সারপ্রাইজ

সারপ্রাইজ

ইলা কখনো তার স্বামী আরমান থেকে কোনো সারপ্রাইজ গিফট পায়নি। ওর খুব সখ বর তাকে হঠাৎ করেই চমকে দেবে। যদিও তাদের এরেঞ্জ ম্যারেজ।

তাতে কি! এমন আশা কি শুধু প্রেমিক স্বামী থেকে করবে? বাপ মায়ের পছন্দের বর থেকে আশা করতে দোষ কি! অনেকভাবে সে সুযোগও করে দিয়েছে কিন্তু ঐ মানুষ বুঝেও যেন বুঝেনা ।

একে কি বলা যায়? চোখ থাকিতে অন্ধ নাকি বুদ্ধু রাম?
হয়তো তিনি তাই।

তারা শপিং করতে গেলে আরমান ইলাকে বলে পছন্দ করতে। ইলা কিছু একটা পছন্দ করে বলতে আসে,
“আমার পছন্দ হয়েছে, খুবই সুন্দর কিন্তু দাম যেন একটু বেশি চায়, তুমি একটু দেখোতো।”

আসলে সে ইংগিত দিয়ে বুঝিয়ে দেয়, তোমার হাতে করে জিনিসটা কিনে আনো।

বর আরমান দোকানদারের সাথে কিছুক্ষণ দাম নিয়ে দরাদরি করে খালি হাতেই ফিরে আসে। ওটা আর নেয়া হয়না। মনে মনে ইলা’র মন খারাপ হয়।

পরবর্তী কয়েকদিন ইলা অপেক্ষা করে থাকে, কিন্তু আরমান ব্যাপারটা বেমালুম ভুলে যায়। ইলা ভাবে, অন্য দোকান থেকেও তো চাইলে সে কিনে এনে ওকে মুগ্ধ করতে পারে!

কতবার আরমানের সামনে ইলা তার গোলাপ ভালো লাগার কথা বলেছে! কিন্তু আরমান মনে হয় ইলা’র কথা কখনোই মন দিয়ে শুনেনা। নইলে রিক্সায় যেতে যেতে যখন ইলা মুগ্ধ হয়ে বলেছে,

“দেখো দেখো, কি সুন্দর করেই না সব গোলাপ সাজানো!”

ঐ চমৎকৃত দৃষ্টির বদলে সে কখনো জন্মদিন বা বিয়ে বার্ষিকীতে হলেও তো একটা ফুল আশা করতেই পারে। তবে তার আশাটা আশা থেকে গেছে, বাস্তবতার মুখ দেখেনা।

আরমান ভালোভাবেই জানে, ইলা’র মিষ্টি পছন্দ। কিন্তু সে হাতে করে কখনোই ইলা’র পছন্দের মিষ্টিটা কিনে আনেনি। উল্টো ইলাকে বলে,

“যা ভালো লাগে, পছন্দ করে কিনে নিতে পারোনা?”

“হুম, পছন্দ হলে নিবো৷” বুক ভরা অভিমান নিয়েই যেন সে জবাব দেয়।

“কখনোই তো তেমন কিছু কিনতে দেখলামনা।”
আরমান তা মন থেকেই বলে। বউটার কোনো কিছুর প্রতিই তেমন আগ্রহ নেয় বোধহয়, সে ভাবে।

ইলা একটা গোপন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মনে মনে বলে,

“আমি চাই তুমি আমাকে আমার পছন্দের কিছু এনে দাও কিংবা কখনো নিজের পছন্দে হলেও কিছু নিয়ে আসো৷”
কিন্তু তা মুখে বলা হয়না।

একবার তো অফিসের কাজে কক্সবাজার যেতে হয়েছে আরমানকে। ফোন করে যখন সে ইলা’র কাছে জানতে চায়,

“তোমার কি কিছু লাগবে? কি আনবো?”

এতো খুশি হয়েছিল ইলা! ও কি উত্তর দিবে ভেবে পায়না।
“তোমার যা ভালো লাগে এনো।”
“নাম বললে সুবিধা হতো না?” আন্তরিকতার সাথেই জানতে চায় আরমান।
“আমার মাথায় কিছু আসছেনা এই মুহূর্তে”। জবাব দেয় ইলা।

আসলে ওর লজ্জা লাগছিলো, এটা, ওটা আনতে বলতে। এখনো সে এসবে অভ্যস্ত হয়নি।

তবে ইলা অনেক কিছু ভেবে রাখে। নিশ্চয় শাল চাদর আনবে, গলার নানান ডিজাইনের সেট আনতে পারে। এসবই তো ওখানে বেশি চলে। তারপর, সুন্দর সেন্ডেল পাওয়া যায়।

গত বছর ওর বান্ধবী ওকে এক জোড়া দিয়েছিল, কক্সবাজার থেকে কিনেছে সে। আরমান জানে, তো তাও আনতে পারে।

কিন্তু ব্যাগ খুলে এত্তোগুলো বার্মিজ আচার, বাদাম যখন দেখে, ওর এমন মন খারাপ হয়েছিল!

তবে দেখায়নি, বুঝতে দেয়নি আরমানকে। খুশি হবার ভান করেছে উল্টা। তবে সর্বশেষে ওর নাম খোদাই করা চাবি’র রিংটা যখন ইলা’র হাতে দেয়, ইলা এবার সত্যিই খুব খুশি হয়।

চাদর, সেন্ডেল, গলার সেট এর দুঃখ মুহূর্তেই ভুলে গিয়েছে সে।

এরপরও ইলা খুব বেশি মন খারাপ করেনা। অনেকেই আছে এমন বেখেয়াল স্বভাবের, আরমানও হয়তো তাই।

ইলা বাইরে কাজ করেনা। সংসারে অসুস্থ শ্বাশুড়ীকে দেখা শোনা করতে হয়। সংসারের খরচটা শুধু হিসাব করে আরমান ওর হাতে দিয়ে দেয়।

এর থেকেও ইলা দুই তিন’শ করে জমাতে চায়। বিয়ের দু’বছর পার হয়ে গেছে এমন নিরামিষ ভাবে। এবার ইলা’র হাতে কিছু টাকা জমেছে। খুব বেশি না, মাত্র চার হাজার টাকা।

সামনে বিয়ে বার্ষিকী, ও কিছু ভেবে নেয়। আরমানকে এবার সে সারপ্রাইজ দিতে চায়। বেচারা দেখে হলেও কিছু শিখুক।

কি কিনতে পারে এই টাকায় ইলা?
ম্যারেজ ডে’র আগেরদিন ইলা ওর এক বান্ধবীকে ফোন করে শপিং করতে সাথে যাবার জন্য। শ্বাশুড়ীর পাশে বসার জন্য কাউকে ডাকতে চাইলে উনি বারণ করেন। বলেন,
“তুমি কি কিনতে যাবে যাও, আমি অতটা বুড়ি নাকি যে কাউকে সাথে বসা লাগবে! নিশ্চিন্তে যাও মা।”

ইলা খুশি মনে বের হয়ে যায়। তার শ্বাশুড়ী মহিলা ভালো, সব বুঝেন।
দুই বান্ধবী অনেক ঘুরেফিরে, অনেক খুঁজে খুউব সুন্দর একটি শার্ট কিনে, জলপাই রঙের। ফর্সা আরমানকে ভালোই মানাবে, ভাবে ইলা। দুইটি ছবি রাখতে পারবে এমন ছবি ফ্রেম নেয়, বড় কিছু মোমবাতিও। দুইটা ভালো থেকে ফুল দানীতেই সাত’শ টাকা চলে যায়।
এতো দাম জিনিস পত্রের!

আসার সময় কিছু তাজা গোলাপ আর ওর প্রিয় মিষ্টান্ন লাড্ডু কিনতেও ভুলেনা ইলা, সাথে আরমানের প্রিয় জিলাপী। কিন্তু জিলাপী’র মচমচে ভাব চলে যাবে নাতো? দুশ্চিন্তা হয় ওর।

সে তো আসবে রাত সাড়ে নয়টায়। তার আগে ইলা নতুন বেড সিট পেতে রাখে বিছানায়। শার্টটা একবার বিছানায়, আরেকবার বালিশের নীচে লুকিয়ে রাখে। বুঝতে পারেনা কোথায় রাখবে।

আসামাত্র আরমানের চোখে পড়লে, ইলা লজ্জায় পড়বে।

টবে গোলাপ গুলো সাজিয়ে রাখে। মোমবাতিও সাজায়, তবে আগুন দেয়না। এসব করতেই ও নিজে নিজে লজ্জা পেতে থাকে।

কেমন যেন প্রথম দিনের মতো নতুন বউ লাগছে নিজেকে। আর সেরকম লজ্জানুভূতি। এবার ইলা নতুন থেকে একটা শাড়ি পরে আরো গুটিসুটি হয়ে থাকে।

শাড়ি বদলিয়ে ফেলবে নাকি গোলাপ মোমবাতি সরিয়ে ফেলবে বুঝতে পারেনা। সব যেন একটু বেশি বেশি লাগছে!
শেষে সব যেমন আছে, তেমনই রেখে দেয়। থাক, সুন্দর লাগছে সবকিছু, শাড়িতে নিজেকেও।

“আচ্ছা, আরমানের কি এই দিনের কথা মনে আছে? যদি একেবারে ভুলে যায়, তবে তো আমি ভীষণ লজ্জায় পড়ব৷” মনে মনে বলে সে।

তারপর চোখে গাঢ় করে কাজল লাগায়, একটু আই লাইনার দিয়ে টানা টানা করে এঁকেও নেয়। ঠোঁটে লিপ জেল লাগায়। সাজ শেষ করে দেখে সাড়ে নয়টা বেজে গেছে।

“এখনো আসছেনা কেনো আরমান!”

দশটা বাজে, সাড়ে দশটা। এবার টেনশান হয়। ফোন করে ইলা। কেউ ফোন ধরছেনা, রিং বাজতেই আছে৷ ভয়ে অজানা আশংকায় ওর মুখটা এতটুকু হয়ে গেছে। এমন দেরি তো কখনো হয়নি! ও দৌড়ে শ্বাশুড়ী’র কাছে ছুটে যায়, উনার কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে দেয়।

“মা, আপনার ছেলে এখনো আসেনি, ফোন ধরছেনা, আমার খুউব ভয় লাগছে।”

“ওর কাজের জায়গায় ফোন করো।” উনি অতোটা অস্থির হয়ে বউকে ভয় পাইয়ে দিতে চাননা৷ আর কতো কারণেই তো দেরী হতে পারে।

“করেছি। নয়টায় বেরিয়ে গেছে বলল।

মা, পুলিশে ফোন করি?”

“দাঁড়াও, ওর বন্ধুদের নাম্বার আছে ডায়রীতে। সবাইকে করে দেখ আগে। হয়তো জ্যামে আটকে আছে বা জরুরি কোনো কাজে “।

একে একে সব বন্ধুকে ফোন করে ইলা। তারাও আরমানের ফোনে চেষ্টা করতে লাগল। এক সময় রিং বাজা বন্ধ হয়ে যায়। ইলা কেঁদে ফেলে এবার, সাথে শ্বাশুড়ীও।
ইলা’র কাজল লেপ্টে বিশ্রী দেখায় ওকে।

তখনই দরজায় কেউ আঘাত করে, ঘড়িতে তখন রাত এগারটা চল্লিশ মিনিট প্রায়।
দু’হাত ভর্তি শপিং ব্যাগ হাতে আরমান বাসায় ঢুকেই বলে,

“তোমার চোখে কি হয়েছে ইলা? এতো কালি কেনো!”

ইলা সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে জানতে চায়,

“কোথায় ছিলে এতক্ষণ? ”
মা বউ দু’জনই এক সাথে একই প্রশ্ন করে।

আরমান হেসে বলে,

“তোমার বউকে কখনো কিছু দেয়া হয়না। আজ বিয়ে বার্ষিকী মনে পড়লে, সারপ্রাইজ দেবার জন্য কিছু শপিং করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ট্রাফিক জ্যামে পড়েই এত দেরি। দশ মিনিটের পথ আসতেই এক ঘন্টা৷”

“ফোন ধরলেনা কেনো?”

“সাইলেন্ট ছিলো মনে হয়, একটু আগে দেখলাম চার্জ নাই। ”

মা নিশ্চিত হয়ে আবার ঘুমুতে চলে যান। ওরা ফ্রেশ হয়ে খেয়ে শুতে যায় প্রায় একটায়।

আরমান বলে,
“কি আনলাম দেখবেনা?”
“না”
অভিমান করে বলে সে।
“কেনো?”
“আমার এমন সারপ্রাইজের দরকার নাই, যেটাতে আমি টেনশনে, ভয়ে মরি। ”

আজ প্রথম সারপ্রাইজ পেয়েও ইলা খুশি হতে পারেনা। ওর বুকটা এখনো ধুকধুক করছে।
“যদি খারাপ কিছু হতো!” ও ভাবতে চায়না বাকিটা।

ইলা বাতি নিভিয়ে দেবে ঐ সময় আরমান বলে,
“মোমবাতি জ্বালাবেনা?”

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত