বিরক্তিকর বরের রোমান্টিকতা

বিরক্তিকর বরের রোমান্টিকতা

বিয়ের কথা শুনে রোমাঞ্চিত হওয়া তোহ দূরের কথা আমার রাগ এবং বিরক্তিটা আরো বহুগুনে বেরে গেল ৷ কিন্তু কিছুই করার নেই, বাবাকে যেমন খুব ভালোবাসি তেমনি খুব ভয়ও করি ৷ জীবনে বহু প্রেম প্রস্তাব পাওয়া সত্ত্বেও, পরিবারের সম্মানের কথা চিন্তা করে এবং বাবার ভয়ে কোনো ছেলেরই প্রেম প্রস্তাব Accept করতে পারিনি ৷
যাই হোক, নির্দিষ্ট দিনে বরপক্ষরা আমাকে দেখতে এলো ৷ আমার একমাত্র ভাবিই আমাকে সাঁজিয়ে দিচ্ছিলো ৷ ভাবি যখন আমাকে সাঁজিয়ে দিচ্ছিলো তখন তাকে অভিমানী সূরে বললাম,

-“ইস,,,!!! ওই ছেলেটা আমার কি হয় যে উনার জন্য আমাকে সাঁজতে হবে?? ঢ্যাং ঢ্যাং করে এসে পরেছে আমাকে দেখতে, এখন উনার জন্যই আমাকে সাঁজতে হচ্ছে আর একটু পরে উনাকে ইমপ্রেস করার জন্য আমাকে উনার কাছেই যেতে হবে!! আমি একটুও চিনি না তাকে ৷ একটু প্রেমও করতে পারলাম না তার সাথে ৷ একটু বুঝতেও পারলাম না ছেলেটা কেমন??? আমার এরূপ কথায় ভাবি একগাল হেসে বলল,

-আহহহারে, আমার দুষ্টু-মিষ্টি ননদটার দুঃখটা কেউ বুঝলো না রে ৷ তার খুব শখ প্রেম করার!! তা ছেলেটাকে বলো যে, তোমার সাথে প্রেম করবে কিনা, হেহেহে ৷ ওতো তোমার হবুবর ৷ আর হবুবরের সাথে কিছুদিন প্রেম করলে কেউই তেমন একটা কিছু বলে না ৷ আর তুমিতো জানোই ছেলেটা তোমার বাবার পরিচিত ৷ ছেলেটা খুবই ভালো, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পরে এবং দেখতে শুনতে সরলসোজা এবং সাদাসিদা ৷ ছেলেটা তোমার ব্যাপারে জেনে বুঝেই তোমাকে বিয়ে করতে চেয়েছে ৷ ছেলেটা আমার সাথেও কথা বলেছে এবং আমাকে চুপিচুপি জিজ্ঞেসও করেছিলো, তোমার মনটা কেমন ধরনের??

-তা তুমি কী বললে তখন???
-যা সত্য তা-ই বলেছিলাম ৷ আমি ওকে বললাম, তুমি খুব রাগী আর ভীষন দুষ্টুবাঁদর স্বভাবের ৷ এটা জেনে কিন্তু ছেলেটা মনে মনে একটু ভয়-লজ্জা পেয়েছে বটেই ৷

-যা-হহহ তুমিও না ভাবী পারো বটে ৷ তা তুমি এতক্ষন ধরে কী ওই ছেলেটার সাথে কথা বলো কী বুঝলে??

-হ্যা, আমার ননদটার বিয়ে যার সাথে হবে তাকে তোহ আপাদমস্তক ভালো করেই বুঝেছি ৷

-আচ্ছা ভাবি…!! তুমি যে বললে, উনি দেখতে সাধাসিধা আর সরলসোজা টাইপের, তার মানে কী উনি স্মার্ট নন?? (মনটা খারাপ করে বললাম)

-হুম, স্মার্ট নন তোহ কী হয়েছে?! স্মার্ট দিয়ে আর কী করবে মনটা ভালো হলেই তোহ হয় ৷

-ওহহ তাই না?? যখন আমার স্মার্ট ভাইয়ার মনটা তুমি কেড়ে নিয়েছিলে তখন তোমার এই কথা কোথায় ছিল??!!

-হেহেহে, পাগলী কোথাকার…!!! তোমার ভাইয়ার মনটা খুব ভালো ছিলো ৷ আমি তোমার ভাইয়ার মনটাকেই ভালো করে বুঝতে পেরেছিলাম ৷ তার স্মার্টনেস আমার কাছে তেমন একটা আকর্ষনীয় ছিল না ৷ বোন এটাই সত্য কথা…

-আচ্ছা ঠিক আছে, বুঝেছি ৷ ভাবী…তবে কী আমি আর হ্যান্ডসাম বর পাবো না?? (অভিমানী সূরে)

-হ্যান্ডসাম বানিয়ে নিও ৷
-হুম বুঝলাম ৷
-চলো এখন সবাই ডাকছে ৷

আমি খুব ভয় আর সংকোচে সবার সামনে এসে বসলাম ৷ ছেলেটাকে এখনও দেখিনি ৷ আর দেখেই-বা কী করবো ৷ এই বোকা ছেলেটাকেই তোহ বিয়ে করতে হবে ৷ শুনলাম ছেলেটা নাকি রসায়ন ইঞ্জিনিয়ার ৷ আল্লাহয় জানে, তার মধ্যে প্রেমের কোনো রসকস আছে কিনা!!! সারাদিন তোহ মনে হয় বইয়ের সাথেই যত গবেষনা করেছে ৷ বৌ-কে ঠিকমত সময় দিবে কি না কে জানে ৷ একটুও রোমান্টিক হবে না আমি নিশ্চিত ৷ এইসব মনে মনে ভাবছিলাম আর নিজের পরিণতির কথা চিন্তা করে মন খারাপ করছিলাম ৷ আমার হবুবরের পরিবারের সবাই আমাকে পছন্দ করেছে ৷ তারা আমাকে ও আমার হবুবরকে নিজেদের মধ্যে একান্তে কিছু কথা বলার জন্য সময় দিলো ৷ আমি চুপ করে আছি…

-আল্লাহ আপনাকে খুব সুন্দর করে সৃষ্টি করেছে ৷ আমি কিন্তু আপনাকে প্রথম দেখাতেই পছন্দ করে ফেলেছি ৷ যাকে বলে Love at first eyes…

(আমি খুব অবাক হলাম ৷ বলে কী বোকা ছেলেটা!!! ইনি যে প্রেমের কথা আমাকে শুনাবেন সেই আসাটাই আমি করিনি ৷ তাকে গভীর জ্বলের মাছ মনে হচ্ছে ৷ আমি কৌতুহলি দৃষ্টিতে তার দিকে পরিপূর্নভাবে তাকালাম ৷ সে-ও আমার দিকেই তাকিয়ে আছে ৷ তবে তার দৃষ্টিটা ঠান্ডা আর স্বচ্ছ ছিলো, সেই দৃষ্টিতে বিন্দুমাত্রও কোনো লোভনীয়তা খুঁজে পাইনি ৷ আর তার উজ্জল শ্যামবর্ন চেহারাটা বোকা বোকা হলেও তার চোখদুটোর চাউনি অসম্ভব রকমের মায়াবী ও করুন ছিল ৷ তার চোখের ভাষাটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম যেন মনে হচ্ছিলো তার ওই দুই চোখ আমাকে ডেকে বলছে, “জানো, আমার কেউ নেই ৷ আমাকে একটু তোমার মাঝে ঠাই দিবে?? আমি তোমাকে খুব ভালোবাসবো ৷ আমি বেশীক্ষন তার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলাম না ৷ লজ্জা এসে ঘিরে ধরলো তাই উঠে চলে যাচ্ছিলাম ৷ সে আমার পিছন থেকে বলে উঠলো,

-আমি জানি আমার মত সাদাসিদা বোকা ছেলেটাকে আপনার মোটেও পছন্দ হয়নি, তাই না?? এবারেও আমি অবাক, সে নিজেই নিজেকে বোকা বলে দাবি করছে!!

-আপনি একচা পঁচাগাধা ৷

এটা বলেই আমি তারাতারি সেখান থেকে চলে আসলাম ৷ অবশেষে আমার সাথে বোকাটার বিয়ে হয়েই গেল ৷ মা, বাবা, ভাইয়া আর ভাবিটাকে ছেড়ে আসতে গিয়ে কান্না করতে করতে চোখমুখ লাল করে ফেলেছিলাম ৷ রাত প্রায় ০৯:৪৫ এর মধ্যে ওর বাসায় পৌছালাম ৷ ওর বাসার সব মেহমান ও আত্নীয়স্বজনরা একে একে আমার সাথে কথাবার্তা বলে চলে গেলো ৷

রাত ১২:৫৮ মিনিট অথচ এখনও উনার আসার কোনো খবর নাই ৷ এদিকে সারাদিনের ক্লান্তিতে আমার চোখে ঘুম আসছে ৷ কিন্তু উনার জন্যই এখনও ঘুমাতে পারছি না ৷ উফফ, কী যে রাগ উঠছে!!! আসলেই মানুষটা বিরক্তিকর ৷ মনে চাচ্ছে তাকে ধরে ইচ্ছেমত গরু পিটা করি ৷ তাকে উচিত শিক্ষা দেওয়া দরকার এটা ভেবে, আমি মরিচের গুড়া আর টেস্টিং সল্ট দিয়ে পানি ইচ্ছেমত গুলিয়ে ছোট টেবিলটার পাশেই রেখে দিলাম ৷ আর মিষ্টির বাটিটা লুকিয়ে ফেললাম ৷ এভাবে তাকে নিয়ে আরো কিছুক্ষন ভবিষ্যত বিধ্বংসী সব চিন্তাভাবনা করতে থাকলাম অবশেষে ০১:৩৩ মিনিটে উনি আসলেন ৷ এসে ধীরে ধীরে আমার পাশে এসে বসলেন ৷ আমি যে কী পরিমান রেগে আছি এটা তাকে বুঝতে না দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

-আচ্ছা আপনি কী হুতুমপেঁচা নাকি বাদুর???

তিনি একটু ভগড়ে গেলেন ৷ হয়তো এরকম কোনো প্রশ্ন আমার কাছ থেকে আসবে এমনটা উনি আশাই করেননি ৷ উনি ইতস্তত হয়ে বললেন,

-মানে?? আমি কেন ওইগুলো হতে যাবো??!

-(আমি রাগে কটমট করে তার দিকে তাকিয়ে বললাম, রাত কয়টা বাজে এখন ৷ এটাই কী আপনার আসার সঠিক সময় ছিলো???
-না-হ মানে আসলে…

-কীসের না মানে আসলে??? হ্যা?? একদম কাঁচা খেয়ে ফেলবো ৷ বন্ধুদের পাল্লায় পরলে হুস থাকে না কেন?? একটা মেয়ে কতক্ষন যাবৎ বসে বসে অপেক্ষা করছে সেইদিকটায় কোনো খেয়ালই নেই??? (রাগত স্বরে বললাম) সে আবারও তার সেই করুন আবেগী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে ৷ আমি তার ওই চাউনি দেখার পরও নিজের মনকে গলতে দিলাম না…

-আমি সত্যিই আন্তরিকভাবে দুঃখিত ৷ অনেকদিন পর সব বন্ধুরা একসাথে হয়েছিলাম তাই আর সময়ের দিকে খেয়াল করতে পারিনি ৷ আচ্ছা ঠিক আছে আপনি যা বলবেন তাই-ই হবে ৷ (খুব শান্তস্বরে বললেন) আমি এই সুযোগটারই স্বদব্যবহার করলাম ৷ আমি মিষ্টিগলায় তাকে বললাম,

-সারাদিন আপনার উপর অনেক ধকল গিয়েছে ৷ অনেক কিছুই তোহ খেলেন ৷ এখন বৌয়ের হাতের বানানো কমলার শরবতটা খান ৷ এই নিন…(এই বলে তার হাতে ওই গ্লাসটা তুলে দিলাম, মজা টের পাবে সাথেসাথেই)

-ওহ আচ্ছা ৷ আপনাকে ধন্যবাদ ৷ আপনি খুব ভালো ৷ এই বলে সে গ্লাসটা নিয়েই ঢোকঢোক করে সেটা খাওয়া শুরু করলো ৷ অর্ধেক খেয়েই আমার দিকে করুনভাবে তাকিয়ে আছে ৷ তার করুন চাউনি দেখে হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছিলাম না ৷ তবুও উনার প্রতি মনটাকে গলতে দিলাম না ৷ একপর্যায়ে গ্লাসটা উনি খালি করে আমার হাতে দিলো ৷ মানুষটার ধৈর্য আছে তবে ৷ আমি গ্লাসটা নিয়ে পাশে রেখে দিলাম ৷ তাকে নিয়ে একটু মজা করে বললাম ৷

-আপনি একটা গন্ডারের চামড়া ৷ এত ঝারি দিলাম একটুও প্রতিবাদ করলেন না…

-তুমি তোহ আমার বৌ ৷ আর আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি ৷ তোমার ঝারি আর শাসনটা আমার কাছে সবসময়ের জন্যই ভালো লাগবে…

-ইসসস, এত্ত খাতির!!! ওই মিয়া, আপনি ভালোবাসার মানে বুঝেন?? এত্ত তারাতারি আবার কীসের ভালোবাসা?? হুম?? সবই আবেগ, বুঝি এইগুলা ৷ আর “তুমি” করে বললেন কেন আমাকে?? আপনি আমাকে চিনেন না, জানেন না ৷ আপনার সাথে কোনো প্রেমও আমার নেই কিংবা ছিলো না ৷ আপনি আমার কাছে সম্পূর্ন অচেনা একজন ব্যক্তি ৷ তাই আমাকে “আপনি” করেই বলবেন আর আমিও আপনাকে “আপনি” করেই বলবো ৷ আর শুনুন, আপনি আমাকে যতই ভালোবাসুন না কেন, আমি আপনাকে একটুও ভালোবাসি না ৷ তাই কোনো ধরনের উল্টাপাল্টা আবদার করা চলবে না ৷

-আচ্ছা ঠিক আছে ম্যাডাম, আপনি যা বলবেন তাই-ই হবে ৷

-হুম, আমি ওয়াশরুমে যাবো, ড্রেস চেঞ্জ করবো ৷ আপনিও ফ্রেস হয়ে নিন ৷
-আচ্ছা ঠিক আছে ৷
-ব–ল–দ–
-কিছু বললেন কী???
-না-হহহ, কিছু বলিনি ৷ গান গেয়েছিলাম একটু ৷
-বাহহহহ, আপনি গান গাইতে পারেন???
-(এ্যাইরে বিপদে পরলাম, নিজেকে সামলিয়ে বললাম), আরে না, না ওই টুকিটাকি একটু সবাইই গাইতে পারে ৷ তেমনটাই আর কি ৷
-ওহ আচ্ছা ৷

ড্রেস চেঞ্জ করে এসে আয়নার সামনে দাড়িয়ে আমার লম্বা লম্বা চুলগুলোকে আচরাচ্ছিলাম ৷ হটাৎ উনার দিকে চোখ পরায় দেখলাম ৷ আমার চুলের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছেন ৷ যেভাবে তাকিয়ে আছেন মনে হয়ে চুলগুলোকে এখনই খেয়ে ফেলবেন ৷

-কী হলো, কী দেখেন??
-আপনার সুন্দর চুলগুলোকে ৷
-ঘুমান ঘুমান চোখটাকে একটু বিশ্রাম দিন ৷
-খুব সুন্দর আপনার চুলগুলো এবং লম্বা ৷ নিশ্চয়ই এর ঘ্রানটাও খুব সুন্দর হবে ৷ (এই বলে সে, আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকলো)

-দেখুন, কাছে আসবেন না ৷

মোটেও ভালো হচ্ছে না কিন্তু ৷ আমি কিন্তু এখনই কেঁদে ফেলবো ৷ আপনাকে দেখতে সরলসোজা মনে হলেও ভিতরে ভিতরে আপনি শয়তানের হাড্ডিমাংশ সেটা আমি বুঝে ফেলেছি ৷ তবুও সে আমার কাছে আসতে লাগলো ৷ একসময় আমার পিছনে দেয়াল ঠেকলো ৷ আমি চিরুনী দিয়ে তার গলার উপর ধরে বললাম,

-একটাই টান দিবো, ধর থেকে গলাটা একদম আলাদা হয়ে যাবে ৷ সে করুন দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,

-চিরুনী দিয়ে গলা কেঁটে ফেলা যায় এটা কোনোদিনই সাইন্সে বা ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যায় পড়িনি, আজ আপনার কাছ থেকে নতুন জানলাম ৷ একথা বলে সে আমার অপর হাতে একটা ছুঁড়ি তুলে দিলো ৷ আবার সে বলল,

-আমার চোখে কী ভালোবাসা নেই?? আপনি কী খুঁজে পান না ভালোবাসা?? আমি তার দিকে একবার তাকিয়ে তার গলায় আলতো করে ছুড়িটা ধরে রাগ দেখিয়ে বললাম,

-শুনুন, আমার খুব ঘুম পেয়েছে ৷ আমাকে এখন যেতে দিন প্লিজ ৷ আমি ঘুমাবো ৷ আর হ্যা, আপনার আর আমার মাঝখানে কোলবালিশ থাকতে হবে ৷ খবরদার!!! কোলবালিশ টপকানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টাও করবেন না ৷ নইলে এমন মাইর দিবো ৷ জীবনে ভুলেও আমার কাছে আসার সাহস পাবেন না ৷ আর হ্যা, আমাকে বিয়ে করে ভুল করেছেন ৷ আমি রাগী এবং মারমুখি স্বভাবের ৷ আপনার মত ঠান্ডা আর শান্ত আমি নই ৷ আমি আপনার একদম বিপরীত ৷ So, Be carefu…

কথাটা বলতে পারলাম না ৷ হটাৎ চোখের পলকে উনার একটা হাত এসে আমার হাত থেকে ছুড়িটা কেড়ে নিলো ৷ আর অন্য হাত দিয়ে আমার মাথার পিছনের অংশটা আঁকড়ে ধরে, উনার চেহারাটা আমার চেহারার মুখোমুখি করলো ৷ আর সাথেসাথেই তার ঠোটের উষ্ম স্পর্শে আমাকে রোমাঞ্চিত করতে থাকলো, শুষে নিচ্ছিলো এতদিনের জমানো সব ভালোবাসাগুলো ৷ তাকে দুই হাত দিয়ে ঠেলেও সরিয়ে দিতে পারলাম না ৷ প্রকান্ড এক ভারী পাথর বলে মনে হচ্ছিলো তাকে ৷ একপর্যায়ে সে নিজেই আমাকে ছেড়ে দিয়ে বলল,

-আর কখনও যদি আমাকে দূরে সরানোর চেষ্টা করো, তবে তোমাকে এইভাবেই শাস্তি দিবো ৷ তুমি আমার অর্ধাঙ্গি, তুমি আমার কেমিষ্ট্রি ৷ তোমাতে আমি মিশে গিয়েছি ৷ তোমাকে আমি ভালোবাসি ৷ আমি তার এরূপ কথা ও কার্যকলাপে লজ্জায় লাল হয়ে গেলাম ৷ তবে বিনা ভালোবাসায় সে আমাকে কিস করলো, এই দুঃখে ও আতংকে আমার চোখে পানি এসে গেল ৷ আমি বললাম,

-আমি আপনাকে ভালোবাসি না ৷ তবুও আপনি আমাকে জোর করে…

-আমাকে ভালোবাসা লাগবে না ৷ আমার ভালোবাসাই তোমাকে আমার প্রতি ভালোবাসার সৃষ্টি করবে ৷

একথা বলেই সে আমার চোখের পানিটুকু শুষে নিলো ৷ আমি অবাক হলাম ৷ এই বোকা ছেলেটার মনের ভিতরে এত্ত ভালোবাসা লুকিয়ে আছে ৷ আগে কেন আমার জীবনে আসলো না?? যাক এখন তাকে ভালোবাসা দেওয়ার ব্যাপারে কোনো কমতি রাখবো না ৷ কিন্তু আমি তাকে বুঝতে দিবো না যে, আমিও তাকে somethimg something…

-ম্যাডামের চোখে মনে হচ্ছে এখন আর কোনো ঘুম নেই, তাই না???

-হুম নেই তোহ ৷ আপনার মত পাগলছাগলের পাল্লায় পরলে কোনো মেয়ের চোখে ঘুম থাকবে কিনা সন্দেহ আছে ৷
আমার কথা শেষ হতে না হতেই হটাৎ করে সে আমাকে কোলে তুলে নিলো ৷ যেন মনে হচ্ছিলো আমার শরীরের ওজন তার কাছে কাগজের ন্যায় হালকা ৷ সে আস্তে আস্তে বিছানার কাছে এসে আমাকে শুইয়ে দিলো ৷ আমি লজ্জায় ঠান্ডা হয়ে প্রায় জমে যাচ্ছিলাম ৷ কিন্তু অবাক করে দিয়ে সে আমাকে বলল,

-সারাদিন আমার উপর অনেক ধকল গিয়েছে, সেইজন্যই তোহ আপনি আমাকে আদর করে মরিচের গুড়ার সাথে টেস্টিং সল্টের শরবত খাইয়েছেন ৷ আর আমি তার বিনিময়ে আপনাকে সুন্দর একটা ঘুম এনে দিতে চাই ৷ কারণ, আপনার সুস্থতা মানেই আমার সুস্থতা ৷

একথা বলে সে হালকা হলদে নীলচে আলোর ড্রীম লাইট জ্বালিয়ে দিলো ৷ বিছানাটা পরিপাটি করাই ছিল তাই চুপচাপ ওপাশ ফিরে শুয়ে পরলাম ৷ উনিও তার অবস্থানে শুয়ে আছেন ৷ উনার দিকে ফিরে তাকাতে পারছিলাম না ৷ আমার মাথায় তখন হাজার চিন্তা ছুটোছুটি করছে ৷ আশ্চর্য…!!! আমি মানুষটাকে কী ভেবেছিলাম আর এখন কী দেখছি ৷ সম্পূর্ন ভিন্ন রকমের ৷ এক নাম্বার দুষ্টের হাড্ডি ৷ তাহলে আগে ক্যান এত বোকা বোকা ভাব নিয়েছিলো?? এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরলাম ৷ খুব ভোর সকালে ৷ কেউ একজন ধীরে ধীরে ডেকে বলছে,

-নাজহা, শুনতে পাচ্ছো?? ওঠো নামাজ পড়বে না???

আমি ভারি ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে তার দিকে আবছা চোখে তাকালাম ৷ হ্যা এটা আমার বিরক্তিকর বরটাই আমাকে ডাকছে ৷ কিন্তু আমি আবার ঘুমিয়ে পরলাম ৷ পরবর্তীতে সে আর আমাকে ডাক দেয়নি ৷ সকাল ০৮:০০ টায় ঘুম থেকে উঠলাম ৷ রান্না ঘরে গিয়ে দেখি আমার শাশুরি নাস্তা বানাচ্ছেন ৷ আমি তারাতারি হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে ৷ শাশুরির পাশে এসে বসলাম তাকে সাহায্য করার জন্য ৷ শাশুরি বললেন,

-মা, তুমি এই কাজে আমাকে পরেও সাহায্য করতে পারবে ৷ আপাতত সাজিদের (আমার বরের নাম) তোয়ালেটা নিয়ে বাসার ছাদে যাও ৷ ওকে তোয়ালেটা দিয়ে আসো ৷ আমাকে আরো আগে দিয়ে যেতে বলেছিলো ৷ আমার মনে ছিলো না ৷

-ঠিক আছে মা ৷

আমি ছাদের দিকে আসতে লাগলাম ৷ ছাদের কাছাকাছি যতই আসছি ততই ধাতব কিছু জোড়া লাগানোর শব্দ টের পাচ্ছিলাম ৷ মনে মনে ভাবলাম, পাগলা সকাল সকাল যন্ত্রপাতি দিয়ে কী করছে?? ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছেলেদের বুঝি এই অবস্থাই হয় ৷ এইসব ভাবতে ভাবতে ছাদে উঠে গেলাম ৷ ছাদে উঠে উনার উপর চোখ পরতেই আমার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল ৷ একদম পাক্কা মুষ্টিযোদ্ধাদের মত উনার শরীরের মাসলগুলো কিলবিল করছে ৷ উনি সকালে উঠে Exercise Gym করেন ৷ আর এখন উনাকে দেখতে সত্যিই খুব স্মার্ট লাগছে ৷ হয়তো যেদিন আমাকে দেখতে এসেছিলেন সেদিন ঢিলেঢালা পোষাক পড়েছিলেন তাই বুঝতে পারিনি ৷

তবে এইমুহূর্তে উনাকে দেখে রীতিমত আমার ভয়ই লাগছিলো ৷ এক হাত দিয়ে যেই ব্যক্তি ৩০ কেজি লোহার ভরকে তুলে নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উঠানামা করাচ্ছিলো সেই ব্যক্তি আমার মত ৪৫ কেজির একটা শরীরকে ঝরের গতির মত কোলে তুলে নিবে এটাই স্বাভাবিক ৷ আমি চুপিচুপি তোয়ালেটা উনার পাশে রেখেই তারাতারি চলে আসতে গেলাম কিন্তু হটাৎ সাথেসাথেই পিছনে ধপধপ পা ফেলবার শব্দ আর কোথ্যেকে এক জোড়া হাত এসে আমার কোমরটাকে জড়িয়ে ধরলো ৷ আমার এইটুকুও নড়াচরার মত কোনো শক্তি ছিল না ৷ হ্যা এটা উনারই হাত ছিলো ৷ উনার তপ্ত নিশ্বাসগুলো আমার গলার কাছে ঘাড়ের উপর এসে থেমে থেমে পরছিলো ৷ উনি বললেন,

-চুপিচুপি এসে তোয়ালেটা রেখেই, কিছু না বলে কেন চলে যাচ্ছিলে??!! কেন আমার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকো বলতো?? কেন আরো কাছে আসতে চাও না?? কত্ত ভালোবাসি তোমাকে জানো না?? তোমার কী আমাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে না বুঝি??

-প্লিজ, এটা নিজের বেডরুম নয় ৷ এটা ছাদ ৷ পাশের বাড়ির কেউ আপনার এই কান্ডকারখানা দেখে ফেলবে ৷
-দেখলে দেখুক, সবাইই জানে, গতকাল এই বাড়িতে বিয়ে হয়েছে ৷
-প্লিজ ছাড়ুন, আপনার আসলেই কোনো লজ্জা নাই, বেহায়া গন্ডারের চামড়া আপনি ৷ আপনি অনুভূতিহীন একটা প্রকান্ড পাথর ৷
-আর কী কী আমি???!!! বলনা প্লিজ,,,শুনে দেখি তুমি আর কী কী উপাধী দিতে পারো আমাকে ৷
-উফফফফফ ধ্যাত,,,জানিনা আমি ৷ প্লিজ ছাড়ুন ৷ আমাকে চলে যেতে দিন…

হটাৎ সে আমাকে তার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে সেই করুন মায়াভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকালো ৷ আমি তার এই করুনাময়ী চোখের দৃষ্টিতে ভালোবাসা দেখতে পেলাম ঠিকই কিন্তু তাকে বুঝতে দিলাম না ৷ আমি আবারও লজ্জায় মাথা নিচু করলাম ৷ সে তার হাতটা আস্তে আস্তে আমার কোমর থেকে সরিয়ে এনে আমার চেহারাটা আলতো করে ধরে তার চেহারার কাছাকাছি নিচ্ছিলো ৷ আমি বুঝেছিলাম, সে আবারও আমার ঠোটের উষ্ম স্পর্শ পেতে চায়, শুষে নিতে চায় ভালোবাসাগুলো ৷ কিন্তু আমি তাকে এত সহজেই এটা নিতে দিবো না ৷ তাই হটাৎ আমার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি চেপে বসলো ৷ আমি জানতাম তার কোমরে কাতুকুতু আছে তাই তার কোমরে জোরে দুটো খোঁচা মারতেই সে “ওউউউউউউউহহহহ” শব্দ করে আমাকে ছেড়ে দিলো ৷ এবার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে সজোরে ধাক্কা দিলাম ৷ তাকে স্থানচুত্ত করতে না পারলেও, আমার অবস্থানটাকে তার কাছ থেকে অনেকটাই সরিয়ে আনতে পেরেছি ৷ আর দেরি না করে দিলাম এক “ভৌ” দৌড় ৷ আমি হাসছি আর দৌড়ে পালাচ্ছি ৷ আর আমার দুষ্টু বরটা ক্ষেপে উঠে আমার পিছু নিয়েছে আমাকে ভালোবাসা দিবে বলে ৷ জানি এরপর তার নাগালের মধ্যে এসে পরার পর আমার আর রক্ষা থাকবে না ৷ কিন্তু তবুও শেষ মুহূর্তে উনার ভালোবাসার গভীরতাটাকে বুঝতে পেরেছি ৷ উনার ভালোবাসাটাকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম ৷ অবশেষে আমি তাকে সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছিলাম..

প্রথম প্রথম এমন অচেনা মানুষটাকে বুঝতে গেলে হয়তো আপনার কাছে সত্যই বিরক্তবোধ লাগতে পারে ৷ কিন্তু তাকে যদি সত্যিকাররূপে বুঝতে পারেন তবে ভালোবাসা থেকে কখনই তাকে বঞ্চিত করবেন না ৷ পৃথিবীর সকল স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যকার ভালোবাসাগুলো এভাবেই খুনসুটি হয়ে বেঁচে থাকুক চিরকাল…

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত