তৃপ্তির হাসি

তৃপ্তির হাসি

তখন আমার বয়স মাত্র ১৭ স্কুল শেষ করে কলেজে উঠেছি, তাতেই বিয়ের জন্যে একের পর এক ছেলে দেখা শুরু। দেখতে খুব একটা সুন্দর ছিলাম না, তবে খুব একটা খারাপও না। বাসা থেকে একটা ছেলে পছন্দ করলো আমার জন্যে, ছেলে বললে ঠিক হবে কিনা জানিনা , বয়স তার পঁয়ত্রিশ ছুঁইছুঁই । এক প্রকার জোর করেই বিয়ে সারা হলো। আমি কেঁদে ব্যাকুল। বাসর রাতে কান্নায় মেকাপ ধুয়ে পেত্নী হয়ে বসেছিলাম। সে ঘরে ঢুকতেই কেঁদে কেটে শত অভিযোগ জানালাম তাকে তার বিরুদ্ধেই। সে চুপচাপ শুনে ঘুমিয়ে পরলো, যন্ত্র একটা যেনো। আমিও কখন জানি ঘুমিয়ে পরলাম। সকালে ঘুম ভেংগে দেখি সাত টা বাজে। বাসা ভরতি মানুষ ছিলো কালকে রাতে আজকে যেনো ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। বের হয়ে দেখি পুরো বাড়িতে দুজন মহিলা ছাড়া আর কেউ নেই। মহিলা দুজন ওর চাচি,তারাও যাওয়ার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। মানে কি! আর কেউ নেই? এই লোকটার সাথে একা থাকতে হবে আমার? দেখতে দেখতে এক সপ্তাহ কেটে গেলো, আমার কাজ শুধু রান্না করা আর খাওয়া, লোকটার সাথে একদমই কথা বলি না, কেমন যেনো টোস্ট বিস্কুট টাইপ লোক একটা, বর বলে মনেই হয় না। আমাকে আবার আপনি আপনি করে বলেন তিনি!

সেদিন ছিলো পহেলা বৈশাখ, আমি রান্না শেষ করে ঘরে গেলাম, বিছানার উপর দেখি একখানা লাল পেরে সাদা কাপড় আর এক শিশি আলতা। উঁকি মেরে দেখি বারান্দায় বসে মশাই পত্রিকা পরছেন । মনে মনে হাসলাম, ভেংচি কেটে বললাম “এহ বুড়োর সখ দেখো!” ঠিক সন্ধে বেলা জানিনা কেনো ইচ্ছে করলো বুড়োটার সখ পূরণ করি । শাড়ি পরে আলতা মেখে দরজা বন্ধ করে পুরো সন্ধ্যা বসে থাকলাম ঘাপটি মেরে। কি আজব! আমার এতো লজ্জা লাগছে কেনো! আটটার দিকে দরজা খুলে বের হলাম, উনি তখন টিভি দেখছে। আশেপাশে হাটছি তাও তাকিয়ে দেখছে না। ভীষন রাগ হলো, গাল ফুলিয়ে বসে থাকলাম বারান্দায় । তখন ফোনে ম্যাসেজ এলো একটা, দেখি তার ম্যাসেজ, “বাইরে যাবেন?” তার নাম্বার টা আমার ফোনে খবিশ দিয়ে সেভ করা । দেখে ভীষণ খারাপ লাগলো । চেঞ্জ করে রাসেল দিয়ে সেভ করলাম । ওহহ বলাই হয়নি, উনার নাম রাসেল । আমি ম্যাসেজের রিপ্লাই দিলাম, “এতো রাতে?” উনি রিপ্লাই দিলেন, ” ৯ টা বাজে মাত্র” আমি আর কথা বাড়ালাম না, চুপচাপ উনার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম । রাস্তায় নেমে দেখি কতো গুলো কপোত কপোতী তখনও হাতে হাত ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, বাহারি সাজগোজ । আমি শুধু একটু কাজল পরেছিলাম, মনে মনে ভাবলাম আর একটু সেজে নিলেই পারতাম । বাইরে সব প্রেমিক জুটি দেখে আমারও ইচ্ছে করছিলো তার হাত টা ধরি, কিন্তু লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছিলাম এটা ভাবতেই। উনি আমার হাত ধরে রাস্তা পার করে দিলেন, অদ্ভুত একটা ভালোলাগা কাজ করছিলো তখন। কিন্তু রাস্তা পার হতেই মন টা খারাপ হয়ে গেলো, উনি আমার হাত টা ছেড়ে দিয়েছেন । কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে বাড়ি ফিরলাম । যখন সোডিয়াম লাইটের আলোয় এক পা দুই পা করে এগুচ্ছি দুইজন, মনে হচ্ছিলো এই মূহুর্ত টার অপেক্ষা যেনো কতো যুগ ধরে করে আসছি। বাতাসে এলোমেলো ভাবে চুল উড়ছিলো। আমি জানতাম উনি এসে চুল গুলো ঠিক করে দিবেন না, তবুও ভালোবাসতে ইচ্ছে করছিলো তাকে। জানি না তারপর থেকে কি হলো, উনি যখনই চোখের আড়াল হোন তখনই অস্থির লাগতো । উনার শরীরের গন্ধ পেলেই মনে শান্তি লাগতো । উনার শার্ট, রুমাল, চশমা এগুলো ছুঁতে ভালো লাগতো। শুধু ভাবতাম, এই বুড়ো লোকটাকে ভালোবাসি আমি? উনি পাশে থাকলে কেমন একটা স্বস্তি হতো, ভরসা পেতাম। লুকিয়ে লুকিয়ে তার চায়ের কাঁপে চুমুক দিতে ভালো লাগতো। এইভাবে কেটে যেতো দিন। কখন কিভাবে যে আমি তার প্রেমে পরে গেছি বুঝতেই পারিনি। সে ও আমাকে একটু দেখতে না পেলেই অস্থির হয়ে উঠতো। অফিস থেকে ফেরার পথে জিজ্ঞেস করতো ফোন করে, কিছু লাগবে কিনা।

আমাদের প্রেম টা রোমান্টিক ছিলো না, ছিলো ভালোবাসার, ভরসার, পূর্নতার। বয়সের পার্থক্য ছিলো অনেক। নাহ আমি তাকে কখন ইয়াং বানানোর চেষ্টা করিনি, তাকে তার মতো করেই ভালো বেসেছি। সাদামাটা ড্রেস, চোখ চশমা, কাঁচাপাকা চুল, এইতো ছিলো আমার উনি। দুইবছর পর আমাদের একটা মেয়ে হয়, উনি যেনো মেয়ের সাথেসাথে নিজের ছোটবেলাও ফিরে পেলেন। একদিন কি যেনো একটা বিষয় নিয়ে আমি খুব রাগ করলাম, মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে গেলাম সন্ধে বেলা । রাত নয়টার দিকে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছি, দেখলাম রাস্তায় একটা লোক পরিচিত ভংগিতে পায়চারি করছে । দৌড়ে নিচে নামলাম, রাস্তায় গিয়ে দেখি উনি দাঁড়িয়ে আছে। শার্ট ঘামে ভেজা, আমাকে দেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উলটো দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে পকেটে হাত ঢুকিয়ে কিছু খুঁজছে। আমি উনার পাশে গিয়ে আমার ওড়নাটা একটুখানি এগিয়ে দিলাম। উনি বললেন “তোমাকে ছাড়া রুমাল টাও খুঁজে পাই না আর তুমি আমাকে একা রেখে চলে এলে? ” বলেই ওড়না নিয়ে চোখ মুছতে লাগলেন । উনার কথা শুনে আমিও কেঁদে দিলাম। উনি পকেট থেকে একটা চকোলেট বের করে বললেন, চকোলেট দিয়ে নাকি রাগ ভাংগানো যায় তাই নিয়ে এসেছি। আমি উনার পেটে একটা গুতো মেরে বললাম হইছে আর প্রেম দেখাতে হবে না। তারপর মেয়ে কে নিয়ে বাসায় ফিরে আসলাম। উনি কথা বলতেন অল্প, আমি একটু বেশিই বলতাম। আমরা কখনও এককাপে দুজন মিলে চা/কফি খাইনি। কখনও বৃষ্টি হলে একসাথে ভিজিনি, হয়তো আমি একা একা ভিজতে যেতাম। কখনও একটা রাত জ্যোৎস্না দেখে কাটিয়ে দেইনি। ধরাবাঁধা নিয়ম অফিস , বাজার ,রান্নাবান্না, ছুটির দিনে মেয়েকে নিয়ে একটু ঘুরতে যাওয়া , তার এক কোলে মেয়ে আরেক হাতে আমার হাত ধরে রাস্তা পার করে দেওয়া, এইতো ছিলো আমাদের জীবন । রোমান্টিকতা বেশি বেশি কিছু ছিলো না। কিন্তু যেদিন আমার বাচ্চা হয়েছিলো, বাবার কাছে শুনেছিলাম উনি নাকি এক মূহুর্ত হসপিটাল থেকে বের হন নি। এমন কি নামাজও সেখানেই পড়েছিলেন ।

বিয়ের পর মনে হতো বাবা মা আমাকে বুঝি জলেই ফেলে দিলেন, এখন বুঝি এটা জল নয়, জান্নাত ছিলো। আজকে আমাদের মেয়ের বিয়ে, আর লোক টা সকাল থেকে কোথায় যে হাওয়া হয়ে গেলো। ছাদে গিয়ে দেখি চিলেকোঠার ঘরে বসে আছে, আমাকে দেখে তারাহুরা করে পকেটে হাত ঢুকিয়ে কি যেনো খুঁজছে । আমি আঁচল এগিয়ে দিয়ে বললাম এই যে চলুন এইবার নিচে, উনি চোখ মুছে বললেন, মেয়েটা চলে যাবে? আমি হেসে বললাম, এটাই তো নিয়ম । উনি বললেন, কতো যত্নে বড় করেছি কতো আদরের মেয়ে আমার, জানি না কেমন থাকবে শ্বশুর বাড়ি গিয়ে আমাদের ছেড়ে। আমি বললাম ভালোই থাকবে, আমিও তো এসেছিলাম সব ছেড়ে। উনি বললেন “তোমাকে ভালো রাখতে পেরেছিলাম আমি?” আমি উনার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিলাম, তৃপ্তির হাসি।

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত