে গেলো, সহ্য করতে পারে নি নষ্ট সমাজের নীতিবাক্যগুলো…

– কি ছেলে জন্ম দিলি? বামন হয়ে চাদেঁ হাত দেয়। গাংচিলকে বলে আবীর

– সাধারণদের কি ভালোবাসতে নেই?

– সারাদিন দেখি, প্রাইমারী স্কুলের ছাদে গাজাঁ খায়, নষ্ট হইলো ছেলে, দেখে শুনে রাখতে তো পারিস। এবার বলে কৃষ্ণচূড়াকে

– উদ্ভট ছেলেটাও মনে মনে কাউকে চাইতো,সমাজ জানতো না? গাজাঁ কেন আমার হাতে আসে? – এমন ছেলে থাকার চেয়ে না থাকা ভালো! এবার একা একাই বলে আবীর

– নিজের স্বকীয়তা নষ্ট করার প্রচেষ্টাই তো করছি দিন দিন।

আবীরের নিজেকে নিজের অপরাধী লাগে, পারতো তো সে এ বন্দী কড়কাব থেকে মুক্তির লক্ষ্যে অবন্তীর হাতটা ধরে দৌড়াতে। নতুন নতুন সৃষ্টির এ বসন্তে নতুন জীবন শুরুর কাহিনী ছাড়া ঈশ্বর আর কোন উপন্যাসই বা লিখবে? মধ্যযুগের গুনীদের কথাগুলো টের পেয়ে চোখ দুটোতে কালির পরিমাণ আরো গাঢ় করে ফেলে আবীর। অল্প অল্প করে বিরাজ করা দেহটির মাঝে বেঁচে থাকা প্রান সন্তুষ্ট হতে পারে না আর। শুধু শেষ, শেষ, শেষ শব্দটা ধ্বনিত হয় মধ্যকর্ণ ভেদ করে অন্তকর্ণে।

নিরবে নিবিড়ে আধার টেনে সন্ধ্যা করতে চারপাশের কঠোর আবরন পাড়ি দিতে যে বিষাদের গভীরতা কাছে টানতে হয় তার একটুতে স্পর্শ করে দেখতে দেখতে চমকে উঠে আবীর প্রতিটা বিকালে। সাথে সাথে হৃদকম্পনের মাত্রা দীর্ঘ হয়, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত দীর্ঘ হয়। তার চোখের ভাষায় মুক্ত প্রকৃতি আধার মেখে, অপ্রত্যাশিত সব ভাবনা থেকে, অপুর্ণ স্বপ্ন পাড়ি দেওয়া ইচ্ছা থেকে, অনেক কিছুই প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়। এ ব্যর্থতার আক্রোশে প্রতিটা মধ্যরাতে অমবস্যা এনে সাজিয়ে নেয় নীলাকাশটাকে। আর তার বক্ষের মাঝে থাকা হিয়ায় প্রলেপ টেনে দেয়, প্রলেপের পুরুত্ব হিসাবে উত্তর আসে কাছে নিয়ে বেঁচে থাকা আর কত? এবার না হয় শেষ হয়ে যাহ। দুটো তারা সঙ্গী হয় রাতের, আবছা আবছা আলো থাকে ছাদ জুড়ে। হঠাৎ করেই খসে পড়ে তারা দুখানা, চলে আসে আবীরের থেকে কয়েক কিঃমি কাছে।

আবীর বলে… – আজ নাহয় আমিও জাগি তোমাদের সাথে! – ঘুমদেবতাকে নিমন্ত্রণ না দেই তবে?

– সেটাই ভালো! তারও ঘুমের দরকার। নির্ঘুম রাত কেটে যায় তারাদের গল্প শুনতে শুনতে। তারারা শুনে বিষাদময় বসন্তের বিকেল কে।

পরেরদিন বিকাল…

এলাকার রন্জিত নামের পাগল টা আসে মাঝে মাঝে। ছাদে উঠে এমনিতেই হাটবে,লাফাবে। আবীর অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে। আজকে বিকালেও আসলো ছাদে, আবীর তখন ব্যস্ত তার নেশার ধ্যানে আর ভাবে ছেলেটার পাগল হওয়ার পেছনে এক বিষ মাখা অতীত ছিলো। নিজ চোখে দেখেছে তাকে পাগল হতে,শিকল দিয়ে বেধেঁ রাখতেও কষ্ট হয়েছে খুব। আবীরও ওর মতো একা হয়ে গেছে, বাচঁতে ইচ্ছে করছে না আর।

– দাদা,

– কি?

– হাতে কি তোমার?

– ব্লেড, লাগবো নাকি তোর? এইনে টান মারলেই শান্তি.. হাহাহ (গলার কাছে ব্লেড টা ধরে বলে)

– দাও তো! শান্তির সন্ধান করছিলাম এতদিন।

মুহুর্তেই কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম ফুলগুলো চিরতরে বিবর্ণ হয়ে গেছে,গাংচিলটাও উড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। সুর্যটাও ডুবে গেছে, এ গোধূলীতে একটা দেহ নিথর হয়ে পড়ে আছে ছাদের উপর, ছাদটা রক্তাক্ত। পাগলটা বলছে চিৎকার করে….

ছেলেটা অদৃশ্য, সে পাথরের ন্যায়, ছেলেটা কবিতায় অবহেলিত অব্যয়, ছেলেটা সিক্ত, মৃক্ত,নত্ব, ছেলেটা উনুন,সবার হাতে হলো খুন, ছেলেটা একটু উদ্ভট ছিলো, নেশাখোর না।

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত