হলুদ রঙের চুমু

হলুদ রঙের চুমু

“লাল রঙ তোর কেমন লাগে?”

“আমি জানি না লাল রঙ দেখতে কেমন!”

“জোছনা?”

“শুনেছি চাঁদের গায়ে সূর্যের আলো পরে তা পৃথিবীতে জোছনা হয়ে আসে। আমি জানি না চাঁদ কেমন। সূর্য কেমন। কেমন করে সূর্যের আলো চাঁদের গায়ে ধাক্কা খেয়ে জোছনা হয়ে যায়।”

“তোর পৃথিবীতে কি কোন রঙ নেই?”

“রঙ কি সেটাই তো জানি না। তবে অনেক রঙের নাম জানি। নাম শুনে একটা রঙ খুব ভাল লাগে। হলুদ রঙ। জানিস আমার না খুব হলুদ রঙ দেখতে ইচ্ছে করে। ছুঁতে ইচ্ছে করে।”

“তুই কি জানিস অন্ধকার কেমন?”

“নাতো। অন্ধকার, আঁধার শব্দ গুলো সেই ছেলেবেলা থেকেই শুনে এসেছি। কিন্তু বুঝতে পারি না ঠিক। সবাই বলে আমি নাকি যা দেখি সবই অন্ধকার। কিন্তু আমি তো কিছুই দেখি না। আমি যে কি দেখি তাও জানি না।”

অথৈ আমার নতুন বন্ধু। মাসs দু’এক হলো নতুন বাসায় উঠেছি। প্রায় বিকেলেই আমি ছাদে আসি। সব সময় দেখতাম একটা মেয়ে সাদা ছড়ি হাতে ছাদে হাঁটে। সাথে কখনো মেয়েটার মা থাকে। কখনো কাজের মেয়েটা। কখনোবা একা। আমাদের পাশের বাসায় থাকে ওরা। দুই পরিবারে যাওয়াআসা করতে করতেই আলাপ হয় অথৈর সাথে।

খুব কৌতূহলী একটা মেয়ে। সব কিছুতেই জানার তীব্র আগ্রহ। আমার সাথে বন্ধুত্বও হয়ে যায় খুব তাড়াতাড়ি। তবে অথৈর সাথে বেশি ভাব আমার ছোটবোন বুবুনের। বুবুন স্কুল থেকে ফিরেই ইউনিফর্ম পরা অবস্থাতেই একবার অথৈর সাথে দেখা করে আসে। এখন আমিই অথৈকে ছাদে নিয়ে যাই। সন্ধ্যার সাথে সাথে ঘরে ফিরে আসি। মাঝেমধ্যে বুবুনও থাকে আমাদের সাথে।

আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে অথৈর জগতটা কেমন। কিভাবে দেখে ও ওর মতো করে পুরো দুনিয়াটা। এই যে আমরা যারা ওর চারপাশে থাকি ও কিভাবে আমাদের অনুভব করে। আমাদের নিয়ে ও কেমন আদল গড়ে। জন্ম থেকেই অন্ধ অথৈ। এতো ফুটফুটে একটা হাসি খুশি মেয়ে। মায়াবী চেহারা। অথচ চোখে দেখে না। কেমন জানি করে বুকের ভিতরে।

“কিরে কথা বলছিস না কেনো?”

“এমনি। তুই বল আমি শুনি।”

“আমি তো সারাক্ষণই তোর সাথে পকপক করি। তোর মাথা ধরে না।”

“ধরে তো। কানের পোকাও বের করে ফেলেছিস।”

“হিহিহি! তাহলে তোর অনেক উপকার করেছি বল।”

“থাক হয়েছে। কি আমার উপকার রে। এতো বাচাল মেয়ে আমি জিন্দেগিতে দেখি নাই।”

“তোর জিন্দেগি তাহলে অনেক ছোট। আহারে বেচারা। জিন্দেগির কিছুই দেখলো না।”

“বাজে বকিস না।”

“আচ্ছা তোর সেই টুনটুনি ডাল্লিং এর খবর কি?”

“দেখ মেজাজ খারাপ করাবি না। তুই কি আসলে আমার বন্ধু নাকি শত্রু।”

“হিহিহি! আমি তো তোর জিগরি দোস্ত।”

“তুই আমার ঘোড়ার ডিমের দোস্ত। তোকে যদি আমি আর কিছু বলেছি দেখিস। তুই একটা শয়তান বেডি।”

“হিহিহি!”

“হাসবি না শাঁকচুন্নির মতো।”

অথৈ তাও গা জ্বালানো হাসি দিয়েই যায়। আমি দুইটা টিউশনি করি। একটা ক্লাসh এইটের ছেলেকে পড়াই। আরেকটা ক্লাস ফাইভের মেয়েকে। গত মাসে মেয়েটা একটা চিঠি লিখে আমাকে প্রপোজ করে। ভাবা যায় মাত্র ক্লাস ফাইভ। তাও আবার আমাকে। দুনিয়া যে কোথায় যাচ্ছে। ইচ্ছা করছিলো সেই মেয়ের কানের নিচে একটা থাবড়া দেই। এই টিউশনিতে টাকা একটু বেশি পাই। তাই হালকা ঝাড়ি দিলাম শুধু। থাবড়া দিলে টিউশনিটাই যেতো। টাকার মায়া বড় মায়া।

আমরা তো ঐ বয়সে জানতামই না প্রেম কি। আর সেই মেয়ে চিঠিতে লিখছে ওকে নিয়ে প্রতি সপ্তাহে ডেটে যেতে হবে। এরা যে কোন কিসিমের জেনারেশন উঠে আসছে ভাবতেই শিউরে উঠি। চিঠিটা আমি অথৈকে পড়ে শুনিয়েছি। অথৈ শুনে হাসতে হাসতে একবার এদিকে পরে যায় তো আবার ওদিকে পরে যায়। ওর এই হাসি দেখে আমার গা জ্বালা আরো বেড়ে যায়। অথৈকে প্রপোজের কথা বলাটাই আমার ভুল হয়েছে। সুযোগ পেলেই খোঁচা মারে।

“আচ্ছা শোন!”

“বল।”

“আর কিছুদিন পরেই তো বর্ষাকাল আসবে তাই না!”

“হ্যাঁ!”

“আমায় একটা জিনিস এনে দিতে পারবি?”

“কি লাগবে তোর বল।”

“কদম ফুল।”

“কদম ফুল?”

“হ্যাঁ! বরষার প্রথম কদম ফুল। দিবি তো এনে?”

“আচ্ছা দিবো।”

“সাথে অনেক গুলো কাঁচের চুড়ি।”

“কাঁচের চুড়ি?”

“হুম। আমার কাজিন মহুয়া আপু বলেছে আমায়, বরষার প্রথম কদম ফুল ছুঁতে হয় কাঁচের চুড়ি পরে।”

“কি আজগুবি কথা বার্তা। আচ্ছা যা কিনে দেবো। কি রঙের? হলুদ রঙের?”

“উঁহু! তোর পছন্দে কিনে দিস। তোর যেই রঙ ইচ্ছে। তুই যা কিনে দিবি সেটাই পরবো।”

অথৈর চোখে কেমন এক ছলছলানি চাহনী। একটু একটু হাসির ঝিলিক। মেয়েটাকে কেন জানি না হঠাৎ করেই দুনিয়ার সব সুখ এনে দিতে ইচ্ছে হলো। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আকাশে গোধূলির রঙ যেন অথৈর গালে আভা ফেলেছে। কি শান্ত একটা চেহারা। কিছু মানুষ থাকে পৃথিবীতে যাদের দেখলেই মনটা ভাল হয়ে যায়। অথৈ আমার কাছে তেমনই একজন মানুষ।

খুব ইচ্ছে করছে ওর হাতটা ধরতে। প্রতিদিনই ধরি ছাদে উঠানামার সময়। আমি ওর সাথে থাকলে ওকে সাদা ছড়ি নিতে দেই না। aআমার কেন যেন ভাল লাগে না। কিন্তু আজ আমি ওর হাতটা সেভাবে ধরতে চাইছি না। অন্যভাবে চাইছি। কিভাবে সেটা বোঝাতে পারবো না।

“নে ধর!”

বেশ ভাল একটা ঝাঁকি খেলাম অথৈর বাড়ানো হাত দেখে। ও কি কিছু টের পেয়েছে!

“কেন বাসায় যাবি?”

“উঁহু!”

“তাহলে?”

“আমি চাইছি বলে।”

অথৈর হাতটা ধরতেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে গেলো। দু’জনে এক সাথেই কেঁপে উঠলাম। এর আগেও তো কতবার একজন আরেকজনের হাত ধরেছি। কই এমন তো লাগেনি কখনো। এটা খুব অপরিচিত অনুভূতি আমার জন্য। এমনটা আগে হয়নি কখনো। সূর্যের আলো নিভে যাচ্ছে। গলিতে গলিতে জ্বলে উঠছে নিয়ন আলো। ম্লান আলোতে অথৈকে যেন আরো অপরূপা লাগছিলো। কেমন এক পবিত্রতায় ছেয়ে আছে ওর চারপাশ।

“চল বাসায় যাই। আন্টি সন্ধ্যার আগেই নিচে নামতে বলেছিলো। সন্ধ্যা হয়ে গেছে।”

“তুই কি একটা কথা জানিস?”

“কি?”

“অন্ধরা অনেক কিছুই টের পায়।”

“মানে?”

“মানে তুই একটা গাধা। হিহিহি!”

“প্লিজ বল কি টের পায়?”

“আরে ধুত্তুরি কিচ্ছু টের পায় না। এমনি বলেছি।”

“না এমনি বলিস নাই। কিছু একটা টের পেয়েছিস। বল কি টের পেয়েছিস?”

“তুই আসলেই একটা বুদ্ধু।”

“বলবি না?”

“আমি কি টের পেয়েছি এটা জানার এতো আগ্রহ কেন তোর হুহ। কি! কিসের এতো আগ্রহ তোর বলতো।”

“আরে এমনি জানতে চেয়েছি।”

“তুই যে বুঝতে পারছিস না তোর ভিতরটা কেন হঠাৎ এমন করছে, সেটাই টের পেয়েছি স্টুপিড।”

“মা… মানে!”

“কি জ্বালা যন্ত্রণা। চল তো বাপ বাসায় যাবো।”

আমি ঢোক গিলে ওকে নিয়ে সিঁড়িঘরের দিকে পা বাড়ালাম। ওদের বাসার সামনে এসে কলিং বেল টিপতেই বলল, “যা বুদ্ধু বাসায় গিয়ে বেশি করে পানি খা। ঢোক গিলতে গিলতে তো শহিদ হয়ে গেলি।”

“বাজে বকিস না।”

“ফান্দে পরছেরে বগা।”

“মানে কি! কি বলতে চাস তুই।”

এমন সময় ওদের বাসার দরজা খুলে গেলো। আমি আর আমাদের বাসায় না গিয়ে নিচে নেমে গেলাম। সিগারেট বাধ্যতামূলক এখন। আমার মাথা এলোমেলো করে দিয়েছে অথৈ। ও যে কি করে এতোকিছু বুঝে যায় আমার মাথায় আসে না। এর আগেও বহুবার এমন হয়েছে। আমি কিছু বলার আগেই ও বলে দেয় কি বলতে চাইছি।

খুব অবাক লাগে একটা ব্যাপারে। যেদিন আমার মন অনেকk ভাল থাকে ও ঠিক বুঝে যায় আজ আমার মন ভাল। মন খারাপ থাকলেও বুঝে যায়। অথচ যারা আমায় সব সময় দেখে তারাই বুঝে না। কিন্তু অথৈ চোখে না দেখেও কি করে যেন বুঝে ফেলে। একদিন জিজ্ঞেসও করেছি কি করে বুঝে। ও বলেছিলো, “আমি তোর হৃৎপিণ্ডের শব্দ শুনতে পাই। শব্দ শুনেই বুঝতে পারি তোর মনে কি চলছে।”

আমি অথৈর কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝি না। মেয়েটা আমার জীবনে অনেক কিছুই পাল্টে দিয়েছে। ওকে দেখে যেন এখন জীবনকে স্পর্শ করতে পারি। অনেক কিছুই ভাবায়। অন্ধ হয়েও ও জীবনকে যেভাবে ছুঁতে পারে; আমরা চোখে দেখেও তা পারি না। ওর একটা কথা আমার ভিতরটা খুব নাড়িয়ে দিয়েছিলো। সেদিন ছাদে যেতেই বলল, “তুই আমার চোখ হবি?”

“মানে? চোখ হবো মানে?”

“আমি তো তোদের এই পৃথিবী দেখতে পাই না। তুই তোর চোখে দেখা পৃথিবীটা আমায় দেখাবি। আশেপাশে কি কি ঘটছে আমায় বলবি। আমি তোর চোখে সব দেখতে চাই। হবি? আমার চোখ হবি?”

আমি ওর হাত ধরে বললাম, “হবো।” ও এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলো। আমি বোঝার চেষ্টা করি অথৈর ভেতরটা। ওর মনটা। কি চলছে সেখানে। সৃষ্টিকর্তা ওকে সবকিছু দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। কেবল চোখের আলোটা দেয়নি। অথচ এই মানুষটা কি প্রচণ্ডভাবে সৃষ্টিকর্তার গড়া পৃথিবীটা দেখতে চায়। কি এমন ক্ষতি হতো যদি অথৈ দেখতে পেতো। অথৈকে একদিন বলেছিলামও এই কথা। ও খুব দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল, “সৃষ্টিকর্তা আমায় চোখের আলো দিলে তোকে তো পেতাম না বুদ্ধু। তুই যেমন কেবলা টাইপ ছেলে। তোকে তখন পাত্তাও দিতাম না।”

“হুহ থাক হয়েছে। এখন যেন কতো পাত্তা দিয়ে উড়াই দিচ্ছিস।” i

“পাত্তা না দিলে কি তোর সাথে ছাদে আসি। মা কি তোর সাথে আমায় ছাদে আসতে দিতো।”

“আচ্ছা বলতো আন্টি কেন তোকে আমার সাথে ছাদে আসতে দেয়?”

“আমি মাকে কিছু কথা বলেছি। কিন্তু কি বলেছি তা তোকে বলবো না। তোর মতো গাধা সেই কথা বুঝবে না।”

“বলবি না বাচাল?”

“উঁহু!”

জানি আর লাভ নাই জোড় করে। ওকে আমার জোড় করতে ভালোও লাগে না। ও থাকুক ওর মতো করে যেভাবে ওর ভালো লাগে। ও ভালো থাকলেই আমার শান্তি লাগে।

সেদিন থেকে আমি অথৈকে আশেপাশে কি হয় সব বলি। রাস্তায় কেমন মানুষ। কোন কোন গাড়ি চলে। ছাদের রেলিং এ কয়টা কাক বসে আছে। গাছের পাতায় রোদের ঝিলিক। ইলেকট্রিক পোলে কতগুলো তার ঝুলছে। বাড়ির সামনের টং দোকানে কয়টা টুল আছে। টং দোকান দেখতে কেমন। কি কি বিক্রি হয় সব বলি ওকে। সেই সাথে আরেকটা ব্যাপার খেয়াল করলাম। ওর স্মৃতিশক্তি অসম্ভব ভালো। একবার বললেই সব মনে থেকে যায়। l

রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পরলাম। কাল সারাদিন অনেক কাজ। বিকেল বেলা অথৈকে রিক্সায় করে ঘুরবো বলেছি। বিকেল বেলা যেন কোন ঝামেলা না হয় তাই সকাল থেকেই সব কাজ গুছিয়ে নিতে হবে। অথৈর ফোন নাই। থাকলে অনেক ভাল হতো। রাতেও বাচালটার সাথে কথা বলতে পারতাম। সকালে বের হয়ে দুপুরেই বাসায় চলে আসি। সব কাজ আপাতত শেষ। দুপুরের খাবার খেয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খেয়ে বিছানায় পিঠ লাগাতেই বুবুন রুমে এলো।

“দাদা কি করিস?”

“দাড়িয়াবান্ধা খেলছি। খেলবি?”

“হ্যাঁ! খেলবো।”

“বাজে কথা ছাড়। কেন এসেছিস তাড়াতাড়ি বলে বিদায় হ এখান থেকে। রেস্ট নিবো।”

“আমাকে নিবি তোদের সাথে?”

“আমাদের সাথে মানে? আর কোথায় নিবো।”

“কেন অথৈ’বুবুকে নিয়ে বাইরে যাবি না আজ। আমাকেও নে না প্লিজ।”

“যাহ ভাগ। আমি গুরাগারা নিয়ে বাইরে যাই না।”

“এমন করিস কেন। আমি তো তোদের ডিস্টার্ব করবো না। তোরা তোদের মতো করে প্রেম করবি।”

“কানের নিচে দিবো একটা। কে বলেছে আমরা প্রেম করি। যাহ ভাগ এখান থেকে।”

“শোন আমি সব বুঝি। আমি গুরাগারা হলেও ছোট না। বুবুর কাছে গেলে সারাক্ষণ তো তোর কথাই জিজ্ঞাস করে। মাকে সব বলে দিবো দেখিস।”

“যা বল গিয়ে যা ইচ্ছে। এখন যা এখান থেকে।”

“নিবি না তোদের সাথে?”

“না নিবো না।”

“ঠিক আছে আজ থেকে তোর মশারি খাটিয়ে দিবো না আর। মনে রাখিস।”

এই কথা বলেই গটমট করে রুম থেকে বের হয়ে গেলো বুবুন। কলিজার টুকরা একটা বোন আমার। অথচ দুনিয়াতে ওকেই বেশি জ্বালাই আমি। কিন্তু আমার মাথায় এটাই কিছুতে এলো না যে আমার আর অথৈর মাঝে বুবুন প্রেমের কি দেখলো। যাক সেসব। বাচ্চা মানুষ কি ভাবতে কি ভেবে বসে আছে।

বিকেলে অথৈদের বাসায় যেতেই দেখি অথৈ রেডি হয়ে বসে আছে। আন্টি সাদা ছড়িটা দিতে চাইলো, আমি বলেছি লাগবে না। অথৈ বাইরে গেলে কালো চশমা পরে। সেটাও পরতে দেই নাই। রিক্সায় বসেই অথৈ বলল, “জানিস আজ কেমন যেন নিজেকে মুক্ত মুক্ত লাগছে।”

“তুই কি বন্দি ছিলি নাকি?”

“হুম ছিলাম তো। সাদা ছড়ি আর কালো চশমায়। জানিস এই দুইটা জিনিস আমার কেমন যেন লাগতো। যেন সবাইকে বুঝিয়ে দিতে হবে আমি অন্ধ।”

“আমার ভাল লাগে না ও গুলো। তোকে আমি কখনো অন্ধও ভাবি না।”

“আমি জানি। তোর সাথে পরিচয়ের সেই শুরু থেকেই জানি। তোকে বলেছিলাম না মা কেন আমায় ছাদে আসতে দেয় তোর সাথে। কিন্তু মাকে কি বলেছিলাম বলি নাই তোকে। শুনবি!”

“হ্যাঁ! বল।”

“মাকে শুধু এটাই বলেছিলাম। তুই-ই প্রথম মানুষ যে আমাকে অন্ধ ভাবিস না। অন্ধদের সাথে সবাই যেমন ব্যবহারr করে তুই তেমন ব্যবহার করিস নাই। অন্য সবাই সবার সাথে যেভাবে আচরণ করে তুই ঠিক তাই করেছিস আমার সাথে। তুই-ই একমাত্র মানুষ যে আমায় করুণা করিস না। মাকে বলেছি আমি তোর কাছে নিশ্চিন্ত। জানিস আমার মাও আমাকে কিছুটা করুণা করে আমি অন্ধ বলে। আমায় কখনো বকেন না। কিন্তু আমি তো চাই আপু ভাইয়াদের মতো মাও আমায় বকুক আমি ভুল করলে। কেন আমার সাথে সাধারণ মানুষের মতো ব্যবহার করা হবে না। কিন্তু তুই একমাত্র স্টুপিড যে আমার সাথে যাতা ব্যবহার করিস। আর এটাই আমার ভাল লাগে।”

এতোগুলো কথা এক সাথে বলে হাপিয়ে গেল অথৈ। আমি এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছি ওর দিকে। আমার পেটে কনুই দিয়ে খোঁচা মেরে বলল, “গাধা তুই আমার হাতটা কি ধরবি! রিক্সা যেভাবে ঝাঁকি দিচ্ছে যদি পরে যাই।” o ওর হাতটা ধরলাম শক্ত করে। আরো কিছুদূর যেতেই একটা ফুচকার দোকান দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাস করলাম খাবে কিনা। বলল খাবে। রিক্সা থেকে নেমে এক প্লেট অর্ডার করলাম।

“তুই খাবি না?”

“আমি ফুচকা চটপটি এসব খাই না।”

“কেন রে। তোর টুনটুনি ডাল্লিং নিষেধ করেছে? হিহিহি!”

“হ্যাঁ! নিষেধ করেছে। তুই একাই খা রাক্ষসী। তুই কি ঝাল বেশি খাস নাকি কম।”

“তুই দুনিয়ার সব ঝাল, শুকনা মরিচের গুঁড়া আমায় এনে দে আমার কোন আপত্তি নাই।”

“তা থাকবে কেন। তোর পেট তো আর পেট না। ওটা তো একটা গোডাউন। হাতি কোথাকার।”

“যা খুশি বল। খাওয়া ছাড়া দুনিয়াতে কি আছে আর।”

“আচ্ছা তোর ফেভারিট খাবার কি?”

“বললে রাগ করবি নাতো!”

“না বল।”

“তোর মাথা। তোর মাথা চাবাই চাবাই খেতে আমার অনেক ইয়াম্মি লাগে। হিহিহি!”

ওর কথা শুনে রাগ করতে গিয়েও আর করতে পারলাম না। আশেপাশের মেয়ে গুলোও অথৈর কথা শুনে হিহি করে হেসে উঠলো। আমার মুখ দিয়েও হাসি চলে এলো। ফুচকাওয়ালা ফুচকার প্লেট দিয়ে গেলো। আমি ফুচকায় টক ঢেলে দিয়ে অথৈকে খাইয়ে দিলাম।

“নে রাক্ষসী হা কর।”

কি যে তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে অথৈ। দেখতে খুবই ভাল লাগছে। পৃথিবীতে কয়েকটা সুন্দর দৃশ্যের একটা দৃশ্য মনে হয় কোন মানুষের তৃপ্তি নিয়ে খাওয়ার দৃশ্য। অথৈর চোখে মুখে তৃপ্তি। ফুচকাওয়ালার কাছ থেকে টিস্যু নিয়ে মুখটা মুছে দিলাম। এক প্লেট প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে।

“কিরে রাক্ষসী আর খাবি? আরেক প্লেট অর্ডার করি?”

“কর। এই কয়টা খেয়ে কি কোন স্বাদ পাওয়া যায়।” ফুচকার দোকানের পিচ্চিটাকে বললাম আরো এক প্লেট বানাতে বলার জন্য।

“তোর কি ফুচকা অনেক প্রিয় নাকি?”

“হ্যাঁ! অনেক প্রিয়। এই ফুচকাওয়ালা মামাকে জিজ্ঞাস করতো উনার কোন ছেলে আছে কিনা। বিয়ে করবো।”

“হাহাহা! কেন সারাদিন ফুচকা খাওয়ার জন্য।”

“হুম। এই দোকানের ফুচকাও তোর মাথার মতোই ইয়াম্মি।” আমি ফুচকাওয়ালা মামাকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞাস করলাম, “মামা আপনার কোন ছেলে আছে?”

“হ এই যে এইটাই আমার পোলা। মাইজ্জা পোলা। কেলাস ফোরে পড়ে। মাথায় গোবরে ভরা। হেরে দিয়া অফিস আদালত হইবো না। এই জন্যি দোকানে কাম শিখাই। আমার লাহান ফুচকাই বেচন লাগবো হারা জেবন।”

পিচ্চিটাকে দেখে মনে হচ্ছে বাপের কথায় ওর ইজ্জতের চল্লিশা হয়ে গেছে। বাপের দিকে রাগি রাগি ভাবে চেয়ে আছে। আমি অথৈর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললাম, “কিরে শুনলি তো তোর জামাইয়ের কোয়ালিফিকেশন। বিয়ার প্রস্তাব কি দিবো নাকি এখানেই ফুলস্টপ দিবি!”

“কেন তোর হিংসা লাগছে। এই মাথায় গোবরওয়ালা জামাই-ই বিয়ে করবো। দে প্রস্তাব। আমি মেয়ে মানুষ হয়ে নিজের বিয়ের কথা কি করে বলি বল। আমার বুঝি লজ্জা করে না!”

“আরেকটু ভেবে দেখ রাক্ষসী। বিয়ের পরে তোর ইচ্ছে হবে জামাইর মাথা চাবাই চাবাই খেতে। কিন্তু খেতে গেলে তো দেখবি সব গোবর। গোবর চাবাই খেতে পারবি তো।”

“ইয়াক। বিয়ে ক্যানসেল। তুই আমার বিয়ের স্বপ্নে এভাবে পানি ঢেলে দিলি দোস্ত।”

“পানি না। পানি না। গোবর। তোর গোবর ডাল্লিং। ক্লাস ফোর। হাহাহা!”

“দেখ বাজে বকবি না। তাহলে কিন্ত আর খাবো না।”

“আচ্ছা আর বলবো না। নে হা কর।”

“দে।”

পরপর দুই প্লেট সাবার করে বিল দিয়ে আসার সময় আমাদের পাশের সীটের একটা মেয়ে আমায় জিজ্ঞাস করলো, “ভাইয়া এই আপুটাকি অন্ধ?” শুনেই মেজাজ বিগড়ে গেলো। এতক্ষণ দেখে সে বুঝেই গেছে যে অথৈ অন্ধ তবুও কেন এভাবে জিজ্ঞাস করা লাগবে।

“না আপু। ও অন্ধ না। ও শুধু চোখে দেখতে পায় না। এই যা।”

বলেই অথৈর হাত ধরে আরেকটা রিক্সায় উঠে সি আর বি’র দিকে গেলাম। আমাদের চট্টগ্রাম শহরে এটা আমার খুব প্রিয় জায়গা। শুরুর দিকে যখন আসতাম তখন খুব একটা কেউ আসতো না। এখন অনেক মানুষ আসে। বৈশাখী অনুষ্ঠান হয়। আগে অনেক বেশি ভাল লাগতো। এখন সিঁড়ি করে, গাছের চারপাশ বাঁধাই করে সুন্দর করেছে। কিন্তু আমার কেন যেন সেই আগের সি আর বি-ই বেশি ভাল লাগে। গগন শিরিষ গাছের নিচে বসলাম। ও চুপচাপ থেকে আশেপাশের শব্দ গুলো শুনছে।

আমি রিক্সায় করে আসার সময় বলছিলাম আশেপাশের দৃশ্য কেমন। এখানে এসেও বলছি পুরো পরিবেশটা কেমন। কয়টা সিঁড়ি। রাস্তা থেকে কয় পা দূরে এসে আমরা বসেছি। আসার সময় আমরা একপা দুই পা করে গুনে গুনে এসেছি। ও অবশ্য এই কাজটা সব সময়ই করে। নতুন কোথাও গেলেই ও কয় পা ডানে, বামে, সোজা যাচ্ছে সব গুনে রাখে। আমি যদি এখন অথৈকে একা ছেড়ে দেই। আমরা যেখান থেকে হেঁটে এসেছি ও ঠিক সেখানেই যেতে পারবে। ওর স্মৃতিশক্তি মাশাআল্লাহ্‌ অনেক ভাল।

“আচ্ছা অথৈ। এই যে তোকে আমি যে চারপাশের দৃশ্যের বর্ণনা দেই। তুই কি কিছু বুঝতে পারিস কেমন দৃশ্য। তোর জগতটা আসলে কেমন?”

“আমি তোকে বোঝাতে পারবো না। আমি কোনদিন কোনকিছু দেখি নাই। তাই বলে বোঝাতে পারবো না কোনটা কিসের মতো করে দেখি। আমার জগতে আমি সবকিছু অনুভব করি শব্দ দিয়ে, গন্ধ দিয়ে। তুই জানিস আমি তোকে হাজার মানুষের ভিড়েও আলাদা করে চিনতে পারবো।”

“কি করে?”

“তোর গায়ের গন্ধ দিয়ে। আমার আশেপাশের সবার গায়ের গন্ধ আমার চেনা। কেউ আমার রুমে এলেই আমি টের পাই।”

“আমার গায়ের গন্ধটা কেমন বলতো।”

“খবিশ খবিশ টাইপ গন্ধ। হিহিহি!”

“মাথায় তুলে আছাড় দেবো একটা। তোর জন্য ঐ গোবর ডাল্লিং জামাই-ই ঠিক আছে। ক্লাস ফোর।”

“বুঝি তো তোর হিংসা লাগে।”

“খায়াদায়া আর কাম নাই আমার হিংসা করবো। চল উঠি একটু পরে সন্ধ্যা হয়ে যাবে।”

“আর একটু থাকি না প্লিজ। মাকে বলে আসছি একটু দেরি হতে পারে। টেনশন করতে মানা করেছি। তুই আছিস না। সো নো টেনশন। আচ্ছা শোন।”

“বল?”

“শিল্পকলা কতদূর এখান থেকে?”

“এইতো কাছেই। যাওয়ার সময় জিইসি মোড়ের আগেই। কেন যাবি?”

“হুম। আমার অনেক দিনের ইচ্ছে শিল্পকলায় গিয়ে রফিকের দোকানের রঙ চা খাওয়ার।”

“তুই রফিকের দোকানের কথা কি করে জানলি?”

“মহুয়া আপু অনেকবার বলেছে। আপু তো আবৃত্তি শিখতে যেতো। সন্ধ্যার দিকে রফিকের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে নাকি বন্ধুরা মিলে রঙ চা খেতো আর আড্ডা দিতো। আমারো খুব ইচ্ছে করে রঙ চা হাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে। আপুকে কতবার বলেছি জানিস। কিন্তু একবারও নেয় নাই। তুই আমায় নিয়ে যাবি?”

“আচ্ছা চল। তুই তো সিগারেটের গন্ধ সহ্য করতে পারিস না। সেখানে তো অনেকেই সিগারেট খায়।”

“এখন অনেকটাই সহ্য হয়। আগে সিগারেটের গন্ধ নাকে এলেই বমি চলে আসতো।”

“কি বলিস। দিবি নাকি দুই এক টান?”

“এখন না পরে দিবো। জানিস তুই আমায় ছাদে নিয়ে যাওয়ার আগে যে সিগারেট খেয়ে আসতি আমি টের পেতাম। বাসায় যাওয়ার পরে হাতটা সারাক্ষণ নাকের কাছে নিয়ে রাখতাম।”

“কেন?”

“তোর হাতে সিগারেটের গন্ধ লেগে থাকতো। ছাদে উঠা নামার সময় যে আমার হাত ধরতি। আমার হাতেও গন্ধ লেগে থাকতো।”

“কি বলিস। এতক্ষণ কি গন্ধ থাকে নাকি?”

“আমি অনেকক্ষণ গন্ধ পাই।”

“তোর আসলে মাথা নষ্ট।”

“পুরাই। হিহিহি!”

শিল্পকলায় আগে রফিকের দোকান ছিল গেইটের ডান দিকে। এখন নিয়ে গেছে বাম দিকে। সবকিছুই পাল্টে যাচ্ছে। শিল্পকলার অপজিটে সেই সময় TnT রেস্টুরেন্টে গিয়ে কত যে মালাই চা খেয়েছি। দিন গুলো খুব দ্রুতই বদলে যাচ্ছে। অথৈকে নিয়ে শিল্পকলার সামনে নামলাম। রফিকের দোকানে গিয়ে একটা দুধ চা আর একটা লাল চা অর্ডার দিলাম। আমি চায়ে দুধ চিনি বেশি খাই।

“আচ্ছা তুই দুধ চা খাস কেনো। এটাতো শরীরের জন্য ভাল না।”

“শরীরের হিসেব করলে তো সিগারেটই খেতাম না।”

“তাও একটা কথা। আচ্ছা শোন একটা সিগারেট ধরা। বাম হাতে খাবি। যাওয়ার সময় আমি তো তোর বাম পাশেই তো বসবো। হাতটা ধরে রাখবো।”

“তোর আসলে মাথা নষ্ট অথৈ।”

সিগারেট ধরিয়ে দুই বন্ধু দেয়ালে হেলান দিয়ে আড্ডা দিলাম অনেকক্ষণ। অথৈ খুব খুশি ওর এতোদিনের ইচ্ছেটা পূরণ হলো বলে।

“অথৈ!”

“হুম বল।”

“আমি কিছু জায়গায় গেলে, কয়েকটা জায়গায় না গেলে ঠিক শান্তি পাই না বুঝলি।”

“বুঝি নাই কি বললি।”

“ধর জিইসি মোড়ে এলে অবশ্যই নিরিবিলিতে চা খেতে যাই। যদিও ভিতরটা মোটেও নিরিবিলি না। ক্যান্ডির বিরিয়ানি নিয়ে যাই। আবার নিউমার্কেট গেলে অবশ্যই জলসা সিনেমা মার্কেটের কারেন্ট বুক সেন্টারে যাই। চকবাজার গেলে চক মালঞ্চে। মেহেদীবাগে গেলে বিশদ বাংলায়। জামালখানে বাতিঘর বুক শপে।”

“তোর পছন্দের জায়গায় আমায় নিয়ে যাবি দোস্ত?”

“অবশ্যই নিয়ে যাবো। আমায় তোর চোখ বানিয়েছিস না নেই কি করে বল।”

“সেটাই সেটাই। আচ্ছা শপিং সেন্টারের অপজিটে বনফুল নাকি কনে দেখার জায়গা। সত্যি নাকি রে!”

“তুই কি করে জানলি?”

“মহুয়া আপু বলেছে।”

“হায়রে মহুয়া আপুরে। বনফুলে ঠিক কনে দেখা হয় তা না। পাতপাত্রি দেখা হয়। মেয়ে গুলা আধামন ময়দা মেখে আসে। এটা চট্টগ্রামে পাত্রপাত্রী দেখার জন্য বিখ্যাত জায়গা বলতে পারিস।”

“আন্টিকে বলবো তোর বিয়ের পাত্রিও বনফুলে দেখার জন্য।”

“চুপ থাক বাচাল। বাজে বকিস না।”

“আচ্ছা আজ কোথায় নিবি?”

“আজ আর কোথাও না। এখান থেকে সোজা বাসায়।”

“কেন?”

“আজ কেন যেনো অন্যকিছু আমায় টানছে না। তুই আছিস সাথে। এটাই আমার কাছে অনেক কিছু। আর কোথাও না গেলেও চলবে আমার।”

“হয়েছে এবার থাম বুদ্ধু।”

আমাকে থামতে বলে আমার বাহুর কাছে খামচি দিয়ে ধরে থাকলো অথৈ। ওর ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি। এই হাসির অনেক অর্থ হয়। চায়ের বিল দিয়ে রিক্সায় উঠলাম দু’জনে। গন্তব্য সোজা বাসায়। হঠাৎ মনে হলো এখন যদি একটা ট্রাক আমাদের রিক্সা চাপা দেয়। আর আমি যদি এখানেই মরে যাই কি করবে অথৈ। কতটা অসহায় লাগবে ওকে। ও কি আমার জন্য খুব কান্না করবে। আস্তে আস্তে একদিন হয়তো অথৈর মনn থেকে ঝাপসা হয়ে যাবো আমি। মৃত মানুষের শোক তো বেশিদিন স্থায়ী হয় না। ওর নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে এই বাজে চিন্তাটা আর বাড়তে দিলাম না।

অথৈ আমার হাতটা শক্ত করে ধরে আছে। আমি হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে ওর বাহু আঁকড়ে ধরলাম। ডান হাত দিয়ে ওর হাত ধরলাম। অথৈ কেমন যেন লাজুক ভাব করে গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেললো। মনে হচ্ছে এই রিক্সা যদি অনন্তকাল এভাবে চলতো আমি অথৈকে এভাবেই আঁকড়ে ধরে বসে থাকতাম। অথৈর চুল গুলো আমার মুখে এসে পরছে। কি এক মাতাল মাতাল গন্ধ এই চুলে।

“অথৈ!”

“হুম বল।”

“একটা কথা জানতে চাইলে সিরিয়াসলি বলবি? কোন দুষ্টুমি করবি নাতো?”

“বলবো বল।”

“আমাকে তোর দেখতে ইচ্ছে করে না?”

অথৈ ওর আরেকটা হাত দিয়ে আমার বুকের কাছে শার্ট খামচে ধরলো। কাঁপছে ও। ওকে আরো কাছে টানলাম। আশেপাশে রিক্সার মানুষ পাশ দিয়ে দ্রুত যাওয়ার সময় আড়চোখে দেখছে আমাদের। কিন্তু আজ আমার কিছুই যায় আসে না। অথৈর কাঁপা হাতের স্পর্ষে টের পাচ্ছি ও নিরবে কাঁদছে। আমি ওর হাত থেকে হাতটা ছাড়িয়ে ওকে আরো শক্ত করে ধরলাম।

“অথৈ কি হয়েছে? প্লিজ বল। আমি কি তোর মনে কোন আঘাত করেছি?”

“না প্লিজ এমন কিছু ভাবিস না। এমনি কিছু হয়নি আমার।”

“কেন এভাবে হঠাৎ করে…”

“আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করে তোকে। আমি কত করে খোদাকে বলি যেন একটাবার হলেও তোকে দেখতে দেয়। এরপরে আবার নাহয় অন্ধ করে দিক আমায়।” ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো অথৈ। আমি তাকিয়ে দেখছিলাম এক মায়াবতী মেয়ের ফুটফুটে মুখটা কেমন অসহায় হয়ে যাচ্ছে।

“কিন্তু কাঁদছিস কেন?”

“সেটা তুই বুঝবি না গাধা।”

পেপসি চলে আসছে। রিক্সাটা বাসা পর্যন্ত না নিয়ে এখানেই নেমে গেলাম। অথৈ জানে আমি রোজ পেপসি থেকে হেঁটে হেঁটে চান্দগাঁও আবাসিকের ভিতর দিয়ে বাসায় যাই। অথৈর হাত ধরে আস্তে আস্তে হাঁটছি আর ওকে আশেপাশের দৃশ্য বলে দিচ্ছি। ও এখন পুরোপুরি স্বাভাবিক।

“এটা হচ্ছে “এ” ব্লক। একটা সময় ছিল আমি আর আমার বন্ধু রাজু এখানে বসে আড্ডা দিতাম। জায়গাটার নামও দিয়েছিলাম- রোড “টু” ব্লক “এ”। কিন্তু অনেক মশা কামড়াতো। নিচেই তো ড্রেন। এখন পার করে যাচ্ছি মসজিদ।”

“মসজিদ কোনদিকে?”

“বামদিকে।”

অথৈ কৌতূহলী বাচ্চাদের মতো কান পেতে বোঝার চেষ্টা করছে আশেপাশের পরিবেশ। কি প্রচণ্ডভাবে ও পৃথিবীটা দেখতে চায়। খুব মায়া লাগছে দেখে। ইচ্ছে করছে আমার চোখ দু’টো ওকে দিয়ে দিতে।

“আমরা এখন মিনি বাংলাদেশের পাশ দিয়ে যাচ্ছি।”

“এখানে নাকি সংসার ভবনকে রেস্টুরেন্ট বানিয়েছে। বুবুন বলেছে আমায়।”

“হ্যাঁ! সন্ধ্যার পরে মশার কামড় খেতে চাইলে মিনি বাংলাদেশ জায়গার থেকে ভাল জায়গা আর পাবি না। এখন আমাদের বাম পাশে হলো কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল।”

“কোন মহিলাকে কি দেখা যাচ্ছে?”

“নারে জানালায় পর্দা দেওয়া। সব বেরসিক মহিলা।”

“খবিশ কোথাকার আবার তাকাসও ঐদিকে।”

“তুই-ই তো জিজ্ঞাস করলি মহিলা দেখা যায় কিনা। এই জন্যই তাকিয়েছি।”

“আমি বললেই তাকাতে হবে কেন? মহিলা দেখার খুব শখ তোর তাই না।”

“আশ্চর্য তুই বললি বলেই…”

“হইছে থামেন আপনে। লুচু কোথাকার।”

“মেয়ে মানুষ মানেই আসলে একটা পেইন।”

“এই পেইন ছাড়া তো তোরা চলতেও পারবি না।”

“পেইন ছাড়া চলতে পারবো, তোকে ছাড়া না।”

“কি বললি! আবার বল বুদ্ধু?”

“না কিছু না। শোন এখন আমরা ডান দিকের রাস্তায় ঢুকে যাবো। এটা হচ্ছে ১৩ নাম্বার রোড। এখান দিয়ে সোজা গিয়ে গ্যারেজের সামনে গিয়ে খতিব বাড়ি রোডের অপজিটে চলে যাবো রাস্তা পার হয়ে।”

“বল না লুচু কি বলেছিস। আবার বল।”

“বললাম তো কিছু না।”

“ফান্দে পরছেরে বগা। হিহিহি!”

“বাজে বকিস না। চুপ থাক।”

বাদ দেওয়া যাক আরো অনেক গুলো দিনের কথা। তেমন নতুন কিছু ঘটেনি আর সেই নিত্যনৈমিত্তিক জীবনে। একটা ব্যাপার নতুন বলা যায়। রোজ বিকেলে অথৈকে ছাদে নিয়ে গল্পের বই পড়ে শোনাই। কখনোবা কবিতার বই। অথৈ মুগ্ধ হয়ে শোনে হাঁটুতে চিবুক ভর দিয়ে।

আজ বর্ষার প্রথম বৃষ্টি। সকাল বেলাতে বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম কদম ফুলের জন্য। মাঝপথে মার্কেটে ঢুকে দুই ডজন সবুজ রঙের কাঁচের চুড়ি নিলাম। প্রায় একই রকম। কিন্তু খাঁচটা ভিন্ন। সারাদিনই প্রায় না খেয়ে আছি। দুপুরের পরে পেলাম সেই প্রতীক্ষিত কদম ফুল। এক হাত ভর্তি করে কদম ফুল নিলাম। এক সাথে অনেক গুলা। আসার সময় দুই তিনটা মেয়ে চেয়েছিলো ফুল- দেইনি। এই ফুল কেবল একজনের জন্য। বাসায় এসে ফুল গুলো ছাদের টাংকির পাশে ফুল গাছের পাশে রেখে ঘরে ঢুকলাম। বুবুনকে দিয়ে অথৈর কাছে চুড়ি গুলো পাঠালাম। বিনিময়ে একশো টাকার একটা নোট হাতিয়ে নিলো ফাজিলটা। যাওয়ার সময় ফিচকা হাসি দিলো।

“প্রেম প্রেম প্রেম! আহা কি গভীর প্রেম!”

“মাড়বো এক চড়। যাহ ভাগ!”

বুবুন যেতেই ফ্রেস হয়ে মুখে যা পারলাম গুঁজে নিলাম। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছি আর বৃষ্টি দেখছি। আজ মনেহয় আকাশ ফুটো হয়ে গেছে। থামার কোন লক্ষণই নেই। ঘন্টাখানিক পর বুবুন এসে বলল অথৈ আমাকে ছাদে যেতে বলেছে। কি জানি কেন কথাটা শুনে সারা শরীরে হঠাৎ একটা শিহরণ বয়ে গেল। ছাদে যেতেই দেখি অথৈ সিঁড়িঘরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। একটা হলুদ রঙের শাড়ি পরা। দুই হাত ভর্তি সবুজ কাঁচের চুড়ি। বেণী করা চুল সামনে বামপাশে এনে রাখা। চোখে গাঢ় করে কাজল দেওয়া। পৃথিবীর সবচেয়ে অপরূপা মেয়েটা আমার সামনে দাঁড়িয়ে। ঢোক গিলে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

“বলতো বুদ্ধু, আমায় কেমন লাগছে দেখতে!” অপলক তাকিয়ে আছি অথৈর দিকে। কি করে বলি, ওকে যে আমার বউ বউ লাগছে।

“এতো ঢোক গিলিস না। আগেই বলেছি আমি তোর হৃৎপিণ্ডের শব্দ বুঝতে পারি।”

“তো… তো… তোকে…”

“থাম স্টুপিড। আমার কদম ফুল কইy দে।”

ফুল গাছের পাশ থেকে কদম ফুল নিয়ে ওর হাতে দিলাম। দুই হাত দিয়ে বুকে আঁকড়ে ধরলো ফুল। আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, “বৃষ্টিতে ভিজবো। ভয় পাস না। মাকে বলে এসেছি।” হাত ধরে বৃষ্টিতে নেমে পরলাম দু’জনে। ঝর্ণার মতো আকাশ থেকে বৃষ্টি নেমে আসছে। হাত ধরে ছাদের রেলিঙের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বৃষ্টির কবিতা পড়ে শোনালাম।

“বৃষ্টি নামলো যখন আমি উঠোন পানে একা দৌড়ে গিয়ে ভেবেছিলাম তোমার পাবো দেখা হয়তো মেঘে বৃষ্টিতে বা শিউলি গাছের তলে আজানু কেশ ভিজিয়ে নিচ্ছো আকাশ ছেঁচা জলে কিন্তু তুমি নেই বাহিরে অন্তরে মেঘ করে ভারি ব্যাপক বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে ঝরে” অথৈ আমার হাত ছেড়ে দুই হাত দুই দিকে ডানার মতো মেলে দিয়ে আকাশে মুখ করে ভিজলো। অথৈ তো চোখে দেখে না। কি করে জানলো এভাবে দুই হাত মেলে দিয়ে ভিজতে খুব দারুণ লাগে। খুব অবাক লাগে অথৈর কিছু ব্যাপারে।

কতক্ষণ ওকে নিয়ে ভিজেছি জানি না। হঠাৎ জোরে জোরে বাজ পরায় সিঁড়িঘরে চলে এলাম অথৈকে নিয়ে। ও খুব কাঁপছিলো ঠাণ্ডায়। এক হাত দিয়ে ওর বাহু ধরতেই আরো কেঁপে উঠলো। আমার বুকের সাথে মিশে গেলো। ওর ভেজা চুলের মাতাল গন্ধে নেশা লেগে যাচ্ছে। দুই হাত দিয়ে আমায় জড়িয়ে ধরলো। ওর হাত থেকে কদম ফুল গুলো আমাদের পায়ের কাছে এসে পরলো। যেন অঞ্জলি দিলো। আমি ওর দিকে ফিরলাম। ওর মুখটা দুই হাতে আঁজলা ভরে ধরলাম। অথৈ মিশে আছে আমার সাথে।

“তোর কি খুব ঠাণ্ডা লাগছে? বাসায় যাবি!”

“উঁহু!”

“সর্দি হয় যদি।”

“হোক।”

ওর বুক উঠানামা করছে আমার বুকের কাছে। ওর কোমরে হাত দিয়ে আরো কাছে টানলাম। ওর খোলা কোমরে হাত পরতেই আরো কেঁপে উঠলো। আমাদের সময় যেন থেমে গেছে। ওর কপালের সিঁথিতে আলতো করে চুমু দিতেই দুই হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরলো। ওর গরম নিঃশ্বাস আমার গলার কাছে পরছে। দু’জনের হৃৎপিণ্ড যেন পাল্লা দিয়েছে কে বেশি কাঁপতে পারে। ওকে ফিসফিস করে ডাক দিলাম, “অথৈ।” ও “হুম” বলে ওর মুখটা উপরে তুললো।

আকাশ থেকে অবিরাম বৃষ্টি ঝরছে। আর আমার বুকের ভিতরে বজ্রপাত। কাজল আঁকা অথৈর চোখের পাপড়িতে, ঠোঁটের উপরে বিন্দু বিন্দু বৃষ্টির ফোঁটা। আলতো করে অথৈর ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ালাম। ও পাগলের মতো আঁকড়ে ধরলো আমায়। সময়ের হিসেব ছাদের এই চিলেকোঠায় হারিয়ে গেছে। অথৈর ভারী নিঃশ্বাসে পার্থিব জগৎ ছেড়ে বিলিন হয়ে যাচ্ছি অন্য কোথাও। অথৈর হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি টুংটাং করে কাঁপছে। ও ফিসফিস করে বলল, “আজই প্রথম কাজল দিয়েছি চোখে। তোর জন্য।”

“আমার জন্য!”

“হুম। শোন?”

“কি?”

“চুমুর রঙ কি জানিস?”

“কি?”

“হলুদ। তুই যখন তোর ঠোঁটের স্পর্শে আমার ঠোঁটে চুমু এঁকে দিলি তখনই আমি দেখতে পেয়েছি হলুদ রঙ। ছুঁতে পেরেছি ঠোঁট দিয়ে। আমি এখন জেনে গেছি, রঙ হলো অনুভূতি। একেক অনুভূতির একেক রঙ। আমি দুনিয়ার সব রঙ দেখতে চাই। দেখাবি?” “আমাদের বিয়ের পরে তোকে লাল, নীল, সবুজ সব রঙই দেখাবো।”

“ভালবেসে।”

“ভালবেসে।”

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত