অনেকক্ষণ হলো ডাক্তারে রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।অনেক বড় লাইন।আমি মাঝামাঝি আছি।সরকারি হাসপাতাল গুলোতে
এই একটা সমস্যা, সকাল হতে না হতেই রোগীদের লাইন পড়ে যায়।তার উপর সবথেকে বিরক্তিকর যেটা!,সেটা হলো ডাক্তার
কিংবা নার্সদের স্টার্ফদের জ্বালা।মানুষ ২ঘন্টা দাড়িয়ে থেকেও ডাক্তার দেখাতে পারেনা আর উনারা সাহেবদের মত এসে সবার
আগে দেখিয়ে চলে যায়।
এখনো তেমন একটা গরম পড়েনি কিন্তু এত লোকের ভিড়ে গরম লাগছে খুব।টিশার্ট ঘামে ভিজে একাকার।
প্রায় ১ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর অবশেষে আসলো আমার সিরিয়াল।রুমের ভেতরে ঢুকতেই বড় ধরনের ক্রাশ খেলাম।এত সুন্দর
পরী এখানে কী করছে?মনে হয় ভুল করে মাটিতে নেমে এসেছে।ডাক্তারের পোশাকে তাকে ভয়ঙ্কর সুন্দর লাগছে।
:-আপনি এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো বসুন?
ডাক্তারের কথাতে বাস্ততে ফিরলাম।আমি ডাক্তারের সামনের চেয়ারটাতে বসলাম।
:-আপনার সমস্যা বলুন?(তুলি রহমান)
টেবিলের উপর একটা কাঠে লেখা আছে।এটাকে কাঠ না কী বলে আমার ঠিক জানা নেই।
:-আপনার সমস্যা কী বলুন?(তুলি)
:-মনে সমস্যা মেডাম।(আমি)
:-কী?
এটা কী বললাম আমি?মুখ ফসকে কী বলে ফেললাম।
:-না মানে হয়েছে কী আজ কয়েকদিন হলো চোখে প্রচন্ড যন্ত্রনা হচ্ছে।ঠিকমত ঘুমোতে পারিনা।(আমি)
:-এর আগে অন্যকোনো ডাক্তার দেখিয়েছেন?(তুলি)
:-না।এখানে এত সুন্দর একটা পরী থাকতে অন্যখানে কেনো যাবো?
:-আপনি এসব কী বলছেন?দেখুন এটা হাসপাতাল।একটু ভেবে চিন্তে কথা বলুন।আমাকে দেখে ভদ্রই মনে হচ্ছে।আশা করি
ভদ্রতা বজায় রাখবেন।
:-সরি।
অনেকক্ষণ পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর কিছু ওষুধ লিখে দিলো।
:-আপনার নম্বরটা দিন।যদি বেশি সমস্যা হয় আপনাকে ফোন করে বলবো।(আমি)
:-প্রেসক্রিপশনের উপর দেওয়া আছে।কোনো সমস্যা হলে সন্ধা ৭টার পর ফোন দিবেন।এর আগে দিবেন না আমি বিজি থাকি।
(তুলি)
:-ওকে।
আমি প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে বাইরে বের হয়ে আসলাম।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ১২ টা বাজে মাএ।অফিস থেকে ৩ ঘন্টার
ছুটি নিয়ে এসেছি।এখনো ১ঘন্টা সময় হাতে আছে।বাইরে থেকে ওষুধগুলো কিনে ব্যাগে রাখলাম।
আমি হুসাইন।পেশায় একজন ব্যাংক কর্মকর্তা।মাএ ৩মাস হলো চাকরীটা পেয়েছি।আজ কয়েকদিন হলো চোখে কী যেনো
হয়েছে শুধু ব্যথা করে তাই ডাক্তার দেখাতে এসেছিলাম।কিন্তু ডাক্তার দেখাতে এসে এমন একটা পরীকে দেখবো সেটা কল্পনাও
করিনি।না এই মেয়েকে হাতছাড়া করা যাবেনা।খোজখবর নিতে হবে।
আমার একটা ফ্রেন্ড আছে ও আবার এলাকার সব সুন্দরী মেয়েদের খোজখবর রাখে। আমরা ওর নাম দিয়েছি মেয়ে বিশেষঙ্গ।
ফোন দিলাম ওকে।একবার রিং হতেই রিচিভ হলে
:-কিরে ফহিন্নি এই অসময়ে ফোন দিলি?(শিপন)
:-একটা দরকারে ফোন দিলাম।(আমি)
:-আমি জানি দরকার ছাড়া তোরা আমাকে কেউ মনে করিস না।তো বল কী দরকার?
:-আমাদের এখানের হাতপাতালে যে চক্ষু ডাক্তার বসে উনার সম্পর্কে কিছু জানিস?
:-মামা ওই মাইয়ার দিকে একদম তাকাবানা।ওইটা তোমাগো ভাবি হবে।
:-দোস দেনা এইটা আমারে।তোরতো অনেক গালফ্রেন্ড।এইটা আমাকে দিয়ে দে।প্লিজ দোস।তুই যা খেতে চাস খাওয়াবো।
:-আচ্ছা যা দিয়ে দিলাম।তুই বন্ধু মানুষ এত করে যখন বলছিস।তবে মামা পার্টি একটা দিতেই হইবো।
:-আচ্ছা।এখন বল মেয়েটা কারো সাথে রিলেশন টিলেশন করে কিনা?
:-আমার জানা মতে কোনো রিলেশন নাই।তবে একটা ছেলের সাথে বিয়ের কথা চলছে।মেয়েটার বাসা ঢাকা কমলাপুর। এখানে
চাকরী হওয়ায় পরিবারসহ এখানে থাকে।
:-এটা হতে পারেনা।আমি ছাড়া ওকে কেউ পাবেনা।এখন রাখিরে অফিসে যেতে হবে।
:-আচ্ছা।
ফোন রেখে দিলাম।ভাবছি কী করবো।তুলিকে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে গেছে।জীবনে কখনো প্রেম করিনি।করিনি বললে ভুল
হবে আম্মু করতে দেয় নি।সবসময় আমাকে চোখে চোখে রাখতো।একবার এক মেয়ের সাথে আমাকে রাস্তায় কথা বলতে
দেখেছিলো সেদিন বাসায় আমাকে তিনবেলা না খাওয়ায়ে রেখেছিলো।এরপর থেকে প্রেম ভালোবাসায় আর সাহস হয়নি।
বিকেল ৪টায় অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে আগে আব্বুর কাছে গেলাম।আব্বু আমার ফ্রেন্ডের মত।আব্বু ড্রয়িংরুমে বসে টিভি
দেখছে।
:-আব্বু তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো।(আমি)
:-বল।(আব্বু)
:-তোমরাতো কয়েকদিন ধরে বিয়ের কথা বলছো তাইনা।
:-বলছি কিন্তু তুইতো রাজি হসনা।
:-না মানে বলছিলাম আমি একজনকে পছন্দ করি।
:-বলিস কী?কবে থেকে?আমাকেতো বলিস নি!
:-বলার সময় পেয়েছি নাকি।আজই প্রথম মেয়েটাকে দেখলাম।
:-বাসা কোথায়?বাবার নাম কী?
:-আমাদের এখানের হাতপাতালের চক্ষু ডাক্তার।
:-মেয়েটা তোকে পছন্দ করে?
:-আব্বু তুমিও না।প্রথম দেখায় কেউ কাউকে পছন্দ করে নাকি।তুমি ওর বাবার সাথে কথা বলো।
:-আচ্ছা বলবোনে।
:-বাপ ছেলেতে এত কিসের গল্প হচ্ছে?(আম্মু)
:-তোমার ছেলে প্রেমে পড়েছে।(আম্মু)
:-কবে কখন?তাড়াতাড়ি বলো।এবার বিয়েটা দিতেই হবে।সেই কতদিনের শখ আমি বউমা দেখবো,নাতি নাতনির মুখ দেখবো।
:-আমি গেলাম।তোমরা কথা বলো।(আমি)
আমি ওঠে চলে এলাম।আমার কেমন জানি লজ্জা লজ্জা লাগছিলো।
রুমে এসে তুলির নম্বর দিয়ে ফেসবুকে চার্চ দিলাম।না এই নম্বরে কোনো আইডি খোলা নেই।শিপনকে আবার ফোন দিলাম
:-মামা তুলির আইডির নাম কিরে?(আমি)
:-ড.তুমি রহমান।(শিপন)
:-পরোফাইল পিক কী দেওয়া?
:-ওর নিজের পিকই দেওয়া আছে।
:-থ্যাঙ্কু দোস।
:-শুধু থ্যাঙ্কুতে কাজ হবেনা।পার্টি চাই।
:-আচ্ছা আমার বিয়ের দিন একবারে সব খাওয়াবো।
:-তোরও বিয়ে হবে আর আমিও খাবো।একটু ব্যস্ত আছি পরে কথা হবে।
:-আচ্ছা।
ফোন রেখে ড.তুমি রহমান নামে চার্চ দিলাম।অনেকগুলো আইডি আসলো।কয়েকটা আইডি খোজার পর তুলির আইডি
পেলাম।পরোফাইল পিক দেখে আমি পুরাই ফিদা।খোলা চুল,লাল শাড়ি,ঠোটে লাল লিপিস্টিক,কপালে কালো টিপ।অসাধারণ
লাগছে এক কথায়।তুলির আইডিতে অনেকগুলো পিক দেওয়া।কয়েকটা পিক ডাওনলোড করে নিলাম।আমি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট
পাঠালাম।জানিনা এপছেট করবেনা কিনা।
রাত ৮টার দিকে তুলির নম্বরে ফোন দিলাম।রিং হতেই রিচিভ হলো।সম্ভবত ফোন হাতেই ছিলো।
:-আসসালামুআলাইকুম(তুমি)
:-ওলাইকুমআসসালম।কেমন আছেন?(আমি)
:-ভালো।আপনাকেতো ঠিক চিনলাম না।
:-ওইযে আজ আপনার কাছে চোখ দেখালাম।
:-সারাদিনেতো কত রোগীই দেখি।
:-যাকে ভদ্রভাবে কথা বলতে বললেন।
:-ও আপনি।তো কী মনে করে ফোন দিলেন?
:-কেনো ফোন দেওয়া মানা নাকি?
:-না আসলে তা না।আমি অপরিচিত কারো সাথে তেমন একটা কথা বলিনা।
:-তাই বুঝি?
:-হ্যা।
:-সমস্যা নেই আস্তে আস্তে পরিচিত হয়ে যাবেন।
:-মানে কী?
:-কিছুনা।আপনি যে ওষুধগুলো দিলেন সেগুলো কখন কখন ব্যবহার করতে হবে?
:-দেখুন প্রেসক্রিপশনের উপর সুন্দর করে লিখে দেওয়া আছে।
:-ও তাইতো।আমার মনে ছিলোনা।
:-মন যদি আকাশে উড়ে তাহলে বুঝবেন কিভাবে?
:-মানে?
:-কিছুনা।আপনি আর ফোন দিবেন না।
:-কেনো?
ওপাশ থেকে কোনো উওর আসার আগে ফোন কেটে গেলো।কী মেয়েরে বাবা একটু কথা বলবো তাতেও রাগ দেখায়।দেখেতো
শান্তই মনে হয় কিন্তু বাস্তবে কাচা লঙ্কা।তবে কন্ঠটা সুইট।
এরপর আমি মাঝে মাঝেই তুলিকে ফোন দিতাম।কখনো ধরতো কখনো ধরতোনা।আমি চেষ্টা করছিলাম তুলির মনে আমার প্রতি
ভালোলাগা সৃষ্টি করার কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিলোনা।
প্রায় ১২ থেকে ১৩ দিন পর হঠাৎ আমার চোখের সমস্যা অতিরিক্ত বেড়ে যায়।আব্বু আম্মু আমাকে নিয়ে হাসপাতালে যায়।তুলি
আমাকে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বলে চোখে অপারেশন করাতে হবে।৭ দিনের ওষুধ লিখে দিলো।৭দিন পর অপারেশন।
অফিস থেকে ১৫ দিনের ছুটি পেলাম।এই ১৫ দিন বাসায়ই থাকবো।
ডাক্তার দেখিয়ে আসার পরেরদিন রাতে তুলির ফোন।যেই মেয়ে আমার সাথে কথা বলতে বিরক্তবোধ করে সে আজ নিজেই
ফোন দিয়েছে এটা অনেকটা রহস্যজনক।ফোন রিচিভ করলাম
:-আসসালামুআলাইকুম(তুলি)
:-ওলাইকুমআসসালাম।আজ সুর্য কোন দিক থেকে ওঠেছে?(আমি)
:-রাতের বেলা আপনি সুর্য পেলেন কোথায়?
:-সেটা বুঝাতে চাইনি।এর আগে আমি যতবার ফোন দিয়েছি ততবারই আপনি বিরক্ত হয়ে ফোন রেখে দিয়েছেন।তো আজ হঠাৎ
ফোন দিলেন?
:-কেনো আমি কী আমার প্রেশেন্টের খোজখবর নিতে পারিনা?
:-তা পারেন।
সেদিন রাতে অনেকক্ষণ কথা হলো তুলির সাথে।এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিন কথা হতো আমাদের মাঝে।আমি যত তুলির সাথে
কথা বলছি ততই ওর প্রেমে পড়ে যাচ্ছি।
৭দিন পর আমার চোখে অপারেশন হলো।২দিন হাসপাতালে থাকতে হবে।অপারেশনের পর থেকে তুলির কেয়ার যেনো হঠাৎই
বেড়ে গেলো।কিছুক্ষণ পর পরই আমার খোজখবর নেই।আম্মু মনে হয় ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে কিন্তু আমাকে সরাসরি
বলছেনা কিছু।একচোখে অপারেশন করায় অন্যচোখ দিয়ে সবকিছু দেখছি।তুলির হঠাৎ এত কেয়ার করার কারণ আমি বুঝে
ওঠতে পারছিনা।তবে কী তুলিও আমাকে ভালোবেসে ফেলেছো?যদি এমন হয় তাহলে ভালোই হবে।
যে দুইদিন হাসপাতালে ছিলাম সেই দুইদিন তুলি অনেক কেয়ার করেছে আমার।বাসার আসার পরেও একই অবস্থা।একটু পরপর
ফোন করে খোজখবর নিচ্ছে।মনে হচ্ছে ও আমার বউ আর আমি ওর বর।আমি অসুস্থ হওয়ায় ও খুব টেনশনে আছে।
৬দিনেই সুস্থ হয়ে গেলাম অনেকটা।অবশ্য এতে তুলিরও অবদান কম নয়।মনে মনে ভাবছি আজ তুলিকে প্রপোজ করবো।
মনের মধ্যে আবার অন্য আরেকটা চিন্তাও ঘুরপাক খাচ্ছে।যদি তুলি রাজি না হয়?আবার মনে হচ্ছে ধুর কী ভাবছি তুলি রাজি
হবেনা কেনো?ও আমাকে ভালোবাসে বলেইতো এত কেয়ার করছে।এসব ভাবছি এমন সময় তুলির ফোন
:-আসসালামুআলাইকুম।কী করছেন?(তুলি)
:-ওলাইকুমআসসালাম।এইতো বসে আছি।আপনি?(আমি)
:-আমিও।ওষুধ খেয়েছেন এখন?
:-হ্যা।আপনাকে কিছু কথা বলার ছিলো?
:-আমি জানি আপনি কী বলবেন।আমি পারবোনা এটা।আমার বাবা মা আমাকে যার সাথে বিয়ে দিবে আমি তাকেই বিয়ে করবো।
:-তাহলে এতদিন আমার সাথে কথা বললেন?
:-ফ্রেন্ড হিসেবে।এক ফ্রেন্ড কী আরেক ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলতে পারেনা?
:-পারে।কিন্তু?
:-আজ আমাকে ছেলেপক্ষ দেখতে আসবে।হয়তো আজ বিয়েও হয়ে যেতে পারে।আপনি যদি আমাকে পছন্দ করে থাকেন
তাহলে আপনার বাবা মাকে আমাদের বাসায় পাঠান ওরা আসার আগেই।নয়তো আমার কিছু করার থাকবেনা।এখন রাখছি
আমার কাজ আছে।
তুলি ফোন রেখে দিলো।আমার মাথায় হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।কী করবো? কী করবো?
আব্বু আম্মুকে তুলিদের বাসায় পাঠিয়েছিলাম কিন্তু তুলির বাবা রাজি হয়নি।তুলির বাবা নাকি অনেক আগেই ওই ছেলের সাথে
বিয়ে ঠিক করে রেখেছিলো।আমার মাথায় কিছু আসছেনা এই মুহুর্তে কী করা উচিত।আব্বু অনেক অনুরোধ করেও তুলির
বাবাকে রাজি করাতে পারেনি।
:-আব্বু আমি তুলিকে ছাড়া বাঁচবোনা।আমার তুলিকে চাই চাই।(আমি)
:-পাগল ছেলে একটা মেয়ে গেছেতো কী হয়েছে।ওর থেকে অনেক ভালো মেয়ে তোর জন্য খুজে নিয়ে আসবো।(আব্বু)
:-আমি আর কাউকে চাইনা।শুধু তুলিকে চাই।ওকে না এনে দিতে পারলে আমি মরে যাবো।(অনেকটা আবেগ নিয়ে বললাম)
:-বুঝার চেষ্টা কর।তুলির আগে থেকেই বিয়ে ঠিক হয়ে আছে।
আমি আর কিছু না বলে নিজের রুমে চলে আসলাম।খুব কান্না পাচ্ছে।বালিশে মুখ চেপে কান্না করছি।চোখে খুব ব্যাথা করছে।
এখনো পুরোপুরিভাবে সুস্থ হয়ে ওঠিনি তাই কান্না করার ফলে এমন হচ্ছে।আমি শুয়ে শুয়ে কান্না করছি এমন সময় তুলির ফোন
:-সরি আমি আপনার জন্য কিছু করতে পারলাম না।আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।(তুলি)
:-তুলি আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবোনা।আমি সত্যিই মরে যাবো।(আমি)
:-দেখুন পাগলামি করবেন না।আমার থেকেও অনেক ভালো মেয়ে পাবেন আপনি।
:-আমি ভালো মেয়ে চাইনা শুধু তোমাকে চাই।
:-আমি জানতাম না আব্বু আমার বিয়ে ঠিক করে রেখেছিলো।জানলে কখনোই আমি আপনার সাথে কথা বলতাম না।সব দোষ
আমার।
:-আমার সাথে পালাবে?
:-আমি পারবোনা।আমি আমার বাবা মাকে কষ্ট দিতে পারবোনা।তাদের জন্য যদি আমার জীবনটাও দিয়ে দিতে হয় তাতেও আমি
রাজি।আপনি আমার থেকে ভালো মেয়ে পাবেন।
:-আমার দরকার নেই কাউকে।শুধু তোমাকে চাই।
:-আমি রাখছি এখন।আপনার আব্বু আম্মু যাওয়ার পর ছেলে পক্ষ দেখতে এসেছিলো।৩দিন পর বিয়ে।নিজের খেয়াল রাখবেন।
ঠিকমত ওষুধ খাবেন।
:-আমি কিছুই করবোনা।
:-আমাকে আপনি সত্যিই ভালোবাসেন?
:-হ্যাঁ।
:-আমাকে যদি সত্যিই ভালোবাসেন তাহলে আপনি সবকিছু ঠিকঠাক মত করবেন।আর যদি কিছু
না করেন তাহলে বুঝবো আপনি আমাকে কখনো ভালোবাসেন নি।
:-প্লিজ এই কথা বলোনা।
:-আমি যেটা বলেছি সেটাই।আমাদের ভালোবাসার কসম দিলাম।আপনি যদি সবকিছু ঠিকঠাক মত না করেন তাহলে আমার মরা
মুখ দেখবেন।
তুলি আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোন রেখে দিলো।আমি সঙ্গে সঙ্গে ফোন ব্যাক করলাম কিন্তু বন্ধ।আবারো চেষ্টা
করলাম এবারো বন্ধ।
তুলি তুমি তোমার কসম ফিরিয়ে নাও।আমি সত্যিই তোমাকে ছাড়া বাঁচবোনা।এসব বলছি আর কান্না করছি।
কান্না করতে করতে কখন ঘুড়িয়ে পড়েছিলাম জানিনা।আম্মুর ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো।আম্মু আমার সামনে ওষুধ আর পানির গ্লাস
নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
:-নে বাবা ওষুধটা খেয়ে নে।(আম্মু)
:-আমি ওষুধ খাবোনা।(আমি)
:-দেখ পাগলামি করিস না।এখনকার যুগের ছেলেরা এমন করেনা।একটা মেয়ে গেলে কিছুক্ষণ পরেই আরেকজনকে ধরে নেয়।
এভাবে শুধু শুধু একটা মেয়ের জন্য কেনো নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করবি?
:-তুমিতো জানো আমি অন্য ছেলেদের মত না।আমি শুধু তুলিকে চাই আর কাউকেই না।
:-তোর বাবা এখনো চেষ্টা করছে।ওষুধটা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়।
আম্মুর জোরাজুরিতে ওষুধ খেতে হলো।ওষুধ খাওয়ার পর কেমন জানি চোখটা আটকে আসছে।কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমের দেশে
হারিয়ে গেলাম।
যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সকাল ৯টা বাজে।মনে হয় আম্মু ওষুধের নাম করে ঘুমের ওষুধ দিয়েছিলো
তাই এতক্ষণ এক নাগারে ঘুমিয়েছি।
৩দিন পর।
আমি অনেক বদলে গেছি।এখন আর কারো সাথে কথা বলিনা।সারাক্ষণ রুমের দরজা আটকিয়ে বসে থাকি।ভালো লাগেনা কারো
সাথে কথা বলতে।তুলির সাথে সেদিনের পর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।আমি ফোন দিয়েছি অনেকবার কিন্তু কখনো ফোন
অন পায়নি।নিজের কষ্টগুলোকে ভুলে থাকার জন্য সিগারেট বেছে নিয়েছি।সিগারেটের ধোঁয়া কিছুক্ষণের জন্য হলেও কষ্টটাকে
ভুলিয়ে রাখে।আজ তুলির বিয়ে।হয়তো এতক্ষণে বর পক্ষও চলে এসেছে।কিছুক্ষণ পরেই তুলি অন্য আরেকটা মানুষের হয়ে
যাবে।
আবার কষ্টগুলো বেড়ে যাচ্ছে।সিগারেটের প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করতে গেলাম কিন্তু প্যাকেটে হাত দিয়ে দেখি একটা
সিগারেটও নাই।বাইরে গিয়ে আবার আনতে হবে।
একটা শার্ট গায়ে জরিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।আমাদের বাসা থেকে দোকান একটু দুরে।আজ রোদের তেজ একটু বেশি বেশিই মনে
হচ্ছে।
সামনে একটা ছেলেকে দৌঁড়াতে দেখে থমকে দাঁড়ালাম।এতো তুলির ছোট ভাই।তুলির সাথে একবার হাসপাতালে দেখেছিলাম।ও
এভাবে কোথায় দৌঁড়াচ্ছে।আমার কাছাকাছি আসতেই ও থেমে গেলো।হাঁপাতে হাঁপাতে বললো
:-ভাইয়া ভাইয়া আপু আপনাকে এখনি একবার ডেকেছে। (তুলির ছোট ভাই)
:-আমাকে কেনো ডেকেছে তোমার আপু?তোমার আপুর না আজ বিয়ে?(আমি)
:-বিয়ে ভেঙ্গে গেছে।আব্বু স্টক করেছে।আপু তাড়াতাড়ি আপনাকে ডেকেছে।
:-চলো।
আমি আর রনি(তু্লির ছোট ভাই) দুজনে দৌড় শুরু করলাম।১০ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম।বাড়ির চারপাশ খুব সুন্দর করে
সাঁজানো।কিন্তু এই মূহুর্তে বাড়িটা থমথমে হয়ে আছে।আমি বাসার মধ্যে ঢুকে দেখি সবাই ওঠোনের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে।তুলির
বাবাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে তুলি চিকিৎসা করছে।আমি গিয়ে তুলির পিছনে দাঁড়ালাম।তুলির পড়নে লাল বেনারসি ভিজে
একাকার। মনে হয় ওর বাবার মাথায় পানি দিতে গিয়ে এই অবস্থা হয়ছে।
আমি তুলির আম্মুকে জিঙ্গেস করলাম এসব কেমন করে হলো
:-ছেলে পক্ষ আগে ৫ লক্ষ টাকা চেয়িছিলো যৌতুক হিসেবে কিন্তু আজ সকালে হঠাৎ করে ১০ লক্ষ টাকা চেয়ে বসে।তোমার
আঙ্কেল বলেছিলো ১০ লক্ষই দিবে কিন্তু একটু দেরী হবে।এসব নিয়ে কথা কাটাকাটি হতে হতে হঠাৎ করে উনি অসুস্থ হয়ে
পড়েন।(কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বললো তুলির আম্মু)
আমি আব্বুকে ফোন করে তুলিদের বাসায় আসতে বললাম।আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি আজই তুলিকে বিয়ে করবো।
রাতের দিকে তুলির আব্বু অনেকটা সুস্থ হয়ে ওঠলো।তুলির বড় ভাইয়ের সাথে কথা বলে আব্বু আম্মু বিয়ের সব ব্যস্থা করে
ফেললো।রাতেই আমাদের বিয়ে হলো।কোনো অনুষ্ঠান হয়নি।রাতে তুলিকে নিয়ে বাসায় আসলাম।ও আসতে চাইছিলো না ওর
আব্বুকে রেখে কিন্তু ওর ভাইয়েরা পাঠিয়ে দিলো।আমিও একবার বলেছিলাম থাকতে কিন্তু নতুন বউকে শুশুর বাড়িতে যেতে হয়
সেই নিয়ম মেনেই তুলিকে আসতে হলো।
আমি আর তুলি এখন বাসর ঘরে বসে আছি।ও এখনো কাঁদছে।আমি চেষ্টা করছি ওর কান্না থামানোর কিন্তু পারছিনা।
:-ওই তুমি কান্না থামাবে?(আমি)
:-নিশ্চুপ।
:-কীহলো?প্লিজ কান্না থামাও।সকালেই তোমাদের বাসায় আব্বুকে দেখতে যাবো।এবারতো কান্না থামাও?
:-সত্যি নিয়ে যাবেতো?
:-হ্যাঁ যাবো।
:-মনে থাকে যেনো।
:-থাকবে।এবার একটু হাসো।কান্না করলে তোমাকে একদম পেত্নীর মত লাগে।
:-আমিতো পেত্নীই।
:-দেখেছো আল্লাহ যার সাথে যার লিখে রেখেছে তার সাথেই তার বিয়ে হবে।কেউ এই লেখন মুছতে পারবেনা।
:-হুম।
:-তবে তোমাকে বিয়ে করে ভালোই হলো ফ্রিতে ডাক্তারের সেবা পাওয়া যাবে।
:-তবেরে দুষ্টু দিচ্ছি তোমার সেবা।
এই বলপ তুলি আমার বুকে কিল ঘুসি মারতে শুরু করলো।আমিও তুলির সাথে দুষ্টুমিতে মেতে ওঠলাম।
২ মাস পরের কথা।
তুলি এখন আমাদের পরিবারের একজন সদস্য।তুলি সকালে হাসপাতালে চলে যায় আর আমি অফিসে।সারাদিন দুজন অফিস
করে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরি তবুও দুজনের মাঝে কোনো ভালোবাসার কমতি ছিলোনা।আম্মু হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ে।আব্বু
আগে থেকেই কিছুটা অসুস্থ ছিলো।আম্মুকে অসুস্থ হতে হতে দেখে টেনশনে আব্বুও অসুস্থ হয়ে পড়ে।আমি তুলিকে বলি
হাসপাতাল থেকে কয়েকদিনের ছুটি নিতে।ও বলে একজন নার্সকে আব্বু আম্মুর দেখাশুনার জন্য রাখবে।আমি মেনে নিই।
এরপর ১সপ্তাহের মত কেটে যায়।আম্মু তবুও সুস্থ হচ্ছেনা।সেদিন রাতে তুলিকে বললাম
:-দেখো এভাবে আব্বু আম্মুকে অবহেলা করা আমাদের ঠিক হচ্ছেনা।তুমি কয়েকদিন ছুটি নিয়ে আব্বু আম্মুর পাশে থাকো
এরপর আমি কয়েকদিন ছুটি নিয়ে পাশে থাকবো তাহলে আব্বু আম্মু দুজনেই ভালোভাবে সুস্থ হয়ে ওঠবে।(আমি)
:-দেখাশুনার জন্যতো লোক আছেই।সুস্থ যখন হচ্ছেনা তখন হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেই হবে।(তুলি)
:-তুমি থাকতে আব্বু আম্মুকে হাসপাতালে থাকতে হবে এটা বলতে পারলে?
:-কেনো খারাপ কিছু বলেছি আমি?
:-থাক তোমার আর চাকরিই করতে হবেনা।তুমি কালই রিজাইন দিবে।আমার এত টাকার দরকার নেই।তুমি আব্বু আম্মুর পাশে
থাকলেই হবে।
:-দেখো এটা নিয়ে আমি নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করতে চাইনা।সারাদিন পর এখন আমি অনেক ক্লান্ত ঘুমোতে দাও আমাকে।
:-তোমার শুশুড় শাশুড়ি দুজনেই অসুস্থ আর তুমি আরামে ঘুমাতে চাচ্ছো?
:-ধুর ভালো লাগেনা।আমি কী করতে পারি উনাদের জন্য?সারাদিন কাজ করে এখনতো আর সারারাত উনাদের জন্য জেগে
থাকতে পারিনা।আমিওতো মানুষ।আমারো বিশ্রামেরর প্রয়োজন আছে।
:-তুমি শেষ কবে আব্বুকে নিজের হাতে ওষুধ খেতে দিয়েছিলে মনে আছে তোমার?
:-আমি আর কেনো কথা বলতে চাচ্ছিনা।তোমার বাবা মাকে তুমি দেখো।আমাকে শান্তিতে ঘুমোতে দাও।
এবার আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না।একটা থাপ্পর বসিয়ে দিলাম তুলির গালে।তুলি গালে হাত দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে
বললো
:-তুমি আমাকে গায়ে হাত তুললে?থাকো তুমি তোমার বাবা মাকে নিয়ে।আমি আর এই বাড়িতে থাকবোনা।
আমি রাগের মাথায় বলে দিলাম
:-যা তুই।এখনি যা।
সেই রাতেই তুলি ব্যাগ গুছিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেলো।আমার থাপ্পর মারাটা ঠিক হয়নি।পরেরদিন সকালে তুলিকে আনতে
গেলাম ওদের বাড়িতে কিন্তু তুলি আমাকে অনেক অপমান করলো ওদের বাসার সবার সামনে।আমি কিছু না বলে চলে আসলাম।
আব্বু আম্মু দিনে দিনে বেশি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে তাই ভালো ডাক্তার দেখালাম।ডাক্তার বললো উনাদের ঠিকমত যত্নের অভাবেই
দিনে দিনে বেশি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে।বাসায় ছোট দুইটা ভাই আছে ওদেরও ঠিকমত আদর যত্ন হচ্ছেনা।আমি তুলির কাছে আবার
গেলাম ওকে ফিরিয়ে আনার জন্য।কিন্তু ও এবারো আগের মতই খারাপ ব্যবহার করলো। আর এবার সরাসরি বলে দিবো ও আর
আমার কাছে আসবেনা।ডিভোর্স দিয়ে দিবে।আমি এবারো মুখ বুজে সহ্য করে নিলাম সব।এখন আমাকে ভেঙ্গে পড়লে চলবেনা।
আমি ভেঙ্গে পড়লে আব্বু আম্মু আর ছোট ভাইদের দেখার কেউ থাকবেনা।
আজ ২দিন হলো তুলি রাগ করে চলে গিয়েছে।এই ২দিন আমার সাথে কোনরকম যোগাযোগ করেনি তুলি।আমি কয়েকবার
ফোন দিয়েছি কিন্তু ধরেনি।ফিরিয়ে আনার জন্যও গিয়েছি কিন্তু আসেনি।যেই তুলিকে আমি নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসলাম
সে আমাকে কষ্টের মাঝে ফেলে চলে গিয়েছে।সারাদিন সবার সাথে হাসি খুশি থাকলেও রাতের অন্ধকারে ঠিকই তুলির জন্য
খারাপ লাগতো। সব থেকে অবাক করা ব্যাপার হলো আমার আব্বু আম্মু দুজনেই অসুস্থ এই কথা জানার পরেও আমার শুশুর
বাড়ির কেউ দেখতে আসেনি।কেনো আসেনি সেই কারণ আমার অজানা।
আজ তুলিকে তৃতীয় বারের মত আনতে যাচ্ছি।জানিনা ও ফিরবে কীনা।তুলিকে আমি খুব ভালোবাসি তাই বারবার অপমান হবার
পরেও ওকে আনতে যাচ্ছি।
তুলিদের বাসায় মধ্যে ঢুকতেই আমার শুশুরের সাথে দেখা হলো
:-আসসালামুআলাইকুম।(আমি)
আমার শুশুড় সালামের উওর না দিয়ে চলে গেলেন।জানিনা কেনো আমার সাথে এমন ব্যবহার করলেন।আমার শাশুড়ি আম্মা
আমাকে দেখে এগিয়ে আসলেন।
:-কেমন আছো বাবা?(শাশুড়ি)
:-জ্বি আম্মা ভালোই আছি।আপনার শরীল কেমন?(আমি)
:-ভালো।তোমার শরীলের এ কী অবস্থা হয়েছে?ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করোনা?
:-সবই ঠিকমত করি।তুলি কোথায়?
:-ওর কথা আর বলোনা।আজ ২দিন ধরে আমি ওকে কত বুঝাচ্ছি ফিরে যাওয়ার জন্য কিন্তু ও যাচ্ছেনা।বাপ মেয়ে দুজনেই
একরকম।
:-আমি ওর সাথে কিছু কথা বলতে চাই।ওকে ডাকুন।
আমাদের কথার মাঝে তুলি বাইরে আসলো।তুলিকে দেখে মনে হচ্ছে ও খুব ভালোই আছে।সম্ভবত এখন হাসপাতালে যাচ্ছে ও।
:-তুলি তোমার সাথে আমি কিছু কথা বলতে চাই?(আমি)
:-আপনার সাথে আমার কোনো কথা নেই।সেদিনই বলেছিলাম আমি আর আপনার বাড়িতে যাবোনা, তো আবার কেনো
এসেছেন?(তুলি)
:-দেখো তুলি এটা কোনো ছেলে খেলা না।চাইলেই একটা সংসার এভাবে ভেঙ্গে ফেলা যায়না।তুমি শিক্ষিত মেয়ে।সবকিছু বোঝার
ক্ষমতা আছে তোমার। ঠান্ডা মাথায় সবকিছু ভেবে দেখো।
:-আমি ভেবে নিয়েছি সবকিছু।আগামী ৪ দিনের মধ্যে ডিভোর্স পেপার পেয়ে যাবেন।
:-তুলি প্লিজ এমন পাগলামো করোনা।আমি বলেছি আমি তোমাকে চড় মেরে ভুল করেছি।তোমার কাছ হাত জোর করে ক্ষমা
চাইছি। প্লিজ বাসায় ফিরে চলো।
:-আপনার সাথে ফালতু কথা বলার মত সময় আমার নেই।যদি ভদ্র ঘরের সন্তান হয়ে থাকেন তাহলে আর আমার সামনে কিংবা
এই বাড়িতে আসবেন না।
তুলি বাইরে বেড়িয়ে চলে গেলো।আমার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে।আমার শুশুড়ি আম্মা কাঁদতে কাঁদতে ভেতরে চলে গেলেন।এই
বাড়িতে এই একটা মানুষই আমার কষ্ট বুঝলো আর কেউ বুঝলোনা।
আমি চোখ মুছতে মুছতে বাইরে চলে আসলাম।চারপাশটা কেমন জানি অন্ধকার লাগছে।এই সাধ সকালেও মনে হচ্ছে কেনো
এমন হচ্ছে জানিনা।খুব ধীরে ধীরে হাঁটছি রাস্তা দিয়ে।মনে হচ্ছে সবকিছু থমকে গেছে।গাড়ির হর্নগুলো খুব বিরক্ত লাগছে।
সবথেকে বেশি বিরক্ত লাগছে রোদ।
পরেরদিন আব্বু আম্মু দুজনকেই হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিলাম।তুলি যেই হাসপাতালে থাকে ওটাতে না।অন্য আরেকটা বে-
সরকারী হাসপাতালে।সাথে মোটা অংকের টাকাও দিলাম দেখাশুনার জন্য।বে-সরকারী হাসপাতাল গুলোতে নার্সরা রোগীদেরর
সরকারী হাসপাতালের মত অবহেলার চোখে দেখেনা।তুলির হাসপাতালে ভর্তি করলে ওর সাথে দেখা হবে ফলে কষ্টটা আরো
বাড়বে।কাল থেকে আমার আবার অফিসে যেতে হবে।ছোট ভাই দুটোকে বললাম হাসপাতালে আব্বু আম্মুর কাছে থাকতে।
পরেরদিন থেকে আমি অফিসে যায় আর অফিস থেকে আসার পর হাসপাতালে আব্বু আম্মুর কাছে থাকি।ছোট ভাই দুটো
সারাদিন হাসপাতালে থাকে তাই ওদের রাতে বাসায় পাঠিয়ে দিই।মাঝে অনেক আত্নীয় স্বজন এসে দেখে গেছে।আমার নানা নানি
কেউ নেই।আমার আম্মু এতিম ছিলো।১০ দিন হাসপাতালে থাকার পর আব্বু আম্মু দুজনেই সুস্থ হয়ে ওঠলেন কিন্তু ডাক্তার
বললো আরো কয়েকদিন থাকতে হবে হাসপাতালে।আব্বু আম্মু দুজনেই বুঝে গেছে তুলি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।তুলি এখন
ডিভোর্স পেপার পাঠায়নি।কেনো পাঠায়নি সেটা আমি জানিনা।হয়তো কোটে কোনো ঝামেলার কারণে পাঠাতে পারেনি।তবে খুব
শিঘ্রই পাঠাবে এটা আমি জানি।
১৪ দিন পর আব্বু আম্মুকে হাসপাতাল থেকে রিজাইন দিলো।এখন দুজনেই সুস্থ।আব্বু আম্মু দুজনকে সুস্থ হতে দেখে খুব ভালো
লাগছে।তবে একটা বিষয় নিয়ে মনটা খুব খারাপ হয়ে আছে তুলির জন্য।মেয়েটাকে বড্ড বেশি ভালোবাসি আমি।
আব্বু আম্মু বাসায় আসার পরেরদিন হঠাৎ করে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি।প্রচন্ড পরিমাণে জ্বর আসে।অবশ্য জ্বর আসার কথাই।
কারণ এই ১৫ দিন একটা রাতেও ঘুম হয়নি।সারাদিন অফিস করে রাতে আব্বু আম্মুর কাছে থাকি।জ্বরের কারণে আমি মাঝে
মাঝেই জ্ঞান হারাচ্ছি।
আমাকে আব্বু আম্মু হাসপাতালে এডমিট করালো।তুলি যেই হাসপাতালে থাকে সেটাতে।হাসপাতালে যাওয়ার পর আমার কী
হয়েছে জানিনা।
যখন আমার জ্ঞান ফিরলো তখন দেখলাম আমার চারপাশে অনেক মানুষ ঘিরে আছে।আব্বু,আম্মু,আমার ছোট ভাই,তুলি,তুলির
বাবা মা আমার কয়েকজন ফ্রেন্ডও আছে।তুলির চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি ওর চোখগুলো লাল টকটকে হয়ে আছে।মনে হয়
খুব কেঁদেছে।আমার মুখে অক্সিজেন লাগানো তাই কথা বলতে পারছিনা।ডাক্তার এসে সবাইকে বাইরে বের করে দিলো।তুলি এই
হাসপাতালের ডাক্তার তাই ও ভেতরে থেকে গেলো।আর আমার কাছের একজন হিসেবে আম্মু থাকলো।এখানের ওআইসিতে
অনেক রোগীই রয়েছে।আমার কেনো জানি তুলিকে সহ্য হচ্ছে না।আমি ইশারায় তুলিকে বাইরে বের হয়ে যেতে বললাম।তুলি
চলে গেলো।সামনেই দেওয়ালে ডিজিটাল ঘড়ি বসানো।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি কেবল দুপুর বারোটা বাজে।তবে তারিখের
দিকে চোখ যেতেই চলকে ওঠলাম।১৭-৪-২০১৭।আমি যেদিন হাসপাতালে আসি সেদিন ছিলো ১৫-৪-২০১৭।তার মানে আমি
পরশু থেকে জ্ঞান হারানো অবস্থায় ছিলাম।
রাত ৭টার দিকে আমার অক্সিজেন নল খুলে দেওয়া হলো।সবার সাথে কিছুক্ষণ কথা বললাম।তুলি এখনো এসেছে আবার।তবে
ওর বাবা মাকে দেখছিনা।
:-আম্মু তুলিকে চলে যেতে বলো।(আমি)
আমার কথা শুনে তুলি আমার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো
:-প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দাও।আমি ভুল করেছি।আর কখনো এই ভুল হবেনা।তুমি যা বলবে আমি তাই করবো।(তুলি)
আমি তুলির কাছ থেকে টান দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিলাম।
:-আমি আপনাকে আর বিশ্বাস করিনা।আপনি যদি আমার সামনে থেকে চলে যান তাহলে খুব খুশি হবো।
:-প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দাও।
:-অপরাধীকে ক্ষমা করা যায় কিন্তু বিশ্বাস ঘাতককে নয়।আপনি এখনি আমার সামনে থেকে চলে যান।আপনার চেহারাও আমি
দেখতে চাইনা।
তুলি কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেলো।ওআইসি রুমের সব মানুষ আমাদের কান্ড দেখছিলো এতসময়।
:-মেয়েটাকে এভাবে না বললেও পারতি।(আম্মু)
:-আম্মু তুমি এই কথা বলছো?তোমরা ১৪টা দিন হাসপাতালে ছিলে একটাবার দেখতে এসেছে?একটাবার জানতে চেয়েছে তোমরা
কেমন আছো?আর তুমি কিনা সেই মেয়ের পক্ষ নিয়ে কথা বলছো!(আমি)
:-ও ওর ভুল বুঝতে পেরেছে।নিজের ভুল বুঝতে পেরেই তুই হাসপাতালে আসার পর থেকে সবসময় সেবা যত্ন করছে।রাতে
আমাদের বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে ও নিজে সারক্ষণ তোর পাশে থেকেছে।এমনকি তোর জন্য ও চাকরীটাও ছেড়ে দিয়েছে।
:-এসব ওর অভিনয় মাএ।তোমরা ভুলে যেতে পারো সবকিছু কিন্তু আমি ভুলিনি।
:-তোর যা ভালো মনে হয় কর।তবে যা করবি ভেবে চিন্তে করবি।
আমি আর কিছু না বলে চুপ করে থাকলাম।তুলি কী আসলেই ওর ভুল বুঝতে পেরেছে নাকি এগুলো শুধুমাএ ওর অভিনয়?যদি
অভিনয়ই হবে তবে চাকরী ছাড়বে কেনো?আমি কী তুলিকে সবকিছু ভুলে মেনে নিবো?না মাথায় কিছু ঢুকছেনা।
পরেরদিন আমাকে হাসপাতাল থেকে রিজাইন দিয়ে দিলো।কালকে রাতের পর তুলি আর আসেনি।বাসায় আসার পর থেকে
মনটা কেমন জানি তুলির জন্য ছটফট করছে।আমাদের মনটা খুবই বেয়াদব।যেই মানুষগুলোকে আমাদের সবথেকে বেশি কষ্ট
দেয়,অবহেলা করে সেই মানুষগুলোর কাছেই বেশি ছুটে যায়।
অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিলাম তুলিকে ক্ষমা করে দিবো।তবে আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে ক্ষমা করতো কিনা আমার জানা
নেই।আমি তুলির ভালোবাসার কাছে দুর্বল
বড্ড বেশি দুর্বল।
তুলির নম্বরে ছোট্র করে একটা মেসেজ দিলাম””তোমাকে খুব মিস করছি,””
আমি জানি তুলি মেসেজটা দেখা মাএ ছুটে চলে আসবে আমার কাছে।বারবার ক্ষমা চাইবে।ঘুম ধরেছে আমার একটু ঘুমানো
দরকার।চোখের পাতগুলো বন্ধ হয়ে আসছে।
পায়ের কাছে কারো কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেলো।তাকিয়ে দেখি তুলি কাঁদছে।তুলির চেহারা আগের থেকে অনেক পাল্টে গেছে।
চোখের নিচে কালো দাগ পড়েছে।আগের তুলির সাথে এখনকার তুলির কোনো মিল নেই।আমি ওঠে দাঁড়ালাম।তুলিকে হাত ধরে
আমার কাছে টেনে নিয়ে বললাম
:-আবার এমন করবে?(আমি)
:-কোনদিনই করবোনা।তুমি যা বলবে তাই করবো।শুধু তোমার বুকে একটু ঠাই দিয়ো।(তুলি)
:-চাকরী থেকে রিজাইন দিয়েছো কেনো?
:-আমি আর চাকরী করবোনা।পরিবারের লোকদের সময় দিবো।
:-চাইলে চাকরীর ভেতর দিয়েও পরিবারের মানুষদের সময় দেওয়া যায়।
:-আমি এই ব্যাপারে আর কিছু বলতে চাইনা।আমি চাকরী করবোনা বলেছি করবোনা।
:-আচ্ছা বলবোনা।
তুলি আমার খুব কাছে চলে আসলো।ওর নিঃসাশের শব্দ আমি শুনতে পাচ্ছি।আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই কোমল দুটি ঠোঁট
আমার ঠোঁটের মাঝে জরিয়ে গেলো।আজ অনেকদিন পর মনের মধ্যে অদ্ভুদ এক ভালোলাগা ঢেও খেলে গেলো।আমিও কম
কিসে তুলিকে শক্ত করে জরিয়ে ধরলাম।অনেকদিনের জমা থাকা ভালোবাসা আজ তুলিকে ফেরত দিবো।আমি জানি তুলিও
আজ ওর জমে থাকা সব ভালোবাসা আজ আমাকে ফেরত দিবে।
…………………………………………………সমাপ্ত………………………………………………