পথচলার সাথী

পথচলার সাথী

বাবার বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে শশুরবাড়ি গেলাম।
সেখানে আমার বর আর শশুর থাকেন।আমার শাশুড়ি কয়েকবছর আগেই মারা গেছেন। বাড়িটা খুবই সুন্দর।বড় বড়
চারটা রুম।একটাতে আমার শশুর থাকেন,আরেকটা আমার বরের,মানে আজ থেকে আমাদের। বাকি দুটো ফাকাই
পরে থাকে। আমার বর আবির রায়হান।একটা কোম্পানিতে চাকরি করে।ভালো বেতন পায়। তার আর কোনো
ভাইবোন নেই।বাড়ির সামনেই অনেক সুন্দর একটা ফুলের বাগান। যেখানে হয়ত নানান রকম ফুল আছে।রাত থাকায় ততটা
ভালো করে দেখতে পারিনি। আর নতুন বউ এতো তাকাতাকি করা যায় নাকি! আমি যে এমন কোনো বাড়ির বউ হবো কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবিনি। কিন্তু আমার বরের ঘরে ঢুকে একটা জিনিস দেখে আমার বুকের মধ্যে কেমন খচখচ করতে লাগল। আর সেই জিনিসটা হচ্ছে স্ক্যাচ।

এটা কার হতে পারে! আমি ভাবতে লাগলাম। এই বাড়িতে আছেই আমার বর আর শশুর। তাদের দুজনেরইতো পা
ভালো।তাহলে এটা কার! হয়ত কোনো সময় কারো পায়ে সমস্যা হয়েছিল তাই আনিয়েছিল। কিন্তু এখনো এখানে কেনো!
এসব ভাবতে ভাবতেই আবির রুমে ঢুকল। আমি উঠে সালাম দিলাম। তিনি সালামের উত্তর দিতে দিতে যেখানে স্ক্যাচটা রাখা
আছে ওইদিকে এগিয়ে যাচ্ছে। উনি যতই স্ক্যাচের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আমার বুকের ভিতর ঢিপঢিপানিটা আরো বাড়ছে।
উনি চুপচাপ স্ক্যাচটা নিয়ে এসে বিছানার উপর বসলেন। আমি বুঝতে পারছি না এসব কি হচ্ছে। ডান পা থেকে জুতাটা
খুলতেই আমার কাছে সব স্পষ্ট হয়ে গেল। ওটা জুতা নয়!

নকল পা। হাটুর নিচ থেকে উনার ডান পা কাটা।
সেটা দেখে আমার মাথার উপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যেতে লাগল।
আমি ধপ করে বিছানার উপর বসে পড়লাম। আমার চোখ থেকে টপটপ করে কয়েকফোটা জল গড়িয়ে পড়ল।
শেষ পর্যন্ত আমার বাবা আমাকে না জানিয়ে এই কাজটা করল!
একটা পংগু ছেলের সাথে আমাকে বিয়ে দিল! অন্তত আমাকে জানাতে পারত। আর ছেলেটাও আমাকে কিছু জানালো না! আমি এতটাই খারাপ দেখতে!

হ্যা বাবাতো তার ঘর থেকে একটা বোঝা সরিয়েছে মাত্র। আপদ বিদায় করতে পেরেছে এই অনেক।
যেইখান থেকেই আমাকে দেখতে আসত,সেইখান থেকেই রিজেক্ট করে দিত।কারণ আমি দেখতে সুন্দরী নই! খাটো! শ্যাম গায়ের রঙ! ফর্সা নই! বাবাতো আজ বছরখানেক প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় পড়ে। আমার ভাই সবে এস এস সি দিবে। ওর পক্ষে বাবার ব্যবসা দেখা সম্ভব নয়। আমার এক দুঃসম্পর্কিত মামা বাবার ব্যবসা দেখে যা দেয় তাতে টেনেটুনে আমাদের সংসারটা
চলে যায়। কিন্তু সেই টাকায় আমার ভাই,ছোটবোন আর আমার পড়াশুনার খরচ চালানোটা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তাই
আমাকে তাড়ানোর এতো তাড়া ছিল বাবা-মায়ের। কেউ আমাকে দেখতে আসলে না হয় আমাকে পছন্দ করত না, আর না হলে আমার ছোটবোনকে পছন্দ করত।
আমার ছোটবোন নয়ন দেখতে ফুটন্ত একটা তরতাজা গোলাপের মতো।টুকটুকে চেহারা! যে কেউ দেখলেই পছন্দ করার কথা। আমার বিয়েটা দিতে পারলে নয়নের বিয়ে দিতে অতোটা বেগ পেতে হবেনা।
আমার চিৎকার করে কান্না করতে মন চাচ্ছে। নিজেকে পৃথিবীর আবর্জনা মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমার মতো মেয়ের কোথাও ভালভাবে বেচে থাকার অধিকার নেই।
যে বাবা-মা ছোটবেলা থেকে এতো আদরযত্ন করে মানুষ করল তারাও আমাকে ঠকালো! আচ্ছা আমাকে অন্তত
জানাতে পারত যে,তারা আমাকে একটা খোঁড়া ছেলের সাথে বিয়ে দিচ্ছে! আমি তাদের কাছে এতটাই যন্ত্রণাদায়ক
হয়ে পড়েছিলাম! আমি এসব ভাবছি আর আমার চোখ থেকে অঝরধারায় পানি গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
হঠাৎ খেয়াল করলাম যে,আবির আমার চোখের জলগুলো মুছে দিচ্ছে। আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি উনার কান্ড দেখে।
অচেনা একটি মেয়ে! বিয়ের আগে যাকে একবার দেখেছে, যার সাথে কখনো কথা হয়নি! তার চোখেরজল মুছে দেওয়ার কি এতো দরকার!

আমি তাড়াতাড়ি করে উনার পাশ থেকে সরে আসার জন্য উঠে দাঁড়ালাম।
আমার দেখাদেখি উনিও উঠে দাঁড়ালেন, তারপর বললেন যে, ” কি ব্যাপার, বাড়ির সবার কথা খুব মনে পরছে?”
উনার এই কথার কি জবাব দিবো বুঝতে পারছিলাম না আমি। উনি আবার বলতে লাগলেন,”চিন্তা করোনা। কালকেইতো
দেখতে পাবে সবাইকে।”
আমি হঠাৎ কর্কশভাবে বলে উঠলাম যে,
_আপনার যে একটা পা নেই,এটা আমার থেকে না লুকালেও পারতেন। আপনি আমার মতো একটা জঞ্জালকে বিয়ে করে আমার বাবাকে মুক্ত করেছেন এটাই আমার কাছে অনেক।

আমার কথা শুনে উনি হা হয়ে গেলেন।মুখ দিয়ে যেন একটা কথাও বেরুবে না এমন অবস্থা।উনার চুপ থাকা দেখে
আমার আরো রাগ হচ্ছে।আবার বলতে লাগলাম,
_কি হলো? আমাকে ঠকিয়ে আপনি জিতে গেছেন ভাবছেন! আমার বাবা-মাও নিশ্চয়ই জানেনা যে,আপনি খোঁড়া!
জানলে নিশ্চয়ই আপনার সাথে আমার বিয়ে দিতনা। বলেন!
জবাব দিন।
উনি তাড়াতাড়ি করে আমার মুখ চেপে ধরে বললেন,
_আস্তে কথা বলেন।বাবা শুনতে পাবে।
আমি আমার মুখ থেকে এক ঝটকায় উনার হাত সরিয়ে দিলাম।
রাগে আমার চোখমুখ লাল হয়ে গেছে।কান্না করতে করতে চোখগুলোও ফুলে গেছে। প্রচুর মাথাব্যথা শুরু হয়ে গেছে। আবার উনাকে বললাম,
_আমি যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দিন।
-আমি আপনার মাকে বারবার জিজ্ঞেস করেছিলাম যে,আপনি এই বিয়েতে রাজি আছেন কিনা। এটাও বলেছিলাম যে,যাকে
বিয়ে করব সে রাজি না থাকলে আমি বিয়েটা করব না। আপনার মা বলেছিলেন যে,আপনি নাকি রাজি। আপনার সাথেও আমি এই বিষয়ে কথা বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আপনার মা বারণ করেছিল। বলেছিল আপনি নাকি বিয়ের আগে আমার সাথে
কথা বলতে চান না।

আমি কি বলব বুঝতে পারছি না। আমার বাকশক্তি রুদ্ধ হয়ে আসছে। আমার মা কি করে পারল এটা। কেনো লুকালো
আমার থেকে এতবড় একটা কথা। নিজের মাকে আমি কি করে দোষারোপ করি। তাই চুপ করে রইলাম। উনি আমাকে
চুপ থাকতে দেখে চিন্তিত হচ্ছেন তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। উনি আস্তে আস্তে বললেন,
_আমাকে আপনার পছন্দ হয়নি? না হলে বলে দিতে পারেন।
এখনো সময় আছে। আমি আপনাকে জোর করব না।
_আমার না খুব ঘুম পাচ্ছে। একটু ঘুমাতে দিবেন প্লিজ। সারাদিন একটু ঘুমাতে পারিনি।
আমার কথা শুনে উনি নড়েচড়ে বসলেন বিছানার উপর। তারপর বললেন,
_হ্যা অবশ্যই।
তবে আমার কিছু কথা ছিল আপনার সাথে যদি আপনি শোনেনতো…
_পরে শুনব?
_না। আজকেই প্লিজ।
_ওকে বলুন।
_আচ্ছা সত্যি করে বলুনতো, আমার একটা পা নেই এটা জানার আগে আপনি যখন আমাকে দেখেছিলেন তখন কি
আমাকে পছন্দ হয়েছিল?
কথাটা শুনে আমার মনের মধ্যে কেমন যেন একটা উথালপাতাল শুরু হয়ে গেল। সত্যি কথা বলতে প্রথম দেখায় উনাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। এমন লম্বাচওড়া, শ্যামবর্ণ ছেলেকে যে কেউ পছন্দ করবে। শুধু খোড়া জন্যই হয়ত মেয়েরা রিজেক্ট করেছে।আমি কি বলব বুঝতে পারছি না। তবুও আমতা আমতা করে বললাম,
_ না মানে,আসলে…
আর কিছু বলতে পারলাম না। উনি হয়ত আমার মনের কথাটা বুঝতে পারল।তখন বলতে শুরু করল,
_আচ্ছা আমাদের বিয়ের পর যদি আমার এক্সিডেন্ট হত আর আমার পা টা কেটে ফেলা হত,তাহলেও কি আপনি আমাকে
ছেড়ে চলে যেতেন?

কথাটা শুনেই আমার ভাবোদয় হলো। আমার বাবার মুখটা আমার সামনে ভেসে উঠল। আজ এতদিন হয়ে গেল বিছানা
থেকে উঠতে পারেনা অথচ মা দিনরাত তার সেবা করে যাচ্ছে। কই মাতো বাবাকে ফেলে যাচ্ছেনা। আর যদি সত্যিই উনার সাথে বিয়ের পর এমন হত তাহলে নিশ্চয়ই আমি উনাকে ছেড়ে যেতাম না। যদিও একটা মেয়ে হয়ে বিষয়টা মেনে নেওয়া কষ্ট, কিন্তু তারপরেও মেনে নিতেই হবে। এটাই তকদীর। আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।
উনি এইবার বললেন,
_জানেন প্রথম আমিও খুব কষ্ট পেতাম। মেনে নিতে পারতাম না আমার একটি পা নেই। খুব কান্না করতাম। একদম
ভেঙে পরেছিলাম। আমার বাবা আমাকে শক্তি জুগিয়েছে,
আমাকে নতুন করে বাচতে শিখিয়েছে। আসলেইতো আমি ভালো আছি।আল্লাহতো আমার দুটি পাই নষ্ট করে দিতে পারতেন,জীবনটাও নিয়ে নিতে পারতেন,সেখানে আমি ভালভাবে বেচে আছি। আলহামদুলিল্লাহ।

কথাগুলো শুনে সত্যি আবার আমার চোখে জল চলে আসল। মানুষ কত কষ্ট করে বেচে থাকে আর আমরা তাদের পাশে না দাঁড়িয়ে তাদের থেকে দূরে যেতে চাই। তাহলে ওই মানুষগুলো কি করে বাচবে! নাহ! আমি এই মানুষটার পাশেই থাকতে চাই,সারাজীবন থাকতে চাই,যত বিপদই আসুক দুজন একসাথে মোকাবিলা করতে চাই,কারণ আজ থেকে এই আমার জীবনের অর্ধেক! আমার স্বামী।

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত