স্বপ্ন নীড়

স্বপ্ন নীড়

সকালবেলা মুখে পানির ঝাপ্টাতে ঘুম ভাংলো আমার।
-ওই নাইম ওঠ(ইরা)
-ওহ তুই(আমি)
চোখ কচলাতে কচলাতে তাকিয়ে দেখি ইরা পানির বোতল হাতে দাড়িয়ে আছে।বলা হয়নি তো,আমি নাইম।শহরের ভার্সিটিতে ভরতি হয়েছি,কিন্তু মেস না পেয়ে পার্কের বেঞ্চে রাত কাটাই আজ তিনদিন যাবত।আর যে ঘুম ভাঙানো পাখী আমার ঘুমের সর্বনাশ করলো উনি ইরা।আমার ছোটবেলার বন্ধু।ওর কোন যেন বান্ধবির বাসায় থাকছে ও।কিন্তু ব্যাচেলরের নোটিশ কপালে থাকায় মেস বা বাসা পেলাম না আমি।
-এই নে,হাতমুখ ধুয়ে নে(ইরা,এক বোতল পানি হাতে দিয়ে)
-আর বলিস না দোস্ত,সারা রাত মশার ভায়োলিন শুনে অস্থির ঘুম হয়েছে(আমি,পানির বোতল হাতে নিয়ে)
-আমারো তো একই অবস্থা।
-তুই না বান্ধবির সাথে থাকছিস,সমস্যা কোথায়?
-অন্যজনের বাসাত থাকা তাও কেমন লাগে বল?
-হুমম,তাও তো কথা।
আমার হাত মুখ ধোতা শেষ। ইরা ওর ব্যাগ থেকে রুটি,কলা,আর জুস বের করে দিলো।সারাক্ষন আমার খেয়াল রাখে মেয়েটা।
-ওইভাবে তাকিয়ে নজর লাগাস কেন(আমি)
-কই নজর দিলাম(ইরা)
-হ্যান্ডসাম ছেলে দেখলেই তাকাই থাকে।
-হি হি হি,দোস্ত পার্কে থাকিস তো,আয়না দেখিস না তাই বলছিস।
-হইসে উল্টোদিকে তাকা,তাকাই থাকলে আমি খেতে পারি না।
ইরা মুখ ঝামটা দিয়ে উল্টোদিকে ফেরে,আমি খাওয়া শেষ করি।খাওয়া শেষে ইরা ক্লাসে চলে যায়।আমিও ধির পায়ে ক্লাসের দিকে চলি।সেদিন।বিকেলে ইরা ফোন করে
-দোস্ত সুখবর আছে(উচ্ছাসিত গলায় বলে ইরা)
-কিসের সুখবর(আমি)
-বাসা পাওয়া গেছে আমাদের জন্য
-আমাদের জন্য মানে?
ইরা যা বলল তা শুনে আমি গর্দভ বনে গেলাম।বাসার মালিক নাকি ফ্যামিলি ছাড়া বাসা দেবে না তাই ইরা বলেছে আমরা স্বামি-স্ত্রী। তারপর লোকটা বাসা দিতে রাজি হয়েছে।এখন ইরার সাথে অভিনয় করে ওই বাসায় থাকতে হবে।
-উপায় যখন আর নেই,এইটাই করি(আমি)
-কাল তাহলে যায়গামত এসে দেখা করিস
-আচ্ছা
পরদিন বিকেলে ইরা আর আমি বাড়িওয়ালার কড়া নজরবন্দির সামনে।বিয়ে কবে হয়েছে,ম্যারেজ সার্টিফিকেট দেখাও,এরকম হাজারটা প্রশ্নবাণ ছুড়ে দিল।ভাগ্য ভালো টাকা খাইয়ে একটা জাল ম্যারেজ সার্টিফিকেট বানিয়েছিলাম। তারপর আমরা দুইজনে রুমে গেলাম।একটা শোবার ঘর,একটা রান্নাঘর আর একটা বাথরুম। ফয়সালা হল যেহেতু বাসা ও খুজেছে তাই ও বিছানায় আর আমি মেঝেতে থাকব।পার্কের বেঞ্চি থেকে ভালো হবে,তাই নির্ধিদ্বায় মেনে নিলাম।ঘর-দোর গোছানো শেষে গেলাম বাজার করতে।যার যার খাবার সে রান্না করবে।প্রথম দিন রান্না করলাম,জঘন্য বললে কম হবে।আর মহারানী ভালো রান্না পারে বলে দেখিয়ে দেখিয়ে খাচ্ছে।রাগ করে খাওয়া ফেলে উল্টোদিকে ঘুরে বসে আছি।
-খাবারটা খেয়ে নে(ইরা,থালা এগিয়ে দিয়ে)
-তুই রান্না পারিস,তুই খা
-রাগ করিস কেন,মিথ্যে করে হলেও একটু কেয়ার না করলে বাড়িওয়ালা বুঝে ফেলবে তো।
-আগলা পিরিত দেখাতে হবে না
-খা বলছি(ধমক দিয়ে)
ঢং করা বাদ দিয়ে থালাটা হাতে নিয়ে খাওয়া শুরু করলাম।উমম, এ মেয়ের।রান্নার হাত ভালো।বৌ হলে মন্দ হত না।
-শোন রান্নাটা এখন থেকে আমিই করব(ইরা)
-হঠাৎ এত দরদ?
-আরে,মেয়েদের কাজ মেয়েদের করতে দে।আলাদা রান্না দেখিলে বাড়িওয়ালা সন্দেহ করবে।
-ভালোই হবে।
-এত্ত বেশি খুশি হওয়ার দরকার নাই,তার বদলে আমায় রোজ ফুচকা খাওয়াবি।
-আমার দায় পড়েছে তো,হুহ।
-এমন করিস কেন।আমি না তোর বৌ।
-হয়েছে যা,শান্তিতে খেতে দে
ওর এমন আবেদনময়ী গলায় বৌ ডাক শুনে ওকে কেন জানি বৌ ভাবতে ইচ্ছা করে।ভালোবেসে ফেললাম নাকি?
উল্টা পাল্টা চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে খাওয়ায় মনোযোগ দিলাম।
২.
কিছুদিন পর এক বিকেলে তুমুল বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে বাড়ি ফিরলাম।শুকনো কাপড় পড়ে ইরাকে ডাক দিলাম।কোন সাড়া না পেয়ে সিড়ি বেয়ে ছাদে উঠে গেলাম।ইরা বৃষ্টিতে ভিজছে।বাচ্চাদের মত বৃষ্টির পানি দুগালে মাখছে।ওর পায়ের নুপুরের ঝনঝন,বৃষ্টির রিমঝিম শব্দকে হার মানিয়ে দিচ্ছে।বৃষ্টিভেজা কদমের মত ওর সর্বাঙ্গে স্নিগ্ধতার অপরুপ পরশ ঢেউ খেলে যাচ্ছে।ছাদের দরজায় দাড়িয়ে একদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে।হঠাৎ আমার দিকে চোখ পড়ায়,লজ্জায় নত হয়ে দৌড়ে পাশ কাটিয়ে নিচে চলে গেল।পরদিন সকালে,ঘুম থেকে উঠে দেখি মহারাণী শুয়েই আছে।রান্না বাদ দিয়ে আরামে ঘুম দিচ্ছে।কয়েকবার ডাকার পর কাছে গিয়ে দেখি ওর চোখ লাল,মাথায় হাত দিতেই শক খেলাম।জ্বরে গা পুড়ে যায় অবস্থা।নাহ,ও জেগেই আছে।আমার দিকে তাকিয়ে মলিন হাসি দিলো।
-তোর খাওয়া দাওয়ার অসুবিধা করে দিলাম রে(ইরা)
-খাবার তো বাইরে থেকে আনা যাবে,কিন্তু তোর কি হব্র(আমি)
-ছাড় তো,,এমনিই ভালো হবে।
-ঢং করা আমার কাজ,তোকে মানায় না।
তরিঘড়ি করে এক বালতি পানি এনে ওর মাথায় ঢালতে লাগলাম।তারপর বাইরে থেকে খাবার এনে খাইয়ে,ঔষধ খাওয়ালাম।আজ তো আর ক্লাস হবে না,বাসায় থেকে একটু পরপর ওর মাথায় জলপটি করে দিলাম।দুপুরের দিকে জ্বর একটু কমে এলে ও রান্না করতে চাইলে আমি বাধা দিলাম।জ্বর আরো বাড়লে আমার সোনায় সোহাগা হবে,তার চেয়ে বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে নিবো।সেরাতে ওর পাশে জাগতে হয় আমাকে।ও জ্বরের ঘোরে আমার হাত খুব শক্ত করে ধরে রাখল।চেয়ারে বসেই ওর হাতে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন সকালে ইরাই আমার ঘুম ভাঙ্গালো।
-কিরে ওঠ,খাবি চল (ইরা)
-জ্বর নিয়ে রান্নাঘরে যাওয়ার কি প্রয়োজন ছিলো(আমি)
-দেখ একদম জ্বর নেই(আমার হাত ওর কপালে ছুয়ে দিয়ে)
-তবুএ দুই একদিন আড়াম………
-ওঠতো আগে(টেনে তুলে)
ফ্রেশ হয়ে এসে দেখি টেবিলে শুধু আমার পছন্দের খাবার।একদিনের জ্বরে ওর চোখের নিচে কালি পড়লেও ওর মুখশ্রীর স্নিগ্ধতায় ভাটা পড়েনি।দুজন একসাথে খেতে বসলাম।খাওয়া শেষ করে ক্লাসে গেলাম।ক্লাস শেষে সারাদিন-সন্ধা পর্যন্ত আমরা ঘুরলাম।রাতের খাবার বাইরে খেলাম।তারপর বাসায় এসে যে যার শুয়ে পড়লাম।জানালা খোলা ছিল,চাঁদের আলো ওর মুখে পড়েছে,যেন ওর মুখ থেকেই চাঁদ আলো শুষে নিচ্ছে।আমি যে ভালোবেসে ফেলেছি এই মায়াবতী কে।কিন্তু সাহস,,ওইটার যে বড্ড অভাব।কি করে যে বলি,কিভাবে নেবে ও,,এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই।
পরদিন সকালে দেখি ইরা ব্যাগ গুছাতে ব্যাস্ত।
-কি রে বাপের বাড়ি যাবি নাকি(আমি)
-বাসা থেকে ফোন করে মা বলল আমাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে,তাই যাচ্ছি(ইরা)
কথাটা শুনে আমার বুকটা কেমন জানি ভারি হয়ে গেলো।ওকে ছাড়া কি করে থাকবো।
-এখন তোর আর সমস্যা হবে না,একাই থাকবি।একটা বুয়া খুজে নিস রান্নার জন্য।
-আচ্ছা(মাথা নিচু করে)
-আমার বিয়েতে আসবি কিন্তু
-হুমমম
-কি হুমম হুমম করছিস। চল এগিয়ে দিয়ে আয়।
হাতের উল্টোপিঠে চোখ মুছে ইরাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে এলাম।ইচ্ছে তো করছিলো দুহাতে আগলে রাখি,কিন্তু সাধ্য কই আমার।
-কি মিয়া,বৌ বাপের বাড়ি গেলো?(বাড়িওয়ালা)
-হুমম(আমি)
-আমি একটা বুয়ার ব্যাবস্থা করে দিবো কি?
-আচ্ছা
দুপুরের দিকে বুয়া রান্না করে দিয়ে গেল,কিন্তু খাওয়ার ইচ্ছে একদমই নেই।একটুপর ইরার ফোন।
-দোস্ত জানিস,আমাকে পছন্দ করেছে(ইরা)
-তুই তো পছন্দ হওয়ার মতই,সাধারন হয়েও অসাধারন যে তুই।
-ধুর,এমন উদাসি ভাব নিয়ে কথা বলিস কেন।
-ভালো লাগছে না রে।
-শোন, তুইও বিয়ে করে নে……
কথাটা শেষ করার আগেই আমি ফোন কেটে দিলাম,তারপর মোবাইল বন্ধ করে সোজা বন্ধুর মেসে।সাধ মিটিয়ে কাদলাম খুব।মনের মধ্যে না বলা কথাগুলো তিলে তিলে নিঃশেষ করে দিচ্ছিলো।ভেবে নিলাম ইরাকে যা বলার বলে দিবো।মোবাইল অন করে দেখি ৪৩ টা মিসকল আর ৫৩ টা মেসেজ।সব ইরার ফোন থেকে।মেসেজ অপশনে লিখলাম “আজ এই কথা টা না বললে হয়ত সারাজিবন নিজের কাছে অপরাধি হয়ে থাকব,জানি অনেক দেরি করে ফেলেছি,বুঝতেই পারি নি তোর নুপুরের ছন্দে আমার মন বাধা পড়েছে,কিন্তু হায় আমার গল্পটাও অপূর্ণ রয়ে গেলো,,ভালো থাকিস”। মেসেজটা সেন্ড করে আবার ফোন অফ করলাম।সেরাতে বন্ধুর সাথেই থেকে গেলাম।পরদিন ক্লাস শেষ করে বাসার দিকে ধির পায়ে হাটা দিলাম।বাসায় এসে দেখি রান্নাঘর থেকে খাবারের সুগন্ধ আসছে,বুয়া এসেছে হয়ত।ঘরে গিয়ে দেখি পরিপাটি করে গোছানো। বুয়া তো এসব করবে নাহ।রান্না ঘরে উকি দিলাম,দেখি ইরা শাড়ির আচল কোমরে গুজে পাক্কা গিন্নির মত রান্না করছে।
-ইরা তুই(অবাক হয়ে)
-কেন,আমার অবর্তমানে কাকে ঘরে তুলেছিস(ইরা)
-তোর না বিয়ে?
-হুমম,না করে দিয়েছি আমি,নিজেকে তোর বৌ ভেবে নিয়েছি,রাখবি না আমাকে?(অস্রু চোখে)
-তারমানে তুইও?
-একবার বলে দেখতি পাগল।
-ফিরিয়ে দিলে সহ্য হত না যে।
-অন্যজনের কাছে চলে গেলে খুব সহ্য হত,তাই না?
-আর কোথাও যেতেই দেব না,,বুকের মধ্যে পুতুলের খোপে সাজিয়ে রাখবো,,একটু বের করে দেখব,আবার রেখে দেবো।
-বৌ পরে,হারামি আগে প্রোপস করবি।
-যদি না করি(ভেংচি দিয়ে)
-গরম খুন্তি দিয়ে ছেকা দিবো।
আশে পাশে কিছু না পেয়ে একটা করলা হাতে নিয়ে বসে পড়লাম
-হবে কি আমার মিষ্টি বৌ?বাধবে কি তোমার চুলে?সুযোগ দেবে কি তোমার সাথে লাল নিল স্বপ্নের স্বপ্ন নীড় গড়ার?
-হয়েছে সব করব,এখন রান্না করতে দাও।
-আচ্ছা(উল্টোদিকে ঘুরে)
-শোন নাইম
-বলো বৌ
-বৌ যখন রান্না করে তখন কি করতে হয় জানো না বুঝি?
-কি করতে হয়(মাথা চুল্কে)
-কোমর জড়িয়ে ধরে রাখতে হয়,আর এটা বারবার বলে দিতে পারবো না কিন্তু।
-ও তাই বুঝি
মহারানীর কোমর জড়িয়ে ধরে চোখে চোখ ডুবিয়ে দিলাম।মহাকাল পেড়িয়ে গেলেও এ দেখা যেন সামান্যই।ওদিকে তরকারি পুড়ছে,সেদিকে কারও খেয়াল নেই।পুড়ুক তরকারি।পোড়া তরকারি দিয়েই যদি ও হাতে তুলে খাইয়ে দেয়,মন্দ হবে না।

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত