স্বপ্ন বাসর

স্বপ্ন বাসর

মা-র হাই প্রেসার।ছোটবেলা থেকেই দেখে অাসছি ভারি কাজ কাম তিনি করতে পারেন না।চাপা কল থেকে পানি এনে দেওয়া, রান্নার জন্য পুকুরের পানি সবটা অামি অার বাবাকেই করতে হত।মা শুধু বসে বসে চুল্লিতে রান্না বসাত।ইদানিং শরীরের অবস্হার অারো অবনতি হয়েছে তার।এইতো গত দুইদিন অাগের ঘটনা।রান্না করার সময় হঠাৎ করে মাথা ঘুরে পড়ে বেহুস হয়ে যায়।ভাগ্য ভালো যে অামি তখন ঘরে বসে মোবাইল টিপছিলাম।অাওয়াজ শুনে দৌঁড়ে যাই।তারপর লেবু পাতার ঘ্রাণ শুকিয়ে, মুখে জল ছিটিয়ে প্রায় অাধঘন্টা চেষ্টার পর হুস ফিরে তার।এভাবে তো চলতে দেয়া যায় না অার।বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন অামাকে বিয়ে করাবে।ঘরে নতুন বউ এনে মায়ের কষ্ট লাঘব করাবে।

অামি তখন অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ছি।বয়স তেইশের কাছাকাছি।নিজের বিয়ে নিয়ে কখনও ওতটা ভাবিনি।এত তাড়াহুড়োর মধ্যে বাবা অামার জন্য মেয়ে দেখা শুরু করবে সেটাও ভাবিনি।ভেবেছিলাম হুট করে তো অার বিয়ে হয়ে যাবেনা।দুজন দুজনকে চেনার, জানার, বুঝার কিছুটা স্পেস তো নিশ্চয় পাব।দূুর্ভাগ্যবশত সেটাও হয়নি।একরাতে বাবা এসে বলে যে সাতদিন পর অামার বিয়ে।দিনতারিখ সব ঠিক করে এসেছে।মেয়ে তার চেনাজানা, কোন এক বন্ধুর মেয়ে।বাবার কথা শুনে মা খুশি হলেন। অামি চুপচাপ ঠাঁই হয়ে দাঁড়িয়েই রইলাম।মুখ দিয়ে বের হলোনা কোনকিছু অার।

দেখতে দেখতে দুইটা দিন কেটে গেল।অামি বিয়ের জন্য মোটেও প্রস্তুত না।একটা মেয়েকে চিনিনা, জানিনা, কোনদিন দেখিনি পর্যন্ত তার সাথে কিভাবে সারাজীবন পার করব।জানিনা বাবা কেমন মেয়ে ঠিক করেছে অামার জন্য।খুব ইচ্ছে করছে মেয়েটার সাথে দেখা করার, কথা বলার।তারপর দুইজনের সম্মতিতে বিয়ের দিনটাকে পিছিয়ে নেয়ার।বাবার কাছে গিয়ে যে মেয়েটার নাম্বার চেয়ে নিব সেই সাহস অামার নাই।তাছাড়া লজ্জারও একটা বিষয় অাছে।কি না কি মনে করে বসবে অাবার।এসময় একটা বোন থাকলে খুব কাজে অাসত।বোনেরা এ কাজগুলাতে বেশ পটু হয়।কিছু একটার লোভ দেখিয়ে নাম্বার ঠিকই নাম্বার হাতিয়ে নেয়া যেত।

বিয়ের বাকি মাত্র তিনদিন।এখনো হবু বউয়ের নামটা পর্যন্ত জানা হলনা।অাজ সকালে মেয়ের বাপের বাড়ি থেকে কিছু অাসবাবপত্র পাঠিয়েছে।সেগুলা গুছাতে গুছাতে বাপ ছেলে দুইজনেই হাঁপিয়ে গেছি।বুঝায় যাচ্ছে মেয়ের বাবা যথেষ্ট বিত্তশালী। বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম- এসবের কি প্রয়োজন ছিল বাবা? বাবা বলল- অামি বলিনি কিছু দিতে।বলেছিলাম তোর মেয়েটাকে অামার ঘরে পাঠালেই হবে।জোর করেই পাঠাল এসব। অামি অার কিছু বললামনা।রাতে খাওয়ার সময় বাবা বলে উঠল- তোর বন্ধু বান্ধব যাদের যাদের বলার অাছে সবাইকে বলে ফেল।মাঝখানে মাত্র একদিন বাকি।এরপর অার সময় পাবিনা। অামি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললাম।

বাড়িতে অাস্তে অাস্তে অাত্মীয়-স্বজন অাসা শুরু হল।অামার পিসি, মাসি, মামা, মামি সবাই একে একে অাসতে থাকল।ছোট ছোট বাচ্চারা এদিক সেদিক খেলছে।পুরো ঘরে একটা গমগম অবস্হা।এইবার মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি বাড়িতে বিয়ে নামছে।তবে অামার বিয়ে হচ্ছে সেটা এখনো বিশ্বাসে অানতে পারছিনা।সকাল থেকেই নানা অানুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে অামাকে।নড়া চড়ার সুযোগ পর্যন্ত পাচ্ছিনা।কত হাসিখুশি সবাই।অাড্ডা চলছে রান্নাঘরে।অামি হাসব নাকি কাঁদব কিছুই বুঝতে পারছিনা। সন্ধ্যার পরে বস্ত্রাদি নিয়ে যাবে মেয়ের বাড়িতে।এমন সময় নিশিকে চুপটি করে ডেকে নিলাম।নিশি অামার মামাতো বোন।বললাম- শোন, একটা কাজ করতে পারবি অামার?

– বল কি করতে হবে?
– তোর নতুন বৌদির ফোন নাম্বার….

এটুকু বলতেই সবাই এসে নিশিকে নিয়ে গেল।নিশি বোধয় শুনতেই পাইনি।একটুপর গাড়ি স্টার্ট দেয়ার শব্দ শুনতে পেলাম।দূররর….. এমন কেন হচ্ছে অামার সাথে।অাজ একটা লাস্ট চান্স পেয়েছিলাম সেটাও হাতছাড়া।বুকে ধুকধুকানি শুরু হয়ে গেল হঠাৎ।ঘড়ির কাঁটার প্রতিটা টিকটক শব্দ অামার অস্তিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে যেন।

সেই রাতের পর থেকে সেকেন্ডগুলা যেন মিনিট হল, মিনিট হয়ে গেল ঘন্টা। অস্হির অস্হির লাগছে সবকিছু ঘরে ঠিকছেনা মনটা।শেষ রাতের দিকে চোখদুটো লেগে এসেছিল এমন সময় দরজার তীব্র ঝাকানিতে সেটাও হলনা।রান্নাঘরে মা-র কাছে গিয়ে কিছু খেতে চাইলাম।মা বলে- তোর অাজ উপোস।কিছু খেতে পারবিনা।

– অামার ক্ষুদা পেয়েছে ভীষণ।অামি না খেয়ে থাকতে পারবোনা মা।
– এখনি যদি ক্ষুদা লেগে যায় তোর, তাহলে সারাদিন কিভাবে থাকবি।
– তুমি তো জানোই মা অামি উপোস করতে পারিনা।তাহলে…
– অাচ্ছা ঘরে যা, অামি তোর জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছি।

ঘরে যেতেই নিশি সামনে এসে পড়ল।বলল- কাল কি বলতে চাইছিলি রে তুই?

– কিছুনা।
– ফোন নাম্বার নাকি কি যেন বলছিলি।
– তুই শুনেছিলি তাইলে।
– হ্যাঁ শুনেছিলাম।এরপর নিশি তার হাতে থাকা একটা ছোট্ট সাদা কাগজ অামার দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল- এই নে ধর বৌদির নাম্বার।জমিয়ে কথা বল কেমন? অামি খুশিতে কি করব বুঝে উঠতে পারছিলামনা।নিশির গাল দুটো দুইহাতে টেনে বললাম- থ্যাংকইউ সো মাচ।

– জানিস কত কষ্ট হইছে নাম্বারটা নিতে।বৌদি অামাকে নাম্বার বলেনি।ওর ভাইয়ের কাছ থেকে নিছি।
– ওরে বাপরে….

নিশি যাওয়ার পর অাস্তে করে কাগজটা খুললাম।একবার পরে নিলাম নাম্বারটা ০১৩…. গলা শুকিয়ে অাসছে।অমনি হাত কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গেল।নাম্বারটা মোবাইলে তুলে কানের পাশে নিয়ে গেলাম।এমন সময় নাস্তা নিয়ে মা এসে হাজির।অামি কলটা তড়িগড়ি করে কেটে দিলাম।ভাগ্যিস রিং হয়নি তখনো।মা বলল-

– কিরে কাকে কল দিচ্ছিস??
– কাকা…কাউকে না মা।

মা নাস্তা রেখে চলে গেল। অামি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।এরপর অার কল দেয়াই হয়নি।তার অাগেই পাড়ার মোহিনী বৌদি, সুমা বৌদি ওরা এসে অামাকে টেনে নিয়ে গেল।

সন্ধ্যায় অামাকে বরের সাজে সাজানো হল।নানা রকম ফুলে সজ্জিত একটা কারে অামাকে বসানো হল।পাশেই বসেছে মোহিনী বৌদি।তার পাঁচ বছরের ছেলে নির্জন বসেছে ড্রাইভারের পাশে।কারে চড়বে বলে সে কি কান্না তার।শেষমেশ কারে তুলতেই হল।একটা জায়গায় গিয়ে গাড়ি থামল।একে তো ঢোলের শব্দ তার উপর অাতশবাজির অাওয়াজে কানের অবস্হা খারাপ।কাউকে কিছু বলতেও পারছিনা।চারদিক থেকে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ কি অসহ্য বিরক্তিকর। একটা সেলফি নেওয়া উচিত ছিল এসময়।নিজের বিয়ের কথাটা ফেসবুকে জানালে কিছু লাইক কমেন্ট অাসত।

এরপর মেয়েটাকে প্রথমবারের মত দেখি অামাদের শুভদৃষ্টি হওয়ার সময়।কি অপরুপ চাহনি তার যেন নেশার অতলে ডুবছি বারবার।বাবার উপর সাতদিন ধরে জমে থাকা অভিযোগগুলা মুহুর্তেই পানি হয়ে গেল।এরপর সিঁদুরদান, মাল্যদান, সাতপাঁকে বাঁধা, ধর্মীয় সব রীতিনীতি মেনে বিয়ের পালা শেষ হয় অামাদের।মধ্যরাতে অনেকেই খেয়েধেয়ে চলে গিয়েছে।এখন দুই পরিবারের কয়েকজন মাত্র অাছে।ভোরে ভোরে শুরু হল কন্যা বিদায়ের তাড়া।কান্নায় ভেসে যাচ্ছে বাপ, মেয়ে, মা, ভাই।ওদের দেখাদেখি অামারও চোখ ভারি হয়ে অাসল।

অবশেষে এল মহাক্ষন, মহাতিথীর লগন।বহু অপেক্ষিত সেই স্বপ্নের বাসর রাত, ফুলসজ্জার রাত।এ রাতটি নিয়ে কত মানুষের কতরকম ভাবনা।এই রাতটা নিয়ে হাবিজাবি ভাবেনি এমন ছেলেমেয়ে পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া জুড়ি মেলা ভার।মোহিনী বৌদি কিসব উল্টাপাল্টা বলে অামাকে রুমে ঢুকিয়ে দিল।একপ্রকার জোর করেই ঠেলে ঢুকিয়েছে অামাকে।তার অাগে অামার বৌটার সাথে ফিসফিস করে অনেক শলাপরামর্শ করে নিয়েছে।অামি দরজার হুকটা অাস্তে করে উপরে তুলে দিলাম।খাটের চারপাশ ফুলেফুলে সাজানো।তার মাঝখানটাতে বৌ ঘোমটা টেনে বসে অাছে।নাটক সিনেমায় যেমন দেখতাম ঠিক সেরকম। অামি বৌয়ের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলাম।বৌ তীব্র ঝাকানি দিয়ে বলে উঠল- এ্যাই এ্যাই একদম কাছে অাসার চেষ্টা করবেননা।পিছিয়ে যান বলছি।পিছিয়ে যান। অবাক সুরে জিজ্ঞাস করলাম- কেন?

– কতটুকু চিনেন অামায়, অাগে কখনও দেখেছেন অামাকে? অামার নাম বলেন তো?

অামার গলা অাটকে গেল।এক বিন্দু পরিমান জানিনা মেয়েটা সম্পর্কে।যেখানে নাম জানিনা তার সেখানে অন্যকিছু জানার প্রশ্নই অাসেনা। বৌ বলে উঠল –  কি হলো চুপ করে অাছেন যে।বলেন অামার নাম? অামি মৃদু স্বরে জবাব দিলাম- জানিনা। অামার কথা শুনে বউ নিজের মাথায় হাত দিয়ে বিলাপ করতে শুরু করল- হে ঈশ্বর, এ কেমন স্বামী জুটালে অামার কপালে।এমন দিন দেখার অাগে অামাকে তুলে নিলেনা কেন……

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত