খুব ভাগ্যবতী

খুব ভাগ্যবতী

রাত ১২ টার বেশি বাজে,আমার রুমের বাকি সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, শুধু আমি একাই জেগে আছি। হঠাৎ আবিরের ফোনে আমি একটুও অবাক হইনি, কারণ আমি জানতাম যে, আবির কল দিবে। আজ সারাদিন ও আমার সাথে ভালো করে কথা বলেনি, ব্যস্ত আছি বলেই ফোন কেটে দিয়েছে, তারপরেও আমি অনেকবার কল করেছি রিসিভ করেনি। আশা ছিল যে,সন্ধ্যার পর হয়ত কল করবে, কিন্তু এতক্ষণে কল করল বলে আমার খুব রাগ হচ্ছে, ফোন রিসিভ করতে ইচ্ছে করছে না।

আমাকে ইগনোর করার একটাই কারণ, আমি ওর সাথে রুমডেটে রাজি হচ্ছিনা। কিন্তু আর নয়! যা হওয়ার হবে, আমি কালকেই ওর স্বপ্ন পুরণ করব। তারপর আমার যা হয় হবে! ওকে প্রচন্ড ভালবাসাটা যদি আমার ভুল হয়ে থাকে, তাহলে সেই ভুলের মাশুলটাও না হয় আমিই দেব!

এসব ভাবতে ভাবতেই এক প্রকার জিদ নিয়েই ফোনটা রিসিভ করলাম।
_হ্যা বলো। সময় হয়েছে তাহলে ব্যস্ত মানুষের!(আমি)
_শোনো নীলিমা, একটা খুব ভালো খবর আছে।(আবির)
_কি আর ভালো খবর থাকতে পারে! আজ সারাদিন অনেক বিরক্ত করেছি, সরি।
_তোমার এই একটা স্বভাব গেলো না! একটু কিছু হলেই অভিমানে গাল ফুলিয়ে বসে থাকবে। আমি কখনো তোমায় বলেছি যে, তোমাতে আমি বিরক্ত।
_কিছু কথা বলতে হয়না,বোঝা যায়।
_হ্যা তুমিতো সব বুঝতে পারো। মেজাজটাই খারাপ করে দিলে।
_আচ্ছা কি বলবে বলো..
_কাল ক্যাম্পাসে যাচ্ছি, তোমার জন্য একটা সু-খবর আছে।
_তোমার কাছে আবার আমার জন্য কি ভালো খবর থাকতে পারে শুনি!
_সারপ্রাইজ! কাল সামনাসামনি বলব। ঘুমাও,শুভ রাত্রি!
_হুম। আর হ্যা, কাল তোমার জন্যও একটা সারপ্রাইজ আছে।
_ওহ! তাই নাকি! অপেক্ষায় রইলাম।
_হুম।শুভ রাত্রি।
অনেকটা অভিমান নিয়েই আবিরের সাথে কথাগুলো বললাম। ও জানে আমি এখন অনেক অভিমান করে আছি, বেশিক্ষণ কথা বললে উল্টাপাল্টা বলতে শুরু করব, তাই তাড়াতাড়ি ফোনটা রেখে দিলো।

তবে কাল ও আমাকে কি সারপ্রাইজ দিবে এটা আমাকে খুব ভাবাচ্ছে। কে জানে আসলেই খবরটা আমার জন্য ভালো না খারাপ!
সকালে উঠতে দেরি হয়ে গেলো, রাতে ভালো ঘুম হয়নি বলে সকালের দিকে ঘুমিয়ে পরেছিলাম। ঘুম ভাঙল অনিকের ফোন পেয়ে। আমি ঘুম জড়ানো কন্ঠে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে অনিকের ঝাড়ি শুনতে পেলাম,,,
_কিরে ৮ টা বাজতে চলল তোর এখনো খবর নেই! আমরা ক্যাম্পাসে চলে এসেছি, তুই তাড়াতাড়ি চলে আয়, মিলন স্যার আজ দেখা করতে বলেছে ভুলে গেছিস!

আসলেইতো! এই আবিরের জন্য ইদানীং আমি সবকিছু ভুলে যাই, ছেলেটা আমাকে পাগল করে ছাড়বে!
তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে কিছু খাওয়ার তোয়াক্কা না করেই ক্লাসের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়লাম।
ক্লাস শেষে দেখি আবির কয়েকবার ফোন করেছিল, বাড়ি থেকেও ফোন করেছে। আমি প্রথমেই আবিরকে ফোন করলাম, ও জানালো যে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে ও রওয়ানা দিয়েছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাবে।
আমি তাড়াতাড়ি রুমে এসে আগে গোসল করে নিলাম, ক্যান্টিন থেকে তাড়াহুড়ো করে কি খেয়েছি না খেয়েছি আবার ক্ষুধা লেগে গেছে।
ফোনটা হাতে নিতেই মনে পড়ল যে, বাড়িতে কল করতে হবে। কল করতেই আম্মু ফোন রিসিভ করল,,,
_হ্যালো নিলু, কেমন আছিস মা?
_হ্যা ভালো। তোমরা কেমন আছো? বাবা কেমন আছে?
_তোর বাবার অবস্থা তেমন একটা ভালো না। আর তোর চিন্তায় আমি ভালো থাকি কি করে বল।
_শোন মা, তোমাকে না কতবার বলেছি যে, আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে হবেনা। আমি ক্লাসে ছিলাম, তাই ফোন ধরতে পারিনি।
_ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করিস। কাল তোর ছোট মামা এসেছিল, একটা ভালো সম্বন্ধ এনেছে, ছেলে….
_আচ্ছা মা, পরে কথা হবে। আমার একটু কাজ আছে।বাই
_নিলু…..
মাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফোনটা কেটে দিলাম। ইদানীং বাবা অসুস্থ হওয়ায় সারাক্ষণ বিয়ে বিয়ে করে আমার মাথা নষ্ট করে ফেলে। আমার বিয়ে না দিলে নাকি তাদের শান্তি নেই, আর এইদিকে আবির….ওর কথা ভাবতে না ভাবতেই দেখি ও কল করেছে।
_হ্যা বলো।
_আমি ক্যাম্পাসে চলে এসেছি, তুমি কোথায়?
_আচ্ছা কয় মিনিট সময় দাও,আমি এক্ষুণি তৈরি হয়ে আসছি।
_এখনো তৈরি হওনি! আমি এতদূর থেকে চলে আসলাম,আর তুমি….
_আরে ক্লাস ছিলোতো, আর আমি আসছি। জাস্ট ১০ মিনিট।
_ওকে। একটু তাড়াতাড়ি করো,আমাকে আবার ফিরতে হবে।
_আচ্ছা।

কয়েক মিনিটের মধ্যে চুলটা চিরুনি করে ড্রেসটা চেঞ্জ করে আমার কফি কালারের থ্রী-পিছটা পড়লাম। চোখে হালকা করে শুধু একটু কাজল দিলাম। এর মধ্যে আবির আরো কয়েকবার ফোন করল।

আমি তাড়াতাড়ি করে ক্যম্পাসে গিয়ে দেখি আবিরের যেখানে থাকার কথা সেখানে নেই। আমি ওকে ফোন করে ওখানেই ওয়েট করতে লাগলাম। হঠাৎ আমার কাল রাতের কথা মনে পড়ে গেলো, আমি আবিরকে যে সারপ্রাইজটা দিতে চাচ্ছি তা কি ঠিক হবে! ও যদি পরে আমাকে আর ভালো না বাসে! বাড়িতে কি বলব! আমি এই মুখ কাউকে দেখাতে পারব! নাহ! নিজেকে দরকার হয় শেষ করে দিবো!

এসব ভাবতে ভাবতে কখন আবির আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতেই পারিনি। ওর হাতে একগুচ্ছ লাল গোলাপ। গোলাপ দেখে আমার খুশি হওয়ার কথা, কিন্তু আমি ঘামছি! প্রচুর ঘামছি!
_কি ব্যাপার! ফুলগুলো পছন্দ হয়নি!
আমাকে ফুলগুলো দিতে দিতেই আবির কথাটা বলল। আমি ফুলগুলো নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছি, কীভাবে আবিরকে বুঝাবো যে, আমার মনের মধ্যে কি চলছে! আপাতত ফুলগুলো নিয়ে মুখে একটা হাসি টেনে নিয়ে বললাম,
_কি সু-খবর আছে বললে নাতো!
_আরে এতদিন পর তোমার সাথে দেখা করতে আসলাম, আর তুমি এভাবে কথা বলছ কেন? কি হয়েছে? তুমি ঠিক আছোতো?
_হুম। একদম ঠিক আছি। বলো না, কি বলবে, আমার আর সহ্য হচ্ছেনা।
_হুম। বলবতো, তার আগে তুমি নাকি কি সারপ্রাইজ দিবে! সেটা আগে, লেডিস ফার্স্ট!
_নাহ! তুমি আগে বলো।
_উঁহু। হবেনা। বলো….
আমি জানি আবির আমার থেকে না শুনে কিছুতেই খবরটা দিবে না। তাই বাধ্য হয়ে আমিই বললাম..
_আজ তুমি আমাকে যেখানে নিয়ে যাবে,আমি সেখানেই যাব।
_মানে! কি বলছ এসব! কোথায় যাবে বল, আমি নিয়ে যাচ্ছি।
_না মানে, তুমিতো এটাই চাও না, যে আমিমি তোমার সাথে রুমডেট….

আমার কথাটা শেষ হতে না হতেই,আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই আবির ঠাস করে আমার গালে এক চড় বসিয়ে দিলো। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না কি বললাম! কি হলো! আর কি হতে যাচ্ছে!

আশেপাশে অনেকেই আমাদের দেখছে। আমার চোখ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। আবিরের চোখ দুটোও দেখলাম লাল হয়ে গেছে, তবে সেটা কান্নার জন্য নয়, বরং ও রেগে গেছে। কারণ ও রেগে গেলে ওর চোখ এমন রক্তবর্ণ হয়ে যায়।

আমি একদম চুপ হয়ে আছি। কি বলব আর কি করব কিছুই বুঝতে পারছি না।
আবির নিজের রাগটাকে একটু কন্ট্রোল করল। আমি তখনো চুপচাপ কেঁদেই চলেছি।
_নীলিমা তুমি কি পাগল হয়ে গেছো! আবোলতাবোল বকছ!
_আমি পাগল নাহ! তুমিইতো সব সময় বলো।
_আরে বোকা মেয়ে আমিতো তোমাকে রাগানোর জন্য বলি। এতদিনে তুমি আমাকে এই চিনলে! আমি অন্যসব ছেলেদের মতো নই!
_কালকেওতো আমায় ইগনোর করছিলে! তুমি জানোনা তোমার অবহেলা আমি একদম সহ্য করতে পারিনা।
_আচ্ছা এরপর আমি যদি তোমার সাথে আর সম্পর্ক না রাখি তখন কি করবে!
_মরে যাব!
আবির এইবার আমার মুখে হাত দিয়ে ধমক দিয়ে বলতে লাগল…
_তোমার মতো পাগলী মেয়েদের জন্যই ছেলেরা সুযোগ পায়! যে ছেলে সত্যিকারের ভালবাসে তার এসবের দরকার হয়না, বিয়ে পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করতে জানে। আর কখনো এইসব কথা বলবেনা।
_তাহলে কাল ভালো করে কথা বললে না কেনো!
_কাল আমি বিজি ছিলাম।
_কিসের এতো বিজি! আমি জানি!
_ঘোড়ার আন্ডা জানো! তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম।
_কিসের সারপ্রাইজ! না বললে জানব কীভাবে!
_তোমাকে একটা চাকরির কথা বলেছিলাম না, কাল ওই চাকরির ইন্টার্ভিউ ছিলো।
_সত্যি! কি হলো, জানালে নাতো! হয়নি নিশ্চয়ই কিছু?
_সব সময় নেগেটিভ ভাবো কেনো! পজিটিভ ভাবতে পারো না!
_তার মানে চাকরিটা!!!!
_হুম।

খুশিতে আমি পুরো আত্মহারা হয়ে গেছি। নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। কি ভেবে এখানে আসলাম! আর কি শুনছি! কি হচ্ছে এসব আমার সাথে! বাড়ি থেকে বিয়ের কথা বলছে জানাতেই আবির একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল যে, ওর চাকরিতে জয়েনের পর একটু সেটল হলেই আমাদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে।

নিজেকে সত্যি আজ খুব ভাগ্যবতী মনে হচ্ছে! আসলেই সব ছেলেরা এক হয়না! আর এতে আমাদের মেয়েদেরও সমান দোষ! আমি আবিরের মতো এমন কাউকে জীবনে পেয়েছি ভাবতেই কেমন গর্ব অনুভব করছি!

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত