বনশ্রী

বনশ্রী

বিছানার ঠিক মধ্যখানে বসে আছে বনশ্রী। লাল টুকটুকে শাড়ি পরা। গলায় ভারি দামী দামী গহনা। বিছানা ফুল দিয়ে সাজানো।
ঘরের এক কোণে একটা অলমারী, তারপাশে একটা ডেসিংটেবিল। একপাশে একটা চেয়ার, টেবিল, আর একটা কম্পিউটার। তারপাশে রাখা কিছু বই।
ঘরটাকে ভালো করে দেখছে বনশ্রী। এই ঘরেই কিছুক্ষণ পর শুরু হবে একটা ভয়ানক আত্ম চিৎকার। শুরু হবে গোঙ্গানির সুর। ভাবতেই তাঁর গায়ে ঘৃণার জন্ম হয়। বাসর রাতেই মানেই তো দুইটি শরীরের মিলন মেলা।এই বিয়েতে তাঁর কোনো মত ছিলোনা। মা বাবার ইচ্ছেই বিয়েটা হয়েছে। তাঁর ইচ্ছে ছিলে পড়ালেখা শেষ করার। নিজের পায়ে দাঁড়াবে। তারপর অন্য সকল চিন্তা।
তাঁর মনে জ্বালানো আগুনের মধ্যেই পানি ঢেলে দিলেন তাঁর বাবা। সবে মাত্র মাধ্যমিক পাস করে কলেজে ভর্তির হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সে।
কিন্তু এর মধ্যেই বাবা ঠিক করে ফেল্লেন। তিন দিনের মধ্যেই বিয়ের সকল আয়োজন। তাঁর বয়স এখনও আটারোও হয়নি, তাঁর বাল্যবিবাহ দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু এটা সে কাউকে বলতে পারছেনা।
এমনকি সে পুলিশ কেও জানাতে পারছেনা।ঘর থেকে সে বের হতে পারছেনা।
গায়ে এত ভারী গহনা, আর এত দামী শাড়ি পরে থাকতে যেন তাঁর কষ্ট হচ্ছে।
ইচ্ছে করছে সব খুলে ফেলতে।কিন্তু পারছেনা।চিন্তার ব্যঘাত ঘটিয়ে দরজা খোলে কেউ একজন আসছে বনশ্রীর কাছে। বনশ্রী বুঝতে পেরেছে এটাই তাঁর স্বামী।
বিয়ের সময় একনজর দেখেছিলো সে। মাথায় পাগড়ি পরা অবস্থায়। তখন আর এখনের মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকার কারণে তাকে চিনতে পারছেনা।
লোকটি বিছানায় এসে বসলেন। বসে বললেন- বনশ্রী তোমার যদি শাড়ি পরে থাকতে অসুবিধা হয়, তাহলে তুমি আলমারীতে রাখা জামকাপড় পরতে পারো। এগুলো আমার হবু বউয়ের জন্য কিনে রাখা।
লোকটির নাম সে একবার শুনেছে। লোকটির নাম হলো রুদ্র।
রুদ্রের কথা শুনে বনশ্রী কিছুটা চমকিয়ে উঠলো।
বনশ্রী কিছু না বলে আলমারী থেকে জামাকাপড় বের করে বাথরুমে গিয়ে চেইঞ্জ করে আসলো।
রুদ্রও নিজের কাপড় পাল্টে ফেললো।
বনশ্রী বিছানার একপাশে এসে বসে আছে, অন্য পাশে রুদ্র।
রুদ্র বনশ্রীকে বললো- আজ তো আমাদের বাসর রাত।আমার দুজন দুজনের মনের সাথে সাথে শরীরেরও বিনময় করবো।
বনশ্রী নীরব।-তুমি ভয় পেয়ো না বনশ্রী। আমি তোমার অমতে তোমার শরীরে টাসও করবো না।এবার যেন বনশ্রীর ভিতর বিশ্বাস এসে স্থাপন করতে শুরু করল। রুদ্র ইচ্ছে করলে বনশ্রীর সাথে জোর করতে পারতো। এত কথা বলার কি দরকার। তবুও যখন এসব কিছু না করে, তাঁর অনুমতি নিচ্ছে। নিশ্চয়ই সে ভালো ছেলে হবে।বনশ্রী ধীরে বললো – হুমম।- হুট করে বিয়ে হওয়াতে তোমার সাথে কথা বলাও হয়নি। তোমাকে তেমন দেখাও হয়নি জানাও হয়নি। এই বিয়েতে কি তোমার মত ছিল?বনশ্রী এবার দ্বিধায় পড়ে গেলো। কি বলবে সে বুঝতে পারছেনা। বিয়েটা তো তাঁর অমতেই হয়েছে। কিন্তু এখন যেন বলতে ইচ্ছে করছেনা। যে বিয়েটা তাঁর অমতে হয়েছে, এতে রুদ্র কষ্ট পাবে। আবারও বনশ্রী চুপ হয়ে রইলো।- দেখে বনশ্রী, আমি পরিবারের বড় ছেলে। আর তুমি সেই পরিবারের বড় বউ। তাই তোমার উপর দ্বায়িত্ব বেশী থাকবে। তোমাকেই এই সংসার চালাতে হবে। হয়তো সব সময় সবটা তুমি নাও পেতে পারো। তোমার যদি কিছু চাওয়ার থাকে, তাহলে আমার থেকে চেয়ে নিতে পারো। আর এখন যদি তোমার কিছু বলার থাকে তাহলে আমাকে বলতে পারো।বনশ্রী এবার মুখ ফুটে বলেই ফেলল- আমি আরো পড়ালেখা করতে চাই।- পড়ালেখা করতে চাও।বনশ্রী এবার রুদ্রের সামনাসামনি বসে কথা বলছে – দেখুন আমার এই বিয়েতে কোনো মত ছিলোনা। আমার ইচ্ছে ছিলো পড়ালেখা শেষ করে নিজের পা’য়ে দাঁড়িয়ে তাঁরপর বিয়ের চিন্তা করবো। কিন্তু বাবার কথায় আমি আর কিছু বলতে পারিনি।
এখন আপনি যদি আমাকে সুযোগ দেন, তাহলে আমি আবার লেখাপড়া শুরু করবো।- দেখে বনশ্রী, তুমি পরিবারের বড় বউ। তোমার উপর কাজ বেশী থাকবে। তুমি কি পারবে পড়ালেখা করে ঘর সামলাতে?- হুমম পারবো।- তুমি যদি কষ্ট সহ্য করতে পারো তাহলে আমার কোনো আপত্তি নাই।- আমি সব পারবো।- তোমাকে সাহায্য করার জন্য আমার যা দরকার আমি সব করবো।- আমাকে কলেজে ভর্তি করিয়ে দিতে হবে।- হুমম।বনশ্রী এবার বিছানা থেকে উঠে গিয়ে সোজা রুদ্রকে জড়িয়ে ধরলো। আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করলো। বনশ্রী বিশ্বাস করতে পারছেনা, যে তাঁর স্বামী এত তাড়াতাড়ি সবকিছু মেনে নিবে। এই কান্না তাঁর দুঃখের কান্না না। এটা তাঁর সুখের কান্না। রুদ্রও তাকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। পরম মমতায় বনশ্রীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
শুরু হলো বনশ্রীর নতুন জীবন। একজন স্ত্রীর জন্য সবচে বড় পাওয়া হলো একজন ভালো স্বামী।[ একটা ভালো বর আর একটা ভালো ঘর সবার ভাগ্যে জুটে না।
ভালো থাকুক ভালবাসা, ভালো থাকুক ভালবাসার প্রিয় মানুষগুলো ]

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত