রুমির প্রেমে পড়েছিলাম

রুমির প্রেমে পড়েছিলাম

রুমির ঠোঁটের নিচের তিল আর গালের ঐ টোল দেখে যেকোন ছেলেই প্রেমে পড়বে কিন্তু আমি তার প্রেমে পড়েছিলাম তার সাদা সিধে ঐ নিষ্পাপ মুখ আর তার সহজ সরল চলাফেরা দেখে তবে সেটা অনেক দেরিতে, অবশ্য আমি সব সময় ই চাইতাম আমার বউ হবে ইয়ো ইয়ো টাইপের, যে কথা কথায় ফটফট করে ইংলিশ বলবে, যে কিনা দুর্দান্ত স্মার্ট হবে আর প্রতিটা মিনিট শেষ হবার আগেই চোখ মুখ বাকিয়ে সেল্ফি তুলবে। কিন্তু হয়েছিল ঠিক উল্টোটা। খালাতো বোনের সাথে অনেকটা মা বাবার জোরের কারনেই আমার বিয়েটা হয়েছিল। বিয়ের রাতে রুমি আমাকে এসে যখন সালাম করতে গিয়েছিল তখন ই ন্যাকামি বলে ওকে সরিয়ে দিয়ে বলেছিলাম- এইসব আলগা প্রেম আমাকে দেখাতে এসোনা। রুমি মাথা তোলার সাহস পায়নি আমার এ কথা শুনে। আমি বিছানায় গিয়েই বিছানার কিছু অংশের ফুল ফেলে দিয়েছিলাম, ফ্লোরে পড়ে থাকা গোলাপের পাপড়িগুলোর উপর এক খাবলা থুথু দিয়ে কোম্বলটা মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মধ্য রাতে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল চুড়ির শব্দে, মেজাজ বিগড়ে বলেছিলাম এইসব বা* ছাল কি খুলে ঘুমানো যায়নি? রুমি মাথা নিচু করে বিছানা থেকে নেমে গিয়েছিল। কোথায় গিয়েছিল সে খোজ নি নাই, আসলে রুমি, আমার বাবা মা সবার উপর ই তখন আমার প্রচন্ড রাগ জন্মেছিল। বাবা মাকে কিছু বলতে পারবোনা বলেই সব ঝাল রুমির উপর দিয়ে উঠিয়েছিলাম। সকালে ঘুম ভেঙ্গেছিল মায়ের ডাকে, উঠে হাত মুখ ধুয়ে দেখি সবাই টেবিলে খাচ্ছে আর রুমিকে উদ্দেশ্য করে বলছে কি রে রুমি রাতে বুঝি ঘুম হয়নি?? এই বলেই সবাই হাসা হাসি শুরু করল, খেয়াল করে দেখলাম রুমি লজ্জায় মাথা নিচু করে আছে তার মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছে। এসব কান্ড দেখে মাকে বলেছিলাম আমার খাবার ঘরে দিয়ে যেতে, বিয়ের কিছু দিন যেতে না যেতেই আমার জলবসন্ত হল, গ্রামের মানুষজন একটু কুসংস্কারাপন্ন তাই তারা বললেন কেউ যেন রুগীর কাছে না যায় তাহলে তার ও জলবসন্ত হবে, আয়নায় নিজেকে দেখলে খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করত।

সারা মুখ – শরীর বড় বড় গোটায় ভর্তি তার উপর অসহ্য ব্যথা। টুকটাক ডাক্তারি উপায় প্রয়োগ চলতে লাগল, সবাই কেমন যেন একটা দূরত্ব নিয়ে চলত। শুধু মা ই কাছে আসত, গায়ে হাত দিত। এর মাঝে রুমি বা আমি কেউ কাউকে ছুয়েও দেখিনি, প্রচন্ড ক্রোধ,জিদ আর রাগের কারনটাই দেয়াল হয়ে ছিল। রুমি নাকি আমাকে মাধ্যমিক থেকেই খুব পছন্দ করত হয়তো ভালও বাসত অনেকেই বলাবলি করত কিন্তু আমি পাত্তা দিতাম না। সেই রুমি আমাকে পেয়ে ভাগ্যবতী মনে করলেও আমি নিজেকে দুর্ভাগা ছাড়া আর কিছু ভেবে উঠতে পারিনি কেননা রুমি ছিল যথেষ্ট ব্যাকডেটেড,আমি যেমনটা চেয়েছিলাম তার সম্পূর্ন বিপরীত মেরুতে ছিল রুমির অবস্থান। রুমি ছিল যুক্তিবিদ্যার আর আমি সাহিত্যর তারপরেও কেন যুক্তি তর্কের বাইরে গিয়ে রুমি আমাকে চাইত বা এখনো চাচ্ছে সে বিষয়টা আমার মাথায় ঢুকত না। একদিন রাতে অনুভব করলাম কেউ যেন আমার পিঠের প্রতিটা গোটায় আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে একটু পর খেয়াল করলাম ঠান্ডা ছোট কিছুর স্পর্শ আমার ছোট ছোট জলবসন্তের উপরে, হয়তো সেটা রুমি ঠোটের স্পর্শ ছিল, আমি সব বুঝেও চুপ করে দেখছিলাম রুমি কি করে। কিছুক্ষন পর আমার খালি গায়ের উপর কয়েক ফোটা পানি গড়িয়ে যাচ্ছে সেটা বুঝতে পারলাম আর সেটা যে রুমির চোখের ই পানি ছিল সেটাও বুঝতে বাকি ছিল না, এই একটা রাত! আমার সব পালটে দিয়েছিল সব। চেয়েছিলাম সব কিছু ভুলে গিয়ে রুমির হাত দুটো বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলি…এক জন্মে এত ভাল কেন বাসতে গেলে আমায়! এত ভালবাসার শক্তি কোথা থেকে পাও তুমি?? কিন্তু আমার ভিতরে থাকা অনেক দিনের আত্ন অহমিকা আমার মুখ চেপে ধরল, আমায় বোবা করে দিয়ে আমার অপরাধবোধকে জিইয়ে রাখল আজন্মের মত। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি রুমি বিছানার পাশে চা নাস্তা রেখে গিয়েছে। আমি সব ফেলে রুমিকেই খুঁজছিলাম বার বার, কিন্তু কেন খুজছিলাম! সেটা আমার জানা ছিল না তখন।

আস্তে আস্তে আমি সুস্থ হয়ে উঠলাম এর মাঝে রুমির সাথে একটু একটু কথা হতে লাগল তবে সেটা মুখে মুখে সৌজন্যতা হলেও ভিতর থেকে খুব করে চাইতাম রুমির সাথে কথা বলতে কিন্তু ঐ যে আমার ইগো সে তো আমার হাত পা বেধে রেখেছিল। একদিন দুপুরে খাবার সময় রুমি আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল, মাংসে এত ঝাল হয়েছিল আমি ঝালে শিশিয়ে উঠেছিলাম তা দেখে রুমির কি ছুটাছুটি! সে রান্না ঘর থেকে দৌড়ে গিয়ে চিনির বয়াম আর জগভর্তি পানি নিয়ে এসেছিল, আমি পানি মুখে দিয়ে স্বাভাবিক হয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু রুমি নিজের ভিতরে গুমরে মরছিল। রুমির চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছিল সে এক্ষুনিই কেঁদে দিবে, তার ঐদিনের ঐ মুখটা দেখে খুব মায়া হয়েছিল, কিন্তু ভালবাসাটা হয়ে ওঠেনি। কাজের খাতিরে ঢাকায় চলে আসলাম, নতুন অফিসের এক মহিলা কলিগের সাথে বেশ ভাব জমে উঠল আমার, সে জিন্স পরত,গুছিয়ে কথা বলত.. সুন্দর হাসি দিয়ে সবাইকেই আপন করে নিতে পারত। আমার সাথে তার খুব জমে যেত কেননা আমি যেমনটাই চাইতাম সে তেমন ই ছিল, আমরা এক সাথে লং জার্নিতে যেতাম, শপিং করে বেড়াতাম, রেস্টুরেন্ট এ গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিতাম এই কয়দিনে আমি রুমিকে একদম ভুলেই গেলাম সে মাঝে মাঝে ফোন দিলেও ত্যাড়া ত্যাড়া কথা বলে রেখে দিতাম। নতুন কলিগ- সোহানার সাথে সারা রাত ফেইসবুকে চ্যাটিং, ফোন কল, হ্যাং আউটে আমি আমার চির কল্পিত সুখ যেন খুজে পেলাম এমন মনে হত। এর মাঝে খবর পেলাম রুমি নাকি খুব অসুস্থ, মাকে ঝাড়ি দিয়ে বললাম.. আমি এখন আসতে পারবা না, কাজের চাপ খুব.. আর টাকা লাগলে বল পাঠিয়ে দিব। তারপরে মা আর ফোন দেবার সাহস দেখান নি। সোহানাকে ছাড়া আমার এক মুহুর্ত যেন নরকের মত মনে হতে লাগল, সোহানাও আমাকে খুব চাইত এটা বুঝতে পারতাম। আমরা অফিসের কাজের খাতিরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে লাগলাম… তখন নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হতে লাগল..সোহানার হাতে হাত রেখে সী বিচ ঘুড়ে বেড়াতাম.. ক্যান্ডেল লাইট ডিনার আর বিভিন্ন কারনে সেলিব্রেশনই আমার কাছে জীবন মনে হতে লাগল…। অফিসে আমার আর সোহানার ডেস্ক ছিল সামনাসামনি, সারাক্ষণ চোখ দিয়েইই কথা বলে যেতে লাগলাম আমরা, একদিন যখন সোহানা ওয়াশ রুমে গিয়েছিল, আমি এই ফাকে তার ডেস্কে একটা গোলাপের তোড়া রাখতে গিয়ে দেখলাম তার ল্যাপ্টপে লগ ইন করা ফেসবুক আইডিতে কে যেন মেসেজ করেছে। আমি মেসেজটা অন করেই দেখি:-

“সোহা সুইটহার্ট আজ চল আমরা সারা রাত ড্রাইভ করি… শুধু তুমি আর আমি”

আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল! কে এই সোহান! একে তো আমি চিনিনা। তারপর দেখতে লাগলাম এরকম অনেক ছেলের সাথেই তার আমার সাথে যেমন কথা হয় তেমন কথা ই সে অন্যদের সাথে নিয়মিত বলে, আমার কান দিয়ে তখন ধোয়া উড়ছিল… আমার মাথায় কে যেন হাতুড়ি দিয়ে পিটাচ্ছিল, সোহানা আমাকে তার ল্যাপ্টপ ঘাটতে দেখে চিৎকার করে বলল – তুমি আমার ল্যাপ্টপে হাত দিলে কেন! তোমার এত্ত সাহস কে দিয়েছে!! কোন ম্যানার শিখোনি?? গেয়ো ভুত কোথাকার। অফিসের সবাই আমাদের দিক তাকালো, আমি এবার লজ্জায় মরে যেতে লাগলাম। সোহানা এবার আমাকে উদ্দেশ্য করে বলা শুরু করল – আপনি আমাকে এত জ্বালান কেন,সারাক্ষন শুধু বিরক্ত করেন কেন?? আমার জিনিসে না বলে হাত দিলেন কেন! আমি এই অফিসে থাকব নয়ত আপনি! ইস্টুপিড বুল কোথাকার। এম ডি স্যার আমাকে আর সোহানাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন.. সোহানা অনেক অনেক কথা বলেছিল আমার নামে কিন্তু সে কি বলেছিল আমি শুনতে পাইনি তখন আমার বার বার রুমির সাদা সিধে চাল চলন,নিষ্পাপ মুখ আর তার ভালবাসার গভীরতার কথা মনে পড়ছিল। স্যার আমার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়েছিলেন, সেটাতে হয়ত রিজাইন লেটার ছিল আমি খুলে না দেখে ড্রেনে ফেলে দিয়েছিলাম, বার বার ইচ্ছে করছিল রুমিকে যেয়ে জড়িয়ে ধরি তার পা দুটো ধরে ক্ষমা চাই….। ট্রেনে উঠে পড়লাম… ট্রেন হয়ত চলছিল আশি কিলোমিটার বেগে কিন্তু আমার মন সেটা রুমির দিকে হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটে চলেছিল সেদিন। বাড়ি ফিরে দেখি বাড়িতে কেউ নেই, পরে খবর পেয়েছিলাম সবাই হাসপাতালে। গিয়ে দেখি রুমি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে, তার চোখের নিচে গাঢ় কালিই বলে দেয় কত রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়েছে সে, তার রুগ্ন শরীর বলে দিচ্ছিল কতদিন শুধু কোন একজনের সাথে বসে না খেতে পারার আক্ষেপে কত দিন না খেয়েই কাটিয়েছে সে, যখন কিনা অন্য একজনের হাত ধরে রেস্টুরেন্টে বসে হাজার টাকার খাবার খেয়েছি তখন আমার রুমি শুধু আমার ই অনাদর আর অবহেলায় না খেয়ে ছিল। আমাকে দেখে সলজ্জ সেই নিষ্পাপ হাসি দিয়ে আমাকে কাছে ডাকল। আমি ছুটে গিয়ে ওর হাতটা ধরলাম, রুমি আমার হাতটাতে আলতো করে চুমু খেল। তারপর আমার হাতে একটা এক ইঞ্চি কাগজ গুঁজে দিল, লেখা ছিল:-

আমার হিম জমানো রুধি ধাবমান হোক তোমার হৃদপিন্ডে, হোমোপ্যাথিয়ান বলুক,”ভুল রুধিতে বিঁধিলাম প্রান…অত:পর দুটো শরীর একই কফিনে..এই তো চেয়েছিলাম জন্ম হতে জন্মান্তরে”

আমি কিছু বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলাম, চিৎকার করে কেঁদেছিলাম রুমির লাশটা ধরে….অত:পর আমিও রুমির হাতে লিখে দিলাম :-

প্রিয়তমা…আগুন রঙের শাড়ি পর, নীলকণ্ঠের গয়না পর…এ মহাক্ষনে পারলে আমায় ক্ষমা কর…মরলে আমায় স্মরণ করো..গোরায় বসে একটু হেসো..ধুপকুপেতে নিশ্বাস নিও…পারলে আমায় ভালবেস!

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত