ধোয়ার-নেশা

পাত্রী দেখতে এসে সিগরেট খাচ্ছেন? তাও পাত্রীর বেড রুমে দাড়িয়ে,আপনার লজ্জা করছেনা???””

অন্ত্রীশার তার তাচ্ছল্যমাখা প্রশ্ন ছুড়ে দিতেই পালক নিজের ঠোটদ্বয়ের সাহায্যে অন্ত্রীশার ঠোট চেপে ধরলো। অন্ত্রীশা ভয়ে ছটফট করতে করতে নিজের হাত দিয়ে পালকের মিস্টি কালারের শার্টটা খামচে ধরে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। পালকের সে দিকে কোনো খেয়ালই নেই। নিজের সিগরেটের শেষ টানে নেওয়া মুখভর্তি ধোয়াগুলো যেন অন্ত্রীশার মুখে ছেড়ে দেওয়ায় তার মুখ্য কাজ হয়ে দাড়িয়েছে!

এই প্রথম অন্ত্রীশার মনে হলো হাতের বড় বড় নখ শুধু সৌন্দর্যই বহন করেনা সাথে সাথে নিজের সেফটি হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। নিজের মনের সেই রাক্ষসী আর জংলি চিন্তাভাবনার জন্য সে কখনোই হাতে নখ রাখেনি। অথচ আজ সেই নখের এক একটা আচড় হয় তো তার বাঁচার সঙ্গী হতে পারতো। অন্ত্রীশা নিজেকে ছাড়ানোর আর কোনো উপায় না দেখে পালকের গলার খালি দিকটায় হাতের ছোট ছোট নখ বসিয়ে দিলো। তাতে যেন পালকের ঠোটের শক্তি ক্রমশ কমে এসেছে। অন্ত্রীশা হাতের খামচিকা আরেকটু গভীর করতেই পালক ওকে ছেড়ে দিয়ে ঘুরে দাড়ালো। মুখে একটা চকলেট পুরে দিতেই পেছন থেকে শুনা গেলো,

“” খালামনি এই আংকেলটা তোমাকে পাপ্পি খেলো কেন? তুমি কি কান্না কলছিলে??””

পালক অন্ত্রীশাকে ছেড়ে দিতেই ও কাশতে থাকে। ওর মনে হলো ওর মুখে কেউ হাজার হাজার জ্বলন্ত সিগরেটের ধোয়া ঢেলে দিয়েছে। প্রতিটা কাশির সাথে যেন ধোয়াগুলো কুন্ডুলি পাকে বের হয়ে তাচ্ছিল্যভাবে বলছে,আমাকে ঘৃনা করিস তো দেখ এবার কেমন লাগে? একটা সিগরেটের প্রতিশোধ কেমন হতে পারে ভাবতে পারছিস? আর কখনো আমাকে দেখে নাকমুখ কুচকিয়ে আমার নামে নিন্দা করবি???

অন্ত্রীশার কাশির গতি যেন বেড়েই যাচ্ছে। কাশতে কাশতে একটু ঘুরতেই নিজেরই বড় বোন অনিকশার কোলে অতিআদরের ভাগনি অরিদ্রাকে দেখতে পেলো। অন্ত্রিশা হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে নিজের কাশি থামানোর চেষ্টা করছে আর ভাবছে তবে কি আপু সব দেখেছে???

পালক চকলেট চুষতে চুষতে ছোট্ট বাবুটার কাছে গিয়ে নাক টিপে বললো,

“” কান্না না করলে বুঝি পাপ্পি দেওয়া যায়না,মামনি?””
“” না। কই আমাল আব্বু তো আমাকে দেয়না। কিন্তু আম্মুকে দেয়!””

পালক অরিদ্রার গালে ছোট্ট করে একটা চুমু খেয়ে বললো,

“” নাও তোমাকেও দিয়ে দিলাম,এবার খুশিতো??””

পালক মুখে ছোট্ট হাসি নিয়ে ড্রয়িং রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

নিজের মা আর ছোট বোনকে নিয়েই কিছুক্ষন আগেই পাত্রী দেখতে এসেছিলো পালক। হালকা কথার মাঝখানেই হুট করে বলে উঠে,সে পাত্রীর সাথে আলাদাভাবে কথা বলতে চায়। পালকের এমন কথায় মিসেস তানিয় বেগম বেশ ঘাবড়ে যায়। মুখে মেঘের ছায়া নিয়ে ভাবতে থাকে তাহলে কি এবারের সম্বন্ধটাও ভেসতে যাবে??? আমার এতো কষ্ট করে সাজানো প্লেনে এভাবে পানি ঢেলে দিবে,পালক?

পালক নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে হালকা মিস্টি হেসে বললো,

“” আম্মু বিয়ের ডেট ফিক্সট করো,পাত্রী আমার পছন্দ হয়েছে। আর এই সপ্তাহের মধ্যে ওকে আমি আমার ঘরে নিতে চাই।””

অনিকশা মেয়েকে কোল থেকে নামিয়ে বোনের কাছে গিয়ে বললো,

“” পানি খাবি,আমি কি পানি নিয়ে আসসস””

অনিকশার কথা শুনারও সময় পেলোনা অন্ত্রিশা। মুখ ভর্তি করে বমি করে দিলো অনিকশার শরীরে। নিজেরি ছোট বোনকে দেখতে আসবে দেখে হালকা বেগুনি কালারের মধ্যে একটা জামদানী শাড়ী পড়েছিলো সে। তার হাসবেন্ডেরই দেওয়া৷ যদিও তার হাসবেন্ডের কথানুযায়ী বেগুনী কালারে তাকে খুব সুন্দরী লাগে কিন্তু কেন জানি তার ভালো লাগেনা। স্বামীর কথা রাখতেই সে এ শাড়ীটা পড়েছিলো৷ এতো অপছন্দের শাড়ি হলেও কি যতই হোক স্বামীর ভালোবাসার উপহার। অনিকশা বেশ রেগেই বললো,

“” দিলি তো আমার শাড়ীটা খারাপ করে? তোর দুলাভাইকে এখন আমি কি জবাব দিবো? মানুষটা এত শখ করে আমার জন্য এটা কিনে এনেছিলো আর তুই কিনা…””

অন্ত্রীশা আবার একদলা বমি করে দিলো অনিকশার উপরে। পেছন থেকে অরিদ্রা হেসে কুটি কুটি হয়ে বললো,

“” আদল কললেও বুঝি বমি আসে খালামনি। কই আমাল তো আসেনা! আম্মু আজকেও আব্বুল কাছে বকুনি খাবে,কি মজা কি মজা। আজকে আব্বুল পাপ্পি পাবেনা।””

অনিকশার ইচ্ছে হলো নিজের এই পাকনা মেয়েটাকে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিতে। ৩ বছরের বাচ্চা এতো বেশি পাকনা কিভাবে হতে পারে??কিন্তু এতে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে ভেবে রাগে গজগজ করতে করতে অন্ত্রীশার রুম ত্যাগ করলো অনিকশা।

অন্ত্রীশা এই নিয়ে তিনবার বমি করলো। কুলি করতে করতে তার মুখ খসিয়ে ফেলছে। সাবান পানি দিয়েও কুলি করেছে, তবুও যেন মুখ থেকে সে সিগরেটের গন্ধ ছড়াতে পারছেনা। নিশ্বাস ছাড়লেই মনে হচ্ছে একদলা ধোয়া কুন্ডুলি পেকে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। অন্ত্রীশা রাগে ক্ষোভে ধীরে ধীরে ১ মিনিট পর পর একটা করে নিশ্বাস নিচ্ছে। তাতে যদি গন্দটা কম কম হয়।

“” তোমার পছন্দ না দেখে তার মধ্যে তুমি বমি লাগাবে? এ কেমন ধরনের আচরন অনিকশা? আমার পছন্দকে তুমি এভাবে হেলা করবে? তুমি জানো আমি কতবার পাক দিয়ে দিয়ে ঘুরে ঘুরে এই শাড়ীটা কিনেছি?””

অনিকশা এতক্ষন চুপচাপ অরিদ সাহেবের কথা শুনলেও আর সহ্য করতে পারলোনা। চোখমুখ লাল করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো। বারান্দায় নেড়ে দেওয়া শাড়ীটা নিয়ে এসে অরিদের সামনেই কুচিমুচি করে তাতে থুতু দিয়ে বললো,

“”তোমার পছন্দে আমি থুতু ফেলি। বিরক্তকর। লাইট অফ করবে নাকি আমি অন্য রুমে গিয়ে ঘুমুবো?””

অনিকশার এমন কান্ডে থতমত খেয়ে গেলো অরিদ সাহেব। মেয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো,

“” মা,তোর বাপটা কি এতো পচা যে তোর মা এমন কষ্ট দেয়? তুই ও কি আমাকে এভাবে কষ্ট দিবি?””

অরিদ্রা নিজের আব্বুর কপালে চুমু খেয়ে বললো,

“” না,পাপাই। আমি তোমাকে সবসময় এমন আদল কলবো। তুমি আমাল ভালো পাপাই।””

অনিকশা শুয়ে শুয়ে বাপমেয়ের আদরের গল্প শুনতে পারলোনা। শুয়ে থেকে উঠে গিয়ে টুপ করে লাইটটা বন্ধ করে দিলো। পুনরায় বিছানায় আসতেই নিজের ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনটা হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে পালক বলে উঠলো।

“” আপনার বোন বিয়েতে এত সহজে রাজি হবে আমি আশা করিনি। উনাকে আমার পক্ষ থেকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে দিবেন।””

বলেই পালক লাইনটা কেটে দিলো। অনিকশা ফোনটা তখনো কানেই ধরে রইলো। যেন পালকের আরো কিছু বলার কথা কিন্তু সে না বলেই কেটে দিয়েছে।

“” তুই নাকি বিয়েতে রাজী হয়ে গেছিস?””

অন্ত্রীশা মুখে পানি নিয়ে বললো,

“” আপু,আমার আবার বমি বমি পাচ্ছে। তোমার সাথে কাল কথা বলি???””

অনিকশা বিড়বিড় করতে করতে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো। যে ছেলে মেয়ে দেখতে এসেই এমন চুমু খেয়ে বসে তাকে বিয়ে করার জন্য এমন ধেই ধেই করার নাচার কি আছে? যার একটা চুমু খেয়েই তুই বমি করতে করতে কাহিল তার সাথে তুই সারাজীবন সংসার কিভাবে করবি?? তুই যে দিনে দিনে এমন ক্যারেক্টারলেন হয়ে যাবে তাতো কখনো ভাবিনি। শেষমেষ কিনা আমি ক্যারেক্টারলেস মেয়ের বোন হলাম? তাও বড় বোন,ছি!ছি!ছি!!!

রাতের বৃষ্টি পড়ার শব্দটা অন্ত্রীশার ভীষন পছন্দ। জানালার পাশে বসেই সে মন ভরে বৃষ্টির শব্দ শুনছে। ইচ্ছে করছে বৃষ্টির শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে হালকা করে নেচে উঠতে,নিজের চুলগুলোতে বৃষ্টির পবিত্র পানি দিয়ে গোসল করাতে। কিন্তু মায়ের কড়া শাসন আজ যেন সে কোনোভাবেই বৃষ্টিতে না ভিজে। দুদিন পর বিয়ে এখন যদি সর্দিকাশি বানিয়ে ফেলে পড়ে দেখা যাবে,বিয়ের দিন কবুল বলতে গিয়ে বেহুশ!

অন্ত্রীশা বৃষ্টিতে নিজের হাতটা মেলে দিয়ে চোখটা বন্ধ করতেই পালকের মুখটা দেখতে পেলো। ঠোটে হালকা হাসি নিয়ে মনে মনে ভাবতে লাগলো,কেমন মানুষ আপনি? দেখতে এসেই, চুমু খেয়ে নিলেন অথচ আজ চারদিন হতে চললো একটা কল দিলেননা। সবার সাথে ফোনে কথা বলেন অথচ আমার সাথে বলেননা। যদি আমার সাথে কথাই না বলবেন তাহলে আমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন কেন?

অন্ত্রীশা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ভেজা হাতটা মুখে ছোয়াতেই মনে হলো এমনও তো হতে পারে উনি চাচ্ছেন আমি উনাকে কল দেই। ভাবতেই অন্ত্রীশা জানালা থেকে সরে এসে নিজের ফোনটা তুলে নিলো। ফোনের লক খুলতেই মনে পড়লো তার কাছে তো তার চুমুবাবুর নাম্বার নেই। তাহলে সে কিভাবে কল দিবে? আব্বুর কাছে চাইবে নাকি আম্মু? কিন্তু ওরা যদি আমাকে নির্লজ্জ মেয়ে মনে করে? এমনিই বলে আমার নাকি লজ্জা কম। আমি কি এখন নাম্বার চেয়ে সেটা প্রমান করে দিবো??? অন্ত্রীশার হাসি হাসি মুখটা নিমিষেই মিলিয়ে গেলো। ইশ! উনার নাম্বারটা যে কেন নাই!

অন্ত্রীশা মন খারাপ করতে করতে জানালাটা বন্ধ করে দিলো এই মুহুর্তে তার বৃষ্টির শব্দ শুনতে খুবই বিরক্ত লাগছে,খুব বেশিই বিরক্ত!

“” আমি কি একটু তোর রুমে ঘুমোতে পারি?””

অন্ত্রীশা পেছনে ঘুরতেই নিজের বোনকে দেখে বললো,

“” আবার ঝগড়া করেছো বুঝি? অমন সহজসরল দুলাভাইটাকে এতো কষ্ট দাও কেন আপু? উনি তোমাকে অনেক ভালোবাসে।””
“” থাক,তোর রুমে আসাটাই ভুল হয়েছে।””

অনিকশা চলে যেতে নিলেই অন্ত্রীশা দৌড়ে গিয়ে ওকে জড়িয়ে নিয়ে বললো,

“” তোমার এতো বেশি রাগ কেন আপু? আগে তো এমন ছিলেনা। তুমি গিয়ে শোও। আমি আম্মুর রুম থেকে কাথা নিয়ে আসছি। মনে হচ্ছে আজ একটু শীত বেশি পড়বে।””

অনিকশাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে অন্ত্রীশা নিজের মায়ের রুমের দিকে এগুলো। নিজের রুমের দরজাটা পার হতেই কেউ একজন তার মুখ চেপে ধরেছে। অন্ত্রীশাকে দেয়ালের দিকে সরিয়ে নিয়ে এসে বললো,

“” কোনো সাউন্ড হবেনা। আমি যা করতে চাই চুপচাপ তা করতে দাও””

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত